অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্য


মাতৃত্বকালীন ছুটির ক্ষেত্রে বৈষম্য।

মেহনাজ রহমান একজন সরকারী কর্মীজীবী নারী, বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিসে কর্মরত আছেন। জানালেন, চাকরিরত অবস্থায় গর্ভধারণের পর সরকারী আইন অনুযায়ী ছয় মাসের মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছেন সকল বেতন-ভাতাসহ।

ইজমা একরাম একজন শিক্ষিকা। জানালেন, তিনি একটি বেসরকারী বিদ্যালয়ে চাকরি করতেন। সে প্রতিষ্ঠানে কোনো নারী গর্ভধারণ করলে তার উপর বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নানা ধরণের চাপ সৃষ্টি করে যাতে সেই নারী নিজেই অব্যাহতি চেয়ে নেন। আবার কেউ ডেলিভারির জন্য ছুটি চাইলে তাকে একবারে টার্মিনেট করা হয়। ইজমা বললেন, “ওই স্কুল কর্তৃপক্ষ মাতৃত্বের সুন্দর জার্নিটাকে দুঃস্বপ্নে পরিণত করে। সহকর্মীদের দুর্দশা দেখেছি। চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি। এখন একটি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ে আছি। এখানে জয়েন করার পরে মা হয়েছি। মাতৃত্বকালীন সময়ে চার মাসের ফুল পেমেন্ট ও বাকি দু মাসের হাফ পেমেন্টসহ মোট ছয় মাসের ছুটি পেয়েছি।”

বাংলাদেশে মাতৃত্বকালীন ছুটির আইন

২০১১ সালের ৯ জানুয়ারি প্রকাশিত গেজেটের ১৯৭ ধারার উপধারা-১ সংশোধন করে সরকারী চাকুরীজীবী নারীদের মাতৃত্বকালীন ছুটির মেয়াদ বেতনসহ চারমাস থেকে ছয় মাস করা হয়। এ সংশোধনের আরও বলা হয় চাকুরীকালীন নারীরা সর্বোচ্চ ২ বার এ ছুটি ভোগ করতে পারবেন। মাতৃত্বকালীন ছুটিকে চাকুরীকাল হিসেবে গন্য করা হবে। এ ছুটি জমাকৃত কোন ছুটি থেকে বিয়োগ করা হবে না। ২০২১ সালের ১৯ মে মাতৃত্বকালীন ছুটি সংক্রান্ত আরেকটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে তা গেজেট আকারে প্রকাশ হয়। বলা হয়, ছয় মাসের কম বয়সী শিশু সন্তান নিয়ে প্রথম সরকারী চাকরিতে যোগ দিলে সন্তানের বয়স ছয় মাস হওয়া পর্যন্ত পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটাতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিল ব্যাংকসমূহেও কর্মরত নারী কর্মীদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস। এছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানে পূর্ণ বেতনে ছুটি ছাড়াও স্বাস্থ্যবীমা, গ্রাচুইটি ইত্যাদি ভাতার সুবিধা আছে।

তবে বাংলাদেশে প্রচলিত শ্রম আইন ২০০৬ (সংশোধিত ২০১৩), ধারা ৪৬, ৪৭ এবং বিধি ৩৮ অনুযায়ী যেকোন নারী শ্রমিকের সন্তান প্রসবের সম্ভাব্য তারিখের আগের আট সপ্তাহ এবং পরের আট সপ্তাহ অর্থাৎ মোট ষোল সপ্তাহ পর্যন্ত পারিশ্রমিকসহ প্রসূতিকালীন ছুটি নেয়ার অধিকার আছে। একটি প্রতিষ্ঠানে নিয়োগকর্তা প্রসূতিকালীন সুবিধা প্রদান করেন এবং এটি প্রতিষ্ঠানের সকল নারী শ্রমিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। এজন্য নিয়োগকর্তার কাছে একজন গর্ভবতী নারীকে তার শিশু জন্মদানের প্রত্যাশিত তারিখের আট সপ্তাহ পূর্বে প্রসবের সম্ভাবনার কথা জানিয়ে বা প্রত্যাশিত তারিখের সাত দিনের মধ্যে জন্মদান করেছেন তা জানিয়ে মৌখিক বা লিখিত নোটিশ দিতে হবে। কোন প্রতিষ্ঠান মালিক সজ্ঞানে কোন নারীশ্রমিককে তার সন্তান প্রসব তারিখের পরবর্তী আট সপ্তাহের মধ্যে কাজ করাতে পারবে না এবং কোন নারী নিজেও সন্তান প্রসবের আট সপ্তাহের মধ্যে কোন প্রতিষ্ঠানে কাজের জন্য নিয়োগ নিতে পারবে না। একজন নারীর ষোল সপ্তাহের প্রসবকালীন ছুটির মজুরী তার পূর্ববর্তী দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক মজুরীর গড় হারে প্রাপ্য হবে।

