অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কর্মীদের হয়রানির জন্য ইরানকে বিবিসির সমালোচনা


রুহুল্লাহ জাম, একজন ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক যিনি তেহরানের ভাষ্যমতে এক গোয়েন্দা অভিযানে বন্দী হয়েছিলেন ইরানের তেহরানে তার বিচারের সময় কথা বলছেন।২ জুন ২০২০।
রুহুল্লাহ জাম, একজন ভিন্নমতাবলম্বী সাংবাদিক যিনি তেহরানের ভাষ্যমতে এক গোয়েন্দা অভিযানে বন্দী হয়েছিলেন ইরানের তেহরানে তার বিচারের সময় কথা বলছেন।২ জুন ২০২০।

ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি জানিয়েছে, বিবিসির ফার্সি ভাষা পরিষেবার সাংবাদিক এবং তাদের পরিবারের প্রতি ইরানের হুমকি ও হয়রানি বেড়েছে।

এই মাসে জাতিসংঘের কাছে দায়ের করা একটি অভিযোগে, বিবিসি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে সংস্থাটির কর্মীদের সঙ্গে “অগ্রহণযোগ্য আচরণের জন্য ইরানের নিন্দা” করার আহ্বান জানিয়েছে।

অভিযোগে ব্রিটেন ও তৃতীয় দেশে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে “দেশীয় সীমানা বহির্ভূত হুমকি”, ইরানে অবস্থানকারী পরিবারের সদস্যদের হয়রানি; সাংবাদিক ও তাদের পরিবারের ওপর আর্থিক চাপ এবং “বর্ধিত গোয়েন্দা ও পাল্টা গোয়েন্দা কার্যকলাপের মাধ্যমে বিবিসি নিউজ পার্সিয়ান এবং এর সাংবাদিকদের পেশাগত খ্যাতি ক্ষুণ্ন করার” কথা উল্লেখ করা হয়।

লন্ডনে বিবিসির পারস্যের বিশেষ সংবাদদাতা কাসরা নাজি বলেছেন, এই হয়রানি বছরের পর বছর ধরে চলছে। তবে তিনি বলেন যে, হয়রানির পরিমাণ সম্প্রতি আরও বেড়েছে।

নাজি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “হয়রানি বৃদ্ধি হয়েছে।” ছয় সপ্তাহের ব্যবধানে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থা বিবিসি পার্সিয়ান কর্মীদের পরিবারের বেশ কয়েকজন সদস্যকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডেকেছিল।

নাজি বলেন, “তারা আমাদের বাবা-মা এবং ভাই-বোনদের বলেছেন যে, যদি আমরা বিবিসির জন্য কাজ বন্ধ না করি তবে লন্ডনে আমরা অপহরণ বা এমনকি হত্যার লক্ষ্যবস্তু হতে পারি।” “তারা এও বলেছেন যে, আমাদের অপহরণ করে ইরানে ফিরিয়ে দেওয়া হতে পারে।”

নাজি বলেন, গোয়েন্দা সদস্যরা রুহুল্লাহ জামের ঘটনা উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করে তাদের কথা না মানলে কী ঘটবে তা নিয়ে সতর্ক করেন।

জাম প্যারিসে নির্বাসনে থাকাকালে ইরানের সরকারবিরোধী একটি নিউজ ওয়েবসাইট ও টেলিগ্রাম চ্যানেল প্রতিষ্ঠা করেন। তাকে ২০১৯ সালে ইরাকে একজন বিশিষ্ট ধর্মগুরুর সাক্ষাত্কার নেওয়ার কথা বলে ডেকে আনা হয়।

পরে তাকে জোরপূর্বক ইরাক থেকে ইরানে ফিরিয়ে নেওয়া হয় এবং সেখানে রেভ্যুলেশনারি আদালত তাকে “পৃথিবীর নিকৃষ্টতম পাপী” হিসেবে দোষী সাব্যস্ত করে ২০২০ সালের ডিসেম্বরে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছিল।

মানবাধিকার আইনজীবী ক্যাওলফিওন গ্যালাঘার এবং বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের কৌঁসুলি জেনিফার রবিনসন এক যৌথ বিবৃতিতে বলেছেন, “আমরা ইরানের অতীত কর্মকাণ্ড থেকে জানি ইরান তার সমালোচকদের মুখ বন্ধ করতে আন্তসীমান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ পদক্ষেপ নিতে সচেষ্ট এবং ইরানের কর্তৃপক্ষ দেশটি সম্পর্কে স্বাধীন সাংবাদিকতাকে তাদের ক্ষমতার জন্য ঝুঁকি হিসেবে মনে করে।”

নাজি বলেন, হুমকিগুলো কোনো নির্দিষ্ট প্রতিবেদন লক্ষ্য করে নয়। এরফলে বিবিসির ফার্সি সংবাদেও কোনো প্রভাব পড়েনি।

