অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

মহসিন খানের আত্মহত্যা, মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন প্রধান কারণ একাকিত্ব


ধূসর জমিনের ওপর সচেতনতামূলক হলুদ ফিতা। (ছবি- অ্যাডোবি স্টক)

ফেসবুক লাইভে আবু মহসিন খানের আত্মহত্যার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। কেউ কেউ লাইভে আত্মহত্যার সেই দৃশ্য দেখে হতবাক এবং বিচলিত হয়েছেন। অনেকে কেঁদেছেন। রাতভর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটাই ছিল প্রধান খবর।

জনপ্রিয় নায়ক রিয়াজের শ্বশুর আবু মহসিন খান যে কায়দায় আত্মহত্যা করেছেন এমন ঘটনা বাংলাদেশে খুব একটা শোনা যায়নি। এ কারণে ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বেশি।

প্রশ্ন উঠেছে, কেন তিনি ৫৮ বছর বয়সে আত্মহননের পথ বেছে নিলেন।

মনোবিজ্ঞানীরা অবশ্য বলছেন, মানুষ যখন একাকী হয়ে যায়, আর্থিকভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে পড়েন তখন তার ভেতর আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে।

কীভাবে আত্মহত্যা করেন মহসিন খান?

বুধবার রাত পৌনে ১০টা। নিজের বাসা থেকে ফেসবুক লাইভে আসেন ব্যবসায়ী মহসিন খান। এই লাইভের ১৬ মিনিটের দিকে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে আত্মহত্যা করেন তিনি। এরপর আত্মহত্যার ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।

আত্মহত্যার আগে ফেসবুক লাইভেই মহসিন খান ঘটনার কিছু কারণ বলে গেছেন। এছাড়া তিনি একটি সুইসাইডাল নোটও রেখে গেছেন বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে পুলিশের রমনা বিভাগের উপ-কমিশনার মো. সাজ্জাদুর রহমান বলেন- "মহসিন খানের সুইসাইড নোটে লেখা রয়েছে, ব্যবসায় ধস নেমে যাওয়ায় আমি হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ি। আমার সঙ্গে অনেকের লেনদেন ছিল। কিন্তু তারা টাকা দেয়নি। আমার মৃত্যুর জন্য কেউ দায়ী নয়।"

এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও জানান, মহসিন খান ২০১৭ সালে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়েছিলেন। তবে পরে সুস্থ হয়ে উঠেছিলেন।

ব্যবসায়িক লোকসান আর নিজের অসুস্থতার কারণ সামনে এনে এই ব্যবসায়ী আত্মহত্যা করলেও সমাজবিজ্ঞানী এবং মনোবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন ঘটনার পেছনে আরও অনেক কারণ রয়েছে। এসব ঘটনা চিহ্নিত করে তা রোধে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রের তরফে পদক্ষেপ নিতে হবে।

ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডি-৭ এর একটি বহুতল ভবনে নিজের ফ্ল্যাটে একাই থাকতেন মহসিন খান। তার স্ত্রী এবং প্রকৌশলী ছেলে থাকেন অস্ট্রেলিয়া। মেয়ে জনপ্রিয় মডেল মুশফিকা তিনা থাকেন স্বামী রিয়াজের সঙ্গে। করোনা মহামারির মধ্যে দুই বছরেও স্ত্রী এবং ছেলের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ হয়নি তার। আত্মহত্যার পর ওই ভবনের দায়িত্বরতরা জানিয়েছেন, একাকী জীবনে মহসিন খান ক্যাটারিং সার্ভিসের খাবার গ্রহণ করতেন। বাসায় কাজের মানুষও স্থায়ী ছিল না। আগে সকালে শরীরচর্চার জন্য বের হতেন। কিছুদিন থেকে তাও করেননি। ফেসবুকে এর আগেও তিনি নিজের হতাশা নিয়ে পোস্ট দিয়েছেন। মহসিন খানের আত্মহত্যার ঘটনায় একটি অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে।

শুধু কি হতাশা থেকেই মহসিন খানের এমন আত্মহত্যা? নাকি এর পেছনে আরও কারণ রয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা কী বলছেন

এমন প্রশ্ন ছিল মনোচিকিৎসক মোহিত কামালের কাছে। তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, আত্মহত্যা একটি সোশ্যাল ও পাবলিক হেলথ প্রবলেম। এই দুটির মিশ্রণে এমন ঘটনা ঘটে। এটা রোধে সামাজিক চিকিৎসা দরকার, ব্যক্তির চিকিৎসা দরকার। যখন কেউ একাকী থাকে বা বিভিন্ন সমস্যায় ভোগে তখন সামাজিক সমস্যা সমাজ থেকেই সমাধান করতে হবে। শারীরিক সমস্যায় পড়লে তার চিকিৎসা দিতে হবে। পারিবারিক সমস্যা পরিবারেই সমাধান করতে হবে। এই মনোবিশেষজ্ঞের মতে, মানুষ যখন একাকী হয়ে যায়, আর্থিকভাবে বিপদগ্রস্ত হয়, মানসিকভাবে বিধ্বস্ত থাকে, অবসাদে ভোগে তখন তার ভেতরে আত্মহত্যার ইচ্ছা জাগে। তাই মানুষ যখন একা হয়ে যায় তখন স্বজনদের তার পাশে দাঁড়াতে হবে। তাহলেই এই ধরনের ঘটনাগুলো ঘটবে না।

বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে বছরে অন্তত ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে থাকে। যদিও আত্মহত্যার ঘটনার সরকারি কোনো তথ্য নেই।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরীর মতে, "মানুষ গভীর মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে আত্মহত্যা করে থাকে। যখন হতাশা, দুঃখ এসব জীবনের ওপর ভর করে তখন আর মানুষ জীবন উপভোগ করতে পারে না। এরপরই মানুষ আত্মহত্যার চিন্তা করে।

মহসিন খানের আত্মহত্যার ক্ষেত্রে কিন্তু সেটিই তৈরি হয়েছে। তিনি একা থাকতেন। একদিকে করোনার কারণে বিচ্ছিন্নতা, অন্যদিকে একাকী জীবন-যাপনের যে অভ্যাস সেটি। সন্তানরা থাকে দূরে এবং অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তা- সবকিছু মিলে তার মধ্যে হতাশা তৈরি হয়েছিল।" তিনি বলেন, মানুষের ভালো থাকার জন্য শারীরিক, মানসিক এবং সামাজিক সুস্থতা প্রয়োজন। মানুষ মূলত একা থাকতে পারে না। তার সঙ্গ দরকার। এজন্যই পৃথিবীতে পরিবার তৈরি হয়েছে। যদি মানুষটি পারিবারিক জীবনযাপন করতো তাহলে এই সিদ্ধান্ত নিতে ভাবতে হতো।

XS
SM
MD
LG