অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

আপনার প্রতিভা থাকতে পারে, আপনি যদি ওইটা ঘঁষামাজা না করেন, লেগে না থাকেন, আপনার ছবিটা হবে না: তারেক আহমেদ


তারেক আহমেদ
তারেক আহমেদ

সম্প্রতি আমরা কথা বলেছি বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের আর্টিস্টিক ডিরেক্টর ও ঢাকা ডকল্যাবের পরিচালক তারেক আহমেদের (৫৫) সঙ্গে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অডিও-ভিজ্যুয়ালসহ সব ধরনের শৈল্পিক নির্দেশনার দায়িত্বে আছেন তিনি। দীর্ঘকাল ধরে বাংলাদেশের ডকুমেন্টারি ফিল্মের দুনিয়ায় একেবারে সামনের সারির একজন সংগঠক তিনি। অনুপ্রেরণা, উপদেশ, সাহায্য - যখন যা প্রয়োজন তা দিয়ে উৎসাহ যুগিয়ে যাচ্ছেন কয়েক প্রজন্মের নির্মাতাদের।


মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর প্রতিবছর বড় পরিসরে ডকুমেন্টারি ফিল্ম ফেস্টিভাল আয়োজন করে তার পরিচালনায়। ভয়েস অফ আমেরিকাকে দেয়া এক একান্ত সাক্ষাৎকারে মার্চে সমাপ্ত হওয়া ‘একাদশতম লিবারেশন ডকফেস্ট বাংলাদেশ ২০২৩’ নিয়ে কথা বলেন আহমেদ। বাংলাদেশের ডকুমেন্টারি ও কমার্শিয়াল ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির হাল হকিকত নিয়ে বিস্তারিত উঠে আসে এ আলাপে। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের সম্ভাবনাময় ফিল্মে গ্র‍্যান্ট দেওয়া, ওয়ার্কশপ বিষয়ক ব্যবস্থাপনা এবং তরুণ, মেধাবী ও ডেডিকেটেড ফিল্ম মেকারদের কাজ নিয়েও কথা বলেন তিনি। জাদুঘরে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে কিছু ‘ইউনিক’ কাজ করার চেষ্টা করছেন, বলেন আহমেদ, যার মধ্যে রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের গল্প নিয়ে এক মিনিটের সিনেমা বানানোর ওয়ার্কশপ। জাদুঘরের কাজের বাইরে একজন প্রতিষ্ঠাতা এবং পরিচালক হিসেবে ঢাকা ডকল্যাবের সব ধরনের প্রোগ্রামের ভারও তাকেই সামলাতে হয়।


ভয়েস অফ আমেরিকার পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন সাকিব প্রত্যয়।


ভয়েস অফ আমেরিকা: মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে ‘একাদশতম লিবারেশন ডকফেস্ট ২০২৩’ হয়ে গেল মার্চে। কেন এটা হয়? এর পারপাসটা কি?


