অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা পুলিশ, রাজনৈতিক কর্মী ও জঙ্গিদের সহিংসতার শিকার—আরএসএফ


বাংলাদেশের ঢাকার একটি আদালতের বাইরে কার্যক্রম কভার করছেন সাংবাদিকরা। ৩ মে, ২০১৬। (ফাইল ফটো)

বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা পুলিশের সহিংসতা, রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা আক্রমণ এবং জিহাদি বা অপরাধী সংগঠনের দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের সম্মুখীন।

মঙ্গলবার (৩ মে) রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে ২০২২ সালের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এই প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে।

আরএসএফের বিশ্ব সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচক অনুযায়ী বাংলাদেশ গত বছরের তুলনায় ১০ ধাপ পিছিয়েছে। এই সূচকে ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৬২তম (স্কোর ৩৬ দশমিক ৬৩)। গত বছর বাংলাদেশের অবস্থান ছিল ১৫২তম। সূচকে সবার শীর্ষে রয়েছে নরওয়ে।

বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের চিত্র

আরএসএফের প্রতিবেদনে বলা হয়, “বাংলাদেশের দুটি নেতৃস্থানীয় রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) ও বাংলাদেশ বেতার (রেডিও) সরকারি প্রচার মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। বাংলাদেশে ক্রমবর্ধমান বেসরকারি খাতের গণমাধ্যমের মধ্যে ৩ হাজার প্রিন্ট মিডিয়া আউটলেট, ৩০টি রেডিও স্টেশন, ৩০টি টিভি চ্যানেল এবং কয়েক শ নিউজ ওয়েবসাইট রয়েছে। দুটি জনপ্রিয় চ্যানেল হলো ‘সময় টিভি’ ও ‘একাত্তর টিভি’। দুটি শীর্ষস্থানীয় দৈনিক ‘প্রথম আলো’ ও ‘ডেইলি স্টার’ একটি নির্দিষ্ট সম্পাদকীয় স্বাধীনতা বজায় রেখে পরিচালিত হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট

আরএসএফের প্রতিবেদনে এ প্রসঙ্গে বলা হয়, “১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে বাংলাদেশের সকল সরকার গণমাধ্যমকে যোগাযোগের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। ২০০৯ সাল থেকে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকারী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারও এর ব্যতিক্রম নয়। তার (হাসিনার) দলের (আওয়ামী লীগ) সদস্য ও সমর্থকেরা প্রায়শই তাদের অপছন্দের সাংবাদিকদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে শারীরিকভাবে আঘাত করেন। এসব সাংবাদিকেরা যাতে কাজ না করতে পারেন, সে জন্য এবং গণমাধ্যম বন্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে হয়রানি করা হয়। এমন প্রতিকূল পরিবেশে সম্পাদকেরা সতর্কতা অবলম্বন করেন, সরকার যা বলেছে সেগুলোকে যেন চ্যালেঞ্জ না করা হয়”।

আইনি কাঠামো

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনকে (ডিএসএ) সাংবাদিকদের জন্য বিশ্বের অন্যতম কঠোর আইন বলে অভিহিত করে আরএসএফ বলেছে, “এটি (ডিএসএ) কোনো প্রকার পরোয়ানা ছাড়াই তল্লাশি ও গ্রেপ্তারের অনুমতি দেয়, যা নির্বিচারভাবে সাংবাদিকদের সূত্রের গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে এবং কোনো সাংবাদিক 'জাতির পিতার (…) বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা' অর্থাৎ বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর পিতার বিরুদ্ধে কিছু পোস্ট করলে ১৪ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে। এই আইনি পরিবেশে সম্পাদকেরা নিয়মিত নিজেদের নিজে সেন্সর করেন”।

অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট

আরএসএফের প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলা হয়, “বেশির ভাগ নেতৃস্থানীয় বেসরকারি গণমাধ্যমের মালিক মুষ্টিমেয় কিছু বড় ব্যবসায়ী। তারা বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উত্থানের সময় আবির্ভূত হয়েছেন। তারা তাদের গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাব প্রয়োগ করার জন্য এবং সর্বাধিক লাভের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেন। তারা সম্পাদকীয় স্বাধীনতার সুরক্ষার চেয়ে সরকারের সঙ্গে সুসম্পর্ককে অগ্রাধিকার দেন। ফলে বেসরকারি মালিকানাধীন টিভি চ্যানেলের সন্ধ্যায় টকশোতে কে অতিথি হবেন তা প্রায়শই সরকারি প্রতিনিধিরাই ঠিক করে দেন”।

সামাজিক–সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

আরএসএফের প্রতিবেদনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে, “সংবিধান অনুযায়ী বাংলাদেশ ধর্মনিরপেক্ষ দেশ, অন্যদিকে ইসলাম রাষ্ট্রধর্ম হিসেবে স্বীকৃতি। এর প্রভাব গণমাধ্যমে প্রতিফলিত হয়। মূলধারার গণমাধ্যম কখনোই ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ইস্যুতে আলোচনা করে না, যদিও বাংলাদেশে তাদের সংখ্যা ১ কোটি। গত এক দশকে কট্টরপন্থী ইসলামপন্থী দলগুলো অত্যন্ত সহিংস প্রচারণা চালিয়েছে এবং এর ধারাবাহিকতায় সাংবাদিকদের হত্যা করা হয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষতা, বিকল্প মতামতের অধিকার বা ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষাকারী সাংবাদিকদের খুঁজে বের করার জন্য এই দলগুলো এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে”।

নিরাপত্তা

আরএসএফের প্রতিবেদনে এ বিষয়ে বলা হয়েছে, “বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা পুলিশের সহিংসতা, রাজনৈতিক কর্মীদের দ্বারা আক্রমণ এবং জিহাদি বা অপরাধী সংগঠনের দ্বারা সংগঠিত হত্যাকাণ্ডের সম্মুখীন। তারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কারণ এই সহিংসতার কোনো শাস্তি হয় না। প্রায়ই সাংবাদিক ও ব্লগারদের কারাগারে ভয়ঙ্কর পরিস্থিতিতে রাখার জন্য ডিএসএ ব্যবহার করা হয়। সাংবাদিকতা এমন একটি পেশা যা এখনো পুরুষ প্রধান। নারী সাংবাদিকেরা হয়রানির শিকার হন এবং যখন তারা তাদের নিজেদের অধিকার রক্ষার চেষ্টা করেন তখন তারা অনলাইনে ঘৃণামূলক প্রচারণার শিকার হন”।

XS
SM
MD
LG