অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

জহির রায়হানঃ বাংলা চলচ্চিত্রের অসমাপ্ত চিত্রনাট্য


জহির রায়হান।

১৯৭০ সালে মুক্তি পায় জহির রায়হান পরিচালিত ছবি 'জীবন থেকে নেয়া'। এক সাধারণ পরিবারকে কেন্দ্র করে গড়া ওঠা কাহিনীতে দেখা যায় স্বামীকে নিয়ে বাবার বাসাতেই থাকেন এক নারী। তার স্বামী অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। সংসারের সব ক্ষমতা সেই নারীর হাতে। এই ক্ষমতার অপব্যবহার করেই তিনি তার স্বামী ও নিজের দুই ভাইয়ের উপর একরকম স্বৈরশাসন চালিয়ে থাকেন।

সামাজিক এই চলচ্চিত্রে তৎকালীন বাঙালির স্বাধীনতা আন্দোলনকে এভাবেই রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন নির্মাতা। এই ছবিতে রাজ্জাক, সুচন্দা, রোজী সামাদ, খান আতাউর রহমান, রওশন জামিল, আনোয়ার হোসেন অভিনয় করেছেন। জীবন থেকে নেয়া ছবিতে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি চিত্রায়িত হয়েছিল, যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। এটি জহির রায়হান নির্মিত শেষ পূর্ণাঙ্গ কাহিনী চিত্র। ধরা হয়, বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলন নিয়ে নির্মিত এটিই প্রথম ছবি।

চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে ১৯৭৭ সালে মরণোত্তর একুশে পদক এবং সাহিত্যে অবদানের জন্য ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরস্কারে ভূষিত করে। চলচ্চিত্রে তার সামগ্রিক অবদানের জন্য ১৯৭৫ সালে ১ম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে তাকে মরণোত্তর বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়।

এই সময়ের নির্মাতা নুরুল আলম আতিক। কিছুদিন আগেই তার নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র 'লাল মোরগের ঝুঁটি' মুক্তি পেয়েছে। জহির রায়হান সম্পর্কে মূল্যায়ণ করতে গিয়ে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি বলেন, “ঠিক এই সময়েও যদি আমাদের চলচ্চিত্রের একটি জাতীয় রূপরেখা প্রকাশের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয় তাহলে সবার আগে উচিত হবে জহির রায়হানকে পাঠ করা। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটিতে যেমন ভাষা সংগ্রামের বিষয় রয়েছে তেমনই রয়েছে একটি স্বাধীন দেশের আকাঙ্ক্ষা। আর শুধু যদি মুক্তিযুদ্ধের চলচ্চিত্র নিয়ে কথা বলতে যাই তাহলে এখন পর্যন্ত স্টপ জেনোসাইডের মতো স্মার্ট, দর্শকদের সহজেই কানেক্ট করার মতো চলচ্চিত্র নেই।"

জহির রায়হান ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর ঢাকায় ফিরে আসেন। ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডে ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারও শহীদ হয়েছেন এটা তিনি জানতেন। তারপরেও সে সময় জহির রায়হানের নিকট বিভিন্ন ধরনের ফোন আসতো। সেসব ফোনে বলা হতো- "আপনি আসুন, আপনার ভাইকে মিরপুরে আটকে রাখা হয়েছে, আপনি এলেই উদ্ধার করতে পারবেন।" এমনটাই জানান পুত্র অনল রায়হান।

অনল বলেন, "সেনাবাহিনী ও পুলিশ সদস্যরা মিলে মিরপুর অভিযানে যান। একমাত্র সিভিলিয়ান ছিলেন বাবা। কালাপানি পানির ট্যাংকের সামনে চারদিক থেকে বিহারী ও আর্মি সৈন্যরা গুলিবর্ষণ শুরু করে। সেসময় বাবা শহীদ হন। আমরা যা শুনেছি তা থেকে নিশ্চিত হয়েছি বাবা শহীদ হয়েছেন। কিন্তু বাবাকে কারা ফোন করতো তা এখনো রহস্যই রয়ে গেছে।" জানুয়ারি মাসের ৩০ তারিখে ভাইকে খুঁজতে গিয়ে চিরতরে হারিয়ে যান জহির রায়হান।