এর জন্য শর্তাবলী হলো, একজন নারীশ্রমিককে সেই প্রতিষ্ঠানে সন্তান প্রসবের আগে ন্যূনতম ছয় মাস কাজ করতে হবে। মাতৃকালীন সুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট নারী শ্রমিককে চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্রসহ সরকার নির্ধারিত নির্দিষ্ট ফরমে প্রথম আট সপ্তাহের ছুটি শুরুর কমপক্ষে আটচল্লিশ ঘন্টা পূর্বে কর্তৃপক্ষের নিকট নোটিশ প্রদান করতে হবে। মাতৃকালীন সুবিধা পাওয়ার জন্য ছুটির জন্য নির্ধারিত ফরমে আবেদন করতে হবে পরবর্তী আট সপ্তাহের আর্থিক সুবিধার জন্য সন্তান প্রসবের প্রমাণসহ নোটিশ প্রদান করতে হবে। তবে যদি আগেই দুই বা তার অধিক সন্তান জীবিত থাকে সেক্ষেত্রে সে মাতৃকল্যাণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। কিন্তু একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত বিনা মজুরীতে ছুটি প্রাপ্য হবে।

গর্ভবতী নারীকর্মীর কর্মে শিথিলতা প্রদান

বাংলাদেশ শ্রমআইন অনুযায়ী, কোনো নিয়োগকর্তা যদি জানতে পারেন যে, তার অধীনস্থ নারী শ্রমিক অন্তঃসত্ত্বা এবং আগামী দশ সপ্তাহের মধ্যে সন্তান প্রসবের সম্ভাবনা আছে, সেই অবস্থায় ওই শ্রমিককে তিনি এমন কোনো কষ্টকর কাজে নিয়োগ করতে পারবেন না যার কারণে অনাগত শিশুটি মায়ের গর্ভে ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে। সন্তান জন্মদানের পরবর্তী ১০ সপ্তাহ পর্যন্ত এই শিথিলতা থাকবে।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মাতৃত্বকালীন ছুটির চিত্র

ফারিয়া শারমিন চাকরি করেন একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে । সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ৬ মাস। কর্মীরা চাইলে বিনা বেতনে আরও ছয় মাস ছুটি নিতে পারবেন।

কথা বলি শারমিন সরকার নামে আকেরজন নারীর সঙ্গে। বললেন, তিনি একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে কাজ করতেন। সেখানে থাকতে চার মাস বা ষোল সপ্তাহের বেতনসহ মাতৃত্বকালীন ছুটি পেয়েছিলেন। এছাড়া স্বাস্থ্যবীমা থেকে সি সেকশনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরণে বহুজাতিক কোম্পানীর লোকাল অফিসগুলোর চিত্র খুব খারাপ বলে জানালেন। শারমিন বলেন, “অনেক অফিসেই তিন মাসের বেশি পূর্ণ বেতনের ছুটি দিতে চায় না। আসলে মাতৃত্বকালীন ছুটি ন্যুনতম ছয় মাস হওয়া উচিত। কারণ ছয় মাস সময়ও মাতৃকালীন এই পুরো জার্নির জন্য পর্যাপ্ত নয়। আমার স্বামী একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে কাজ করেন, সেখানে ৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি দেয়।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা কাজ করেন দেশীয় একটি প্রাইভেট কোম্পানীতে। তিনি জানালেন, তাদের প্রতিষ্ঠানের নারী কর্মীরা তিন মাসের বেসিক বেতনে গর্ভকালীন ছুটি পান এবং বাকি তিন মাস বিনা বেতনে ছুটি কাটাতে পারেন। যেখানে এই সময় একটা পরিবারের আর্থিক সাপোর্ট খুব বেশি প্রয়োজন সেখানে সেই সময়ই তাকে বেতন ভাতার ক্ষেত্রে বঞ্চিত করছে অনেক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান।