তারেক আহমেদ: ফেস্টিভালটি শুরু হয় ২০০৬ সালে। তখন এর নাম ছিল ‘মুক্তি ও মানবাধিকার প্রামাণ্য চিত্র উৎসব’। আমি তখন মূলত ঢাকা ডকল্যাবের সাথে ইনভল্ভড্‌। ডকল্যাব প্রথম বছরটা শিল্পকলায় করার পর সেকেন্ড ইয়ারে আমরা এখানে আসি। মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের মফিদুল ভাইকে আমি পার্সোনালি চিনি যখন থেকে স্টুডেন্ট পলিটিক্স ও সাংবাদিকতা করতাম। ২০১৮ তে ডকল্যাবের ক্লোজিং যেদিন হল, মফিদুল ভাই আমাকে বললেন, আমাদের ফেস্টিভালটা তো বন্ধ কয়েক বছর ধরে, তুমি যদি দায়িত্ব নাও, আমরা ফেস্টিভালটা আবার শুরু করতে পারি। এটা শুরু হয়েছিল মানজারে হাসিন মুরাদের হাত ধরে। আরো অনেকে ছিলেন। কিন্তু ২০১২-র পরে জাদুঘরের নানা জটিলতার কারণে এটা বন্ধ হয়ে যায়। আমরা ‘১৯ থেকে আবার শুরু করলাম। টানা পাঁচ বছর ধরে এটা চলছে এখন। করোনার কারণে ‘২০-২১ দুই বছরই আমরা অনলাইনে করেছি। মফিদুল ভাইয়ের যে আগ্রহের জায়গাটা ছিল, সেখান থেকে এখন কর্মশালাও হচ্ছে। ২০০৯ সাল থেকে জাদুঘর ফিল্মমেকারদের আর্থিক সহায়তা দেয়া শুরু করেছে। সেটা কিন্তু ইন্ডিভিজুয়ালি হত। ধরেন আপনার একটা ভালো আইডিয়া আছে। এখানে জমা দিলেন, এরপরে ট্রাস্টিরা দেখল। এগ্রি করার পরে হয়তো আপনার সাথে বসবেন। এখন এটা অনেক অফিশিয়াল হয়ে যাওাতে আমরা একটা দীর্ঘ প্রসেসের মধ্যে দিয়ে যাই। প্রথম বছরই আমরা এখানে একটা কর্মশালা করি, দুইটা প্রজেক্ট এওয়ার্ড করি। তো, ‘১৯ সালের দুইটা প্রজেক্টের মধ্যে দুইটা ছবিই হয়ে যায় এক বছরের মধ্যে। রফিকুল আনোয়ার রাসেল চিটাগাংয়ের ফিল্ম মেকার। তার একটা ছবি “আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল”। করোনার মধ্যে দেখাতে পারিনি, পরবর্তীতে দেখাই। এখনতো এটা কন্টিনিউ হচ্ছে প্রতিবছরই। এভাবেই চেঞ্জটা হচ্ছে। দ্বিতীয় যেটা চেঞ্জ ঘটে, সেটা (হলো), আমরা পরের বছর ২০২০ থেকে আন্তর্জাতিক ভাবে (পুরোটা) ওপেন করে দিই কোভিডের মধ্যে। কর্মশালাটা আমরা অনলাইনে করি প্রথম, এপ্রিলে। ফেস্টিভাল টা আমরা জুনে করি। অনলাইনের কারণে একটু লিঙ্গার হয়ে যায়। প্রথম দিকে কোভিডের খুব ইনটেন্স সিচুয়েশন ছিল। আমি নিজেই প্রায় দুই আড়াই সপ্তাহ ঘর থেকে বেরুইনি। আমার একটু ঠান্ডার প্রবলেম আছে। কিন্তু ঘরে বসেও কাজগুলো করি। পরপর দুই বছর আমাদের ফিজিক্যাল ফেস্টিভাল হয়। সবাই বলছেন লোক হয় না, অনলাইনে গিয়ে দেখলাম প্রচুর লোক রেজিস্ট্রেশন করে। ওই দুই বছর আমি দেখেছি প্রতিবছর সাড়ে তিন হাজার করে মানুষ রেজিস্ট্রেশন করে। ভিউয়ার প্রথম বছর ৮ হাজার ছিল পরের বছর ১৪-১৫ হাজার হয়ে গেল। কেউ কেউ রেগুলার ঢুকে দেখতো। তবে বিদেশী দর্শক আমরা রেসট্রিক্টটেড করে দিয়েছিলাম। অনলাইনে অনেকে ছবি দিতে চায় না। ফিজিক্যালি যে ছবিটা দেখছেন আপনি নিজে, অস্কারে শর্ট লিস্টেড একটা ছবি আপনি অনলাইনে পাবেন না। কারণ এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। যে কারণে ওইটাও এনশিওর করতে হয়েছিল আমাদের। আমি মনে করি এটা আমরা সাকসেসফুলি করতে পেরেছি বলে অনেকেই ছবি দিয়েছে, ছবি দেখছে। আমি এটা ক্রস চেক করে দেখেছি। এভাবে আমরা ২০-২১-এ করলাম। এরপর গত বছর আমরা ফিজিক্যালি চলে আসলাম। গত বছর লিমিটেড স্কেলে করি। জুরিবোর্ড অনলাইনে করেছিলাম। জুরি বাংলাদেশেরটা লোকাল হয়েছিল। ইন্টারন্যাশনাল জুরি এইবারই আপনারা ফিজিক্যালি দেখছেন। এ বছর আটটা ছবি ইন্টারন্যাশনাল কম্পিটিশনে আর বাংলাদেশের পাঁচটা ছবি। গত বছর পর্যন্ত কোন রেজিস্ট্রেশন ফি নিতাম না। এই বছর থেকে রেজিস্ট্রেশন ফি নিচ্ছি। ফিল্ম সাবমিশন করার জন্য কারণটা হচ্ছে একটু যদি আমাদের কিছু ইনকাম বাড়ে ১০ ডলার করে হলেও। তাতে দুইটা জিনিস হয়েছে, গত বছর পর্যন্ত দেখতাম অন এভারেজ ২০০০ করে ছবি জমা হয়। অনেক আবর্জনা। সেগুলা স্ক্যানিং করা একটা ব্যাপার। ক্যাটালগে আমরা সিলেকশন কমিটির একটা তালিকা দিয়েছি। তারা তিন চার মাস ধরে ছবি দেখে টায়ারড হয়ে যায়। এইবার সংখ্যা কমে গেছে। এটা হয়তো সাবমিশন ফি নেয়ার কারণেই। আমাদের সাবমিশন ফি কম ছিল, ৬০০-৬৫০। ওখান থেকে আমরা শর্ট লিস্ট করে ৯১ টা ছবি দেখাচ্ছি। কোনটাই ফিজিকাল প্রোগ্রাম হচ্ছে না। এটা বাংলাদেশের একমাত্র ডকুমেন্টারি ফেস্টিভাল। আরো একাধিক ফেস্টিভালে আপনারা দেখবেন ডকুমেন্টারি স্লট আছে কিন্তু আলাদা করে কিছু নাই। শুধু একটা ক্যাটাগরিতে আছে আরকি। কিন্তু এটাই প্রাইম ডকুমেন্টারি ফেস্টিভাল।


ভয়েস অফ আমেরিকা: ইন্টারনেশনাল ফেস্টিভাল হিসেবে গ্লোবাল মার্কেটে এর স্থান কোথায়?


তারেক আহমেদ: সাউথ এশিয়াতে প্রাইভেটলি অর্গানাইজড বললে, নেপালের ফিল্ম সাউথ এশিয়ার পরেই আমাদেরটা। আমি বলব সাউথ এশিয়ার মধ্যে এটি দ্বিতীয় (বৃহত্তম) ফেস্টিভাল। ইন্ডিয়াতে একাধিক ডকুমেন্টারি ফেস্টিভাল আছে যেগুলো সরকারি। আমি নিজেও মুম্বাই ফেস্টিভালের জুরিতে ছিলাম। সেটা অনেক বড় ফেস্টিভাল। টাকার অংকে আমি বলব এত বড় ফেস্টিভাল আমরা চিন্তাও করতে পারিনা। শুধু পাঁচ কোটি টাকায় ওসব চিন্তাই করা যায় না। আমাদের চিন্তাটা প্রথম রিজিওনাল লেভেলে। ইন্টারন্যাশনাল ফেস্টিভাল করছি এই লক্ষ্যে, ফিল্ম একটা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়া। আরেকটা হচ্ছে আমাদের ফিল্মমেকাররা কিন্তু একটা সুযোগ পাচ্ছে। এখান থেকে শোকেস করার প্রথম দিন হুমায়রা বিলকিসের যে ছবিটা দেখানো হলো, দুইটা খুব বড় ফেস্টিভালে তার প্রিমিয়ার হয়েছে। কিন্তু এটাই তার প্রথম পাবলিক স্ক্রিনিং হলো। ন্যাশনালি ছবি দেখানো কিন্তু বাইরে একটা অন্যরকম পজেটিভ ভাইব তৈরি করে। আমি বলব, ফেস্টিভালটা করার মধ্য দিয়ে ডকুমেন্টারি বা নন ফিকশন সিস্টেম তৈরি করার চেষ্টা করছি। এটা একটা নিরন্তর চেষ্টা। সেটা সময় লাগবে। বাংলাদেশের ছবি কিন্তু আমরা খুব বেশি পাই না, স্পেশালি ডকুমেন্টারি একদমই হয় না। আমরা এখান থেকে দুইটা ছবিতে খুব নমিনাল ফান্ড দেই। একটা পাঁচ লাখ টাকা, একটা সাড়ে তিন লাখ টাকা। জাদুঘরের ফান্ডিং সাপোর্ট কমে যাচ্ছে। আমি জানিনা এই বছর কয়টা দিতে পারব। দুইটা দিতে চাই কিন্তু পারব কিনা জানিনা। একটা মেন্ডেটরি থাকে- মুক্তিযুদ্ধের। কিন্তু যে সমস্ত আইডিয়া আমরা পাই খুব যে ভালো আইডিয়া তা না। ন্যাশনাল কম্পিটিশনে পাঁচটা ছবি খুব কষ্টে সিলেক্ট করা হয়েছে। বাইরের জন্য কিন্তু সেই চিন্তা করতে হয় না। এই প্র্যাকটিসটাও কিন্তু ফারদার এনরিচ করার চেষ্টা করছি। আমরা কর্মশালা, ছবির শো, নানা রকম ভাবে করার চেষ্টা করি। এই যে এক্সিবিশন হচ্ছে, তার মধ্য দিয়ে তরুণ প্রজন্ম ফিকশন ছবি তৈরি করছে, ওয়েব সিরিজ তৈরি করছে, নাটক তৈরি করছে, ডকুমেন্টারির দিকেও যাতে আসে এটা আমাদের বড় চেষ্টা।