জহির রায়হান এমন একজন নির্মাতা, যাকে হারানোর পঞ্চাশ বছর পরেও এক বুক আফসোস নিয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন কাছের, দূরের, নানা প্রজন্মের মানুষেরা।

'জীবন থেকে নেয়া'র মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব একটা সহজ ছিল না"- ছবির নায়িকা সুচন্দা

১৯৬৭ সালে বেহুলায় অভিনয় করার সময় চিত্র পরিচালক জহির রায়হানের সাথে পরিচয় এবং ১৯৬৭ সালেই তাকে বিয়ে করেন সুচন্দা। ভয়েস অফ আমেরিকার সঙ্গে আলাপকালে সুচন্দা বলেন, "আমাকে এই ছবির নায়িকা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল, তখন সত্যি বলতে কি আমি ছিলাম অন্তসত্ত্বা। একজন গর্ভবতী নারী ছবিতে নায়িকা হিসেবে অভিনয় করবে- এটা ভেবে কেমন লাগছিল। জহির রায়হানকে জিজ্ঞেস করলাম- ‘আমি কি এভাবে অভিনয় করবো?’ জহির রায়হান বললেন, ‘কেন করবে না? অবশ্যই করবে। শুধু এই ছবি না, তুমি আমার আর সব ছবিতেই অভিনয় করবে।‘ আমিও এরইমধ্যে চিত্রনাট্য পড়ে ফেললাম। এমন অপূর্ব সংলাপ ও চিত্রনাট্য এই ছবি আমি করবো না- এটা হতেই পারে না। শুরু করলাম অভিনয়। মানিকগঞ্জ, ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ও এফডিসিতে শুটিং শুরু হলো। প্রতিটি শটের পর আমি তার পাশে থাকতাম। সত্যি কথা বলতে আমি সবসময় জহির রায়হানের পাশেই থাকতাম।"

ছবির ফ্রেমিং ও গল্পকে জীবন্তভাবে তুলে ধরার বিষয়ে জহির রায়হান ছিলেন বিশেষ পারদর্শী- এমনটাই উল্লেখ করে সুচন্দা বললেন, “জহির রায়হানের ছবিই কথা বলতো। তার ফ্রেমিং বলে দিতো এটা জহির রায়হানের ছবি। গল্পের বাস্তবতার জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারিতে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শুটিং করা হবে। ওই ২১ তারিখেই প্রভাত ফেরির সময় শুটিং করা হলো। যারা প্রভাত ফেরিতে এসেছিল শুটিংয়ের সময় তারা সকলেই সহযোগিতা করলো। এভাবেই ধীরে ধীরে নির্মিত হলো চলচ্চিত্রটি।"

স্বাধীনতার পূর্ব মুহূর্তে 'জীবন থেকে নেয়া'র মতো চলচ্চিত্র নির্মাণ খুব একটা সহজ ছিল না বলে মনে করেন সুচন্দা। জানালেন এই ছবি নির্মাণের পেছনে শত প্রতিবন্ধকতার কথা। সুচন্দা বলেন, “এফডিসিতে শুটিং চলছিল। এ সময় আর্মির গাড়ি চলে এলো। বলা হলো এই ছবির শুটিং বন্ধ করতে হবে। জহির রায়হান ছিলেন অত্যন্ত সাহসী মানুষ। তিনি জানতে চাইলেন কেন বন্ধ করা হবে? তারা কথা শুনলো না। জহির রায়হানকে উঠিয়ে নিয়ে গেল। এর প্রতিক্রিয়া হলো। পরে অবশ্য তাকে ফিরিয়ে দিয়ে যাওয়া হলো। ছবির শুটিং শেষ হওয়ার পরেও ছিল প্রতিবন্ধকতা। সেন্সরবোর্ডে এই ছবি আটকে দেওয়া হলো। পারিবারিক গল্পের মধ্যে একটি স্বাধীন দেশের চেতনা প্রবাহিত হচ্ছে, সেটা মেনে নিতে পারছিলেন না শাসক শ্রেণীরা। রাস্তায় নেমে এলো সাধারণ জনতা। তারা ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রের মুক্তির জন্য আন্দোলন শুরু করলো। অবশেষে ৭০ সালে মুক্তি পেল ছবিটি।"

