অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

চড়া সুদের অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণের চাপে পিরোজপুরের ভাসমান কৃষি, বিপাকে চাষীরা

ভাসমান কৃষি
ভাসমান কৃষি

বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের জেলা পিরোজপুর। এই জেলায় জলাবদ্ধতা একটা প্রায়-স্থায়ী সমস্যা। বিশেষ করে নাজিরপুর ও নেছারাবাদ উপজেলার কিছু এলাকা সারাবছরই জলাবদ্ধতার কারণে কচুরিপানায় ভরা থাকে। এই বিরূপ পরিস্থিতিকে জীবিকার অবলম্বন করে তুলেছেন এলাকার মানুষ। বছরজুড়েই এখানে এখন ভাসমান কৃষি পদ্ধতিতে সবজি চাষ ও চারা উৎপাদন করেন স্থানীয় লোকজন। মহামারী করোনা কারণে পিছিয়ে পড়ে ভাসমান কৃষি, অপ্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিতে বাধ্য হন সবজির চাষীরা। এ কারণে চাপে পড়েছেন তারা।

প্রতি বছর এখানে উৎপাদিত সবজি-চারার যে দাম পাওয়া যেত, এবছর সেই হার অনেকটাই কম। তার ওপর রয়েছে মহাজনদের কাছ থেকে নেওয়া চড়া সুদের দাদনের টাকা। বিক্রিতে মন্দার কারণে ঋণ শোধের চাপে পড়েছেন ভাসমান কৃষির সবজি চাষীরা।

কৃষি সম্পসারণ অধিদপ্তরের জেলা অফিসের মতে, শত বছরের বেশি সময় ধরে পিরোজপুরের নাজিরপুর ও নেছারাবাদে ভাসমান কৃষি পদ্ধতিতে সবজির চাষাবাদ হচ্ছে। জেলার নাজিরপুর উপজেলায় ১২০ হেক্টর জমিতে এবং নেছারাবাদ উপজেলায় ৩৭ হেক্টর নিচু জমিতে ধাপের উপরে ভাসমান কৃষি পদ্ধতিতে সবজি ও চারার আবাদ করা হয়।

এই দুই উপজেলায় প্রায় ৩২০০ চাষী ভাসমান কৃষির সঙ্গে জড়িত। কচুরিপানার ধাপ তৈরি হলেই, সেসব ভাসমান ধাপের উপর বীজতলা তৈরি করা হয়। এগুলোতে পেঁপে, লাউ, কুমড়া, শিম, বরবটি, টমেটো, বেগুন, করলা, চিচিঙ্গা, ঝিঙ্গা, বাঁধাকপি, ফুলকপি, সবুজ ফুলকপি ও শসার চারা উৎপাদন করেন। আর, লাউশাক, লালশাক, পালংশাক, ডাঁটাশাক বা সাদা শাকের চাষ করেন চাষীরা। জেলার বিভিন্ন উপজেলাসহ পার্শ্ববর্তী জেলাগুলোসহ বিভিন্ন জেলায় বিক্রি করা হয় সবজি চারা।

সম্ভাবনাময় এই কৃষি পদ্ধতিতে সরকারি কোনো সহযোগিতা নেই। করোনা মহামারীর সময় সবকিছু বন্ধ থাকায়, চাষীরা মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেছেন। মৌসুম শুরু হলেও চারার বাজার মন্দা যাচ্ছে। ফলে বিপাকে পড়েছে ভাসমান কৃষিতে নিয়োজিত সবজি চাষীরা।

এবছর দুই উপজেলা মিলে মোট ১৫৭ হেক্টর জমিতে ৮৬ লাখ ৫০ হাজার চারা উৎপাদন হওয়ার কথা।

ভাসমান কৃষি জমি নির্ভর নয় বলে চাষীরা ব্যাংক থেকে ঋণ সুবিধা পান না। স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়েফসল আবাদ করতে হয় তাদের। মহাজনদের দাদন ব্যবসার জালে জড়িয়ে অনেক চাষী এখন সর্বশান্ত হওয়ার পথে।

চাষী জামাল হোসেন জানান, “জমি বর্গা নিয়ে সবজির চাষাবাদ করছি। এই জমিতেই গড়ে তোলা হয়েছে ভাসমান সবজির খেত।আমার নিজের চাষ করার মতো ১৫/১৬ টি ধাপ আছে। সিম, পেঁপে, টমেটো, মরিচ ও লাউসহ বিভিন্ন সবজির চাষ হয় এখানে। ৬০ হাত একটি বেড কিনে আনলে, ৭ থেকে ১০ হাজার টাকা খরচ হয় প্রতি বেডে। করোনার কারণে ব্যাপারীদের আসা যাওয়া না থাকায় এ বছর দাম ভালো পাচ্ছিনা।”

পিরোজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ পরিচালক ড. মো. নজরুল ইসলাম সিকদার জানান, “নাজিরপুর উপজেলার গাওখালী, মনোহরপুর, দেওলবাড়ি ও মালিখালী, এই সব এলাকায় ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ কৃষক এই ভাসমান পদ্ধতির সবজি চাষে জড়িত। আমরা কৃষকদের চাষাবাদের মান রক্ষার্থে পরামর্শ ও চাষীদের বিভিন্ন পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকি।”

তিনি আরও বলেন, “ব্যাংক থেকে সহজ শর্তে ঋণ পাওয়ার জন্য চাষিরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন। তা নাহলে এই চাষ পদ্ধতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হবে।”

XS
SM
MD
LG