অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশে আসার শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না বুদ্ধদেব গুহের


বুদ্ধদেব গুহ

দুই বাংলায় সমানভাবে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের শেষ ইচ্ছা পূরণ হলো না। আসা হলো না বাংলাদেশে। দেখা হলো না বাংলাদেশের বরিশাল ও রংপুরে ছোট বেলার স্মৃতিঘেরা স্থানগুলো। রবিবার রাতে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে রাত সাড়ে ১১টায় হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। চলতি বছর এপ্রিলে তিনি করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। ৩৩ দিন পর করোনা মুক্ত হন। কিন্তু তারপর থেকে শরীরটা ভালো যাচ্ছিল না। অবস্থার অবনতি হতে থাকে। ৮৫ বছর বয়সী প্রবীণ এই লেখক এমনিতে দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ ছিলেন। শ্বাসকষ্টজনিত সমস্যা ছাড়া লিভার ও কিডনি জটিলতা দেখা দিয়েছিল। পরে মূত্রনালিতেও সমস্যা ধরা পড়ে।

পেশায় তিনি ছিলেন একজন চাটার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট। অরণ্যপ্রেমী হিসেবে খ্যাত এই লেখক খুব ধোপদুরুস্ত চলতে পছন্দ করতেন। তিনি অন্য গড় বাঙালি লেখক সাহিত্যিক কবিদের মতো ছিলেন না। টেনিস খেলতেন, টালিগঞ্জ রাইফেল ক্লাবে গিয়ে শুটিংয়ের প্র্যাকটিস করতেন। বন্দুক নিয়ে জঙ্গলে যেতেন শিকারে। রাতে ক্লাবে গিয়ে আড্ডা দিতেন। শহরে মানুষদের নিয়ে স্পষ্ট কথা বলতেন। তাঁর চলাফেরাতেই আলাদা একটা ভাব ছিল। লেখক জীবনের শুরুও অনেক দেরিতে। বুদ্ধদেব গুহের প্রথম বই ছিল জঙ্গলমহল। তারপর দুই হাত ভরে লিখে গেছেন, মাধুকরী, কোজাগার, একটু উষ্ণতার জন্য, চাপরাশ, অববাহিকা, বাবলি, কুমুদিনীর মতো জনপ্রিয় অনেক উপন্যাস। কিশোর সাহিত্যের বিখ্যাত চরিত্র ঋজুদা ও ঋভু তাঁর সৃষ্টি। সাহিত্য জগৎকে অন্য মাত্রায় নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। লেখায বিষয়বস্তুু, নায়ক, নায়িকাদের চরিত্রগুলো সব সময় ব্যতিক্রম থাকত।

২০১৯ সালের শেষ দিকে বুদ্ধদেব গুহের সঙ্গে ভোয়া প্রতিনিধির সর্বশেষ সাক্ষাতের সময় বাংলাদেশ নিয়ে অনেক কথা বলেন। তিনি আক্ষেপ করছিলেন বাংলাদেশে দীর্ঘদিন বিভিন্ন কারণে না আসতে পারা নিয়ে। আমন্ত্রণ জানাতেই বললেন, অবশ্যই যাব। তারপর বললেন, নিয়ে যেতে হবে প্রিয় শহর রংপুর ও বরিশালে। কেন এই দুই শহর প্রিয় জানতে চাইলে বলেন, ছোট বেলায় বাবার চাকরির সূত্রে বরিশাল ও রংপুরে একটা বড় সময় কাটিয়েছিলাম। আহা বরিশালের সেই নদী, গাছপালা এখনো টানে। মনে হয় দৌড়ে ছুটে যাই এখনই। আ হা সেই সব দিন। রংপুরও ছিল অন্য রকম একটি শহর। ছুটে বেড়াতাম স্কুল থেকে খেলার মাঠে। তিনি বললেন, বাংলাদেশে যাবই। ২০২০ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকার একটি জাতীয় দৈনিকের অনুষ্ঠানে তাঁকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন। এরপর করোনা পরিস্থিতির কারণে তাঁর আর ঢাকা আসা হলো না। ফোনে তিনি বলেছেন, পরিস্থিতি বদলালে ঢাকা আসব মেয়েকে নিয়ে। তারপর যাব আমার দুই শহরে। ছোটবেলার স্মৃতির শহরে ঘুরে বেড়াব। হাঁটব, বাতাসের গন্ধ নেব, অনুভব করব এইখানে আমার প্রথম জীবন কেটেছে নানা রকম আড্ডায়, খেলায়, আনন্দে।

শেষ বয়সে গ্লুকোমার কারণে দৃষ্টি শক্তির সমস্যা ছিল। এই কারণে লেখালেখি করতেও সমস্যা হতো। তবে, তার মনোবল সব সময় চাঙা থাকত। বয়সজনিত সমস্যাতে উপেক্ষা করে করোনাকালের আগেও ক্লাবে গিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমাতেন। বুদ্ধদেব গুহের মৃত্যু সংবাদে বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে অনেকে শোক প্রকাশ করেছেন।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ মোদি শোক বার্তায় লিখেছেন, তাঁর লেখা ভীষণ জনপ্রিয়,বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের কাছে। তাঁর মৃত্যু সহিত্য জগতের কাছে অপুরণীয় ক্ষতি। তার পরিবার ও গুণমুগ্ধদের প্রতি সমবেদনা জানাই।

কথা সাহিত্যিক বুদ্ধদেব গুহের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে জানানো হয়, প্রয়াত লেখকের আত্মার শান্তি কামনা করে তিনি শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন।

এইদিকে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানর্জি অপর এক বার্তায় শোক প্রকাশ করেছেন বুদ্ধদেব গুহের মৃত্যুতে। তিনি শোক বার্তায় লিখেছেন, বাংলার অন্যতম লেখকের মৃত্যুকে গভীর শোকাহত। বাংলা সাহিত্যে অনেক কীর্তি রেখে গেলেন এই লেখক। তাঁর পরিবার ও অনুরাগীদের প্রতি স্বান্তনা জানাই।

XS
SM
MD
LG