সুচন্দা বলেন, “মুক্তির পরেই ছবিটি সুপার ডুপার হিট। যেখানেই যাই জীবন থেকে নেয়ার গল্প। দেশে বিদেশে সবাই আমার এতো প্রশংসা করলো যে আমার এখনো মনে পড়ে সেসব কথা। এই ছবিটি আমাদের স্বাধীনতার চেতনাকে ভীষণভাবে অনুপ্রাণিত করে। এর একটি অংশ হতে পেরে আমি গর্বিত।"

জহির রায়হানের ছবিতেই প্লেব্যাক শিল্পী হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেন সাবিনা ইয়াসমিন

'জীবন থেকে নেয়া' ছবিতে, প্রথমবারের মতো চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয় “আমার সোনার বাংলা” গানটি যা পরে বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়। “আমার সোনার বাংলা” সম্মিলিত কণ্ঠে গাওয়া হয়েছিল। এই কণ্ঠশিল্পীদের একজন ছিলেন সাবিনা ইয়াসমিন।

সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আসলে জীবন থেকে নেয়া চলচ্চিত্রে আমি গেয়েছি ওই একটাই গান। 'আমার সোনার বাংলা'। হ্যাঁ, এটা পরবর্তীতে জাতীয় সংগীত হয়ে যায়। কিন্তু এটা রেকর্ড করা হয়েছিল আরো বেশ কয়েক বছর আগে। আর এই গান নিয়ে আমার জহির রায়হানের সঙ্গে কথা হয়নি। কথা হয়েছিল খান আতার সঙ্গে। আমিও যতদূর জানি জহির রায়হান কথা কম বলতেন। আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে একবার। তেমন কথা হয়নি। আমার প্রথম প্লেব্যাক ১৯৬৭ সালে। এটা জহির রায়হানের হাত ধরেই। ‘আগুন নিয়ে খেলা’ ছবিতে আমি প্রথম প্লেব্যাক করি। এই ছবির গানগুলো জহির রায়হান দেখাশোনা করেছেন।"

প্রথম প্লেব্যাকের অভিজ্ঞতা জানিয়ে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, “আলতাফ মাহমুদের বাসা আমাদের বাসার পাশেই ছিল। তিনি আমার মা'কে রাজি করালেন। তার আগে আমি ছোটদের গান করতাম। মা বললেন, আর কত ছোটদের গান করবি। এটা কর। তারপর গাওয়া হলো। দেড় মাসের মতো সে গানের খোঁজ পেলাম না। জানতেই পারলাম না গানটি ঠিকঠাক হয়েছিল কি না। কিন্তু দেড় মাস পর আলতাফ মাহমুদ হাজির হলেন। বললেন, ওই ছবির আরেকটা গান গাইতে। সেসময়ই তিনি বললেন যে, জহির রায়হান সাহেব গানটা খুব পছন্দ করেছেন। তিনি প্রশংসা করেছেন। আমি এ কথা শুনে খুব আনন্দিত হয়েছিলাম। গর্বে বুকটা ভরে উঠেছিল। আমি জানি না ছবিটি কে তখন পরিচালনা করেছিলেন। কিন্তু নেপথ্যে ছিলেন জহির রায়হান। আমি জহির রায়হানের বানানো চলচ্চিত্রের সাত থেকে আটটা গান গেয়েছিলাম।“