ভয়েস অফ আমেরিকা: নতুন প্রজন্মের মাঝে ডকুমেন্টারি ফিল্মের প্রতি আগ্রহ তৈরি করতে কী পরিকল্পনা?


তারেক আহমেদ: আমাদের ভলেন্টিয়ার্স যারা আছে, তারা কিন্তু ক্যাম্পাস কেন্দ্রিক। কিন্তু আমরা ফিল্ম গুলোর পাবলিসিটি ক্যাম্পাস কেন্দ্রীক করতে পারছি না। মুক্তিযুদ্ধের ছবি বানানোর আলাদা একটা কাজ আছে জাদুঘরের নিজস্ব উদ্যোগে। সেটার সাথেও কিছু স্টুডেন্ট কিন্তু জড়িত। এইগুলাকে কানেক্টিভিটির একটা অংশ হিসেবে এখনো আমরা কাজে লাগাতে পারিনি। আমি সত্যি বলি, প্রতিষ্ঠান বড় হচ্ছে কিন্তু কাজও প্রচুর। ক্যাম্পাসে পাবলিসিটি করতে গেলে আমাদের কিছু প্ল্যান নিতে হবে। সেই ক্ষেত্রে আমার জাদুঘরের অন্য সেকশনের যারা অনুষ্ঠান ব্যবস্থাপনা করেন, তাদের একটা সহযোগিতা নিতে হবে। কিন্তু তারা এই মার্চ মাসে প্রচন্ড ব্যস্ত থাকেন। সাপোজ, জাদুঘরের একটা প্রোগ্রাম আছে, এখানে দুইজন কাজ করেন, তাদের মাধ্যমে সকালে একটু সাপোর্ট নেওয়ার চেষ্টা করি। আমরা এবার চিন্তা করছি আগামী বছর এমন ফেস্টিভাল করলে সেটা মার্চে না, একটু সরিয়ে নেওয়া হবে। তখন সবাই এভেইলেবল থাকবেন। ক্যাম্পেইন বা পাবলিসিটি করতে চাইলে সবাইকে আমাদের লাগবে।


ভয়েস অফ আমেরিকা: আপনার দৃষ্টিতে ডকুমেন্টারি ফিল্ম কি?


তারেক আহমেদ: আমি এখনকার প্রেক্ষাপট যদি বলি, দুইটি ব্যাপার বলতে পারি। আমাদের এখানে ডকুমেন্টারি সম্পর্কে একটা ভিন্ন ধারণা রয়েছে। কিছু লোক লিমিটেড স্কেলে ডকুমেন্টারি চর্চা করে। তারা এক ধরনের চর্চা করে আর নন ফিকশন কন্টেন্ট, কারেন্ট অ্যাফেয়ার্স ইস্যু নিয়ে টেলিভিশনগুলো এক ধরনের কনটেন্ট তৈরি এবং প্রচার করে। সেগুলোকেও তারা ডকুমেন্টারি বলে। কিন্তু আপনি যদি বাইরের দুনিয়াতে যান, পার্টিকুলারলি এখন তো নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম খুবই জনপ্রিয়। সেখানে কিন্তু ডকুমেন্টারি খুবই আকর্ষণীয় একটা বিষয়। তারা কিভাবে সেটা তৈরি করছে, কী ধরনের ইস্যু নিয়ে কাজ করছে সেগুলো একটা বড় বিষয়ই। সেখানে অনেক ক্ষেত্রেই ড্রামাটাইজড করা হয় কনটেন্টের আকর্ষণ বাড়ানোর জন্য, রি-এন্যাকমেন্ট যেটাকে বলি। আপনি যদি একটি ওয়েব সিরিজ দেখেন, তার চেয়ে ডকুমেন্টারি কিন্তু কম আকর্ষণীয় না। আমি নাম বলতে চাই না, বাইরের টেলিভিশন গুলো আমাদের কনটেক্সটে এরকম একাধিক ছবি করেছে। এগুলো নিয়ে অনেক কথা হয়েছে। ইউটিউবে গেছে, প্রচুর ভিউ হয়েছে। কন্ট্রোভার্সি তৈরি করেছে। তার মানে ডকুমেন্টারির একটা বৈশ্বিক চাহিদা আছে। দ্বিতীয়ত, আমি যদি এখন ফেস্টিভালের কনটেক্সটে দেখি, অনেক ফেস্টিভালে ফিকশন এবং নন ফিকশনকে আলাদা করে না। আপনি ছবি দেখতে গেলেও টের পাবেন না। কারণটা হচ্ছে আমরা ফিকশন ছবিতে যেটা করি, একটা গল্প লিখা হয় স্ক্রিপ্ট আকারে। পারফর্মার পারফর্ম করে। যেটা আসলে এক ধরনের রিপ্রেজেন্টেশন। একজন ক্রিয়েটিভ মানুষ যা ভাবছেন সেটার রিপ্রেজেন্টেশন। ডকুমেন্টারিও একটি ভিন্ন ফর্মে রিপ্রেজেন্টেশন। সেটা কিন্তু পুরোটাই হচ্ছে রিয়েলস্টিক রিপ্রেজেন্টেশন। ডকুমেন্টারির আদি একটা সংজ্ঞা আছে জন গ্রিয়ারসনের, যাকে ফাদার অব মডার্ন ডকুমেন্টারি বলা হয়। দ্য ক্রিয়েটিভ ট্রিটমেন্ট অব একচুয়ালিটি। যেটাই রিয়েলিটি সেটাই কিন্তু ফিল্ম হবে বা ডকুমেন্টারি হবে, বিষয়টা এমন নয়। এটা একটা ক্রিয়েটিভ রিফ্লেকশন এবং একটা সাবজেক্টিভ বিষয়। সেই অর্থে আমি বলবো এখন ডকুমেন্টারি এবং ফিকশনের তফাৎটা, বৈশ্বিক কনটেক্সটে যদি বলি, অনেকটাই ঘুঁচে যাচ্ছে। অনেকে ফিকশন ছবিও করছে ডকুমেন্টারির আঙ্গিকে। আপনি হয়তো দেখলে বুঝতেই পারবেন না ফিকশন ছবি দেখছেন না ডকুমেন্টারি দেখছেন। রিয়েল লাইফ ক্যারেক্টারগুলোকে ইউজ করছে। মনে হবে যে তারা অভিনয় করছে, কিন্তু শেষে আপনি দেখলেন যে তারা আসলে মূলত বাস্তব জীবনের ক্যারেক্টার। তো এভাবে এটা মার্জ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের দেশের মানুষ সেটার সাথে এখনও পুরোপুরি পরিচিত না। যারা বাইরে ছবি দেখার সুযোগ পান, আমি নেটফ্লিক্সের কথা বললাম বা অন্যভাবেও, তারা মাঝে মাঝে এ ধরনের কনটেন্ট দেখেন। তাদের মধ্যেই কিন্তু আকর্ষণটা তৈরি হয়। এখানে আমি বলবো যে আমরা পিছিয়ে আছি। অডিয়েন্স পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে যদি আমি বলি, সেখানে যারা ছবি করছেন তাদের একটা বড় ব্যর্থতা। তারা দর্শককে হয়তো ঐরকম কন্টেন্টের স্বাদ দিতে পারেনি, যেটা দেখলে দর্শক বুঝতে পারবে, আসলে ফিকশন নন-ফিকশনের তফাৎটা নেই। এখন সেটা ঘুঁচে যাচ্ছে। সে রকম ছবি আমার মনে হয় হচ্ছে এখন কিছু কিছু। আমরা সামনের দিনে আরও দেখতে পাবো।


