অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আঁখি খাতুনের সঙ্গে এখনো কথা বলেন না প্রতিবেশীরা


মোসাম্মৎ আঁখি খাতুন

সাফজয়ী নারী ফুটবল দলের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় মোসাম্মৎ আঁখি খাতুন তার ডিফেন্সিভ দক্ষতার কারণে দেশ-বিদেশে প্রশংসায় ভাসলেও গ্রামের বাড়িতে রীতিমতো ব্রাত্য। বুধবার (২১ সেপ্টেম্বর) দেশে ফিরে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনে (বাফুফে) বসে ভয়েস অফ আমেরিকাকে জানিয়েছেন, তার ‘বংশের’ মানুষেরা এখনো তাকে এবং তার মা-বাবাকে ‘বাজেভাষায়’ কথা শোনায়।

আঁখির বাড়ি সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের পারকোলা গ্রামে। বাবা-মায়ের সঙ্গে এক ভাই নিয়ে তার বসবাস। তার ছোটবেলা থেকেই মা অসুস্থ। অসুস্থ মা আর পুরো পরিবার সামলে আঁখিকে স্কুল এবং প্র্যাকটিসে যেতে হতো।

উচ্চতা আর শারীরিক গঠনের কারণে এই আঁখি বাংলাদেশ নারী জাতীয় দলের সম্পদে পরিণত হয়েছেন। তিনি ডিফেন্সে থাকা মানে প্রতিপক্ষ স্ট্রাইকারদের ‘ভয়’ ধরে যাওয়া। রক্ষণভাগে যেমন ‘অতন্দ্রপ্রহরী’, তেমনি কর্নারের সময় প্রতিপক্ষের বক্সে ‘দির্ঘাঙ্গী আতঙ্ক’।

দেশের ফুটবলে আঁখির সুনাম তার সেই কিশোরীবেলা থেকেই। সেই ২০১৭ সালে তার দক্ষতায় ভর করে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের অনূর্ধ্ব-১৫’র আসরে প্রথমবার চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ। লাল-সবুজের প্রতিনিধিরা সেবার গোটা টুর্নামেন্টে ১৩ গোল দিয়ে এক গোলও হজম করেনি এই আঁখির কারণে। রক্ষণভাগ আগলে রাখার সুবাদে টুর্নামেন্টটিতে ‘মোস্ট ভ্যালুয়েবল’ খেলোয়াড়ের পুরস্কার পান আঁখি।অথচ এই ফুটবলের কারণেই নানা অপমান আর কটুকথা শুনতে হয় তাকে।

‘‘ফুটবল খেলার ক্ষেত্রে পরিবারের পুরোপুরি সাপোর্ট ছিল। তার জন্য এতদূর আসতে পারছি। কিন্তু বংশের অন্যদের থেকে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়েছি,’’ জানিয়ে আঁখি বলেন, ‘‘আমার দাদারা চারভাই। আমাদের বাড়িটা মাঝখানে। আমাদের সঙ্গে বংশের অন্যরা কথা বলে না। তবে গ্রামের অনেকে পাশে থাকেন।’’

‘‘বংশের মানুষেরা সব সময় নেগেটিভভাবে চিন্তাভাবনা করে আসছে। তারা এখনো চায় না। শুধু পরিবার চায় যে আমি ভালো কিছু করি।’’

অসুস্থ মায়ের প্রসঙ্গ টেনে আঁখি বলেন, ‘‘আমার ছোটবেলা থেকেই মায়ের শরীরটা ভালো না। মাঝে-মাঝে অসুস্থ হয়ে পড়ে। কথাগুলো বলছি অনেক কষ্টে। আমি যখন প্র্যাকটিসে যেতাম, তখন অন্যদের বলে যেতাম যে মাকে একটু দেখে রাইখো। এসে দেখতাম মা পড়ে আছে। কেউ দেখতো না। এখনো আমাদের বাসায় কেউ মারা গেলে, তারা দেখতে আসবে না!’’

আঁখি বলেন, ‘‘আমি টাকা আয় করলে...কোথাও থেকে সাহায্য করা হলে, তারা মা-বাবাকে খারাপ ভাষায় বলে...মেয়ে মানুষের কামাই বসে বসে খায়।’’

২০১৭ সালের অনূর্ধ্ব সেই টুর্নামেন্টের মতো জাতীয় দলের হয়ে নেপালেও দুর্দান্ত খেলেছেন আঁখি। গত সোমবার (১৯ সেপ্টেম্বর) কাঠমান্ডুর দশরথ স্টেডিয়ামে স্বাগতিক নেপালকে ৩-১ গোলে হারিয়ে চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন তারা।

কিন্তু ফাইনালে নেপালকে হারানো অতটা সহজ ছিল না। কারণ তাদের দলে সাবিত্রা ভান্ডারি নামের একজন স্ট্রাইকার ছিলেন। তিনি ইউরোপে খেলেন। অসুস্থ থাকায় সাবিত্রা দ্বিতীয়ার্ধে মাঠে নামলেও আঁখির কারণে বাংলাদেশকে বিপদে ফেলতে পারেননি।

দ্বিতীয়ার্ধের কৌশল সম্পর্কে জানতে চাইলে আঁখি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন,‘‘নেপালের স্ট্রাইকার সাবিত্রা ভান্ডারি অনেক ভালো খেলোয়াড়। ইউরোপে লিগ খেলে। ওর সাথে খেলার কোনো অভিজ্ঞতা ছিল না। ওর বিপক্ষে খেলতে একটু নার্ভাস লাগছিলো...পারব কি না। ও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিল। প্রথম হাফ খেলতে পারেনি। যখন শুনেছি যে দ্বিতীয় হাফ খেলবে, তখন সেই নার্ভাস ফিল হইছে। কিন্তু বসে না থেকে ডিফেন্স লাইনের কৌশল বদলে ফেলি আমরা। একজন বলে গেলে আরেকজন কাভারে থাকবে। এটা করে ডিফেন্স অনেক ভালো হয়েছে।’’

জাতীয় দলের হয়ে সাফ জেতার পর আঁখি ভাবছেন পরবর্তী মিশনের কথা। সেই মিশনে তিনি সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিকে জয় করতে চান, ‘‘মানুষের কথা শুনতে শুনতে অভ্যাস হয়ে গেছে। এখন আর কানে লাগাই না। গোটা দেশকে নিয়ে ভাবি। সামনেও তাই ভাবব।’’

আঁখিদের প্রতি সমাজের কিছু মানুষের এমন দৃষ্টিভঙ্গির কথা প্রশাসনেরও অজানা নয়। এ বিষয়ে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী মোঃ জাহিদ আহসান রাসেলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘‘স্কুল লেভেলে যখন বঙ্গমাতা গোল্ডকাপ শুরু হয়, তখন অনেক ধরনের বাধা বিপত্তি হয়েছিল। কয়েক বছর ধরে সেটি কমেছে। এখনো অনেকের মধ্যে দৃষ্টিভঙ্গির সমস্যা রয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনে এই ধরনের ফলাফল অনেক বেশি কাজ করবে। সরকারের পক্ষ থেকে নারীর উন্নয়নে, ক্ষমতায়নে আমরা কাজ করছি। নারীরা যে পিছিয়ে নেই, এই শিরোপা তার প্রমাণ। জাতীয় দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়াটা আমাদের জন্য অনেক বড় অর্জন। এই অর্জন তাদের সব দুয়ার খুলে দেবে।’’

XS
SM
MD
LG