অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কীভাবে পশ্চিমবঙ্গের দূর্গাপূজা পেয়েছিল ইউনেস্কোর স্বীকৃতি


পশ্চিমবঙ্গের একটি পূজামণ্ডপ। ফাইল ছবি।

“বাংলার দূর্গাপূজা অনুভব করতে তিন সপ্তাহ বাদে ফের কলকাতায় আসছি।" — ১ সেপ্টেম্বর রেড রোডে পশ্চিমবঙ্গ সরকার আয়োজিত ইউনেস্কোর স্বীকৃতি উদ্‌যাপন অনুষ্ঠানে সানন্দে ঘোষণা করেছিলেন দিল্লীতে নিযুক্ত ইউনেস্কোর প্রতিনিধিরা।

ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন ২০২১ সালের ডিসেম্বরে সংস্থার রিপ্রেজেন্টেটিভ লিস্ট অফ ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজের তালিকায় স্থান দিয়েছে ভারতের বর্ণাঢ্য শারদীয়া উৎসব দূর্গাপূজাকে। দিল্লীতে এক অনুষ্ঠানে সেই স্বীকৃতির প্রশংসাপত্র কেন্দ্রের সংস্কৃতি মন্ত্রকের আধিকারিকের হাতে তুলে দেয় ইউনেস্কো। এই স্বীকৃতি লাভ করার পর, ইউনেস্কোর নয়াদিল্লীর অফিস থেকে টুইট করা হয়েছে, “কলকাতার দূর্গাপূজা সবেমাত্র ঐতিহ্যের তালিকায় লিপিবদ্ধ হয়েছে! এই তালিকায় লিপিবদ্ধকরণের মাধ্যমে UNESCO অধরা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রচার ও সুরক্ষাকে সমর্থন জানায়।”

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী টুইট করেছেন, “প্রত্যেক ভারতীয়র জন্য অত্যন্ত গর্বের এবং আনন্দের বিষয়! দুর্গাপূজা আমাদের ঐতিহ্য ও নীতির সেরা দিকটা তুলে ধরে এবং কলকাতার দুর্গাপুজো এমন একটি অভিজ্ঞতা, যা প্রত্যেকেরই থাকতে হয়।”

বাংলার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও টুইট করে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছেন, “বাংলার জন্য গর্বের মুহূর্ত! বিশ্বজুড়ে প্রতিটি বাঙালির কাছে, দুর্গাপুজো একটি উৎসবের চেয়েও অনেক বেশি কিছু। এটি একটি আবেগ, যা সবাইকে এক করে তোলে এবং এখন দূর্গাপূজা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতিনিধি তালিকায় যুক্ত হয়েছে। আমরা সবাই আনন্দে উদ্ভাসিত!”

কলকাতার সেন্টার ফর স্টাডিজ ইন সোশ্যাল সায়েন্সেস-এর পরিচালক তথা ইতিহাসের অধ্যক্ষা তপতী গুহ ঠাকুরতা তার সংগঠনের সঙ্গে মিলিত প্রচেষ্টায় ডসিয়ার প্রস্তুত করেছিলেন, যা ২০১৯ সালের মার্চ মাসে ভারতের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক মন্ত্রকের তত্ত্বাবধানে ইউনেস্কোতে পাঠানো হয়েছিল। এরপর ২০২১ সালে ইউনেস্কো দ্বারা দূর্গাপূজাকে সারা পৃথিবীর গৌরবপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়।

“দুর্গাপুজো একটি ধর্মীয় উৎসব, যা ধীরে ধীরে একটি সাংস্কৃতিক ও ধর্মনিরপেক্ষ অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এটি সামাজিক এবং শৈল্পিক কার্যকলাপের জন্য বিশেষ স্থান লাভ করেছে। এই মর্যাদাপূর্ণ তকমাটি সারা বিশ্বের কাছে এই সমৃদ্ধশালী উৎসবকে উন্মুক্ত করবে”, জানিয়েছেন তপতী গুহঠাকুরতা।

অভিজ্ঞ গবেষক সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "বাংলার মানুষের জন্য এই সম্মান আনতে পেরে আমি গর্বিত। ডিসেম্বর মাসে আমরা একটি ব়্যালি করেছিলাম। সমস্ত পুজো কমিটি এবং উদ্যোক্তাদের নিয়ে এই মিছিলের আয়োজন করা হয়েছিল। ধন্যবাদ জানানো হয়েছিল ইউনেস্কোকে। কিন্তু, এটা তো সরকারি উদ্যোগ। পুজোর মরশুমে এই আয়োজন সত্যিই সাড়া ফেলে দিচ্ছে।" পাশাপাশি তিনি আরও জানান, "দুর্গাপুজোর এই স্বীকৃতি কারও একার নয়। এটি একটি সম্মিলিত কাজ। আমার ওপর একটা দায়িত্ব পড়েছিল। এটি একা আমার কাজ নয়। পুজো কমিটিগুলিকে নিয়ে আমি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করেছি। অনেকেই আমাকে সাহায্য করেছেন। কাজটা করতে পেরে আমি গর্বিত। সারাজীবন এই শহরে থেকেছি। শহরকে কিছু ফেরত দিতে পেরে আমি খুশি।"