"তিনি হারিয়ে গেলেন, আর ছবিটিও শেষ করা হলো না"- ববিতা

সাবিনা ইয়াসমিন যেমন জহির রায়হানের হাত ধরে প্লেব্যাকে এসেছেন তেমনই ফরিদা আক্তার পপি ওরফে ববিতাও "অভিনেত্রী" হয়েছেন জহির রায়হানের হাত ধরেই। খুব অকপটেই বিষয়টি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বললেন ববিতা।

জহির রায়হান ও ববিতা সম্পর্কে তারা দুলাভাই-শ্যালিকা। বড় হয়ে ডাক্তার হতে চাওয়া ববিতাকে এক প্রকার জোর করেই চলচ্চিত্রে এনেছিলেন জহির রায়হান। ববিতা বলেন, "তখন আমি পঞ্চম বা ষষ্ঠশ্রেণিতে পড়ি। ‘সংসার’ নামে একটি চলচ্চিত্রে বানাচ্ছিলেন দুলাভাই (জহির রায়হান) সেখানে কিশোরী একটি চরিত্র রয়েছে। আমাকে বললেন যে সেই চরিত্রে অভিনয় করতে হবে। আমি তো কোনোভাবেই করব না। কারণ শুটিং করা খুব পরিশ্রমের কাজ। সুচন্দা আপাকে দেখতাম। তাই আমি মায়ের মতো ডাক্তার হওয়ার বাসনা নিয়ে ছিলাম। জহির ভাই আমাকে প্রায় ধমক দিয়েই চলচ্চিত্রে অভিনয় করালেন। এই ছবিতে সুচন্দা আপা আমার মায়ের চরিত্রে ও রাজ্জাক ভাই ছিলেন আমার বাবার চরিত্রে। ছবিটা অবশ্য সে অর্থে হিট হয়নি।"

নায়িকা হিসেবে নিজের ছবির কথা উল্লেখ করে ববিতা বললেন, “যে রাজ্জাক ভাই আমার বাবার চরিত্রে ছিলেন এই রাজ্জাক ভাইকেই আমার নায়ক বানানো হলো। চলচ্চিত্রের নাম ‘শেষ পর্যন্ত।' কিন্তু জহির ভাই যখন আমাকে প্রস্তাব দিলেন, তখন আমি অভিনয় করবো না বলে আবার জানিয়ে দিলাম। আমাকে নায়িকা? তারমধ্যে রাজ্জাক ভাই নায়ক এটা করাই যাবে না। জহির ভাই আমাকে ধমক দিলেন। শুটিং করতে গিয়ে রোমান্টিক দৃশ্যে অভিনয় করতে পারছিলাম না। জহির ভাই আমাকে ধমক দিয়ে বললেন, এটা কি সত্যি সত্যি নাকি এটা অভিনয়। করলাম অভিনয়। ১৯৬৯ সালের ১৪ আগস্ট ছবিটি মুক্তি পায়। ওইদিনই ধানমন্ডির নিরাময় ক্লিনিকে আমার মা মারা যায়। শেষ পর্যন্ত ছবিটি তো সুপার ডুপার হিট হয়েছিল। কিন্তু ওইদিন আমি মায়ের আকস্মিক মৃত্যুর খবরে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিলাম।"

ববিতা বলেন, "লেট দেয়ার বি লাইট নামের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র বানাবেন জহির ভাই। আমাকে বলতেন এই ছবিটা সারাবিশ্বে মুক্তি দেব। সারাবিশ্বের মানুষ দেখবে। কিন্তু তিনি কেন জানি বলতেন এই ছবিটি হবে আমার শেষ ছবি, কেন বলতেন আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি নি। ছবিটির শুটিং শেষ হয়নি। এটা অনেকভাবেই শেষ করার চিন্তা করা হয়েছিল কিন্তু করা যায়নি। কারণ এই ছবির কোনো স্ক্রিপ্ট ছিল না। এটা একদম জহির ভাইয়ের মাথায় সেট করা ছিল। সেভাবেই অভিনয় করছিলাম। এতো সুন্দর একটি ছবি...! তিনি হারিয়ে গেলেন, আর ছবিটিও শেষ করা হলো না। এতো চমৎকার ছবিটি, হয়তো ছবিটি মুক্তি পেলে সারাবিশ্ব অবাক হয়ে দেখতো।"

