বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অন্দরমহলের ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিদের উপর আরেক দফা কড়া নিষোজ্ঞা আরোপ করেছে এবং ইউক্রেনের জনগণের জন্য ১০০০ কোটি ডলার সাহায্যের অনুরোধ করেছে। এর কয়েক ঘন্টা আগেই রাশিয়া ও ইউক্রেনের কর্মকর্তারা জানান যে রুশ বাহিনী কৌশলগত ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইউক্রেনের বন্দরনগরী দখল করে নিয়েছে এবং প্রধান শহরগুলোর উপর বোমাবর্ষণ করেছে। এক সপ্তাহ ধরে চলে আসা এই আগ্রাসনের কারণে ঐ অবরুদ্ধ দেশের এক লক্ষেরও বেশি লোক দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছে।
বৃহস্পতিবার মন্ত্রীপরিষদের বৈঠকের আগে বাইডেন বলেন , “আজ আমি ঘোষণা করছি যে আমরা এই নিষোজ্ঞার তালিকায় আরও প্রায় ডজনখানেক নাম যোগ করছি, যাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার ধনাঢ্য কোটিপতি এবং আমি রাশিয়ার ৫০ জন ক্ষমতাধর ধনকুবের , তাঁদের পরিবার এবং ঘনিষ্ঠজনদের আমেরিকায় ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করছি”। তিনি আরও বলেন , “আমরা ইউক্রেনের জনগণকে প্রত্যক্ষ সহযোগিতা দিয়ে সমর্থন করে যাবো।
ব্যবস্থাপনা ও বাজেট দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক শালান্ডা ইয়ং -এর এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে প্রশাসন কংগ্রেসের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়ন বাবদ ১০০০ কোটি ডলারের অনুমোদন চেয়েছে যাতে, “ ইউক্রেন ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে আগামি দিন ও সপ্তাহগুলিতে আরও মানবিক , নিরাপত্তাজনিত এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা দেওয়া যায়। তিনি বলেন এই অর্থ প্রতিরক্ষা সাজ- সরঞ্জাম, জরুরি খাদ্য সহযোগিতা, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের সৈন্য মোতায়নের ব্যয় বহন করতে পারবে।
পুতিনের যে সব ঘনিষ্ঠজনের উপর এই নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো তাদের মধ্যে রয়েছেন রাশিয়ার অন্যতম ধনকুবের আলীশের উসমানভ। জার্মান কর্তৃপক্ষ তার ৬০ কোটি ডলার মূল্যের ৫১২ ফুট দীর্ঘ নৌযান আটক করেছে। সেই নির্দেশে তার ব্যক্তিগত জেট বিমানও আটক করা হতে পারে। নির্দেশনা অনুযায়ী ৫০ জনেরও বেশি ধনী রাশিয়ানদের যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের উপর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। নিষেধাজ্ঞার তালিকায় আরও রয়েছেন পুতিনের পুরোনো কিছু বন্ধু, জুডো খেলায় এক সময়কার সহযোগী, ভাড়াটে ওয়েগনার গ্রুপের সঙ্গে সম্পৃক্ত কয়েকজন এবং পুতিনের প্রেস সচিব দ্যমিত্রি পেসকভ।
হোয়াইট হাউজের প্রেস সচিব জেন সাকি বলেছেন , “ একটা বড় বিষয় হচ্ছে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা। আমরা চাই তার আশপাশের লোক চাপ অনুভব করুক। আমার মনে হয় না , এরাই সেখানকার ক্ষমতাধর ধনাঢ্য ব্যক্তিদের শেষ দল যাদের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হলো”।
এ দিকে রাশিয়ার বাহিনী বৃহস্পতিবার কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ ইউক্রেনের বন্দর নগরী খেরসন দখল করেছে। এরই মধ্যে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে রাশিয়া গোলাবর্ষণ করে চলেছে এবং এই আগ্রাসনের কারণে ১০ লক্ষেরও অধিক মানুষ দেশটি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছে।
স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তারা এবং রাশিয়ার সামরিক বাহিনী খেরসন দখলের সংবাদটি নিশ্চিত করেছে। কয়েকদিন ধরে শহরটির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবির পর, এটিই এক সপ্তাহ ধরে চলমান এই আক্রমণে ইউক্রেনের এমন প্রথম শহর যেটি রাশিয়া দখলে নিতে সক্ষম হয়েছে।
ইউক্রেনের রাজধানী দ্রুত দখলে নেওয়ার মস্কোর প্রচেষ্টাটি আপাতদৃষ্টিতে থমকে গিয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে, দেশটির দক্ষিণে রাশিয়ার সামরিক বাহিনী উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সাধন করেছে। এর মাধ্যমে তারা ইউক্রেনকে কৃষ্ণ সাগর ও অ্যাজভ সাগর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলতে চায়।
