অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

১৯৫৭ সাল থেকে মানসিক রোগীদের সেবায় নিবেদিত ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’


পাবনা মানসিক হাসপাতাল ভবন

মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য বাংলাদেশের একমাত্র বিশেষায়িত হাসপাতাল ‘পাবনা মানসিক হাসপাতাল’। হাসপাতালের তথ্যে জানা যায়, ১৯৫৭ থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত সেখানে আবাসিক রোগী ভর্তি হয়েছেন ৮৬ হাজার ৪১৯ জন। তাদের মধ্যে ছাড়পত্র নিয়ে বাড়ি ফিরেছেন ৭৩ হাজার ৭৩১ জন। ২০১৪ সাল থেকে ২০২১ সালের আগষ্ট পর্যন্ত প্রায় আট বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর মধ্যে মারা গেছেন ৪৯ জন। পাবনা মানসিক হাসপাতালের পরিসংখ্যান কর্মকর্তা দেলোয়ার হোসেন এসব তথ্য জানিয়ে আরো বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২১ সালের আগস্ট পর্যন্ত বহির্বিভাগে চিকিৎসা নিয়েছেন ৪ লাখ ৭৭ হাজার ৭৫৯ জন। এর মধ্যে নারী রোগীর সংখ্যাই বেশি ছিলো। এই হাসপাতালের আউট ডোরে প্রতিদিন গড়ে ১৩০ থেকে ১৪০ জন রোগীর চিকিৎসা দেয়া হয়।


৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে গত ৭ সেপ্টেম্বরের হিসেব অনুযায়ী ৩৫০ জন রোগি ভর্তি আছে। কোভিডের কারণে রোগী একটু কম আসছে বলে জানায় কতৃপক্ষ। কোভিড পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলে ৪৫০ এর বেশি রোগি ভর্তি থাকে। বর্তমানে কোভিড পরীক্ষা ছাড়া কোন রোগিকে ভর্তি নেয়া হচ্ছে না। পরীক্ষার পর নেগেটিভ ফলাফল আসলেই কেবল ভর্তি নেয়া হচ্ছে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে লক ডাউন থাকায় দূরের রোগীরা সহজে আসতে পারছেন না। এজন্য মূলত এখন রোগী তুলনামূলকভাবে একটু কম।


মানসিক হাসপাতালের শুরু কথা: পাবনা শহর থেকে তিন কি: মি: দূরে হেমায়েতপুর ইউিনয়নে ১৯৫৭ সালে ১৩৩ একর জমির উপর নির্মিত হয় হাসপাতালটি। শুধু বাংলাদেশ নয় ভারতীয় উপমহাদেশে প্রসিদ্ধ এ হাসপাতালের নাম ডাক আছে। ১৯৫৭ সালে তৎকালীন পাবনা জেলার সিভিল সার্জন মোহাম্মদ হোসেন গাঙ্গুলী এই হাসপাতালটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠার বছরে প্রথমে কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো শহরের শীতলাই জমিদার বাড়িতে। প্রথম বছর হাসপাতালে মানসিক রোগী ভর্তি হয়েছিল ৮০ জন। প্রথমে ৬০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল এই হাসপাতালের। ১৯৬৬ সালে প্রথম দফায় শয্যা সংখ্যা বাড়িয়ে ১৫০ ও পরে ২০০টি করা হয়। ১৯৯৬ সালে শেষ দফায় ৫০০ শয্যায় উন্নীত করা হয় হাসপাতালটিকে। বর্তমানে হাসপাতালের মোট ১৯টি ওয়ার্ডের মধ্যে ৫টি নারী রোগীদের জন্য বরাদ্দ। আর বাকি ১৪ টি ওয়ার্ডে পুরুষ রোগী ভার্তি আছে।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীরা বিছানায় শুয়ে আছে
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীরা বিছানায় শুয়ে আছে

এদিকে হাসপাতালের দ্বিতল ভবন, বহির্বিভাগ, প্রশাসনিক ভবন, ওষুধ সংরক্ষণ ভবন, মালামাল সংরক্ষণ ভবন, রান্নাঘর, ধোপাঘর, বিনোদন বিভাগ, সিনেমা হল, হস্তশিল্প ভবন, তাঁতশিল্প ভবন, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসিক ভবন ও কটেজ মিলিয়ে মোট ৫৩টি ভবন রয়েছে। যদিও এসব ভবনের অনেকগুলোই এখন ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। তবুও মানসিক রোগীদের চিকিৎসার জন্য এই হাসপাতালের উপারেই এখন দেশের মানুষের মূল ভারসা।


মানসিক রোগের কারণ ও চিকিৎসা পদ্ধতি: মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার নির্দিষ্ট লক্ষণ নেই। তবে একেক রোগীর একেক ধরণের লক্ষণ চিকিৎসকদের কাছে দৃশ্যমান হয়। রোগীদের হিস্ট্রি পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে তাদের বেশির ভাগের বংশের পূর্বপুরুষদের কারো না কারো মানসিক রোগ ছিলো। ফলে এটিকে অনেকটা বংশগত রোগ হিসেবেই দেখেন পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার মাসুদ রানা সরকার।


তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, আমরা যখন রোগীর হিস্ট্রি দেখি তখন ওই রোগীর বংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কারো না কারো এই রোগ ছিলো বলে দেখতে পাই। এজন্য আমরা বলতে পারি মানসিক রোগ বংশগত কারণে হয়। এছাড়াও দু:শ্চিন্তা, বড় ধরণের কোন মানসিক আঘাত, আর্থিক সমস্যা থেকে মানুষ মানসিক রোগগ্রস্ত হয়। দীর্ঘদিন এ ধরণের সমস্যায় ভোগা মানুষ এক সময় মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।


তিনি আরো বলেন, এখানে যেসব রোগীকে ভর্তি করা হয় তাদের বেশির ভাগের মধ্যে ‘সন্দেহ’ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। তারা ওষুধে সন্দেহ করে, কাছের মানুষদেরকে সন্দেহ করে, শক্র মনে করে, গায়েবি আওয়ার শোনে, হঠাৎ করেই হিংসাত্বক হয়ে ওঠে। নিজের ক্ষতি করার চেষ্টা করে, আশেপাশে মানুষের উপর চড়াও হয়ে মারতে যায়, জিনিষপত্র ভাংচুর করে। আবার কিছু রোগী আছে যারা নেগেটিভ মুভমেন্টের। তারা কারো সাথে কথা বলে না, চুপ করে থাকে, কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলে শুধু ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে। কথার উত্তর দেয় না।


ডাক্তার মাসুদ রানা বলেন, বর্হিবিভাগে মোটাদাগের রোগী আসে মাথার ব্যথা নিয়ে আর এই মাথা ব্যথার প্রধান কারণ হচ্ছে মানসিক চাপ। দীর্ঘদিন যদি কেউ মানসিক চাপে থাকেন, দু:শ্চিন্তা করেন তাহলে তাদের মাথা এভাবেই ব্যথা করবে। এছাড়াও তাদের শরীরের নানা ধরণের আলামত লক্ষ করা যায়। তাদের ভালোভাবে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা যায় তারা মূলত ডিপ্রেশনে ভুগছেন। তীব্র মানসিক চাপে তারা এক পর্যায়ে পাগল হয়ে যান।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীরা ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে
পাবনা মানসিক হাসপাতালের পুরুষ ওয়ার্ডের রোগীরা ক্যামেরার সামনে পোজ দিচ্ছে

এমন রোগীদের আমরা আউট ডোরে চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দিই। যাদের সমস্যা তীব্র হয় কেবল তাদেরকে আমরা দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য ভর্তির পরামর্শ দিই। এছাড়াও আউট ডোরে মৃগি রোগি, অটিস্টিক শিশুদের চিকিৎসা প্রদান করা হয়।

মানসিক রোগীর চিকিৎসায় ওষুধ অবশ্যই প্রয়োগের পাশাপাশি বায়ো-সাইকো-সোশ্যাল অ্যাপ্রোচ বিভাগ, আকুপ্রেসার বিভাগের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। ওষুধ প্রয়োগের পর যখন রোগী উন্নতির দিকে যায় তখন তাদের এই বিভাগের মাধ্যমে চিকিৎসা দেয়া হয়। এছাড়াও তাদের মনস্তাত্বিক কিছু কাউন্সিলিং করানো হয়। তা ছাড়া ইনডোর রোগীদের হাতের কাজ শেখানো হয়, নিয়মিত পত্রিকা পড়তে দেয়া হয়। এদের দ্বারা ছোটখাটো কাজও করানো হয় মানসিক চাপ ভুলে থাকার জন্য।

পাবনা মানসিক হাসপাতালের আবাসিক সাইকিয়াট্রিস্ট ডাক্তার মাসুদ রানা সরকার আরো বলেন, মানসিক রোগে পুরুষের চেয়ে নারীদের আক্রান্তের হার দ্বিগুণ হলেও ইনডোরে পুরুষ রোগী বেশি আর আউট ডোরে নারী রোগীর সংখ্যা বেশি। পরিবার পুরুষদের চিকিৎসায় আগ্রহী হলেও নারীদের চিকিৎসায় তাদের আগ্রহ কম। নারীদের নানাবিধ সমস্যার কারণে ইনডোরে ভর্তি রাখতে চায় না বেশির ভাগ পরিবার। ফলে আউট ডোরের চিকিৎসার উপরেই তাদের মূল ভরসা।


কোভিডের সময়ে হাসপাতলের অবস্থা: কোভিড-১৯ ‘এর সময়ে বাংলাদেশের পরিস্থিতি যখন খুব খারাপের দিকে তখন সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ফলে হাসপাতালের আবাসিকে ভর্তি থাকা রোগীদের কেউ কোভিডে আক্রান্ত হয়নি এবং প্রাণহানীর ঘটনাও ঘটেনি। হাসপাতালের পরিচালক ডা: আবুল বাশার মো: আছাদুজ্জামান এমন তথ্য দিয়ে ভয়েস অফ আমেরিকাকে আরো বলেন, কোভিড পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে কোভিড পরীক্ষা ছাড়া কোন রোগীকে ভর্তি নেয়া হয়নি। হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের টিকার আওতায় আনা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে ডা: আবুল বাশার বলেন, এখনো এখানকার রোগীদের টিকার আওতায় আনা হয়নি। আমরা টিকা প্রদানের বিষয় নিয়ে বৈঠক করেছি। কি ভাবে ভর্তি রোগীদের টিকার আওতায় আনা যায় সে বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্টদের সাথে আলোচনা করা হবে।

XS
SM
MD
LG