জহির রায়হানের সঙ্গে কাজ করেছেন আবু মুসা দেবু

জহির রায়হানের সঙ্গে কাজ করেছেন আবু মুসা দেবু। স্বাধীনতা সংগ্রামের অসংখ্য চলচ্চিত্রের চিত্র সম্পাদন করেছেন তিনি। জীবন থেকে নেওয়া চলচ্চিত্রের শুটিং এর সময় তিনি এফডিসিতেই ছিলেন। ছবিটির কথা স্মরণ করে বললেন, “আমি জহির রায়হানের স্টপ জেনোসাইড চলচ্চিত্রের সম্পাদনা করেছি। কিন্তু অন্যান্য কিছু ছবির ক্ষেত্রেও তার সঙ্গে ছিলাম। ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি ঢাকার এফডিসির ৪ নম্বর ফ্লোরে শুটিং করা হয়েছিল। এই ছবিতে আমার কাজ করা হয়নি। তবে স্টপ জেনোসাইডের সম্পাদনার কাজ আমি করেছি।"

জহির রায়হান সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবু মুসা দেবু ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “আমরা স্টপ জেনোসাইডের কাজ করেছি কলকাতার টালিগঞ্জের তিনটি স্টুডিওতে। এগুলোর নাম হলো, ফিল্ম সার্ভিস, টেকনিশিয়ান স্টুডিও, নিউ থিয়েটার ওয়ান। তার সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি উনি মানুষকে খুব সম্মান করতেন। একজন প্রোডাকশন বয়কেও আপনি করে বলতেন। কখনই কাউকে তুমি বা তুই করে বলতেন না। জহির রায়হান সাহেব অনেক আধুনিক চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন। চলচ্চিত্র নিয়ে চিন্তাধারা অনেক আধুনিক ছিল। তার হাত ধরেই এদেশে প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’ নির্মিত হয়, প্রথম সিনেমাস্কোপ ছবি নির্মিত হয়। চলচ্চিত্রের অনেকগুলো মাইলফলক তাঁর হাতেই রচিত হয়। জহির রায়হান আলো ও কম্পোজিশন অনেক ভালো বুঝতেন। স্টপ জেনোসাইডের একটা দৃশ্যে মহাস্তানগড়ের রিফিউজি ক্যাম্পকে নিতে হবে। তিনি আমাকে বুঝিয়ে দিলেন। বললেন, এখানে স্টোন 'এফেক্ট দিতে হবে।' ক্যামেরার সুক্ষ্ম বিষয়গুলো বেশ ভালো বুঝতেন। আমার সঙ্গে জহির রায়হান সাহেবের কাজ কম হয়েছে কিন্তু আমি তাঁর সঙ্গে মিশেছি। ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ চলচ্চিত্রে আমি তাঁকে সহায়তা করেছি। যদিও এটা উল্লেখ করার মতো কিছু নয়।"

বাবা জহির রায়হানের সাথে পুত্র অনল রায়হান।
বাবা জহির রায়হানের সাথে পুত্র অনল রায়হান।