খেরসনের পূর্বদিকে অবস্থিত বন্দর নগরী মারিউপোলকেও অবরোধ করে রেখেছে রাশিয়ার সেনারা। শহরটির মেয়র ভাদিম বোইশেঙ্কো বলেন যে এটি ইউক্রেনকে বিচ্ছিন্ন করার একটি প্রচেষ্টা।
বোইশেঙ্কো বৃহস্পতিবার সম্প্রচারিত এক ভিডিওতে বলেন, “তারা এখানে একটি অবরোধ সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে”। তিনি বলেন যে, রাশিয়া রেলস্টেশনে আক্রমন চালাচ্ছে যাতে করে পলায়নরত বেসামরিক মানুষজনকে আটকানো যায়। এই আক্রমণের ফলে সেখানে পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে।
সাফল্যের সম্ভাবনা কম থাকলেও দুই পক্ষ বেলারুশে বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফায় শান্তি আলোচনার জন্য বৈঠক করছে। ইউক্রেন জানিয়েছে যে তারা অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি এবং তাদের নাগরিকদের জন্য মানবিক কারণে পালিয়ে যাওয়ার পথ নিশ্চিতের দাবি করবে।
রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সার্গে ল্যাভরভ বৃহস্পতিবার সংবাদদাতাদের বলেন যে, রুশ বাহিনী ইউক্রেনের সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে এবং তাদের প্রতিবেশী এই দেশটিকে রাশিয়ার প্রতি কোন সামরিক হুমকি হয়ে উঠতে দিবে না।
বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণের এক সপ্তাহ পূর্ণ হল। এরই মধ্যে ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোতে রাশিয়া গোলাবর্ষণ করেছে এবং ইউক্রেন ছেড়ে পালানো শরণার্থীর সংখ্যা ১০ লক্ষ ছাড়িয়ে গিয়েছে।
খারকিভ, চেরনিহিভ এবং মারিউপোল-এ রাশিয়ার আক্রমণ সত্ত্বেও, বৃহস্পতিবার ব্রিটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে যে শহরগুলো ইউক্রেনের দখলেই রয়েছে। তবে খেরসন-এর পরিস্থিতিটি একটু অস্পষ্ট। সেখানে রাশিয়ার সৈন্যদের উপস্থিতি রয়েছে এবং উভয় পক্ষই শহরটির নিয়ন্ত্রণের পাল্টাপাল্টি দাবি করেছে।
ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেন্সকি বৃহস্পতিবার দিনের শুরুতে একটি ভিডিও বার্তায় বলেন, “আমরা এমন জাতি যারা এক সপ্তাহে শত্রুর পরিকল্পনা ভেস্তে দিয়েছি”। তিনি আরও বলেন, “তারা এখানে শান্তি খুঁজে পাবে না। তারা খাবার পাবে না। তারা এখানে এক মুহুর্তও শান্তিতে থাকতে পারবে না।”
রাশিয়া দ্রুতই ইউক্রেন দখল করে নিবে – আক্রমণের আগের এমন ধারণার কথা উল্লেখ করে ইউক্রেনের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওলেকসি রেজনিকভ ফেসবুকে লিখেন, “রাশিয়া বা পশ্চিমে, কোথাওই কেউ বিশ্বাস করেনি যে আমরা এক সপ্তাহ পর্যন্ত টিকতে পারব”। তিনি যোগ করেন যে, যদিও সামনের দিনগুলোতে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবুও ইউক্রেনের কাছে “আত্মবিশ্বাসী হওয়ার সকল কারণ রয়েছে”।
একই সাথে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিতীয় দফায় আবারও শান্তি বিষয়ে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে বৃহস্পতিবার। তবে সেটিতে সাফল্যের সম্ভাবনা কমই দেখা গিয়েছে। গত সোমবারের প্রাথমিক আলোচনাটিতে ভবিষ্যত আলোচনার পরিকল্পনাই তৈরি হয়েছে মাত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিংকেন বলেন যে, পরিস্থিতিটির একটি কূটনৈতিক সমাধান খুঁজে বের করতে যুক্তরাষ্ট্র এখনও প্রস্তুত, তবে সেজন্য রাশিয়াকে অবশ্যই আগে উত্তেজনা হ্রাস করতে হবে।
রাশিয়ার আক্রমণ সম্পর্কে নিজেদের প্রতিক্রিয়ার বিষয়ে আলাপ করতে, নেটো ও অন্যান্য মিত্রদের সাথে কয়েকটি বৈঠকের উদ্দেশ্যে বৃহস্পতিবার ইউরোপ সফরে যাচ্ছেন ব্লিংকেন। নেটোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা শুক্রবার ব্রাসেলস-এ একটি বিশেষ বৈঠক করবেন। শনিবার ব্লিংকেন পোল্যান্ড সফর করবেন, যেখানে তিনি নিরাপত্তা আরও জোরদার এবং ইউক্রেন থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীদের মানবিক সহায়তার বিষয়ে আলাপ করবেন।