অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আমাজন রেইনফরেস্টের জলবায়ু প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত সহনসীমা অতিক্রম করছে


ফাইল - আমাজন রেইনফরেস্টের একটি পোড়া এলাকা ব্রাজিলের পারা রাজ্যের প্রিনহাতে দেখা যাচ্ছে। ২৩ নভেম্বর ২০১৯।

জলবায়ু পরিবর্তন এবং নিরবচ্ছিন্ন বন উজাড়ের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত আমাজন রেইনফরেস্ট পুনর্জীবিত হওয়ার ক্ষমতা হারাচ্ছে। এর ফলে এই অঞ্চল পুনরুদ্ধারের অযোগ্য বৃক্ষহীন তৃণভূমিতে রূপান্তরিত হতে পারে, যেটা এই অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য মারাত্মক পরিণতি বয়ে আনবে। সোমবার (৭ মার্চ) প্রকাশিত একটি সমীক্ষায় এ কথা বলা হয়েছে।

গবেষকেরা সতর্ক করেছেন যে, সমীক্ষায় প্রাপ্ত এই ফলাফলের অর্থ হলো আমাজন প্রত্যাশিত সময়ের চেয়ে দ্রুত ধংসের প্রান্তে পৌঁছাতে পারে।

২৫ বছরের স্যাটেলাইট ডেটা বিশ্লেষণ করে, গবেষকেরা প্রথমবারের মতো খরা এবং দাবানলের মতো ধাক্কাগুলোর বিরুদ্ধে আমাজনের স্থিতিস্থাপকতা পরিমাপ করেছেন, যা বনের সামগ্রিক অবস্থার একটি প্রধান সূচক।

ন্যাচার ক্লাইমেট চেঞ্জ জার্নালে গবেষকেরা জানিয়েছেন, বিশ্বের অর্ধেক রেইনফরেস্টের আবাসস্থল আমাজন বেসিনের তিন-চতুর্থাংশেরও বেশির স্থিতিস্থাপকতা হ্রাস পেয়েছে।

ধ্বংস বা খরার কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে, বনের পুনর্জীবিত হওয়ার ক্ষমতা প্রায় অর্ধেক হ্রাস পেয়েছে। ইউনিভার্সিটি অব এক্সেটারের গ্লোবাল সিস্টেম ইনস্টিটিউটের পরিচালক ও সহ-লেখক টিম লেন্টন এএফপিকে বলেছেন।

“আমাদের স্থিতিস্থাপকতার পরিমাপ দুটি ফ্যাক্টরের মাধ্যমে বেশি প্রভাবিত হয়েছে। একটি হলো মানুষের উপস্থিতি যেখানে বেশি এবং আরেকটি হলো শুষ্ক স্থানগুলো”। তিনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন।

জলবায়ু মডেলগুলো অনুসারে, পৃথিবীর পৃষ্ঠকে গড়ে ১ দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস উষ্ণকারী বৈশ্বিক তাপমাত্রা আমাজনকে ধীরে ধীরে উদ্ধার-অযোগ্য শুষ্ক উষর রাজ্যে পরিণত করতে পারে।

যদি কার্বন দূষণ নিরবচ্ছিন্নভাবে চলতে থাকে, এই শতাব্দীর মাঝামাঝি নাগাদ বন ধ্বংসের প্রক্রিয়াটি ঘটে যাবে।

“তবে, অবশ্যই, এর কারণ কেবল জলবায়ু পরিবর্তন নয়—মানুষ জঙ্গল কাটতে বা পুড়িয়ে ফেলতে ব্যস্ত, যা দ্বিতীয় একটি কারণ”, লেন্টন বলেছিলেন।

“এই দুটি জিনিসই একে অপরের সঙ্গে ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া করে, তাই আশঙ্কা রয়েছে যে, রূপান্তর আরও আগে ঘটতে পারে”।

আমাজন ছাড়াও, গ্রিনল্যান্ড ও পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকের বরফ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড ও মিথেন সমৃদ্ধ সাইবেরিয়ার ভূগর্ভস্থ বরফ, দক্ষিণ এশিয়ায় মৌসুমি বৃষ্টিপাত, প্রবাল প্রাচীরের বাস্তুতন্ত্র এবং আটলান্টিক মহাসাগরের স্রোত সবই ঝুঁকিপূর্ণ সহনসীমায় রয়েছে, যা বিশ্বের আমূল পরিবর্তন ঘটাতে পারে।

