অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

চীনের টিকটক ও ফেসবুকের প্রভাব বিস্তরকারীরা যেভাবে দেশের পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন


বিদেশি বিভ্রান্তিমূলক ক্রিয়াকলাপগুলোকে ট্র্যাক করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান “মিবুরো”। প্রতিষ্ঠানটির প্রেসিডেন্ট ক্লিন্ট ওয়াটস নিউইয়র্কে প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরে তার কম্পিউটারে কাজ করছেন। ১৫ মার্চ ২০২২

ভিকা লি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তার ১৪ লাখ অনুসারীদের কাছে বলেছেন, তিনি একজন “লাইফ ব্লগার” এবং “খাদ্যপ্রেমী”, যিনি তার ভক্তদের চীন সম্পর্কে ধারণা দিতে চান যাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্যে দেশটিতে ভ্রমণ করতে পারেন।

“আমার চোখ দিয়ে আমি আপনাকে চীনের চারপাশে ঘুরে দেখাব, আপনাকে ভিকার জীবনযাপন দেখাব!” তিনি জানুয়ারি মাসে ইউটিউব ও ফেসবুকে পোস্ট করা একটি ভিডিওতে বলেন।

কিন্তু তার সেই চোখ চীনের রাষ্ট্র পরিচালিত টিভি নেটওয়ার্ক সিজিটিএনের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হতে পারে। ভিকা নিয়মিত সিজিটিএনের সম্প্রচারে উপস্থিত হন এবং প্রতিষ্ঠানটির ওয়েবসাইটে ডিজিটাল প্রতিবেদক হিসেবে তালিকাভুক্ত। ভিকা লি তার অনুসারীদের বলেন যে, তিনি “এই সমস্ত চ্যানেল নিজেই তৈরি করেছেন”। অথচ তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেখা যায়, অন্তত নয়জন তার পেজটি পরিচালনা করেন।

যেহেতু চীন বিশব্যাপী তার অর্থনৈতিক শক্তি জাহির করে চলেছে, দেশটি ইতিমধ্যেই শক্তিশালী প্রভাব বিস্তার করতে বিশ্বব্যাপী সামাজিক মাধ্যমের অনুসারীদের ব্যবহার করছে। দেশটি সামাজিক মাধ্যমের জনপ্রিয় ব্যক্তিত্বদের একটি নেটওয়ার্ক তৈরি করেছে, যারা পোস্টে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি প্রচারে তোতাপাখির মতো বুলি আওড়ান, ভার্চ্যুয়াল লকস্টেপে কাজ করে চীনের পক্ষে প্রচার করেন। কিন্তু চীনের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সমালোচনাকে এড়িয়ে চলেন এবং ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক বিষয়ে বেইজিংয়ের ব্যাখ্যাকে প্রচার করেন।

চীনের রাষ্ট্রঅধিভুক্ত কিছু সাংবাদিক নিজেদেরকে ট্রেন্ডি ইনস্টাগ্রাম প্রভাব বিস্তারকারী বা ব্লগার হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

প্রভাব বিস্তারকারী নেটওয়ার্ক বেইজিংকে বিশ্বব্যাপী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারকারীদের কাছে প্রোপাগান্ডা ছড়াতে সহায়তা করে। মিবুরোর গবেষণা অনুসারে, চীনা সরকার বা দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের সঙ্গে সংযোগ রয়েছে এমন কমপক্ষে ২০০ প্রভাব বিস্তারকারী ৩৮টি ভিন্ন ভাষায় কাজ করছেন।