ভয়েস অফ আমেরিকা: একটা প্রচলিত কথা আছে, যেখানে ফটোজার্নালিজম শেষ হয় সেখানে, ডকুমেন্টারির শুরু। ডকুমেন্টারি ফিল্মের ক্ষেত্রে একথা খাটে?


তারেক আহমেদ: অফকোর্স। এখন জার্নালিস্টিক ডকুমেন্টারিও হচ্ছে। এখানে তফাতটা যদি আমি বলি সাংবাদিকের ক্ষেত্রে হয়তো একটা অবজেক্টিভ জায়গায় দাঁড়ানো ইম্পরটেন্ট হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু একজন ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারও ক্রিয়েটিভ লোক। তার কাছে কিন্তু অবজেক্টিভ ভিউয়ের চাইতে একটা সাবজেক্টিভ অ্যাপ্রোচ অনেক বেশি ইম্পর্ট্যান্ট। আমি একটা এক্সামপল দেই, এখনকার মর্ডান ডকুমেন্টারিতে ক্লাসিক ছবি “অ্যাক্ট অব কিলিং”। আমি এই ছবিটা প্রথম দেখি বার্লিন ফেস্টিভালে গিয়ে। যিনি ফিল্মমেকার তিনি মূলত আমেরিকান, জশোয়া ওপেনহেইমার। ইন্দোনেশিয়াতে যখন সুহার্তো ক্ষমতায় ছিল, তখন প্রচুর কিলিং হয়। অনেক সময় এটাকে জেনোসাইডের সাথে তুলনা করা হয়। সুহার্তো ৬৫ সালে ক্ষমতায় আসে। প্রায় ৯০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। একটা শহরের লোকাল যারা গ্যাং, তারা যাদের প্রতিদ্বন্দ্বী মনে করত তাদেরকে কমিউনিস্ট নাম দিয়ে মেরে ফেলত। এরকমই একটি চরিত্রকে নিয়ে সে ছবিটা করে। এটা মডার্ন ডকুমেন্টারির একটা ক্লাসিক যেমন, জেনোসাইডের ছবির ক্ষেত্রেও এটাকে একটা রিডিং মেটেরিয়াল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। আমি তার একটি মাস্টারক্লাসে অ্যাটেন্ড করেছিলাম। তাকে অনেকেই ব্লেম করছিল যে “আর ইউ এ স্পাই?’ তুমি কি ওদের পক্ষে দাঁড়াচ্ছো?” এটা কিন্তু একটা বিপদ। লোকজনের একটা বিভ্রান্তিকর ধারণা থাকে যে তুমি একটি সত্যকে উপস্থাপন করবে। এখানে তুমি উল্টো সত্যটা বলছো। যেটা সবাই মেনে নিতে পারে না, মানবে না। সেরকম একটা কথা বলতে চাইছে। হুইচ ইজ ভেরি রং। ফিল্মমেকার একজন সাবজেক্টিভ মানুষ। সেটা আপনি ডকুমেন্টারি বানান, ফিকশন বানান। তিনি সাবজেক্টিভ জায়গা থেকে এই ব্যাপারটা দেখছেন। সেখানে জার্নালিস্টরা যে অবজেক্টিভিটি নিয়ে কাজ করে সেটা তার জন্য জরুরী না। তার ব্যাপারটা পুরোটাই সাবজেক্টিভ। আমি একটা খুবই ক্লাসিক এক্সামপল দেই, জার্মানির ফিল্মমেকার লেনি রিফেনস্টলের দুইটা ছবি ক্লাসিক ডকুমেন্টারিতে পড়ানো হয়। তিনি দুইটি ছবির জন্য বিখ্যাত। মূলত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে ছবি করেছেন। একটা হচ্ছে “অলিম্পিয়াড”, আরেকটা হচ্ছে “ট্রায়াম্ফ অব দ্যা উইল”। এই দুটি ছবি হচ্ছে হিটলারের প্রোপাগান্ডা। আমি পার্টিকুলারলি “ট্রায়াম্ফ অব দ্য উইল” ছবিটা কয়েকবার দেখেছি। যতবারই দেখি, অবাক হই। এস্থেটিক্যালি ছবিটি এত অদ্ভুত… ইউথ নাজিসদের একটা সম্মেলন হচ্ছে, সেটাকে তিনি ডকুমেন্ট করেছেন। এটা বোধহয় ৩৭ কি ৩৮ এর সময়কার। তখনকার সময়ে, ৩২টা ক্যামেরায় শ্যুট করা হয় ওই ফিল্ম। ছবিটি দেখলে আপনার মনে হবে, এটা খুবই ভালো একটি কাজ, অদ্ভুত একটি কাজ। মানে যে কাজটা হিটলার করছে, সে যে ভাষায় বক্তৃতা দিচ্ছে তাকে একটা সুপারহিরো মনে হবে। অথচ পুরোটাই একটা প্রোপাগান্ডা। ছবিটা এস্থেটিক্যালি এত চমৎকার যে, অনেকেই এস্থেটিক্যালি এই ছবিটাকে ওয়ান অফ দ্য বেস্ট বলে কাউন্ট করেন। ফিল্ম এস্থেটিকস নিয়ে ছবিটি অনেক জায়গায় পড়ানোও হয়। কিন্তু তার কনটেন্ট এবং তিনি কোথায় দাঁড়িয়ে ছবিটা করছেন সেটা দেখুন। এটা হিটলারের পক্ষের একটা প্রোপোগান্ডা। তিনি হিটলারের নাৎসিজমটাকে ফিলোসফিক্যালি থিওরাইজড করার জন্য এবং প্র্যাক্টিক্যালি বোঝানোর জন্য ছবিটাকে ইউজ করেছেন। তারমানে আপনি বুঝতেই পারছেন যে, সত্য একটা সাবজেক্টিভ ব্যাপার, তার কাছে ওটাকেই সত্য মনে হয়েছে। অথচ এস্থেটিক্যালি, ইট ইজ এ ক্লাসিক। কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। কিন্তু বিভ্রান্তিটা এখানেই। তার মানে পুরো বিষয়টাই হচ্ছে সাবজেক্টিভ। সিনেমার হিস্ট্রিতেও লেনি রিফেনস্টল খুবই নামকরা একজন আর্টিস্ট। কিন্তু তিনি ফ্যাসিজমের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।


