অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতি প্রবর্তন বিল পাস


বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ

বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনসংখ্যাকে সর্বজনীন পেনশন প্রকল্পের আওতায় আনার লক্ষ্যে ইউনিভার্সাল পেনশন ম্যানেজমেন্ট বিল-২০২৩ বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে।

মঙ্গলবার (২৪ জানুয়ারি) অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বিলটি উত্থাপন করলে তা কণ্ঠভোটে পাস হয়।

বিল অনুসারে ১৮ থেকে ৫০ বছর বয়সী সকল বাংলাদেশি নাগরিক এই পেনশন পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবেন। প্রবাসী বাংলাদেশিরাও এ সুবিধা পাওয়ার যোগ্য হবেন।

ক্রমবর্ধমান প্রবীণ জনগোষ্ঠীকে টেকসই সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর আওতায় আনতে বিলের খসড়া তৈরি করেছে অর্থ বিভাগ।

এটির মাধ্যমে মূলত বয়স্ক জনগোষ্ঠী অবসরে বা বেকার হয়ে যাওয়ার পর উপকৃত হবেন। এ ছাড়া রোগ, পক্ষাঘাত, বার্ধক্য বা অন্য অনুরূপ পরিস্থিতিতে বা উচ্চ আয়ু হারের মধ্যে চরম দরিদ্র্ হলেও তারা সুবিধা পাবেন।

খসড়া আইন অনুসারে একজন ব্যক্তিকে ৬০ বছর বয়স থেকে মৃত্যু পর্যন্ত পেনশন পেতে কমপক্ষে ১০ বছর বিরতিহীনভাবে প্রিমিয়াম প্রদান করতে হবে।

৭৫ বছর বয়সের আগে একজন বয়স্ক ব্যক্তি মারা গেলে মনোনীত ব্যক্তি অবশিষ্ট সময়ের জন্য পেনশন পাবেন।

তবে প্রিমিয়ামের পরিমাণ প্রস্তাবিত আইনের অধীনে একটি নিয়ম দ্বারা নির্ধারিত হবে।

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী একজন চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষ থাকবে এবং অর্থমন্ত্রীর সভাপতিত্বে ১৫ সদস্যের একটি গভর্নিং বডি থাকবে।

সরকার চেয়ারম্যান এবং বাকি চার সদস্যকে জাতীয় পেনশন কর্তৃপক্ষে নিয়োগ দেবে।

অর্থমন্ত্রী গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান থাকবেন যেখানে অন্য সদস্যরা হবেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর, অর্থসচিব, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, এনবিআর চেয়ারম্যান, সমাজকল্যাণসচিব, মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানসচিব, শ্রম ও কর্মসংস্থানসচিব, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব, প্রধামন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব, বিএসইসি চেয়ারম্যান, এফবিসিসিআই সভাপতি, বাংলাদেশ এমপ্লয়ার্স ফেডারেশনের সভাপতি, বিডব্লিউসিসিআই সভাপতি এবং নির্বাহী চেয়ারম্যান।

গভর্নিং বডি প্রতি বছর কমপক্ষে তিনটি সভা করবে।

কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয় ঢাকায় হবে এবং পূর্বানুমতি সাপেক্ষে দেশের যেকোনো স্থানে এর শাখা স্থাপন করা যাবে।

এই পেনশন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্তি স্বেচ্ছায় হবে, যদি না সরকার এটিকে বাধ্যতামূলক করার জন্য কোনো গেজেট জারি না করে।

জমাকৃত অর্থকে (ফি) তিনি বিনিয়োগ হিসেবে গণ্য করবেন এবং কর মওকুফের জন্য প্রযোজ্য হবে যখন পেনশনটি করমুক্ত হবে।

বিলে বলা হয়েছে যে বিনামূল্যের একটি অংশ সরকার সর্বনিম্ন আয়ের স্তরের নিচে বা যারা দেউলিয়া তাদের জন্য দিতে পারে।

একটি সর্বজনীন পেনশন তহবিল জমাকৃত অর্থ সঠিকভাবে পরিচালনা করবে। এক বা একাধিক তফসিলি ব্যাংক তহবিলের ব্যাংকার হিসেবে কাজ করবে।

