অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের আরো নিষেধাজ্ঞা চায় গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার ও অধিকার কর্মীদের পরিবার


বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় বলপূর্বক গুমের শিকার হয়েছেন, এমন লোকেদের প্রিয়জনরা নিখোঁজদের ছবি হাতে নিয়ে বিক্ষোভ করছে। ৩০ আগস্ট, ২০২২। (আব্দুর রাজজাক/ভিওএ)

বাংলাদেশের কুখ্যাত এবং অভিজাত নিরাপত্তা বাহিনী, র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের সদস্যদের দ্বারা মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের শিকার ব্যক্তিদের স্বজন এবং অধিকারকর্মীরা, দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থাটির বিরুদ্ধে বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা অব্যাহত রাখার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন।

দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়া বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু-এর সফরের পর, এই আহ্বান জানানো হয়। লু গত ১৫ জানুয়ারী বলেন, যুক্তরাষ্ট্র র‌্যাবের উপর নতুন করে কোনও নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করেনি, কারণ দেশে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কমিয়ে এনে, এই বাহিনী মানবাধিকারের ক্ষেত্রে বেশ অগ্রগতি অর্জন করেছে।

অধিকার কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে দেশটির আইন প্রয়োগকারী সংস্থার বিরুদ্ধে প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, হাজার হাজার ব্যক্তির বলপূর্বক গুম এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিল র‌্যাব। বাংলাদেশী নিরাপত্তা সংস্থা এবং এর সাবেক ও বর্তমান র‌্যাব কর্মকর্তাদের উপর যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর না করায়, কথিত অধিকার লঙ্ঘনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারগুলো বলছে, তারা বেশ হতাশ হয়েছে।

২০২১ সালের ডিসেম্বরে র‌্যাব এবং এর ছয়জন সাবেক এবং তৎকালীন কর্মরত কর্মকর্তাদের উপর মানবাধিকার-সম্পর্কিত নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ওয়াশিংটন। তাদের দেশে হাজার হাজার বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড এবং জোরপূর্বক গুমের জন্য দায়ী করা হয়।

র‌্যাবের উপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা কবে প্রত্যাহার করা হবে, তা জানাননি লু। তবে লুর সঙ্গে সাক্ষাতের একদিন পর, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন সংবাদদাতাদের বলেন, তিনি আশাবাদী র‌্যাব ও এর কর্মকর্তাদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হবে।

হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলী বলেছেন, যদিও এটা সত্য যে, নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পরপরই র‌্যাবের ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘন সাময়িকভাবে হ্রাস পেয়েছে, তবে এটি ঠিক, কেবল জবাবদিহিতা থাকলেই, নিরাপত্তা বাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়।

যুক্তরাষ্ট্র কেন বাংলাদেশের উপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি, লু তা ব্যাখ্যা করার পর অনেকেই হতাশা প্রকাশ করেছেন। তবে, বাংলাদেশের মন্ত্রীরা বলেছেন, তারা বিশ্বাস করেন, যুক্তরাষ্ট্র বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করে নেবে।

বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের একজন সিনিয়র নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় ভিওএ-কে বলেন, “র‌্যাব দুই সাবেক সংসদ সদস্য ও কয়েক ডজন নেতাসহ শত শত বিএনপি কর্মীকে জোরপূর্বক গুম করেছে, যাদের মধ্যে ৫০ জনেরও বেশি এখনো ফিরে আসেননি। র‌্যাব সদস্যরা বিএনপি নেতা-কর্মী-সমর্থকসহ সারা দেশে হাজার হাজার মানুষকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করেছে; এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের এখনো বিচার করা হয়নি।”

তিনি বলেন, “এর পরিবর্তে আমরা দেখেছি, যাদের মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের জন্য যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে, বাংলাদেশ সরকার উল্টো তাদের বীরত্বের জন্য পুরস্কার প্রদান করেছে এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “এ অবস্থায় নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হলে, বাংলাদেশে বিভিন্ন মতের মানুষ আবারও র‌্যাবের হাতে বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের শিকার হবে।”

নিরাপত্তা বাহিনীর প্রতিশোধের ভয়ে নাম পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক নারী ভিওএ-কে বলেছেন, তার স্বামী ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের আগে পুলিশের একটি শাখার দ্বারা অপহৃত হওয়ার পর থেকে আর বাড়ি ফিরে আসেননি। তিনি বলেন, "আমরা সবাই বিশ্বাস করতাম যে আমেরিকান কর্তৃপক্ষ এটি ভালভাবে জানত যে, বাংলাদেশের পুলিশ এবং অন্যান্য সংস্থার বিভিন্ন শাখা গুরুতর মাত্রায় অধিকার লঙ্ঘনের সাথে জড়িত। র‌্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর আমরা আশাবাদী ছিলাম যে, অন্যান্য সংস্থাগুলোকে লক্ষ্য করে আরো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।”

তিনি আরও বলেন, "এখন এটাই পরিলক্ষিত হচ্ছে যে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে নতুন কোনও নিষেধাজ্ঞা না আসলে, আমরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবো...এটি খুবই হতাশাজনক।"

হংকং-ভিত্তিক এশিয়ান লিগ্যাল রিসোর্স সেন্টারের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আশরাফুজ্জামান বলেন, র‌্যাবের নিষেধাজ্ঞার পরও শেখ হাসিনা সরকার বাংলাদেশের বিচার বিভাগসহ রাষ্ট্রের সব সংস্থাকে ক্রমাগত নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেই চলেছে।

আশরাফুজ্জামান ভিওএ-কে বলেছেন, “বাংলাদেশে ন্যায় বিচারের সুযোগ লাভের পদ্ধতিগত অস্বীকৃতি একটি নিয়মে পরিণত হয়েছে। যতক্ষণ না কার্যকরভাবে জবাবদিহিতার ব্যবস্থা আনা সম্ভব হয়, ততক্ষণ পর্যন্ত দেশে মানবাধিকার পরিস্থিতির কোনও উন্নতি হবে না”।

XS
SM
MD
LG