ভয়েস অফ আমেরিকা: বাংলাদেশের ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির ইতিহাসে ‘হাসিনা: এ ডটারস টেল’ ডকুমেন্টারি ফিল্মটির গুরুত্ব কেমন বলে আপনি মনে করেন?


তারেক আহমেদ: আমি বলব, অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ একটা ছবি। কারণ সেই সময়টাকে তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে, যে সময়টা আমরা হারিয়ে এসেছি। যেটা অনেকেই জানে না। (তবে) আমার কাছে মনে হয়, যে সময়ে ছবিটা করা হলো, হয়তো নানা কারণে ছবিটার গুরুত্ব হারিয়ে গেল। এটা যদি আরো ১৫ বছর আগে নির্মাণ করা হতো তাহলে মানুষ লুকব্যাক করতে পারত। এটা মনে হচ্ছে, আমি প্র্যাকটিকালি যদি বলি, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী - তিনি ক্ষমতায় আছেন, মনে হচ্ছে যে এ ঘটনাটা বলা দরকার, সে কারণে বলা হচ্ছে। তাতে করে কিন্তু অনেকেই এটাকে ওভারলুক করে যাচ্ছে। যখন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন না, আমি যদি ২০ বছর আগের কথা বলি, তখন যদি ছবিটা হতো তাহলে কিন্তু ছবিটা অন্য একটি জায়গায় গিয়ে দাঁড়াতো। কারণ এটার একটা অন্যরকম ভ্যালু আছে সময়টাকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে। সে সময়টাকে রিকন্সট্রাক্ট করা, যেটা এখনকার জেনারেশন জানেই না। ছবিটার যে ইম্প্যাক্ট, সে ইম্প্যাক্ট খুবই ইম্পরট্যান্ট। ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে সেটা হয়তো অনেক জায়গায় আন্ডারমাইন্ড হয়ে যায়। একটা ক্রান্তিকালের সময়ে যদি ছবিটা দেখানো হতো তাহলে এটা যেভাবে মানুষকে ইম্প্যাক্ট করার কথা, সেটা এখন হচ্ছে না। আমি একটা সিম্পল উদাহরণ দেই। আমি এবার মুম্বাই ফিল্ম ফেস্টিভালের জুরি ছিলাম। ঐটা ডকুমেন্টারিতে ইন্ডিয়ার সবচাইতে বড় ফেস্টিভাল। আমরা ৫ জন জুরি, এরমধ্যে ভারতের তিনজন, আমি এবং শ্রীলংকা থেকে একজন। ইন্ডিয়ার কলকাতা থেকে যে মেয়েটা এসেছিল - আমরা ডেইলি ব্রেকফাস্ট করি, আড্ডা দেই। তো একদিন সকালবেলা কি নিয়ে কথা উঠেছিল, তো আমি তাকে একটা ঘটনা বললাম। সেটা হচ্ছে নির্মলেন্দু গুণের সেই কবিতাটা, “সমবেত সকলের মতো আমিও গোলাপ ফুল খুব ভালোবাসি।” ‘৭৭ সালে, বাংলা একাডেমিতে একটা আলোচনা অনুষ্ঠান হচ্ছিল। এটা সম্ভবত ২১ শে ফেব্রুয়ারি বা ২৬ শে মার্চ - কোন একটা সময়ে। সেখানে দাঁড়িয়ে এই কবিতাটা পাঠ করেন তিন লাইন কি চার লাইন। মানুষের গায়ের পশম দাঁড়িয়ে যায়। দ্যাট ইজ দ্যা ইমপ্যাক্ট। কবিতাটি (তখন) দুঃসহ ছিল। আজকে তাকে অনেকেই বদনাম করে। কিন্তু পেছনটা দেখে না, যখন বঙ্গবন্ধুর নামও মানুষ বলতে পারত না, উচ্চারণ করতেও কারো সাহস ছিল না, তিনি জাস্ট চারটা লাইন… আমি কেন এই এক্সাম্পলটা দিলাম? ওই মহিলাকে যখন বলেছি, তার চোখ দেখি ছলছল করছে। আমি বললাম যে আমারই গায়ের পশম দাঁড়িয়ে গেল। কবিতার শেষ লাইনটা হচ্ছে এরকম যে, “রেসকোর্স পার হয়ে যেতে সেইসব গোলাপের একটি গোলাপ গতকাল আমাকে বলেছে, আমি যেন কবিতায় শেখ মুজিবের কথা বলি। আমি তাঁর কথা বলতে এসেছি।” এবং এটা কখন বলছেন? যখন তার নাম নেয়া যাবে না। তাই না? আপনি এখন বলেন, হাজার কন্ঠে বলেন! কিন্তু তখনকার সময় আর এখনকার সময়, তফাতটা হচ্ছে এখানে। আমি ইম্প্যাক্ট - ওইটাই বলছি।