নির্দিষ্ট সময়ে স্থানান্তর নিশ্চিত করতে ইলেকট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার সিস্টেমের মাধ্যমে তহবিল স্থানান্তর করা হবে এবং এর জন্য একটি কেন্দ্রীভূত এবং স্বয়ংক্রিয় পেনশন বিতরণ কাঠামো গঠন করা হবে।

সরকারি, আধা-সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোকে এই পেনশন স্কিমে অন্তর্ভুক্ত করতে সরকার গেজেট বিজ্ঞপ্তি জারি করবে।

আলোচনায় অংশ নিয়ে গণফোরামের সংসদ সদস্য মোকাব্বির খান বিলটিকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের একটি চমৎকার উদ্যোগ বলে অভিহিত করেন।

তবে, তিনি বলেন, “এই পেনশন ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের সাড়া পাবে না। কারণ সরকারি কর্মচারীরা যেভাবে পেনশন পান তার সঙ্গে অনেক কিছুই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। মানুষ কীভাবে লাভ বা সুবিধা পাবে তা পরিষ্কার নয়। এটা অনেকটা ব্যাংকিং প্যাকেজের মতো। এই বিল পাস হওয়ার আগে জনগণের মতামত নেওয়া উচিত”।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমাম বলেন, “এই বিল সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। সংবিধানে বলা হয়েছে, বেকারত্ব, অসুস্থতা বা দুর্বলতা বা বিধবা, পিতামাতাহীনতা বা বার্ধক্য বা অন্যান্য অনুরূপ পরিস্থিতির মতো অনিয়ন্ত্রিত কারণে সরকারের কাছ থেকে জনগণের সহায়তা পাওয়ার অধিকার রয়েছে”।

তিনি আরও বলেন, “সরকার জনগণের কাছ থেকে ফি নেবে এবং ফেরত দেবে। এই বিল পাস হওয়ার কোনো সুযোগ নেই”।

জাতীয় পার্টির আরেক সংসদ সদস্য মুজিবুল হক প্রশ্ন রেখে বলেন, বিলের কথাগুলো ভালো। “কিন্তু এই পেনশন স্কিমে সরকারের অংশগ্রহণ কী?”

পেনশনে সরকারের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে উল্লেখ করেন তিনি বলেন, “এটা ব্যাংকের ডিপিএস স্কিমের মতো। গুজব আছে যে সরকারের অর্থের অভাব থাকায় জনগণের কাছ থেকে টাকা নিতে বাধ্য হচ্ছে”।

অর্থমন্ত্রীর মৌন অবস্থান নেওয়ার সমালোচনা করে মুজিবুল হক বলেন, “অর্থমন্ত্রী বেশি কথা বলেন না”।

তিনি বলেন, “বোবার কম শত্রু আছে। কিন্তু কথাগুলো অর্থমন্ত্রীর কানে পৌঁছেছে কি না তা জানা যায়নি। তাঁর কাছ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া বা উদ্যোগ দেখা যায় না”।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, “আপাতদৃষ্টিতে আইন ভালো। কিন্তু বিভিন্ন প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের দেওয়া পথের বাইরে কিছু আছে বলে মনে হয় না। সরকার কী লাভ দেবে তা পরিষ্কার নয়”।

জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য কাজী ফিরোজ রশীদ বলেছেন, “এটা শেয়ালের কাছে মুরগি পালনের মতো। মানুষ ব্যাংকে টাকা রাখবে এবং ব্যাংকগুলো টাকা বিদেশে পাচার করবে। ব্যাংকগুলো মানুষের আস্থা হারিয়েছে। এক ব্যাংকের পরিচালক অন্য ব্যাংক থেকে টাকা নিচ্ছেন।… ঋণ খেলাপিরা সব সুবিধা পাচ্ছেন”।

বিদেশে অর্থ পাচারের বিষয়ে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “বিষয়টি দেখার কেউ নেই। যারা অর্থ পাচার করছে তাদের উৎসাহিত করা হচ্ছে”।

বিরোধী দলের সদস্যদের সমালোচনার জবাবে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল বলেন, “এই বিল আনার আগে অনেক আলোচনা হয়েছে। যারা লিখিত মন্তব্য জমা দিয়েছেন তাদের মন্তব্য বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। সংসদীয় কমিটিতেও বিলটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে। বিলটি গ্রহণযোগ্যতার লক্ষ্যে সংসদে আনা হয়েছে”।

XS
SM
MD
LG