বৈশ্বিক বিচ্ছিন্নতা

২০১৯ সালে চরম ডানপন্থী প্রেসিডেন্ট জাইর বলসোনারো ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে ব্রাজিলে বন উজাড় বেড়েছে, যা গত বছর ১৫ বছরের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।

বিজ্ঞানিরা সম্প্রতি বলেছেন যে, ব্রাজিলের রেইনফরেস্ট, যেটি আমাজন অববাহিকার মোট ৬০ শতাংশ কার্বন-ডাই-অক্সাইডের একটি “শোষক” থেকে কার্বন-ডাই-অক্সাইডের “উৎস” হিসেবে পরিবর্তিত হয়েছে। গত দশকে এটি শোষণের চেয়ে ২০ শতাংশ বেশি গ্রিনহাউস গ্যাস বায়ুমণ্ডলে ছেড়েছে।

বিশ্বব্যাপী কার্বন–ডাই–অক্সাইডের নির্গমন রোধ করতে স্থলজ বাস্তুতন্ত্রগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী হিসেবে কাজ করছে। কার্বন নির্গমন ৫০ শতাংশ বাড়লেও ১৯৬০ সাল থেকে বিশ্বব্যাপী বনভূমি এবং মাটি ক্রমাগতভাবে প্রায় ৩০ শতাংশ কার্বন দূষণ শোষণ করেছে।

আমাজনের “বৃক্ষহীন” (স্যাভানিফিকেশন) দক্ষিণ আমেরিকা এবং সারা বিশ্বকে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ করবে।

এর রেইনফরেস্টে সঞ্চিত রয়েছে ৯০ বিলিয়ন টনেরও বেশি কার্বন–ডাই-অক্সাইড, যা বিশ্বের অন্য উৎস থেকে বার্ষিক নির্গমনের দ্বিগুণ। বায়ুমণ্ডলে এই পরিমাণ কার্বন নির্গত হলে বৈশ্বিক তাপমাত্রা আরও দ্রুত বৃদ্ধি পাবে।

ইশ্বরের কৃপা

রেইনফরেস্টের স্থিতিস্থাপকতার পরিবর্তনের মূল্যায়ন করার জন্য লেন্টন ও বোয়ার্স এবং মূল লেখক এক্সেটার ইউনিভার্সিটির ক্রিস বোল্টন দুটি স্যাটেলাইট ডেটা সেট বিশ্লেষণ করেছেন। একটি বায়োমাস পরিমাপ করে এবং অন্যটি বনভূমির “সবুজতা”।

“যদি খুব বেশি স্থিতিস্থাপকতা হারিয়ে যায়, তবে “ডাইব্যাক” (ধীরে মৃত্যুবরণ করা) অনিবার্য হয়ে উঠবে। তবে যে জিনিসটা এই প্রক্রিয়াকে চূড়ান্ত রূপ দেবে, সেটা ঘটার আগ পর্যন্ত এটি স্পষ্ট হবে না”, বোয়ার্স বলেছেন।

একটি “ঐশ্বরিক কৃপা” আমাজনকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্ত থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।

“রেইনফরেস্টের প্রাকৃতিকভাবে অনেক স্থিতিস্থাপকতা রয়েছে—এটি এমন একটি জীববৈশিষ্ট্য যা বরফ যুগের আবহাওয়াকে পরিশোধন করেছে”, লেন্টন বলেছিলেন।

“আপনি যদি ‘টিপিং পয়েন্ট’ বা সহনসীমা অতিক্রম করার পরেও তাপমাত্রা আবার কমিয়ে আনতে পারেন, তবে আপনি পরিস্থিতি উন্নয়নে সক্ষম হতে পারেন।”

“কিন্তু তারপরেও ব্যাপক কার্বন–ডাই–অক্সাইড অপসারণ বা জিও–ইঞ্জিনিয়ারিং করতে হবে, যার নিজস্ব ঝুঁকি রয়েছে।”

১৯৭০ সাল থেকে আমাজন রেইনফরেস্টের ২০ শতাংশ ধ্বংস বা অবনমিত হয়েছে। বেশির ভাগ কাঠ, সয়া, পাম তেল, জৈব জ্বালানি এবং গরুর মাংস উৎপাদনের জন্য ব্যবহৃত হয় এসব জায়গা। এই ২০ ভাগ অঞ্চল প্রায় ৫ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার এবং নয়টি দেশ জুড়ে বিস্তৃত।

XS
SM
MD
LG