ভয়েস অফ আমেরিকা: গত পাঁচ বছরে আপনার দেখা বাংলাদেশি কিছু সেরা ডকুমেন্টারির কথা বলুন, যা আপনার ভালো লেগেছে বা দর্শকদের দেখা উচিত মনে করেন?


তারেক আহমেদ: আমি ডকল্যাবের অ্যালামনাই হুমায়রা বিলকিসের ছবিটার কথা বলব। ওর ছবিটা ওর মাকে নিয়ে। শুরু করেছিল ছবিটা বিলকিস অ্যান্ড বিলকিস নামে, পরে নাম রাখে “থিংস আই কুড নেভার টেল মাই মাদার”। খুবই পার্সোনাল একটা ছবি। তার মায়ের সাথে তার সম্পর্ক। মহিলা এক সময় কবিতা লিখতেন। সেখান থেকে একটা কনজারভেটিভ দিকে টার্ন করেছে। কিন্তু সেটার মধ্য দিয়েই আমাদের সমাজের পরিবর্তনের একটা বড় চিত্র ছবিটার মধ্যে উঠে এসেছে। আমি মনে করি, এরকম ছবি আরো হওয়া দরকার। একদম বাঙালি মুসলমান মধ্যবিত্ত পরিবার গুলোর ঘরের ভেতরের কথা। এরকম আরো কিছু কাজ হচ্ছে। যেগুলো আমরা সামনে দেখতে পাবো। আমার কাছে মনে হয় ১০০ জন আর্টিস্ট যদি বলি ১০০ রকম কাজ তো তারা করবেন। সেরকম, আমি ডকল্যাবে যারা কাজ করছে, অ্যালামনাই যারা বিভিন্ন বছর আসছে, এরকম ১০-১৫-২০ রকমের ছবি হওয়ার একটা সম্ভাবনা থাকছে। এই ডাইভার্সিটিটা সবচেয়ে বড়। একেক জন একেক ভাবে ছবিটা করছে। অনেকের ছবি আমি মনে করি আগামী ১-২ বছরের মধ্যে শেষ হবে। শেষ হয়ে একটা জায়গায় গিয়ে দাঁড়াবে। এটা আমি পজেটিভ মনে করব।


ভয়েস অফ আমেরিকা: আগে ডক ফেস্টে কেবল শর্টস দেখানো হত। এবারে ফিচার ফিল্মসও দেখানো হচ্ছে। চেঞ্জটা কেন আনলেন?


তারেক আহমেদ: ফিচার ফিল্ম মানে ফিচার লেংথ ডকুমেন্টারি। এটা তো ছোট আকারে শুরু হয়েছিল। বাংলাদেশের ডকুমেন্টারি যেগুলো হয়, এক ঘন্টা লেংথের বেশি করে না। এখন আমাদের বন্ধুরাও কিন্তু বড় লেংথের ছবিগুলা করছে। আরো কিছু কিছু এরকম আন্ডার প্রোডাকশন কাজ আছে যেগুলা ফিচার লেংথের। আমরা চিন্তা করছি আগামী বছর অন্তত একাধিক ক্যাটাগরি… ফিচার লেংথের জন্য একটা অন্তত ক্যাটাগরি ক্রিয়েট করব। সেটা যদি বাইরের জন্য না হয়, বাংলাদেশের জন্য হতে পারে। বাংলাদেশের যেই ন্যাশনাল কম্পিটিশনটা, সেটার জন্য লেংথ ফিক্স হতে দিব না। আমরা লেংথ ওপেন করে দিতে পারি। এটা আমার ধারণা। এটা ফেস্টিভালের পর আলাপ করে সিদ্ধান্ত নিব। তাহলে কিন্তু ছবি আরো কিছু যুক্ত হতে পারে। আর কম্পিটিশনে যুক্ত হলে, একটা ছবি এওয়ার্ড পেলে, তখন তার ক্রেডেনশিয়ালস বেড়ে যায়। আর আন্তর্জাতিকভাবেও দেখেছি, অনেক ভালো ছবিও কম্পিটিশনে রাখতে পারতাম। বিকজ দে আর ফিচার লেংথ, আমরা রাখতে পারছি না। কারণ আমার কম্পিটিশনটাই এক ঘন্টা লেংথের মধ্যে। যদি কম্পিটিশনের মধ্যে না রাখি, তাহলে শুধু ছবির মান কমে যায় না, ফিল্মমেকাররাও আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। কেবল ফিচার লেংথ হওয়ার জন্য সে (জয়েন) করলো না। এই যেমন “অল দ্যাট ব্রিদস” ছবিটা খুবই ইম্পরট্যান্ট। অস্কারের শর্ট লিস্টেড পাঁচটা ছবির মধ্যে একটা। আমরা কম্পিটিশনে তাকে রাখতে পারলাম না বিকজ অফ লেংথ। ফেস্টিভালের মেরিটটা কিভাবে হবে এগুলা আমরা এখন ভাবছি। আশা করছি দ্রুতই পরিবর্তন করব। দিস ইজ দা লাস্ট ইয়ার। অলরেডি এই বছর কথা শুরু হয়েছে। আমরা এটা এক্টিভলিই করছি।


ভয়েস অফ আমেরিকা: বাংলাদেশের ফিল্মমেকারদের আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিতি বাড়ানোতে আপনারা কিভাবে সহযোগিতা করেন?


