অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সয়াবিনের বিকল্প: খরচ কেমন?


বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার কারওয়ান বাজারের একটি দোকানে সাজিয়ে রাখা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ভোজ্যতেল।

বাংলাদেশের বাজারে সয়াবিন তেল নিয়ে নানা তেলেসমাতি দেখা গেল গত দুই সপ্তাহ। বাজারে দুষ্প্রাপ্য হয়ে উঠেছিল ভোজ্যতেল হিসেবে ব্যবহৃত এই তেল। গত ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহে ভোজ্যতেলের দাম বাড়ানো হয়েছিল। তখন বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম লিটারে আট টাকা বাড়িয়ে ১৬৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। বোতলজাত ৫ লিটার সয়াবিন তেলের দাম ৭৯৫ টাকা রাখা হয়েছিল। এর আগে ছিল ৭৬০ টাকা। বর্তমানে সরকারের নির্ধারিত দাম অনুযায়ী, বোতলজাত সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৬৮ টাকা, পাঁচ লিটারের বোতলের দাম ৭৯৫ টাকা। আর খোলা সয়াবিন লিটার ১৪৩ টাকা।

দেশের বাজারে সয়াবিন নির্ভর ভোজ্যতেলের বাইরে আর কী কী তেল বা তেলজাতীয় দ্রব্য রয়েছে তা জানতে চেষ্টা করেছে ভয়েস অফ আমেরিকা। রাজধানীর বাজারে সরিষার তেল, ঘি, ডালডা, পামওয়েল, নারিকেল তেল, অলিভ ওয়েল, কালোজিরার তেল, রাইস ব্রান অয়েল বিক্রি হচ্ছে ভোজ্যতেল হিসেবে।

সরিষার তেল

সরিষার তেল বাংলাদেশের ঐতিহ্যের সঙ্গেই মিশে আছে। একসময় গ্রামবাংলার একমাত্র ভোজ্যতেল ছিল সরিষার তেল। সরিষার তেল যেমন প্রয়োজনীয় তেমন উপকারীও। ভারতীয় উপমহাদেশে খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০০ থেকে সরিষার ব্যবহার হয়ে আসছে। সরিষার তেলের ব্যবহার দিন দিন কমে যাচ্ছে। সরিষাবীজ থেকে তৈরি হয় সরিষার তেল।

রাজধানী ঢাকার মিরপুর, কারওয়ান বাজার, হাতিরপুল ও বনানী বাজার ঘুরে সরিষা তেলের দামে রকমফের দেখা গেছে। ভিন্ন ভিন্ন দামের জন্য তারা বলছেন, কেউ সরাসরি ঘানি ভাঙা তেল দিচ্ছেন। আবার কেউ বলছেন বাছাইকৃত সরিষা থেকে তেল করা হয়েছে। প্রতি লিটার সরিষা তেল কিনতে খরচ হবে ২১০ টাকা ৩০০ টাকা।

ঘি

গরু বা মহিষের দুধ থেকে ঘি তৈরি হয়। ঘি বা মাখন কয়েকটি পদ্ধতিতে তৈরি করা যেতে পারে। ভাত, ডাল বা খিচুড়িতে এক চামচ ঘি দিলেই এর স্বাদ বেড়ে যায় বহুগুণ। আবার মুরগির মাংস বা খাসির মাংসের ঘি রোস্টও খেতে সুস্বাদু। বর্তমানে বাজারে এক কেজি খাঁটি ঘি কিনতে খরচ হবে ১২০০ থেকে ১৫০০ টাকা। আবার বিভিন্ন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের কৃত্রিম ঘি পাওয়া যায় ৭০০ থেকে ১০০০ টাকার মধ্যে।

ডালডা

ভেজিটেবল অয়েল বা উদ্ভিজ তেল (পাম, সয়াবিন) যান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় পারশিয়ালি হাইড্রোজেনশন করা হলে তরল অবস্থা থেকে মাখনের মতো অর্ধকঠিন কঠিন ডালডা বা বনস্পতি ঘি উৎপন্ন হয়, যা বাজারে ডালডা নামে পরিচিত। বাসাবাড়িতে এর ব্যবহার কম হলেও বেকারিপণ্য ও বাণিজ্যিক উৎপাদনে এটি বহুল ব্যবহৃত হয়। বাজারে বিভিন্ন কোম্পানির ডালডা পাওয়া যায় ৪৫০ টাকা থেকে ৬০০ টাকার মধ্যে।

পামঅয়েল

পাম তেল একটি উদ্ভিজ তেল। এটি পাম ফলের নির্যাস থেকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আহরণ করা হয়। পাম তেল লালচে রংয়ের হয়। একই ফলের শাঁস (বীজ) হতে পাম শাঁসের (বীজের) তেল পাওয়া যায়। আফ্রিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া এবং ব্রাজিল অঞ্চলে পাম তেল রান্নায় ব্যবহৃত হয়। দেশে পাম তেল উৎপন্ন হয় না বললেই চলে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া থেকে পামঅয়েল আমদানি করা হয়। আমদানি নির্ভর এই তেল বাজারে পাওয়া যায় ১৩০ টাকা ১৬০ টাকার মধ্যে।

নারিকেল তেল

নারিকেল তেলের ব্যবহারের কথা উঠলেই শুধু মনে হয় চুল ছাড়া এই তেলের ব্যবহার আর নেই। তবে খাবার উপযুক্ত নারিকেল তেল প্রতিদিন খেলে তা দেহের এনার্জি বৃদ্ধিতেও কাজ করে। রান্নায় বিশুদ্ধ নারকেল তেল ব্যবহার করা উচিত। বাংলাদেশে নারিকেল তেল কেবল চুলে ও শরীরে ব্যবহার হলেও শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশে তা রান্নাতেও ব্যবহার হয়। বাংলাদেশে নারকেল তেলের মাসিক চাহিদা প্রায় ১ হাজার ২০০ টন। দেশে নারিকেল তেলের দাম বিভিন্ন ব্র্যান্ড ভেদে ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা প্রতি লিটার।

