অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সেই শিক্ষার্থীদের ক্ষমা করে দিয়েছেন বিজ্ঞানশিক্ষক হৃদয় মণ্ডল


শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল

হাফহাতা শার্ট পরা মানুষটা এই হাসছেন, এই কাঁদছেন। হাসিটা তার আলাদা করা গেলেও কান্না ধরা কঠিন। ১৯ দিন কারাভোগের পর গেল রবিবার জামিন পেয়েছেন এই বিজ্ঞান শিক্ষক। ঢাকার জাতীয় প্রেসক্লাবে সোমবার (১১ এপ্রিল) দুপুরে এভাবে দেখা দেয়ার পর মুন্সিগঞ্জের বিজ্ঞান শিক্ষক হৃদয় মণ্ডল সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বললেন, যে শিক্ষার্থীরা তাকে জেল খাটিয়েছে তাদের ক্ষমা করে দিয়েছেন।

হৃদয় মণ্ডল গত কয়েক দিন ধরে বাংলাদেশে বহুল আলোচিত একটি নাম। তথাকথিত ধর্ম অবমাননার অভিযোগে নিজের শিক্ষার্থীদের হাতে হয়রানির শিকার হওয়ার পর জেলে যান। জামিন পেয়ে সরাসরি চলে এসেছেন ঢাকায়। আত্মীয়র বাসায়। সোমবার বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে প্রেসক্লাবে আসেন। সেখানেই ভয়েস অফ আমেরিকার সঙ্গে একান্তে কথা বলেন।

জামিন পাওয়ার স্বস্তিতে শুরুতে বললেন, "সকল প্রশংসা তার। সকল ধর্মের লোককে আমি শ্রদ্ধা করি। শ্রদ্ধা করে যাব।"

কারাবাসের স্মৃতি স্মরণ করতে করতে চোখে ভিজে যায় হৃদয় মণ্ডলের, "আমি বন্দীদের সঙ্গে সুখ-দুঃখ শেয়ার করেছি। চোখে পানি এসেছে। সৃষ্টিকর্তাকে বলেছি আমাকে সহ্য করার ক্ষমতা দাও।"

অভিযুক্ত ছাত্রদের ক্ষমা করার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "অবশ্যই তাদের ক্ষমা করব। কোমলমতি শিশু। শিক্ষক হিসাবে (যদি) ক্ষমাই করতে না পারি, তাহলে শিক্ষক কি করে হলাম। ওরা হয়তো ভুল ডিসিশন নিয়েছে।’

হৃদয় মণ্ডল ঠিক কবে স্কুলে যাবেন, সে বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি। তাকিয়ে আছেন প্রশাসন এবং স্কুলকমিটির দিকে, "এখন আমার সেফটির ব্যাপার আছে। তারা যদি বলে তাহলে যাব।"

হৃদয় মণ্ডল যেতে চাইলেও স্কুলটিতে নিজেকে আর নিরাপদ মনে করছেন না বলে জানালেন। যদি তাকে অন্য স্কুলে বদলি করা হয় তবে মেনে নেবেন, "আমার তো বেসরকারি স্কুল। ট্রান্সফার সম্ভব না। যদি সরকারের ট্রান্সফার করার ব্যবস্থা থাকে, তাহলে অন্য কোথাও যেতে পারি।"

হৃদয় মণ্ডল কারাগারে যাওয়ার পর অনেক বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ তার মুক্তির দাবি করেন। ভয়েস অফ আমেরিকা এমন কয়েক জনের প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে। সেখানে বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মুহম্মদ জাফর ইকবাল বলেন, ‘‘আমি শুধু একটি কথাই বলতে চাই শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলকে সসম্মানে মুক্তি দিতে হবে। নইলে আমাকেও যেন গ্রেপ্তার করা হয়।”

এসব শুনে হৃদয় মণ্ডলের মনে হয়েছে এই লড়াইয়ে তিনি শুধু একা নন, "আমার মন আনন্দে ভরে গেছে। ভাবলাম আমি তো একা না। আমার যে দুঃখ ছিল, হতাশা ছিল, তা কেটে গেছে।"

এমন একটা ঘটনার পর নিজের এলাকায় নিশ্চিন্তে বাস করা নিয়ে সন্দিহান তিনি, "কতটা নিশ্চিন্তে বাস করতে পারব, নিজেই বিচার করতে পারছি না। কত স্বাধীনভাবে বাস করতে পারব। প্রশাসন আশ্বাস দিলেও নিজে থেকে হতাশা ফিল করছি। কী হবে একমাত্র ঈশ্বরই জানে। তবে আমার বিশ্বাস তারা যথাসাধ্য চেষ্টা করবে।"

হৃদয় মণ্ডল কারাগারে যাওয়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার ঘরের ছবি ভাইরাল হয়। ছবিগুলোতে দেখা যায় দেয়ালে দেয়ালে বিভিন্ন সূত্র, অঙ্কের হিসাব-নিকাশ। বাড়ি থাকলে সব সময় বিজ্ঞান সাধনায় নিজেকে ডুবিয়ে রাখেন কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে একটি স্বপ্নের বাড়ির কথা বললেন, "আমার বাস্তব জীবনের কল্পনা, যদি একটা বাড়ি করতে পারি...ওয়ালে শুধু থাকবে গণিতের সূত্র, গণিতের মহান ব্যক্তিরা।"

"চারদিকে থাকবে গণিতের সূত্র, বিজ্ঞানের সূত্র। থাকবে সেই মহান ব্যক্তিদের ছবি।"

উল্লেখ্য ২০ মার্চ বিনোদপুর রামকুমার উচ্চ বিদ্যালয়ের (বিজ্ঞান বিভাগ) দশম শ্রেণির কিছু ছাত্র বিজ্ঞান ও ধর্মের ওপর হৃদয় মন্ডলের একটি ক্লাস কথোপকথন রেকর্ড করেছিল। যেখানে তিনি “ধর্মকে অসম্মান” করেছিলেন বলে তাদের অভিযোগ।

২২ মার্চ কিছু ছাত্র হৃদয় মন্ডলের শাস্তির দাবিতে স্কুলের বাইরে বিক্ষোভ করে।

পরে ওই দিন হাইস্কুলের একজন অফিস সহকারী (ইলেকট্রিশিয়ান) ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে থানায় মামলা করেন। এর জেরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়।

(এই প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ইউএনবি থেকে নেওয়া হয়েছে।)

XS
SM
MD
LG