তারেক আহমেদ: এনাবলিং এনভায়রনমেন্ট পলিসি। যেটা ম্যাচ মেকারের কাজটা করে। এখন আমরা ইকো সিস্টেমটা আরো শক্ত করার চেষ্টা করছি। কিন্তু ফিল্মমেকারদের চেষ্টাটা সবচেয়ে বেশি লাগবে। সেটা দুই অর্থে। এক নাম্বার, আপনার প্রতিভা থাকতে পারে। আপনি যদি ওইটা ঘঁষামাজা না করেন, লেগে না থাকেন, আপনার ছবিটা হবে না। সেইটা বড় জিনিস। আমরা এখানে চেষ্টাটা করছি। ওই যে বললাম ম্যাচ মেকিং করার বা ইকোসিস্টেমটা ডেভলপ করার। আমি কোরিয়াতে দেখেছি, ওরা যখন ফেস্টিভালে যায়, ওদের ছবির একটা প্রায়োরিটি থাকে। ফেস্টিভালগুলোতে ওরা যখন পিচিং করতে বসে, ১২-১৩ জনের মত যায়। সিনেমার লোকজন, সিনেমা হলের মালিক, স্টুডিও, ফাউন্ডেশনগুলো, সরকারের লোকজন - কারণ ন্যাশনাল সিনারিওটা আস্তে আস্তে বড় না হলে বাইরের লোকজন আসবে না। যখন দেখবে আপনার এখানে চর্চাটা আছে, বাইরের লোকজন আসবে। যেটাকে বললাম কিনা ‘এনভায়রনমেন্ট’। আপনি সেটা ক্রিয়েট করছেন, করেছেন - করতে পারছেন, চেষ্টা করছেন। তাহলেই কিন্তু আপনি তখন বাইরের লোকজনকে গ্র্যাজুয়ালি টেনে আনতে পারবেন। অন্যথায় পারবেন না।


ভয়েস অফ আমেরিকা: তাহলে আমরা কি আশা করতে পারি আজ থেকে ৪-৫ বছর পরে পলিসি মেকার ও ডোনাররা সকলেই ডকুমেন্টারি পিচিং সেশনে থাকবেন? সচিব থেকে শুরু করে ইউএন বডি, কর্পোরেশনগুলো - সব স্টেকহোল্ডাররা থাকবেন - যেখানে হিউম্যান রাইটস নিয়ে কাজ হবে?


তারেক আহমেদ: এটা আমি অনেক জায়গায় বলি, (বাংলাদেশের) ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি ইকো সিস্টেমে অনেক পেছনে পড়ে আছে। শুধু ডকুমেন্টারি আলাদা করে না, সবকিছুতেই। সেই জায়গায় আমরা যদি কাজ করি, যারা পলিসিমেকার, এলাইড ইন্ডাস্ট্রির লোকজন। সিনেমার ইন্ডাস্ট্রি এখন আসলে নাই, একটা সময় ছিল। এলাইড ইন্ডাস্ট্রি অ্যাডভার্টাইজমেন্ট এর কথা শুনি, হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হয়। বা ধরেন ওয়েব সিরিজও করছে অনেকে। শুধু তাই না, কর্পোরেটরা নানা রকম কাজ করছেন। তাদেরকে যুক্ত করতে পারলে কিন্তু কোন না কোন সময় সেই প্রভাবটা পড়বে। ইন্ডিয়াতে একাধিক ছবি অস্কারে শর্ট লিস্টেড হয়ে এখন শুধু ইন্ডিয়ান গভমেন্ট না কর্পোরেট সেক্টরও আস্তে আস্তে এগিয়ে আসছে। এটা পজিটিভ নেগেটিভ - পরে। কিন্তু আপনার যদি প্রাইভেট সেক্টর না আসে…। এখন আপনি ঢাকা আর্ট সামিট দেখেন, ইন্টারেস্টিং কাজ। কিছু আছে গিমিক, (কিছু) খুবই ইন্টারেস্টিং। ঢাকা সামিট যারা করে, সামদানীসহ এরকম আরো ৪-৫টি অর্গানাইজেশন বহুকাল ধরে লেগে আছে। যে কারণে বাংলাদেশের ফাইন আর্টটা অন্য একটা জায়গায় চলে গেছে। আমার এক বন্ধু বলেছিল, রিসেন্টলি আর্টিস্টরা কিন্তু আমাদের ফিল্মমেকারদের থেকে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। তারা অনেক বেশি গ্লোবাল। নানাভাবে সুযোগ পাচ্ছে, কাজটাও করছে। ফাঁকিবাজি করছে না। কিছু কিছু ফাঁকিবাজ লোক থাকবেই, কিন্তু ফিল্মের জায়গাটা এখনও কূপের মধ্যে আবদ্ধ। একটা ন্যাশনালিস্টিক…সো কল্ড ন্যাশনালিস্টিক ছবি বানাতে হবে এরকম…আমি নাম বললাম না, সেটার মধ্যে আবদ্ধ আছে। কিন্তু এর বাইরেও যে হাজারটা… মানুষের ঘরের মধ্যকার গল্প, কত পারসোনাল, কত রকম সামাজিক বৈষম্য বাংলাদেশে - সেগুলো যদি আসে এবং এগুলো যদি আস্তে আস্তে আমরা পুশ করতে পারি, লোকালি করতে পারি, তাহলেই আসলে একটা চেঞ্জ হবে। ওই জায়গায় আমি আশাবাদী। আমরা আরেকটা জায়গায় কাজ করছি। ডকুমেন্টারি যেহেতু ইকোসিস্টেমের অংশ, ডকল্যাব থেকে, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর থেকে আমরা ফেস্টিভাল করি। পলিসির সাথে যারা এনগেজড, তাদেরকে কি করে কাজে লাগানো যায়, পুশ করা যায়, পুল করা যায়, সে চেষ্টা করছি। সেটা নানাভাবে করতে হয়। ওয়ান অন ওয়ান মিটিং করে, কথা বলে, কারো সাথে লাঞ্চ করে - (যদি) সেই চেষ্টা রাখতে পারি, তাহলে চেঞ্জ হবে। আপনি বিচ্ছিন্ন হলে হবে না। আপনাকে পুরো সিস্টেমের মধ্যে ঢুকতে হবে। আমাদের সরকার অনুদান দেয়। সেটা ভালো জিনিস। এটাকে আরো স্ট্রাকচারের মধ্যে (কিভাবে) ফেলা যায়, সেগুলোই কিন্তু আমাদের চেষ্টা। আর, একটু অফিশিয়াল প্রসেস করা। এখন কেউ একটা কাগজ জমা দিলেও, জমা দেওয়ার পরে দুইটা কমিটি হয়। তারপর তারা কাগজপত্র পড়ে ডিসাইড করে ফেলে। বিহাইন্ড দা সিন কি হয় আমি জানি না।


ভয়েস অফ আমেরিকা: জাদুঘর নির্মাতাদের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে পাঁচ লাখ টাকা এবং হিউম্যান রাইটসের ক্ষেত্রে সাড়ে তিন লাখ টাকা অনুদান দিচ্ছে। এখানটায় কারা এপ্লাই করতে পারে?