জলপাই তেল

দামে বেশি হলেও স্বাস্থ্যের কথা ভেবে বর্তমানে অনেকেই রান্নায় অলিভ অয়েল বা জলপাই তেল ব্যবহার করেন বা করতে চান। অলিভ অয়েল শরীরে ব্যবহারের পাশাপাশি রান্নার জন্যও উপযুক্ত। এক্সট্রা ভার্জিন অলিভ অয়েল স্যালাড ড্রেসিং হিসেবে ব্যবহার করা যায়। সবজি রান্না করার জন্যও এই অলিভ অয়েল ব্যবহার করা যায়। বাংলাদেশের বাজারে প্রতি লিটার জলপাই তেল কিনতে খরচ করতে হবে ১০০০ থেকে ১৩০০ টাকা।

রাইস ব্রান অয়েল

রাইস ব্রান অয়েল তৈরি হয় ধানের তুষ থেকে, যা একসময় ব্যবহৃত হতো জ্বালানি আর গোখাদ্য হিসেবে। প্রযুক্তির উৎকর্ষের কল্যাণে এখন তা নিংড়ে তেল বের করা হচ্ছে। বাজারে বেশ কয়েকটি ব্র্যান্ডের রাইস ব্রান অয়েল রয়েছে। আবার আমদানিও করা হয়। দাম প্রতি লিটারে ১৬০ থেকে ১৮০ টাকা।

সূর্যমুখির তেল

আমাদের দেশের পরিচিত একটি তেল হচ্ছে সূর্যমূখী তেল। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এই ফুলের বাণিজ্যিক চাষ হয়ে থাকে। দেশে সূর্যমুখীর তেলের চাহিদা পূরণ করা হয় আমদানি করে। পাঁচ লিটারের এক বোতল সূর্যমুখী তেলের দাম ১২৫০ টাকা থেকে ১৪০০ টাকা।

বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন

শুভব্রত মৈত্র বাংলাদেশের জনপ্রিয় শেফ এবং রন্ধন বিশেষজ্ঞ। আন্তর্জাতিক পরিসরে বাঙালি খাবার তিনি তুলে ধরেছেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বাংলাদেশে আমন্ত্রিত হয়ে এলে তিনি শুভব্রত মৈত্রর খাবার খেয়েছেন। বাংলা খাবার ছাড়াও বিদেশি বহু খাবার তৈরিতে পারদর্শী তিনি। ভয়েস অফ আমেরিকা তার সঙ্গে কথা বলেছে রান্নার তেল বাছাই নিয়ে। শুভব্রত বলেন, “আমি রান্নার ক্ষেত্রে পছন্দ করি সরিষার তেল। বাংলা খাবারের ক্ষেত্রে যেখানে ঘি বা সরিষা ব্যবহার করার সুযোগ আছে আমি সেখানে তাই ব্যবহার করি। আমার কাছে সয়াবিনের চেয়ে সরিষার তেল বেশি পছন্দ। আবার রাইস ব্রান অয়েল এখন ব্যবহার করা হয়। এটাও স্বাস্থ্যকর। সয়াবিন তেলের চেয়ে সরিষা এবং রাইস ব্রান অয়েলকে আমি এগিয়ে রাখি।”

সেন্ট্রাল পুলিশ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের মেডিকেল অফিসার ডা. অর্পিতা সরকার বলেন, "আমাদের দেশে যে মানের সয়াবিন তেল ব্যবহার করা হয় তা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ, এটাতে মান যাচাইয়ের কোনো প্রক্রিয়া মানা হয় না। তারচেয়ে, দেশের খাঁটি সরিষার তেল অনেক ভালো। আর সবচেয়ে ভালো হচ্ছে অলিভঅয়েল ব্যবহার করা। কিন্তু আমাদের দেশের বাস্তবতায় অলিভঅয়েল ব্যয়বহুল। তাই সরিষার তেল ব্যবহার অনেক নিরাপদ। তবে কোনো তেলই মাত্রার বেশি ব্যবহার করা যাবে না।"

আসফি মোহাম্মদ চিফ ডায়টেশিয়ান হিসেবে কর্মরত রয়েছেন এভারকেয়ার হসপিটাল চট্টগ্রামে। ভোজ্যতেল ব্যবহার নিয়ে তার মতামত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমাদের দেশে অনেকেই মনে করেন তেল মানেই ক্ষতিকর। আসলে এটা পুরোপুরি সঠিক নয়। নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল আমাদের দেহের ও ত্বকের সুস্থতার জন্য দরকারি। তাই একেবারেই তেল পরিহার করা ঠিক নয়। তবে একেক তেলে একেক ধরনের গুণমান রয়েছে। ভিন্ন ভিন্ন তেল ব্যবহারের পদ্ধতিও ভিন্ন। যেমন- সয়াবিন তেল দিয়ে ভাজা-পোড়া জাতীয় খাবার তৈরি করা যায়। অলিভঅয়েল দিয়ে সালাদ ধরনের খাবার। আবার ঘি দিয়ে পোলাও ধরনের। তবে তেল ব্যবহারের আগে অবশ্যই তার বিশুদ্ধতা যাচাই করতে হবে। মনে রাখতে হবে, দূষিত বা ক্ষতিকর তেল ব্যবহারের চেয়ে মানে ভালো এমন তেল ব্যবহার তুলনামূলক কম ক্ষতির কারণ।"

XS
SM
MD
LG