তপতীর সাথে, সিএসএসএস গবেষক পণ্ডিত সন্দীপন মিত্র এবং দেবী চক্রবর্তী এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা নীলাঞ্জন ভট্টাচার্যও ডসিয়ারে কাজ করেছেন এবং ইউনেস্কোকে উৎসব সংক্রান্ত যাবতীয় প্রশ্নের ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি গ্রহণ করে দূর্গাপূজা বিশ্ব মানচিত্রে একটি বিশিষ্ট চিহ্ন রেখে গেল। বিশেষজ্ঞদের মতে, দূর্গাপূজার এই অন্তর্ভুক্তিকরণের ফলে, পুউৎসবের যে উন্মাদনা সৃষ্টি হবে, তা অর্থনীতিকে দারুণভাবে চাঙ্গা করে তুলবে।

ভারত থেকে বর্তমানে ১৪টি সংস্কৃতি জিতে নিল ইউনেস্কোর হেরিটেজের তকমা। ২০২১ সালের ১৩-১৮ ডিসেম্বর, ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে আয়োজিত হয়েছিল ইউনেস্কোর ইন্টারগভর্নমেন্ট কমিটির ১৬তম অধিবেশন। সেই অধিবেশনেই কলকাতার দূর্গাপূজাকে ‘ইনট্যানজিবল কালচারাল হেরিটেজ অব হিউম্যানিটি’-র তালিকায় যুক্ত করে রাষ্ট্রসংঘের এই শাখা সংগঠন। ভারতীয় উৎসবের নিরিখে কুম্ভ মেলার পর কলকাতার দুর্গাপুজো ইউনেস্কোর-র তালিকায় পেল হেরিটেজের তকমা।

১০ দিনের উদযাপন হিসাবে দূর্গাপূজা হিন্দু দেবী দূর্গার উপাসনার অনুষ্ঠান। এই সময়ে, নিপুণভাবে গড়ে তোলা দেবী প্রতিমাগুলিকে ‘প্যান্ডেল’ বা মণ্ডপে পুজো করা হয়। যেখানে সম্প্রদায়ের সমস্ত মানুষ একত্রিত হন এবং উদযাপনে মেতে ওঠেন। বাংলা, তথা সারা বিশ্বের বহু লোকসংগীত, রন্ধনশিল্প, লোকশিল্প, নৃত্য-গীত-বাদ্য, রীতি, আচার-অনুষ্ঠান এই উদযাপনের ঐতিহ্যে আড়ম্বর যোগ করে।

মূলত, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হলেও দূর্গাপূজা সারা ভারতজুড়ে এবং বিশ্বের ছোট-বড় বহু শহরে সনাতন ধর্মালম্বীদের জন্য ব্যাপক আনন্দের উৎসব। যুগ-যুগান্তর ধরে, ভারতীয় শহর কলকাতা উৎসবের জাতীয় ও বৈশ্বিক উদযাপনের ভৌগোলিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছে।

শিল্পকলা, সামাজিক অনুশীলন, বিবিধ আচার, উৎসব, অনুষ্ঠান এবং এগুলির শিক্ষা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বিস্তার করার লক্ষ্যে, প্রকৃতি এবং মহাবিশ্ব সম্পর্কিত অনুশীলনের প্রয়োজনীয় জ্ঞানের সংরক্ষণের উদ্দেশ্যে সম্মান জ্ঞাপন এবং স্বীকৃতি প্রদান করে থাকে ইউনাইটেড নেশনস এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন। “এই উৎসবে পুজোর থেকেও শিল্পকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়ে থাকে”, বলেছেন ইউনেস্কোর পূজা-পরিক্রমার নেপথ্যে থাকা সংস্থার সদস্য ধ্রুবজ্যোতি বসু ওরফে শুভ।

“দূর্গাপূজাকে ধর্ম এবং শিল্পের সর্বজনীন সমন্বয়ের সর্বোত্তম উদাহরণ হিসাবে দেখা হয় এবং সহযোগী শিল্পী ও ডিজাইনারদের জন্য এটিকে একটি সমৃদ্ধ ক্ষেত্র হিসাবে দেখা হয়। উৎসব চলাকালীন, যখন দর্শনার্থীদের ভিড় উপস্থাপনাগুলির প্রশংসা করতে করতে এগিয়ে যায়, তখন শ্রেণী, ধর্ম এবং জাতপাতের দেওয়াল ভেঙে পড়ে,” জানিয়েছে ইউনেস্কো।

XS
SM
MD
LG