দাম বেড়েছে পেঁয়াজ, রসুন, মৌসুমি সবজি ও ভোজ্য তেলের। বাড়তি টাকা গুনতে হচ্ছে এলপিজি গ্যাস কিনতে। বাজারে নিত্যপণ্যের এই দামবৃদ্ধিতে হুমকিতে পড়েছে হোটেল-রেস্তোঁরা ব্যবসায়ীরা। আগের মূল্যে খাবার বিক্রি করতে গিয়ে লোকসান গুনতে হচ্ছে। আবার দাম বৃদ্ধি করে কাস্টমার হারানোর ঝুঁকিও আছে। দ্রব্যমূল্যের এই উর্দ্ধমুখী চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে হোটেল-রেস্তোঁরা ব্যবসায়ীরা। আবার ভোগান্তি বেড়েছে নিম্ন -মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত শ্রেণীর। চরম সংকটে পড়েছে নিম্ন-আয়ের মানুষেরা। বিশেষ করে, রিকশাচালক, সিএনজি অটোরিক্সা চালক, যারা রাস্তায় থাকেন ও খাবার কিনে খেতে হয় তাদের খাদ্যাভ্যাস বদলাতে হচ্ছে। ভয়েস অফ আমেরিকার পক্ষ থেকে ঢাকার মিরপুর, পান্থপথ, কাঁঠালবাগান, বাংলামোটর এলাকা ঘুরে হোটেল মালিক, সাধারণ ক্রেতা, রিকশাচালকদের সাথে কথা বলেছি।
মিরপুরের সিটি ক্যাফে হোটেল অ্যান্ড রেস্তোঁরা। এখানে সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার ও সন্ধ্যায় নাস্তার ব্যবস্থা আছে। সকালের খাবারের তালিকায় রুটি, পরোটা, ডিম ভাজি, ডাল-সবজি, স্যুপসহ নানা রকম আইটেম থাকে। আবাসিক এলাকার পাশে হওয়ায় এখানে প্রায় সবসময়ই বেচাবিক্রি ভালো হয়। এখানকার হোটেলবয় মিজানের কাছে জানতে চাওয়া হয়, খাবারের দাম বাড়ছে কিনা? মিজান হেসে বললেন, “গ্যাসের দাম বাড়ছে। খরচা বাড়ছে মালিকের। আবার ধরেন, তেলের দামও ম্যালা। মালিক বলছে এমুন চললে দাম বাড়াতে হবে। এখন দাম বাড়ানোর মধ্যে খালি সিঙ্গারার দাম বাড়ানো অইছে। আগে ৮ ট্যাকা ছিল। অহন ১০ ট্যাকা করা অইছে।”
এখানেই কথা হয় সিএনজি অটোরিক্সা চালক মকবুল মিয়ার সাথে। মকবুল মিয়া থাকেন মিরপুরের শিয়ালবাড়ি এলাকায়। সকালের নাস্তা খেতে আসা ষাটোর্ধ্ব মকবুল মিয়া বললেন, "পরিবার গ্রামের বাড়ি নীলফামারি গ্যাছে। বাসায় খাওন রান্নার কেউ নাই, তাই হোটেলে আসলাম। তয় হোটেলের খাবার খাইয়া প্যাট ভরে না। আবার দামও বেশি। নগদ টাকা খরচ হয়। তাই দিনে দুইবেলা হোটেলে খাই। একবেলা চা-বনরুটি দিয়ে পার কইরা নিতে অয়।”
দুই দিন আগে সিএনজি নিয়ে বাড্ডার দিকে গিয়েছিলেন জানিয়ে বললেন, "এইদিকে অহনো দাম বাড়া শুরু অয় নাই। তয় বাড্ডা মেরুল বাড্ডার হোটেলের সিঙ্গারা দেখলাম সাইজে ছোট করতেছে। তারাই আর কি করবো কন! আমাগো যেমন সিএনজির জমা খরচ বাড়ায়া দিছে মালিক। আমাগো বাধ্য হয়ে যাত্রীগো থেকেও বাড়তি ভাড়া লইতে অয়।”
শুক্রাবাদ বাস স্ট্যান্ডের কাছেই ফুটপাতে ব্যবসা করেন জোলেখা বেগম। চপ, সিঙ্গারা, পিয়াজু, নুডুলস, ছোলা ইত্যাদি বিক্রি করেন। ফুটপাতের পাশেই গ্যাসের সিলিন্ডার দিয়ে রান্না করেন। গরম গরম খাবারের বিক্রি ভালো হয়। তার দোকানের ক্রেতারা অধিকাংশই রিকশাওয়ালা। আবার মাঝেমাঝে পথচারিরাও কিনে নেন তার তৈরি খাবার। জোলেখা বেগম জানালেন একটি সিলিন্ডার দিয়ে দশ দিনের মতো যায়। এছাড়া প্রতিদিন তার রান্নার জন্য তেল কিনতে হয় ৩-৪ লিটার। গ্যাস ও তেলের দাম বৃদ্ধিতে এখন আগের মতো লাভ হয় না। জোলেখা বেগম বলেন, “এখন আর আগের মতো লাভ থাকে না। সবকিছুরই দাম বাড়তির দিকে।”