আফজাল হোসেন পেশায় প্রকৌশলী। চাকরি করেন একটি টেলিযোগাযোগ কোম্পানিতে। জানালেন সেখানে মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাসের। সাথে রয়েছে পূর্ণ বেতন ভাতাদি এবং ডেলিভারি খরচ, হাসপাতাল খরচসহ অন্যান্য সুবিধা আছে। পুরুষকর্মীদের দেয়া হয় ২ সপ্তাহের পিতৃত্বকালীন ছুটি। আবার আরেকটি টেলিযোগাযোগ কোম্পানিতে কাজ করতেন নাসরীন সুলতানা আজম। সেখানে ৪ মাসের ছুটি, ইন্স্যুরেন্স কভারেজ আছে। ৫ দিনের পিতৃত্বকালীন ছুটি আছে। বর্তমানে নাসরীন একটি প্রাইভেট ব্যাংকে আছেন। ব্যাংকে ৬ মাসের পূর্ণ বেতনসহ ছুটি ও হাসপাতাল খরচ শতভাগ দেয়া হয় বলে জানালেন।

একই চিত্র গণমাধ্যমগুলোতেও। গণমাধ্যম আইন (ওয়েজ বোর্ড) অনুযায়ী ছয় মাস মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রাপ্য নারী সংবাদকর্মীদের। সে অনুযায়ী প্রিন্ট মিডিয়ার কর্মীরা ছয় মাস ছুটি পেয়ে থাকেন তবে ইলেকট্রনিক মিডিয়াতে প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী ১৬ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি দেয়া হয় নারীকর্মীদের।

মাতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে সরকারী বেসরকারি খাতে আছে বিস্তর বৈষম্য। আবার বেসরকারি খাতে মাতৃত্বকালীন ছুটি অনেকাংশেই নির্ভর করে মালিক বা কর্তাব্যক্তিদের ওপর।

কথা বলি, ঢাকা জজ কোর্টের এ্যাডভোকেট ও এনসিসি ব্যাংকের আইনজীবী তানজিলা আরেফিনের সঙ্গে। তানজিলা নিজেও এখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। ভয়েস অফ আমেরিকাকে বললেন, “সরকারী গেজেট অনুযায়ী মাতৃত্বকালীন ছুটি পূর্ণ বেতনে ৬ মাস এবং বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী যে কোনো বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে মাতৃকালীন ছুটি পূর্ণ বেতনে ১৬ সপ্তাহ বা ৪ মাস। ব্যাংকিং অ্যাক্ট অনুযায়ী ব্যাংকিং খাতে যারা কাজ করেন তারা সাধারণত ৬ মাসের পূর্ণ বেতনের ছুটি পেয়ে থাকেন। এই যে মাতৃত্বকালীন ছুটির আইনে প্রতিষ্ঠানে ভেদে ৪ মাস ও ৬ মাসের কথা বলা হয়েছে সেটা কিন্তু ন্যুনতম সময়সীমার কথা বলা হচ্ছে। প্রতিষ্ঠান চাইলেই কিন্তু এই সময়টাকে বাড়াতে পারে। অনেক কিন্ডারগার্টেন স্কুল, বেসরকারি স্কুলগুলো নিয়ম নীতির ধার ধারে না। তাদের ইচ্ছেমতোন ছুটি দেয়া হয়। কোন কোন স্কুলে ছুটিকালীন সময়ে বেতন-ভাতা মাসিক ভিত্তিতে না দিয়ে এককালীন হিসেবে দেয়।”