"তাকে এখনো আমি ক্রমাগত আবিস্কার করে চলেছি"- অনল রায়হান

চলচ্চিত্রের প্রতিটি জায়গায় জহির রায়হান বিচরণ করতে পারতেন জহির রায়হান। এমনটাই মনে করেন অনল। বাবা সম্পর্কে ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “বাবা যখন শহীদ হন তখন আমার বয়স মাত্র তিন বছর। বাবাকে নিয়ে আমার তেমন স্মৃতি নেই। এটা একদিক দিয়ে ভালো হয়েছে। স্মৃতি থাকলে হয়তো আমি তাকে শৈশবে কৈশোরে, যৌবনে নতুন নতুনভাবে আবিস্কার করতে পারতাম না। তাকে এখনো আমি ক্রমাগত আবিস্কার করে চলেছি। বাবা একজন কমপ্লিট শিল্পী। তিনি যেনতেনভাবে লেখেননি, যেনতেনভাবে সিনেমা বানাননি। 'কাঁচের দেয়ালে'র মতো সিনেমা বানিয়ে তিনি দেখিয়েছেন শিল্পমান কাকে বলে। আবার 'স্টপ জেনোসাইড', 'জীবন থেকে নেওয়া'র মতো রাজনৈতিক চলচ্চিত্র বানিয়েও দেখাতে পেরেছেন চলচ্চিত্র মানুষকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে। এসব একদম রাজনৈতিক ছবি। 'সঙ্গম', 'বাহানা', 'বেহুলা'র মতো চলচ্চিত্র বানিয়েও দেখিয়েছেন বাণিজ্যিকভাবে সফল চলচ্চিত্র বানাতে পারেন। আবার 'লেট দেয়ার বি লাইট'-এর মতো ছবি বানিয়েছেন যদিও সেটা শেষ করে যেতে পারেননি। এটা আন্তর্জাতিক মানের চলচ্চিত্র। সিনেমা নির্মাতা হিসেবে মাত্র ১০ বছরে যা নির্মাণ করে গেছেন, উনি যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে অনুমান করাই যায় বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আজ কোথায় গিয়ে দাঁড়াতো।

জহির রায়হান সম্পর্কে এই সময়ের নির্মাতা নুরুল আলম আতিকের ভাবনা

নুরুল আলম আতিক ২০০০ সালের কিত্তনখোলা চলচ্চিত্রের জন্য ২০০৩ সালে তিনি শ্রেষ্ঠ চিত্রনাট্যকার এবং শ্রেষ্ঠ চিত্রগ্রাহক বিভাগে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়াও তিনি ছয় বার বিভিন্ন বিভাগে মেরিল-প্রথম আলো সমালোচক পুরস্কার জিতেছেন। সম্প্রতি তাঁর নির্মিত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্র লাল মোরগের ঝুঁটি চলচ্চিত্র মুক্তি পায়।

জহির রায়হান সম্পর্কে বলতে গিয়ে আতিক বলেন, “জহির রায়হান স্বাধীনতার আগের দশকের সময়টায় চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন কিন্তু তার চলচ্চিত্র নির্মাণ কৌশল ও গল্প এখনও এই প্রজন্মকেও স্পর্শ করে যায়। ‘কখনো আসেনি’ বা ‘কাঁচের দেয়াল’ এর মতো চলচ্চিত্রগুলো আমার দেখার সুযোগ হয়েছে। নাগরিক জীবনকে এতো গভীরভাবে সেসময়ে আর কেউ ধারণ করতে পেরেছে কি না আমি নিশ্চিত নই। জহির রায়হানের চিন্তা চেতনা, যা তিনি ধারণ করেন এই দুই চলচ্চিত্রে তার প্রভাব ফুটে উঠেছে। ব্যবসায়িকভাবে সাফল্য না পেলে শিল্পগুণে এই চলচ্চিত্রগুলো অনন্য। তার নির্মানে যে ইউনিক ব্যাপার রয়েছে সেটা এখন পর্যন্ত এই পঞ্চাশ বছরেও সেটা পরিলক্ষিত হয়। স্বাভাবিকভাবে যারা এখন নির্মাণ করছেন তাদের এই চলচ্চিত্রগুলো বেশ ভাবায়।"

XS
SM
MD
LG