অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

'আমি শোভা বলছি' 


শোভা চৌধুরী। (ছবি- মাহতাব হোসেন)

তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাতের কোলে পড়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বইমেলা অংশের সমস্ত বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠেছে। অদূরের গ্লাস টাওয়ার বইমেলার আলো গায়ে মেখে নিজের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে। আলো ঝলমলে মেলার লিটল ম্যাগ চত্বরের একেবারের উত্তরের কোনায় একজন কবি দাঁড়িয়ে নিজের লেখা বইয়ের ফিরিস্তি দিচ্ছেন পাঠককে। কাছে এগিয়ে যেতেই অবাক হতে হলো। কেননা বইমেলায় সচরাচর এই দৃশ্য চোখে পড়ে না। কবি একজন ট্রান্সজেন্ডার। কথা বলতে চাইলেই হাসিমুখে সায় দিলেন। নাম জিজ্ঞেস করতেই জানালেন নিজের নাম শোভা চৌধুরী। কোথাও কোন অস্বাভাবিকত্ব নেই। পাশে দাঁড়িয়ে অন্য স্টলের কর্মীরা। সেখানে সাবলীল কায়দায় শোভা জিজ্ঞেস করলেন বই কিনবো কি না। জানালাম কিনবো।

তিনি নিজের বই মেলে ধরলেন, দেখালেন পাতায় পাতায় নিজের লেখা কবিতা- "আমি আর থাকবো না/ তোমাদের এইসব বীতশ্রদ্ধ স্বার্থপরতায়/চলে যাব বহুদূরে/ যেদিকে দু চোখ যায়"- কবিতার শব্দে শব্দে যেন অজ্ঞাত অভিমান মিশে রয়েছে আত্মবঞ্চনার কথা। আবার পৃষ্ঠা উল্টালে, "বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়েছে/কিছু বিষাক্ত কুলাঙ্গারের নিঃশ্বাস/ পরিত্রাণ নেই কোথাও!/ আমার স্তনে হাত দেয়া ছেলে/ফিরে যাক বাবা মায়ের কোলে/ তাদের কোলে জন্ম নিক/দুটি ফুটফুটে মেয়ে/দিব্যি দিয়ে বলছি/ এ আমার আশির্বাদ।"

শোভা জানালেন তার লেখালেখির কথা। ছোটবেলা থেকেই লিখতেন। সেসব ডায়েরির পাতায় লিখে রাখা মনের কথা কিংবা ব্যথা কখন যে কবিতা হয়ে উঠেছে তিনি নিজেও টের পাননি। জন্মগত নাম ছিল শুভ। জন্মেছিলেন খুলনার খালিশপুরে। পরে ধীরে শারীরিক পরিবর্তনের মাধ্যমে হয়ে উঠলেন শোভা। শোভার কথা- "আমি পুরুষের শরীর নিয়ে জন্মেছি। কিন্তু ধীরে ধীরে আমার শারীর ও মানসিক পরিবর্তন হয়। আমার ভেতরের নারীসত্তা আমি সবসময় অনুভব করি।"

শোভার কবিতার বই কিনেছেন এমন একজন ক্রেতার নাম মাসুদ হোসেন। তার কাছে জানতে চাইলে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি বলেন, "আগ্রহ নিয়ে কয়েকটি পৃষ্ঠা পড়লাম। মনে হলো সবগুলো বুঝে পড়তে হবে এজন্য কিনে নিলাম বইটি। বাসায় গিয়ে পড়বো। আর আমি কবিতা পছন্দ করি। এজন্যই আগ্রহ। অবশ্য একজন ট্রান্সজেন্ডার কবি- এটাও আগ্রহের আরেকটি কারণ।"

শোভার পেছনের গল্প

শোভা জানতেন নিজের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে সমাজের পরিবর্তন হবে না। নিজেকে যোগ্য করে তুলতে হবে। তাই দেশের পড়াশোনার সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েছেন, করেছেন সমাজকর্ম বিষয়ে স্নাতকোত্তর। শোভা ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, "পড়াশোনাটা করে যেতে হবে এটা মাথায় ছিল। ২০০৪ সালে এসএসসি পাশ করি, এরপর কৃষি ডিপ্লোমায় ভর্তি হই। ডিপ্লোমা কোর্সা সম্পন্ন করে ২০১০ সালে ঢাকায় চলে আসি। এরপর মিরপুরের সরকারি বাংলা কলেজ থেকে অনার্স করি সমাজ কর্ম বিষয়ে। পরে একই বিষয়ে মাস্টার্স করি।"

শোভার ঢাকার জীবনযাপন সহজ ছিল না। পড়াশোনার পাশাপাশি জীবিকার জন্য চাকরি করেছেন বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থায়। আইসিডিডিআরবিতে এইডস প্রতিরোধক বিষয়ক একটি প্রকল্পে কাজ করেছেন। পরে 'বন্ধু' নামক একটি বেসরকারি সংস্থায় একই বিষয়ে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। কোভিড পরবর্তী সময়ে অনেকটা বেকার জীবন যাপন করছেন বলে জানালেন শোভা।

শোভা চৌধুরী। (ছবি- মাহতাব হোসেন)
শোভা চৌধুরী। (ছবি- মাহতাব হোসেন)

সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে আসার বিষয়ে শোভা বলেন, "ছোট বেলা থেকে সংস্কৃতি প্রিয় মানুষ আমি। মনের কথা লিখে রাখতে ইচ্ছে করতো। সেসব লিখে রাখতাম। আবৃত্তির প্রতি ছিল আমার নেশা। যার ফলে খুলনা শিল্পকলা একাডেমির সঙ্গে যুক্ত হই। সেখানে নৃত্যকলা, নাট্যকলা, চারুকলা এবং আবৃত্তি শিখেছি। পাশাপাশি লেখালেখির চর্চটা অব্যাহত ছিল। তখন থেকেই আমি আমার মাতৃভাষার বিভিন্ন শব্দের কৌশল আত্মস্থ করেছি। কবিতায় আমি অনেকের কাছে ঋণী। তার মধ্যে আছেন, সৈয়দ আব্দুল মতিন, ও রামেন্দু মজুমদার।"

লেখালেখি যেভাবে আলোর মুখ দেখলো

লেখালেখির বিষয় নিয়ে শোভা অনেকের প্রশংসাই শুনেছেন। কিন্তু এসব লেখা নিয়ে যে একটি বই প্রকাশ হতে পারে সে বিষয়ে সহযোগিতা পাচ্ছিলেন না। এগিয়ে আসেন লুলুআল মারজান। যিনি ট্রান্সজেন্ডারদের জীবন আচরণ ও সার্বিক বিষয় নিয়ে কাজ করেন। শোভা ২০১৮ সালে 'শ্রাবণ সন্ধ্যা' নামের একটি বই প্রকাশ করেন মারজানের সহায়তায়। সে সময় বইমেলা হলেও শোভার মেলায় আসা হয়নি। তবে এবারের বই নিয়ে বেশ উচ্ছ্বসিত তিনি। বললেন, "আমার কবিতার বই প্রকাশের বিষয়ে মারজান আপুই সব করেছেন। এমনকী বইটি মেলায় কিভাবে বিপণন হবে সেটিও ঠিক করে দিয়েছেন আপু। আপুর কাছে আমার কৃতজ্ঞতার শেষ নেই।"

ট্রান্সজেন্ডার কমিউনিটি থেকে তিনিই প্রথম কোনো কবিতার বই প্রকাশ করেছেন দাবি করে বলেন, "আমি যতদূর জানি আমাদের কমিউনিটি থেকে ইতোপূর্বে কেউ কবিতা কিংবা গল্পের বই প্রকাশ করেনি, আমি প্রথম।"

'আমি শোভা বলছি' বইটি প্রকাশ হয়েছে বিন্দুধারী প্রকাশনী থেকে। এটির কর্ণধার মারজান। তিনি বললেন, "আমি অনেকদিন ধরেই ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে কাজ করছি। শোভার লেখা দেখে মনে করেছি এর একটা বই প্রকাশ করা যেতে পারে। আমার নিজস্ব একটি প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে। বিন্দুধারী নাম। এখানে থেকেই বইটি প্রকাশ করেছি। এবারের বইটি বিপণন নিয়ে ঝামেলা হচ্ছিল। পরে একটা স্টল পেয়েছি যারা বিপণনের দায়িত্ব নিয়েছেন।"

বই প্রকাশের নেপথ্যে গল্প বলতে গিয়ে লুলু আল মারজান ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, "ট্রান্সজেন্ডারদের নিয়ে কাজ করতে গিয়ে অনেক মেধাবীর দেখা পেয়েছি। যে জায়গায় ভালো সে জায়গায় তাকে ফোকাস করে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। শোভার লেখালেখির হাত ভালো, ভাবলাম ওর একটা বই প্রকাশ হলে কমিউনিটির অনেকেই উৎসাহ পাবে। সবচেয়ে বড় কথা কেউ একজন প্রতিষ্ঠিত হলে আর পাঁচজন তার কমিউনিটির সদস্যকে সে সামনে টেনে নিতে পারবে- এটাই আমার উদ্দেশ্য।"

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও খ্যাতিমান লেখক সেলিনা হোসেন যা বলছেন

বাংলা একাডেমির সভাপতি ও খ্যাতিমান লেখক সেলিনা হোসেন ভয়েস অফ আমেরিকার প্রতিবেদকের মাধ্যমেই শোভা চৌধুরীর কবিতার বই বেরিয়েছে সংবাদটি প্রথম জানতে পারেন। বললেন, "আমি জানতাম না এ খবর। শোভা চৌধুরীর এ খবর শুনে আমি তো মহাখুশি। সৃজনশীল এমন একটি জায়গায় পিছিয়ে পড়া এই জনগোষ্ঠীর কেউ একজন লেখালেখি করছেন, কবিতা চর্চা করছেন, এটা অত্যন্ত আনন্দের। আমি শোভা চৌধুরীকে অভিনন্দন জানাই। আমি চাই এই জনগোষ্ঠী থেকে শোভা চৌধুরীর মতো আরো অনেকেই বেরিয়ে আসবে, শোভা চৌধুরী তাদের অনুকরণীয় হবে।"

সেলিনা হোসেন বাংলা একাডেমির গুরুত্বপূর্ণ একটি পদে রয়েছেন, সেক্ষেত্রে এমন পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কেউ যদি সৃজনশীল কাজে তাদের কাছে সহযোগিতা চান তা পাবেন কিনা এমন প্রশ্ন করা হয়েছিল সেলিনা হোসেনকে। হাঙর নদী গ্রেনেডের এই লেখক বলেন, "সংখ্যাটা কয়েকজন হলে বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক বরাবর আবেদন করতে হবে৷ তারপর আমার সঙ্গে যোগাযোগ যেন করে। আমি সম্পূর্ণভাবে তাদেরকে সমর্থন করতে রাজি আছি।"

XS
SM
MD
LG