এ্যাডভোকেট তানজিলার মতে, “মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা একজন কর্মজীবী নারীর অধিকার। এটার জন্য সব শ্রেনীর পেশাজীবী নারীদের সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবেই ছুটির ক্ষেত্রে এই বৈষম্যগুলো দূর হবে।” ছয় মাসের ছুটি যথেষ্ট কিনা এ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আসলে ছয় মাস ছুটির চাইতেও আরো বেশি ছুটির দরকার হয়। প্রেগনেন্সির জার্নিটা তো সহজ নয়। দীর্ঘ নয় মাসে একজন গর্ভবতী নারী প্রায় সময়ই অসুস্থ বোধ করতে পারেন। অনেক সময় ডেলিভারির মাস খানেক আগে থেকেই গর্ভবতী মা অসুস্থ বোধ করতে পারেন, তার পক্ষে অফিসে যাওয়া ও কাজ করা কষ্টকর হতে পারে, সে কারণেই ডেলিভারির আগেই মাতৃকালীন ছুটি নিয়ে নিতে হতে পারে। আবার সন্তান হওয়ার পরে সন্তানের দেখভাল করার জন্য মাকে সারাক্ষণ প্রয়োজন হয়। শিশুদের বয়স ছয় মাস হলে তাকে বুকের দুধের পাশাপাশি সলিড খাবার দিতে হয়। সে সময়টাতেও মাকে খুব প্রয়োজন। তাই ছয় মাস ছুটিও পর্যাপ্ত নয়। কিছু বেসরকারী ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠান ছয় মাসের বাইরে আরো দুই/তিন মাস ছুটি কর্মীকে আবেদনের ভিত্তিতে প্রদান করে তবে সেক্ষেত্রে সেই ছুটিটা বিনা বেতনে প্রদান করা হয়।”

পোশাক শিল্পের শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি

নারায়ণগঞ্জের মার্টিন নীটওয়্যারের এইচ আর, অ্যাডমিন, কমপ্লায়েন্স বিভাগের সিনিয়র ম্যানেজার মো. হাশিম মিয়া বললেন, তাদের প্রতিষ্ঠানে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৬০%। তারা মাতৃত্বকালীন ছুটি ১১২দিন দিয়ে থাকেন। ডেলিভারি ডেটের ৫৬ দিন আগে এবং ডেলিভারি ডেট থেকে পরবর্তী ৫৬ দিন পর্যন্ত একজন নারী কর্মীকে ছুটি প্রদান করা হয়ে থাকে। আর্থিক সুবিধাদিও দুইভাগে পেয়ে থাকে। কর্মী যখন থেকে গর্ভকালীন ছুটিতে যাবে তার পূর্ববর্তী তিন মাসের বেতন ক্যালকুলেশন করে শ্রম আইন অনুযায়ী দৈনিক গড় মজুরি বের করা হয় এবং ছুটিতে যাওয়ার আগে তাকে ৫৬ দিনের বেতন ও ডেলিভারির পরে সমস্ত ডকুমেন্ট অফিসে পেশ করার পরে তাকে বাকি ৫৬ দিনের বেতন প্রদান করা হয়। এছাড়া কোনো ধরণের স্বাস্থ্যবীমা বা মাতৃত্বকালীন ভাতা শ্রমিকরা পায় না। মো. হাশিম মিয়া বললেন, “গর্ভধারণের কথা জানার পরে সেই কর্মীকে দিয়ে কোনো ভারী কাজ করানো হয় না। এছাড়া ল্যাকটেটিং মাদারদের জন্য বিকেএমইএ থেকে মাসিক ভাতা দেয়া হয়। আমাদের ফ্যাক্টরিসহ বেশিরভাগ ফ্যাক্টরিতেই চাইল্ড কেয়ার রুম রয়েছে। এ রুমে কর্মীরা বাচ্চাদের খাওয়াতে পারে, ঘুম পাড়াতে পারে। তবে খুব কম শ্রমিকই ফ্যাক্টরিতে বাচ্চা নিয়ে আসে। বেশিরভাগ শ্রমিক বাসায় ফ্যামিলি মেম্বারদের কাছে বাচ্চা রেখে আসে।”

