অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

"ছেলে দেশকে জিতিয়েছে, এর চেয়ে গর্বের আর কী হতে পারে"


বাবার সঙ্গে তাসকিন। (ছবি- Instagram@taskintazim)

"কাল আমাদের পরিবারের জন্য ছিল আনন্দের এক দিন। আমার ছেলের দুর্দান্ত বোলিংয়ে দেশ জিতেছে, বাবা–মা হিসেবে এর চেয়ে বড় গৌরবের আর কী হতে পারে! আপনারা সবাই আমার ছেলের জন্য দোয়া করবেন, সে যেন দেশের জন্য আরও বড় সাফল্য এনে দিতে পারে"—কথাগুলো আবদুর রশিদের। বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের পেসার তাসকিন আহমেদের বাবা।

বুধবার সেঞ্চুরিয়নে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডেতে তাসকিনের বিধ্বংসী বোলিংয়েই বাংলাদেশের ঐতিহাসিক সিরিজ জয় তরান্বিত হয়। ৯ ওভার বোলিং করে মাত্র ৩৫ রানে ৫ উইকেট নিয়ে তাসকিনই ফাটল ধরান প্রোটিয়াদের ব্যাটিং লাইনে। দক্ষিণ আফ্রিকার
ইনিংস থামে মাত্র ১৫৪ রানে। যেটি মাত্র ২৬.৩ ওভারে তামিম ইকবাল আর লিটন দাসের ব্যাটে ৯ উইকেট হাতে রেখে পেরিয়ে যায় বাংলাদেশ।

কেবল কালকের ম্যাচই নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে সিরিজের প্রথম ম্যাচেও বল হাতে দারুণ অবদান তাসকিনের। সেঞ্চুরিয়নের সেই ম্যাচেও ৩ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। তিন ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের এই পেসারই সিরিজ–সেরা।

মায়ের সঙ্গে তাসকিন। (ছবি- Instagram@taskintazim)
মায়ের সঙ্গে তাসকিন। (ছবি- Instagram@taskintazim)

কাল ছেলের পারফরম্যান্সে বাবা আবদুর রশিদের সঙ্গে অসম্ভব খুশি মা সাবিনা ইয়াসমিনও। ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি বলেন, "আমার ছেলে গত দেড়–দুই বছর অসম্ভব পরিশ্রম করেছে। শীত–গ্রীষ্ম,রোদ–ঝড়–বৃষ্টি, কোভিড, লকডাউন কিছুই তাকে দমাতে পারেনি। ২০১৯ বিশ্বকাপে চোটের কারণে দল থেকে বাদ পড়ে সে কিছু দিন খুবই ভেঙে পড়েছিল। অথচ ওই সময়টা ঘরোয়া ক্রিকেটে তার পারফরম্যান্স ছিল বেশ ভালো। চোটের দুর্ভাগ্যে বাদ পড়ার পর সে নিজেকে বদলে ফেলে। মা হিসেবে মাঝেমধ্যে খারাপই লাগত। আমি তো মনে করি অমানুষিক পরিশ্রমের ফল পেয়েছে আমার ছেলে। পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই, এটি তাসকিনও বুঝেছে।"

২০১৭ সালে বিয়ে করেছেন তাসকিন। স্ত্রী সৈয়দা রাবেয়া নাঈমা। তাসকিন–নাঈমার ঘর আলো করেছে তাশফিন আহমেদ রিয়ান। বয়স তার তিন। কাল টিভিতে বাবার দুর্দান্ত বোলিং ছুঁয়ে গিয়েছিল রিয়ানকেও।

স্ত্রী সৈয়দা রাবেয়া নাঈমার সঙ্গে তাসকিন আহমেদ। (ছবি- Instagram@taskintazim)
স্ত্রী সৈয়দা রাবেয়া নাঈমার সঙ্গে তাসকিন আহমেদ। (ছবি- Instagram@taskintazim)

"আমার নাতি দৌড়ে কী যে আনন্দ করছিল কাল! বারবার বলছিল, দাদু, বাবা জিতে গেছে।" বলছিলেন আবদুর রশিদ। তাসকিনের বাবা জানালেন তার পুত্রবধু নাঈমাও স্বামীর সাফল্যে আপ্লুত। তিনি আরও বললেন, "তাসকিনের খেলার সময় ওর মুখের দিকে তাকানো যায় না। খুব টেনশনে থাকে। আমি বলি টেনশনের কিছু নেই। এটা খেলাই। হার–জিত থাকবে। সাফল্য–ব্যর্থতা থাকবে। কখনো কখনো খুব বাজে খেলবে। এসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই।"

