অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আদালত অবমাননা আইন বাতিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ


বাংলাদেশ হাইকোর্ট

আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক ঘোষণা করে তা অবৈধ ও বাতিল করে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টর হাইকোর্ট বিভাগের দেওয়া রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করা হয়েছে।

প্রায় ৯ বছর আগে বিচারপতি কাজী রেজা-উল হক ও বিচারপতি এ বি এম আলতাফ হোসেনের দেওয়া ওই রায়ের ৩৮ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি বুধবার (১৬ নভেম্বর) হাতে পেয়েছেন বলে জানিয়েছেন রিটকারীদের আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

২০১৩ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে আদালত অবমাননা আইন-২০১৩ পাস হয়। ১৯২৬ সালের আদালত অবমাননার আইন রহিত করে ওই বছরের ২৩ ফেব্রুয়ারি গেজেট প্রকাশিত হয়।

পরে একই বছরের ২৫ মার্চ নতুন আইনের ৪, ৫, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৩(২) ধারার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টের দুই আইনজীবী রিট আবেদন করেন।

রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে একই বছরের ৩ এপ্রিল হাইকোর্ট রুল জারি করেন। ওই রুলের ওপর চূড়ান্ত শুনানি শেষে ২০১৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর রায় ঘোষণা করেন আদালত।

আইনের ৪ ধারায় নির্দোষ প্রকাশনা বা বিতরণ অবমাননা নয়, ৫ ধারায় পক্ষপাতহীন ও বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ প্রকাশ আদালত অবমাননা নয়, ৬ ধারায় অধস্তন আদালতের সভাপতিত্বকারী বিচারকের বিরুদ্ধে অভিযোগ আদালত অবমাননা নয়, ৭ ধারায় কিছু ক্ষেত্র ছাড়া বিচারকের খাসকামরায় বা রুদ্ধদ্বার কক্ষে অনুষ্ঠিত প্রক্রিয়া-সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ আদালত অবমাননা নয় বলে আইনে ব্যাখ্যাসহ বলা হয়েছে।

আইনের ৯ ধারায় আদালত অবমাননার পরিধি বিস্তৃত না হওয়া অর্থাৎ এই আইনে শাস্তিযোগ্য নয় এমন কোনো কাজ আদালত অবমাননা বলে গণ্য হবে না।

আইনের ১০ ধারায় প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের কথা বলা হয়।

১০(১) ধারায় বলা হয়, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের প্রচলিত আইন, বিধিমালা, সরকারি নীতিমালা, পরিপত্র, প্রজ্ঞাপন, স্মারক ইত্যাদি যথাযথভাবে অনুসরণ করে জনস্বার্থে ও সরল বিশ্বাসে কাজ করলে তা আদালত অবমাননা হিসেবে গণ্য হবে না।

১০(২) ধারায় বলা হয়, উপধারা (১)-এর অধীনে করা কাজের বিষয়ে আদালতের আদেশ-নির্দেশ যথাযথ প্রচেষ্টা সত্ত্বেও বাস্তবায়ন বা প্রতিপালন করা অসম্ভব হলে তার জন্য আদালত অবমাননার অভিযোগ আনা যাবে না।

আর আইনের ১৩(২) ধারায় বলা হয়, আদালত অবমাননার দায়ে শাস্তি হলে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি আপিলে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইলে এবং আদালত তাতে সন্তুষ্ট হলে তাকে ক্ষমা করে দণ্ড মাফ বা কমাতে পারবেন।

বুধবার আইনজীবী মনজিল মোরসেদ জানান, আদালত রায়ে বলেছেন, যে উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য নিয়ে আইনটি প্রণয়ন করা হয়েছে তাতে মনে হয় নির্দিষ্ট একটি গ্রুপকে আদালত অবমাননার দায় থেকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য প্রনয়ন করা হয়েছে।

আদালত আরও বলেন, সংবিধানের আর্টিকেল ১০৮ অনুসারে যেকোনো নাগরিক আদালতের রায় অমান্য করলে তার বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আদালত শাস্তি দিতে পারেন এবং অনুচ্ছেদ ১১২ অনুসারে রাষ্ট্রের সকল কর্তৃপক্ষ, নির্বাহী এবং বিচার বিভাগীয় ব্যক্তিগণ সুপ্রিম কোর্টের কাজে সাহায্য করবে।

সংবিধানে উক্ত নির্দেশনা থাকা স্বত্বেও আদালত অবমাননা আইনের উল্লেখিত ধারাসমূহে সংবিধানের উক্ত নির্দেশনাকে অগ্রাহ্য করা হয়েছে।

এ ছাড়া সংবিধানে আইনের দৃষ্টিতে সকলে সমান এবং একই প্রতিকার পাওয়ার বিধান থাকলেও উক্ত ধারাগুলো বিশেষ ব্যক্তিদের সুরক্ষা দিয়েছে।

এসব কারণে আদালত অবমাননা আইনের ওই ধারাগুলো সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং বৈষম্যমূলক।

রায়ে আদালত আরও বলেন, ২০১৩ সালের আইনে উল্লেখিত মূল ধারাগুলো না থাকলে আইনের অন্যান্য বিষয়গুলো অপ্রয়োজনীয় হয়ে যায়।

সে কারণে ‘আদালত অবমাননার আইন-২০১৩’ সংবিধান পরিপন্থী ও বাতিল ঘোষণা করে রায় দেন আদালত।

রায়ে আদালত ‘১৯২৬ সালের আদালত অবমাননার আইন’ পুনর্বহাল করেন বলে জানান আইনজীবী মনজিল মোরসেদ।

XS
SM
MD
LG