গর্ভাবস্থায় কর্মীদের ছাঁটাই করে দেয়া হয় কি না এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, “আসলে এখন সময় অনেক পাল্টেছে। একটা সময় এরকম হতো অনেক প্রতিষ্ঠানে। তখন শ্রম আইনের চর্চাটা সেভাবে ছিলো না। এখন কারখানার মালিক পক্ষ, ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তাগণ, শ্রমিকপক্ষ থেকে শুরু করে সব বায়াররাও সচেতন। পোশাক শিল্পে শিক্ষিত লোকের হার বেড়েছে তাই এই বিষয়গুলো নিয়ে সচেতনতাও বেড়েছে। গার্মেন্টস কর্মীদের সুযোগ সুবিধাও বেড়েছে।”

তবে পোশাকশিল্পে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মকর্তা বলেছেন কিছুটা ভিন্ন কথা। তিনি বলেন, “অনেক প্রতিষ্ঠানই কাগজে-কলমে এ ধরণের ছুটি-ছাটা, ভাতাদি প্রদান দেখানো হয় কিন্তু বাস্তবে তা হয় না। বাস্তবতা হলো অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনো পোশাক শিল্পের নারীশ্রমিকরা এক-দুই মাসের বেশি মাতৃত্বকালীন ছুটি পান না। অনেকক্ষেত্রেই নারীশ্রমিক অন্তঃসত্তা জানতে পারলে চাকরিচ্যুত করা হয়। ”

এশিয়ান সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্টের (এসিডি) গবেষণা (the survey of Garments workers 2020) অনুযায়ী পোশাকখাতে কর্মরত নারীশ্রমিকদের মধ্যে প্রতি বছর ৮.৩ শতাংশ শ্রমিক মা হন। তারমধ্যে মাত্র ৩.১ শতাংশ নারীশ্রমিক মাতৃত্বকালীন ছুটি ও ভাতা পান। গবেষণাটি আরো বলছে,গড়ে প্রত্যেক শ্রমিক ১-২ কিলোমিটার হেঁটে কর্মস্থলে আসেন। তাই ৮৭.৫ শতাংশ কারখানায় শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্র সুবিধা থাকলেও এত দূর হেঁটে শিশুকে না নিয়ে এসে বাসায় রেখে আসা ভালো মনে করেন। মাত্র ১১.৭ শতাংশ নারী দিবাযত্ন কেন্দ্র ব্যবহার করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে এ্যাডভোকেট তানজিলা আরেফিন বলেন, "অনেক তৈরি পোশাক কারখানার মালিকরা ইচ্ছেমতন ছুটি ও ভাতা দিয়ে থাকেন। শ্রমিকদের মধ্যে আইন সম্পর্কে জ্ঞানের অভাবের কারণে তারা তাদের অধিকার আদায়ের লড়াই করতে পারে না। মূলত আমাদের দেশে এ সমস্যাগুলো হয় আইন না জানার কারণেই। আইন না জানার কারণেই আমরা অনেক পদক্ষেপ নিতে পারি না। তাছাড়া মালিকপক্ষের তুলনায় শ্রমিকপক্ষের ক্ষমতা কম থাকায় মামলা মোকদ্দমায় যায় না। তার চাইতে চাকুরি ছেড়ে দেয়াই শ্রেয় মনে করে। সন্তান প্রসবের পর কিছুটা বড় হলে আবার নতুন করে অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানে কাজে যোগ দেন।"