জোলেখা বেগমের দোকানের সামনেই কথা হয় রিকশা চালক কাসেম এর সঙ্গে। কাছে গিয়ে কথা বলতে চাইলে প্রথমে রাজি হলেন না। পরে জানালেন, বাড়ি কুমিল্লা। ঢাকায় মগবাজার এলাকায় থাকেন। সারাদিন রিকশা চালান। নিজের দুইবেলা খাবার রাস্তাতেই খেতে হয়। কিন্তু পরিবারের বাকি সবার জন্য বাসায় রান্না হয়। দৈনিক আয় গড়ে মোটামুটি ৭০০-৯০০ টাকার মধ্যে থাকে। গ্যারেজ ভাড়া দিয়ে যা থাকে তাতে সংসার চালাতে টানাটানি হয়। এখন বাজারে তেল, গ্যাস, পেঁয়াজের দাম বাড়ায় সবকিছুর দাম বাড়ছে। এখন আর নিজে দুইবেলা বাইরে পকেটের টাকা খরচ করে খান না। একবেলা রাস্তার দোকান থেকে খেয়ে নেন। একবেলা খাবার বন্ধ করতে হয়েছে।
জোলেখা বেগম জানালেন তার স্বামী তার দোকানের কাজে সাহায্য করেন। আগে রাজমিস্ত্রির কাজ করতেন। দুর্ঘটনার পর পায়ে আঘাত লাগায় এখন বেকার। তাই স্ত্রীর দোকানের কাজে সময় দেন। মাঝেমাঝে টিসিবির ট্রাকে গিয়ে লাইন দিয়ে মালামাল কিনে আনেন। সেখান থেকে প্রতি লিটার সয়াবিন তেল ১১০ টাকা, মসুর ডাল প্রতি কেজি ৬৫ টাকা ও পেঁয়াজ ৩০ টাকায় কেনা যায়।
পান্থপথে স্কয়ার হসপিটালের পাশেই মাদল খাবার ঘর। এটি এখানকারর বেশ ভালো মানের খাবার ঘর। বেসরকারি ব্যয়বহুল হাসপাতালের পাশে হওয়ায় এখানকার বিক্রি তুলনামূলক ভালো। এখানকার কাস্টমাররাও সমাজের অবস্থাপন্ন শ্রেণির লোকেরা। আবার মেইন রোডের পাশে হওয়ায় বেশ কাস্টমারও পাওয়া যায়। এই খাবারের ঘরে সকালে নাস্তা, দুপুরে ভাত, বিরিয়ানি, খিচুড়ি, রাতের জন্য খাবারের ব্যবস্থা আছে। এছাড়া মিষ্টিান্ন ও পিঠা-পুলির আয়োজনও থাকে। এখানে কথা হয় ম্যানেজারের সাথে।
খাবারের দাম বাড়ানো হয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বললেন, “আমাদের এখানে খাবারের দাম জানুয়ারি থেকেই বাড়ানো হয়েছে। এখন আর নতুন করে বাড়ানো হচ্ছে না। তবে সামনে রমজানে আবার দাম বাড়াতে হবে।” রমজানে দাম বাড়বে কেন? এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “রমজানের ইফতারি আইটেমের অধিকাংশ খাবার তৈরি করতে তেলের ববহার হয়। আমরা একবারের ব্যবহৃত তেল আর ব্যবহার করি না। তাই মান ঠিক রাখতে গেলে তখন দাম না বাড়িয়ে আসলে উপায় থাকবে না।”
মাদল খাবার ঘরেই কথা হয় বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র অনিকের সাথে। অনিক তার এক বন্ধুকে নিয়ে খেতে এসেছেন। বললেন, ধানমন্ডি ৩২ ধেকে হাঁটতে হাঁটতে তারা এখানে এসেছেন। এখানকার পুডিং খেয়েছেন তারা। বাসার বাইরে সবসময় খাওয়া কিনা জানতে চাইলে এই শিক্ষার্থী বললেন “আমরা বন্ধুরা মিলে মেসে থাকি। মাঝে মাঝে বাইরে খাওয়া হয়। কিন্তু আগের মতো এখন আর খুব বেশি বাইরে হোটেলে খাওয়া হয় না। এখন অল্প টাকায় ভালো মানের খাবার পাওয়া যায় না।”
বাংলামোটরে বৈশাখী হোটেল অ্যান্ড রেস্টুরেন্ট। এর মালিকদের সাথে কথা বলে জানা গেল, তারা দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাওয়ায় খাবারের দাম এখনও বাড়ানি। তবে রুটি-পরোটার সাইজ কিছুটা ছোট হয়েছে। রুটি বানানোর কারিগর বুঝিয়ে বললেন, “আগে যেই আটায় ধরেন ১০টা রুটি বানাতাম বখেন তা দিয়ে ১২-১৩ টি বানাচ্ছি। এভাবে পোষাতে হয়।”
বাংলাদেশ রেস্তোঁরা মালিক সমিতির সভাপতি মো. ওসমান গণি বলেন, “সত্যিকার অর্থে এখন আর আমাগো হাতে ব্যবসা নাই। দীর্ঘদিনের পুরানা ব্যবসা তাই পাল্টানো যায় না। অল্পকিছু মানসম্মত হোটেল ছাড়া আর কেউ ব্যবসা করতে পারছে না। এইভাবে দ্রব্যমূল্য লাগামহীন থাকলে খাবারের দাম না বাড়ায়া উপায় নাই। আবার কাস্টমার কমে যাওয়ার ভয়ে হোটেলগুলো দাম বাড়াতে পারছে না। নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে কমদামে খাবার দিতে গিয়ে অনেক সময় খাবারের মান ঠিক থাকে না। ব্যবসায়ীদের কিছু করার নাই। হাত পা বান্ধা।”