“আমাদের প্রতিবেদন করতে হবে। খবর দিতে হবে। কী ঘটছে তা আমাদের বলতে হবে”, নাজি বলেন। “এবং সম্ভবত এই কারণেই ইরান সরকার আমাদের আক্রমণ করে যাচ্ছে, কারণ স্পষ্টতই তারা মনে করে, তারা আমাদের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি।”

জাতিসংঘে ইরানের মিশনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা ভয়েস অফ আমেরিকার কাছে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।

আগের একটি অভিযোগের জবাবে, ২০২০ সালে জাতিসংঘের বিশেষজ্ঞরা ইরানের প্রতি হয়রানি বন্ধ করার দাবি এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সদস্য দেশগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন।

হয়রানির ধারাবাহিকতা

অধিকার কর্মী এবং ইরানে ২০০৯ সালের নির্বাচনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভের বিষয়ে একটি গ্রাফিক উপন্যাস জাহরাস প্যারাডাইসের লেখক, আমির সোলতানি বলেন, ইরানি গোয়েন্দা সংস্থা ১৯৭৯ সালের বিপ্লবের পর থেকে বিভিন্ন ব্যক্তিদের টার্গেট করছে।

তেহরানের গণমাধ্যমের প্রতি দমনমূলক ব্যবস্থার কারণে অনেক সাংবাদিক নির্বাসনে কাজ করেন। কিন্তু ইরানের বাইরে থাকাও নিরাপত্তার জন্য যথেষ্ট নয়।

ফ্রিডম হাউসসহ বিভিন্ন সংস্থা বলছে আর্ন্জাতিক দমন, যেখানে একটি দেশের সরকার সীমান্ত অতিক্রম করে কাউকে দমন, ভয় দেখানো এবং কখনো কখনো নাগরিকদের ক্ষতি বা এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটায়। কর্তৃত্ববাদী শাসন ব্যবস্থাগুলোতে এসব ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।

গত বছর ভয়েস অফ আমেরিকার ফার্সি হোস্ট এবং ইরান সরকারের সমালোচক মাসিহ আলিনেজাদকে নিউইয়র্কে তার বাড়ি থেকে অপহরণের চেষ্টা করা হয়।

এই ঘটনায় চারজন ইরানির বিরুদ্ধে, যাদের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্য বলে মনে করা হয়, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছিল।

২০২০ সালে মিডিয়া ওয়াচডগ রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস বলেছে যে, দেশের বাইরে বসবাসকারী কমপক্ষে ২০০ ইরানি সাংবাদিককে হয়রানি করা হয়েছে, যার মধ্যে ৫০ জন মৃত্যুর হুমকি পেয়েছিলেন।

২০১২ সালে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরা সাংবাদিকদের বেশ কয়েকজন আত্মীয়কে আটক করে এবং তাদেরকে বিবিসির জন্য কাজ করা বন্ধ করতে বা গোয়েন্দা সদস্য হিসেবে কাজ করার জন্য প্ররোচিত করার চেষ্টা করে—কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্টস জানায়। পরিবারের অন্য সদস্যদের পাসপোর্ট বাতিলসহ তাদের দেশ ত্যাগ করতে বাধাও দেওয়া হয়।

ইরান ২০১৭ সালে নাজিসহ ১৫২ জন বিবিসি পার্সিয়ান স্টাফের বিরুদ্ধে “জাতীয় নিরাপত্তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের” অভিযোগ আনে।

আদালতের আদেশ, যেটা এখনো বহাল রয়েছে, তাদের সমস্ত সম্পদ জব্দ করেছে এবং আনুমানিক ছয়–সাত শ পরিবারের সদস্যদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে, নাজি বলেন। সম্পত্তির অধিকার স্থগিতের ফলে সম্পত্তি বিক্রি বা ভাগ করাও সম্ভব হয় না।

সাম্প্রতিক হুমকির জন্য বিবিসি জাতিসংঘকে ইরানের প্রতি নিন্দা জ্ঞাপনের আহ্বান জানালেও, গণমাধ্যমটির সাংবাদিকেরা বলছেন যে, তাদের মুখ বন্ধ করা যাবে না।

“আমরা বিবিসির সবাই একমত হয়েছি”, নাজি বলেন, “প্রয়োজনে আমাদের চিৎকার করতে হবে যাতে সবাই বিষয়টি জানতে পারে, বিশেষ করে ইরান সরকার, যদি তারা আমাদের স্পর্শ করে, যদি তারা আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, তাদের চরম মুল্য দিতে হবে।”

প্রতিবেদকের তথ্য: কারমেলা কারুসো নর্থ ক্যারোলিনার আশভিলে বসবাসকারী একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক। তিনি সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ও মানবাধিকার বিষয়ে বিশেষজ্ঞ । তিনি সাভানা কলেজ অফ আর্ট অ্যান্ড ডিজাইনের ছাত্রী।

XS
SM
MD
LG