অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

করতোয়ায় নৌকাডুবি: দু’দিনে ৫০ মরদেহ উদ্ধার, কাজ শুরু করেছে তদন্ত কমিটি


বোদা শহরের কাছে নৌকা ডুবির পর করতোয়া নদীর তীরে লোকজনের ভিড়। ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২। (ছবি-ফিরোজ আল সাবাহ/এএফপি)

বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলায়, করতোয়া নদীতে নৌকাডুবির ঘটনায় দ্বিতীয় দিনের উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। সোমবার (২৬ সেপ্টেম্বর) ২৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এ নিয়ে দুদিনে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ৫০ জনে পৌঁছেছে। এদিকে এ দুর্ঘটনা তদন্তে জেলা প্রশাসন গঠিত তদন্ত কমিটি কাজ শুরু করেছে।

পঞ্চগড়ের করতোয়া নদী ও দিনাজপুর জেলার আত্রাই নদীর বিভিন্ন স্থান থেকে সোমবার সারা দিনে ২৫টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এর পর, নিখোঁজের সংখ্যা ৪০ জনে নেমে এসেছে।

সোমবার রাতে জেলা প্রশাসন স্থাপিত জরুরি তথ্য ও সহায়তা কেন্দ্রে (কন্ট্রোল রুম), অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দিপংকর রায় জানান, “দ্বিতীয় দিনের মতো উদ্ধার অভিযান স্থগিত করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ সেপ্টেম্বর) থেকে আবারও উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হবে।”

এসময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষ, বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার, স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

দ্বিতীয় দিনে উদ্ধার করা মরদেহের মধ্যে ২৫ জন নারী, ১৩ জন শিশু ও ১২ জন পুরুষ রয়েছে। এদের মধ্যে ৭টি মরদেহ দিনাজপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়।

কন্ট্রোল রুম, ফায়ার সার্ভিস ও এলাকাবাসী জানান, রাজশাহী, রংপুর ও কুড়িগ্রাম থেকে আসা ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল সকাল ৬টায় উদ্ধার অভিযান শুরু করে। নিখোঁজ স্বজনদের খুঁজে বের করতে ভোর থেকেই করতোয়ার দু’পাড়ে মানুষ আসতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে গোটা এলাকায় মানুষের ঢল নামে।

ডুবুরি দলের উদ্ধার অভিযানে আধুনিক যন্ত্রপাতির স্বল্পতায় স্থানীয় মানুষ ক্ষোভ প্রকাশ করে। একপর্যায়ে নিখোঁজদের উদ্ধারে বিভিন্ন শ্রেণী-পেশার মানুষ নদীতে নেমে পড়েন। দুপুরের পর থেকে বিভিন্ন এলাকায় মরদেহ ভেসে উঠতে থাকে।

মরদেহ উদ্ধারের সঙ্গে সঙ্গে শত শত মানুষ পরিচয় জানতে সেখানে ভিড় করে। ইউনিয়ন পরিষদ, বিভিন্ন স্বাস্থ্য কেন্দ্রে হারানো স্বজনের মরদেহ খুঁজতে যান অনেকে। মাড়েয়া বামনহাট ইউনিয়ন পরিষদের সামনে ছবিসহ নিখোঁজদের তালিকা টানিয়ে দেওয়ার পর, সেখানে শত শত মানুষ জড়ো হয়।

দুর্ঘটনার পর, পঞ্চগড় জেলা প্রশাসন ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট দীপঙ্কর রায়কে কমিটির প্রধান করা হয়। কমিটিকে ৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যাত্রী বহন, ঘাট ইজারাদারের অবহেলা, মন্দির কমিটির নেতৃবৃন্দের অবহেলার কারণেই মূলত এই নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটেছে। শৃঙ্খলা ও সাবধানতা অবলম্বন করা হলে, এ দুর্ঘটনা এড়ানো যেতো বলে মনে করছেন তারা।

পঞ্চগড় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের উপ-সহকারী পরিচালক শেখ মোহাম্মদ মাহাবুবুল ইসলাম জানান, “আমরা উদ্ধার অভিযান নিবিড়ভাবে পরিচালনা করছি। গত দু'দিনে স্থানীয় বাসিন্দাদের সহায়তায় ৫০টি মরদেহ উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি।। নিখোঁজদের উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত থাকবে।”

মাড়েয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু আনছার মো. রেজাউল করিম শামীম জানান, “অধিকাংশ মৃতদেহ সৎকার করা হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের প্রত্যেককে ২০ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে।”

তদন্ত কমিটির প্রধান দীপঙ্কর রায় জানান, “আমরা তদন্ত কার্যক্রম শুরু করেছি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যেই তদন্ত প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে দাখিল করতে পারবো। ইজারাদারের অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। আমরা তাকে খুঁজে পাচ্ছি না।”

জেলা প্রশাসক মো. জহুরুল ইসলাম জানান, “নৌকাডুবির ঘটনায় মৃত, আহতসহ সকল ব্যক্তিকেই আমরা বিভিন্নভাবে সেবা ও সহযোগিতা দিয়ে আসছি। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

উল্লেখ্য, রবিবার (২৫ সেপ্টেম্বর) দুপুর আড়াইটার দিকে পঞ্চগড় জেলার বোদা উপজেলার বড়শশী ইউনিয়নের বধেশ্বর মন্দিরে (নদীর অপরপাড়ে) মহালয়া উপলক্ষে এক বিশাল ধর্মসভার আয়োজন করা হয়। জেলার বোদা ও দেবীগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন এবং অন্যান্য এলাকা থেকে লোকজন ইঞ্জিন চালিত নৌকা করে, ঐ ধর্মসভায় যোগ দিয়েছিলেন।

XS
SM
MD
LG