খুব ছোটবেলা থেকেই তাসকিন ক্রিকেটকে ধ্যান–জ্ঞান বানিয়েছেন। টেলিভিশনে যে খেলাই হতো তাকে ওঠানো যেত না। সারাদিন ক্রিকেট বল আর ব্যাট নিয়ে পড়ে থাকতেন। সেই দিনগুলির স্মৃতিচারণ করে আবদুর রশিদ বলেন, "ওর ধ্যানজ্ঞানই ছিল ক্রিকেট। আমরাও বাধা দিই নি। সবসময় বলেছি, যদি ক্রিকেট খেল, তাহলে ভালোভাবে খেল। সে ক্রিকেটটা ভালো করেই খেলেছে। সব সময় ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিসের মতো বোলারদের অনুসরণ করত। খুব গর্ব লাগছে কাল সে যে কীর্তি করেছে, তাতে তাসকিনের নাম তার আদর্শ খেলোয়াড়দের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে। তাসকিনের জন্য এর চেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আর কী হতে পারে।"

দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে উপমহাদেশীয় ফাস্ট বোলারদের ৫ উইকেট–কীর্তি খুব বেশি নেই। তাসকিন সেই দলে কাল প্রবেশ করেছেন। তাসকিনের আগে এই ক্লাবে যাদের নাম উঠেছে, তারা সবাই কিংবদন্তি। গতকাল থেকে ওয়াসিম আকরাম, ওয়াকার ইউনিস, নুয়াস জয়সা ও লাসিথ মালীঙ্গাদের সঙ্গে উচ্চারিত হচ্ছে বাংলাদেশের তাসকিন আহমেদের নাম।

তাসকিনের বাবা বলছিলেন, তার ছেলের জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছিল ২০১৯ বিশ্বকাপের দল থেকে বাদ পড়াটাই, "ওই সময় তাসকিন বিপিএলে খুব ভালো বোলিং করেছিল। কিন্তু বিপিএলের সময়ই সে চোটে পড়ল। চোটটা খুব বাজে ধরনের ছিল।

ছেলে তাশফিন আহমেদ রিয়ানের সঙ্গে তাসকিন। (ছবি- Instagram@taskintazim)
ছেলে তাশফিন আহমেদ রিয়ানের সঙ্গে তাসকিন। (ছবি- Instagram@taskintazim)

বিশ্বকাপের আগ দিয়ে সে আর সেই চোট থেকে পুরোপুরি মুক্ত হতে পারেনি। খুব ভেঙে পড়েছিল। তবে সে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল প্রতিজ্ঞা করেছিল নিজেকে বদলে ফেলার। প্রিয় খাবারগুলিও ছুঁয়ে দেখত না। জিমে ট্রেনিং করত। ফাঁকা জায়গায় রানিং করত। আমার বাড়ির গ্যারাজে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বোলিং করে যেত। মিরপুরের
অনুশীন নেট তো আছেই। কোনো বড় ক্রিকেটারের সঙ্গে দেখা হলেই তার পরামর্শ নিত। আমি উৎসাহ দেওয়ার চেষ্টা করতাম। বলতাম পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। সে পরিশ্রম করে গেছে। হাতে হাতে ফলও পেয়েছে।"

২০১৪ সালে ঢাকায় ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক তাসকিনের। প্রথম ম্যাচেই মিরপুর শেরেবাংলা স্টেডিয়ামে ২৮ রানে ৫ উইকেট নিয়েছিলেন তিনি। তার টি–টোয়েন্টি অভিষেকটা অবশ্য আরও আগে। ২০১৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত টি–টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে স্বাগতিকদের শেষ ম্যাচের আগে হঠাৎ করেই দলে সুযোগ পান তিনি। মাশরাফি বিন মুর্তজা চোট পেলে তাসকিনকে নেওয়া হয়েছিল তার বদলি হিসেবে। গতকাল সেঞ্চুরিনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ক্যারিয়ারে দ্বিতীয়বারের মতো তাসকিন পেলেন ৫ উইকেট। এখনো পর্যন্ত ৪৮টি ওয়ানডে খেলে ৬৭ উইকেট তার। ৩৩ টি–টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে তাসকিন নিয়েছেন ২৩ উইকেট। এখনো পর্যন্ত খেলেছেন ১০টি টেস্ট। বড় সংস্করণেও তাঁর উইকেটসংখ্যা ২৩।

দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজের মধ্যেই তাসকিনের ডাক আসে আইপিএলের নতুন ফ্র্যাঞ্চাইজি 'লক্ষ্নৌ সুপার জায়ান্টস' থেকে। তবে সামনেই টেস্ট সিরিজ থাকায় আইপিএলে যোগ দেননি বাংলাদেশের এই পেসার।

XS
SM
MD
LG