ইউক্রেনের সঙ্গে রাশিয়ার যুদ্ধবিষয়ক প্রচারণা একটি উদাহরণ মাত্র।

যখন এই হামলাকে গণতন্ত্রের ওপর নির্লজ্জ আক্রমণ হিসেবে নিন্দা করা হচ্ছিল, তখন লি জিংজিং তার ২১ হাজার ইউটিউব গ্রাহকদের কাছে একটি ভিন্ন আখ্যান উপস্থাপন করেন। তিনি এমন ভিডিও পোস্ট করেন, যা রাশিয়ার প্রচারেরই প্রতিফলন। তিনি রাশিয়ার বিভ্রান্তিকর দাবিগুলো প্রচার করেছেন, যেমন যুক্তরাষ্ট্র ও নেটো রাশিয়াকে হামলা করতে উস্কানি দিয়েছে৷

এপি অনুরূপ কয়েক ডজন অ্যাকাউন্ট চিহ্নিত করেছে, যেগুলোর সম্মিলিতভাবে এক কোটির বেশি অনুসারী এবং গ্রাহক রয়েছে৷ প্রোফাইলগুলোর মালিক প্রায়শই চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদকদের, যারা তাদের ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার ও ইউটিউব অ্যাকাউন্টগুলোকে প্রচারণায় ব্যবহার করছেন। উল্লেখ্য, এই প্ল্যাটফর্মগুলো মূলত চীনে বন্ধ। এসব ব্যক্তিরা নিজেদের “ব্লগার”, “প্রভাব বিস্তারকারী” বা অখ্যাত “সাংবাদিক” হিসেবে পরিচয় দিচ্ছেন।

সিজিটিএন মন্তব্যের জন্য করা অনুরোধে সাড়া দেয়নি। যে আইনজীবী সিজিটিএন আমেরিকার প্রতিনিধিত্ব করেছেন তিনিও সাড়া দেননি।

ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের একজন মুখপাত্র লিউ পেংইউ বলেছেন, “চীনা গণমাধ্যম এবং সাংবাদিকেরা স্বাধীনভাবে স্বাভাবিক কার্যক্রম পরিচালনা করে এবং এতে চীনা সরকারের নেতৃত্ব বা হস্তক্ষেপ রয়েছে বলে অনুমান সত্য নয়”।

যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের প্রকাশিত নথি থেকে জানা যায়, নিউইয়র্কের চীনা কনস্যুলেট বেইজিং অলিম্পিকের সময় ইনস্টাগ্রাম ও টিকটকে বার্তা পোস্ট করার জন্য প্রভাব বিস্তারকারীদের নিয়োগ দিতে নিউ জার্সির একটি প্রতিষ্ঠান ভিপ্পি মিডিয়াকে তিন লাখ ডলার প্রদান করেছে। ভিপ্পি মিডিয়ার সিইও ভিপ্পি জাসওয়াল, এপির সঙ্গে পোস্টগুলো সম্পর্কে কথা বলতে অস্বীকার করেন।

গত এপ্রিলে সিজিটিএন সারা বিশ্বের ইংরেজি ভাষাভাষীদেরকে একটি মাসব্যাপী প্রতিযোগিতায় যোগদানের জন্য আমন্ত্রণ জানায়। প্রতিযোগীদের লন্ডন, নাইরোবি, কেনিয়া বা ওয়াশিংটনে সামাজিক মাধ্যম প্রভাব বিস্তারকারী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হতে পারে।

ব্রিটিশ ভিডিও ব্লগার জেসন লাইটফুট একটি ইউটিউব ভিডিওতে এই সুযোগের কথা বলেছেন এবং “দ্য অলিম্পিক ব্যাকফায়ারড অন ইউএসএ—বিপর্যয়কর আক্ষেপ” এবং “চীন সম্পর্কে পশ্চিমা মিডিয়ার মিথ্যাচার” এই ধরনের শিরোনামসহ পোস্ট দিয়ে দুই লাখের বেশি গ্রাহক সংগ্রহ করেছেন৷

আমেরিকান ইউটিউবার ম্যাথিউ টাই এবং দক্ষিণ আফ্রিকার উইনস্টন স্টারজেল বিশ্বাস করেন, অনেক ক্ষেত্রেই চীন কনটেন্টের জন্য অর্থ প্রদান করছে।

XS
SM
MD
LG