চা বাগানের শ্রমিকদের অবস্থা

চা বাগানে যেসব নারীরা কাজ করেন তারা সাধারণত চা বাগানে পাতা সংগ্রহ, নার্সারিতে গাছের কলম তৈরি, সারা সংগ্রহসহ ইত্যাদি কাজ করে থাকেন। বাংলাদেশের প্রচলিত শ্রমআইন অনুযায়ী, চা বাগানে কর্মরত গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রে চা বাগানের চিকিৎসক কর্তৃক পরামর্শ অনুযায়ী ষোল সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবে এবং অতিরিক্ত সময় কাজের জন্য ভাতা প্রাপ্ত হবে। তবে অভিযোগ আছে বৃহত্তর সিলেটের অনেক চা বাগানেই তা মানা হয় না। অনেক বাগানে সন্তান প্রসবের আগ পর্যন্ত কোনো ছুটি দেয়া হয় না। অনেক সময় শ্রমিকরাও মজুরি এবং প্রসব পরবর্তীকালে ছুটির আশায় ছুটি নেয় না । গর্ভকালীন সময়ে টানা আট ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করায় মা ও সন্তান উভয়েরই ক্ষতি হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের গর্ভপাতও হয়।

‘বাংলাদেশ চা কন্যা’ নারী সংগঠনের সভাপতি খায়রুন আক্তার ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানান, সিলেটের হবিগঞ্জের চা বাগানের নারী শ্রমিকরা প্রায় সবাই চার মাসের প্রসূতিকালীন ছুটি পান। এ ছুটি গর্ভধারণের চার মাস পরে থেকেই শ্রমিকরা নিতে পারেন। চা বাগানের প্রজনন স্বাস্থ্য খুব ভালো না। গর্ভাবস্থায় নারীরা অপুষ্টি, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য জটিলতায় ভুগে। সন্তান জন্ম দেয়ার পর বাগানে কাজ করতে আসা মায়েদের শিশুদের যত্ন নেয়ার জন্য কাজের জায়গায় কোনো ব্যবস্থা নাই। সন্তানকে মাটিতে শুইয়ে রেখেই প্রসূতি মায়েরা বাগানে কাজ করে থাকেন।

বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারন সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত) নৃপেন পাল শ্রমিকদের গর্ভকালীন ছুটির সময়টা খুব কম। বেশিরভাগ শ্রমিকই আটমাস পর্যন্ত টানা কাজ করেন। প্রসবের পরে যাতে বাচ্চাকে সময় দিতে পারে সেজন্য আগে ছুটি নেয় না। পোশাক শ্রমিকদের মতোই চা বাগানের শ্রমিকদের প্রসবকালীন ভাতা পাওয়ার কথা। তবে সব শ্রমিকরা এ আর্থিক সুবিধা পায় কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত নন তিনি। বললেন, “সব বাগান কর্তৃপক্ষ এ বিষয়গুলো আমাদের জানায় না। কাজ হারানোর ভয়ে শ্রমিকরাও এসব জানায় না। গর্ভবতী মায়েরা যারা বাগানে পাতা তোলার কাজ করে তারা গর্ভকালীন সময়ে খুব বেশি কাজ করতে পারে না। সাধারণ সময়ে যে নারী দৈনিক দুইশত টাকা মজুরির কাজ করতে পারে, গর্ভাবস্থায় সে একশত টাকার কাজও করতে পারে না। আমরা দাবী করেছি নারী শ্রমিকদের মাতৃত্বকালীন ছুটি ছয় মাস করা হোক এবং ছুটি প্রদানের সময় যে মজুরি দেয়া হবে তা যেনো বর্তমান দৈনিক মজুরির দ্বিগুণ হয়।” চা শ্রমিক নারীদের স্বাস্থ্যগত দুর্দশার কথা উল্লেখ করে নৃপেন পাল বলেন, “যেহেতু তারা টানা আট-নয় ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাজ করে, রেস্ট হয় না, পুষ্টিকর খাবার পায় না তাই চা-শ্রমিকরা বেশিরভাগ সময় অপুষ্ট, কম ওজনের সন্তান প্রসব করে। অনেক শিশু মারাও যায়। মায়েরাও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে থাকে। ”

পিতৃত্বকালীন ছুটি

রায়হান মাহবুব কাজ করেন একটি বহুজাতিক কোম্পানীতে। বছরখানেক আগে সন্তান প্রসবের সময় স্ত্রীর শারীরিক জটিলতা দেখা দিলে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার পর মা ও শিশুর যত্ন নেয়ার জন্য রায়হান মাহবুবকে আরো কিছু দিন তাদের সঙ্গে থাকতে হয়। দুই সপ্তাহ তিনি অফিস করতে পারেননি। তবে এই ছুটিটা প্রতিষ্ঠান তার অর্জিত ছুটি থেকে কেটে রেখেছে। পিতা হওয়ার জন্য তিনি অফিস থেকে কোনো আলাদা ছুটি পাননি।

সন্তানের জন্ম হওয়া শুধু মায়ের নয়, বাবার জন্যও সমান আনন্দের, টেনশনের ও উত্তেজনার। স্ত্রী ও সন্তানের প্রতি দায়িত্বের জায়গা থেকেও তাকে বাড়িতে বাড়তি সময় দিতে হয়। তাছাড়া যেহেতু সন্তান জন্মদানের পুরো শারীরিক কষ্টটা নারীকেই পোহাতে হয়, তাই এ সময়টাতে একজন স্বামীর তার স্ত্রীর পাশে থাকা খুব প্রয়োজন। তাছাড়া সন্তান জন্মলাভের পরও মা ও শিশুর সেবার-যত্নের জন্য বাবার পাশে থাকা গুরুত্বপূর্ণ।

অথচ বাংলাদেশে সরকারীভাবে পিতৃকালীন ছুটির বিধান নেই। ২০১৫ সালে ১৫ দিনে পিতৃত্বকালীন ছুটির ব্যাপারে সরকারিভাবে উদ্যোগ নেয়া হলেও পরে তা আর আলোর মুখ দেখেনি। বাংলাদেশে হাতে গোনা কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এই ছুটি পান। কিছু ব্যাংক, বহুজাতিক কোম্পানীর পুরুষ কর্মীদেরকে তাদের স্ত্রীর সন্তান জন্মদানকালীন সময়ে কর্মীর স্বাস্থ্যবীমা, গ্রাচুইটি ইত্যাদি খাত থেকে ভাতা প্রদান করা হয় যাতে সেই পুরুষকর্মী স্ত্রী-সন্তানের হাসপাতাল খরচ বহন করতে পারেন।

লাবন্য হায়দার একটি ফার্মাসিটিক্যালস কোম্পানীতে কাজ করেন। সেখানে চার মাস পূর্ণ বেতনে মাতৃত্বকালীন ছুটি। জানালেন, ফর্মাল কোনো পিতৃত্বকালীন ছুটি নেই। কিন্তু কেউ চাইলে দুই/তিন দিনের ছুটি নিতে পারে। সেটা তার বাৎসরিক ছুটি থেকে কাটা যায়। তিনি বললেন, “পিতৃত্বকালীন ছুটি এখন সময়ের দাবী। একটি মেয়ে তার সবচেয়ে দুর্বল সময় পার করে প্রেগনেন্সির সময়টাতে। তার ডেলিভারির সময়ে পাশে স্বামীকেই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন হয়। অফিস ছুটি না দিলে এ সময়টাতে একজন পুরুষকর্মীকে প্রচন্ড মানসিক চাপ ও টানাপোড়েনের ভেতর দিয়ে যেতে হয়।”

প্রতিবেশি দেশ ভারত, পাকিস্তান ও নেপালেও পিতৃত্বকালীন ছুটি রয়েছে। এছাড়া নরওয়ে, স্পেন, ফ্রান্স, বেলজিয়াম, সুইডেন, এস্তোনিয়া, কানাডা, স্লোভেনিয়াসহ অনেক দেশে ভাতাসহ বিভিন্ন মেয়াদে কর্মীরা পিতৃত্বকালীন ছুটি পেয়ে থাকেন।

XS
SM
MD
LG