তারেক আহমেদ: ওপেন ফর অল। যে কেউ এপ্লাই করতে পারবে। আমরা কর্মশালাটি করি। ভারত থেকে দুইজন এসেছেন। আমাদের বাংলাদেশের একজন। এই তিনজন চারদিন কর্মশালা করেন। আমরা প্রজেক্ট জমা নেই, আইডিয়া জমা নেই। এর আগের বছর যেটা করেছি শুধু কাগজপত্র[ই] জমা নেইনি পাশাপাশি বলেছি, আপনি যে আইডিয়া দিয়েছেন শুট করেন। কেউ স্টোরিবোর্ড করে জমা দেয়। যেমন, একজন এনিমেশনের একটা আইডিয়া নিয়ে এসেছে। তাকে জমা দিতে বলছি স্টোরি বোর্ড করে। শুট করা সম্ভব না যেহেতু। তো জমা দিয়েছে, এগুলা আমরা দেখছি। এবার আইডিয়া ছিল মনে হয় এরাউন্ড টুয়েন্টি। তার থেকে আমরা বাছাই করেছি। ঢাকার বাইরে থেকেও চারজন নিয়েছি। চট্টগ্রাম থেকেই ছিল তিন জন। চট্টগ্রাম এ জাদুঘর ফেস্টিভাল করেছিল অক্টোবরে। তখন এরকম একটা কর্মশালা হয় তিন দিনের। সেই কর্মশালায় ১৭ জন ছিল। সেখান থেকে আমরা তিনজনকে সিলেক্ট করি। এখানে ১-২ টা স্টোরি খুবই ইন্টারেস্টিং ছিল। একটা স্টোরি ছিল হালদা নদী (নিয়ে), যেখানে মাছেরা ডিম ছাড়ে। তিনটা স্টোরি চট্টগ্রাম থেকে নিয়েছি আমরা। আরেকটা আইডিয়া… আমি সিলেটে অন্য একটা কর্মশালা (আয়োজন) করতে যাই, প্রায় ১৪-১৫ জন এসেছিল। তার মধ্যে এক ভদ্রলোক এসেছেন সুনামগঞ্জের একটা রিমোট উপজেলা থেকে। তিনি মূলত রিসার্চের কাজ করেন। একটি ইন্টারেস্টিং বিষয়ে কাজ করছিলেন। আমি প্রথম দিনই তার সাথে পরিচয় হওয়ার পরে বুঝলাম, আইডিয়াটা খুব ইন্টারেস্টিং। ‘৭৫ এর পরে মুক্তিযোদ্ধাসহ যে সমস্ত মানুষ বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন অফিশিয়ালি আনঅফিসিয়ালি। কেউ কেউ যুদ্ধ করেছে বন্দুক দিয়ে আর্মির বিরুদ্ধে। তাদেরকে নিয়ে তিনি গবেষণা করছেন সাত আট বছর ধরে। একটা বই করবেন তিনি। এসেছিলেন ওই ওয়ার্কশপটাতে, ফিল্ম কিভাবে বানায় জানতে। তিনি ডকুমেন্টেশন করতে চান। আমি বললাম, এটা তো খুবই ইন্টারেস্টিং আইডিয়া। এটা নিয়ে কেউ কেউ ভাবছে। অনেকে কথা বলে কিন্তু কেউ কাজটা করে না। এই গবেষণা তার বই হয়ে বেরোবে। এখানে সুনামগঞ্জের কিছু লোক আছে, সিলেটের কিছু লোক আছে। তারপরে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের কিছু লোক আছে, যারা ঐখানকার লোকাল মুক্তিযোদ্ধা। আবার অনেকে পুশ ব্যাক করায় ইন্ডিয়াতে চলে গিয়েছিল। আর্মির কারণে তারা থাকতে পারছিল না। ধরেন ৭৫-৭৬ এই সময়ের ঘটনা। সেই লোকগুলোই তার বইয়ের গবেষণার বিষয়। আমি বললাম, আপনি যেহেতু এসেছেন এখানে কর্মশালাটি করতে, ঢাকায় চলেন। তিনি ওই আইডিয়াটি নিয়ে এসেছেন। আরো ফারদার কি করা যায় সে বিষয়ে কথা বলতে। এই চারটা হচ্ছে বাইরের থেকে আর বাকি আটটা আইডিয়া ঢাকার। আইডিয়াগুলো নিয়ে চার দিন স্টোরি টেলিং ওয়ার্কশপে ফারদার ডেভলামমেন্টের সেশন চলবে। আমরা এই সেশনটাকে স্টোরি টেলিং বলছি। ফান্ডিং নিয়ে বা প্রোডাকশন কিভাবে হবে সেসব আমাদের আলাপের বিষয় না। গল্পটা কিভাবে তৈরি হবে, গল্পের স্ট্রাকচার, ক্যারেক্টার ও তার ধরন এসব বিষয়ে। যেমন একটা গ্রুপে আমি ছিলাম। একজন নারী তিনি একটা আইডিয়া নিয়ে এসেছেন। তিনি বেসিক্যালি স্টুডেন্ট। বিহারীদের নিয়ে একটা কাজ করবেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম, আপনার এই ফ্যামিলিগুলোতে এক্সেস কেমন? আপনি যদি ডকুমেন্টারি করতে চান আর এক্সেস না থাকে, তাহলে পারবেন না। এগুলো নিয়ে এই কর্মশালাতে আলাপ হবে। এরপরে আমরা যেটা করব তিন মিনিটের একটা প্রেজেন্টেশন করতে বলবো। এই ১২ জন প্রেজেন্ট করবে। আমরা সিলেক্ট করব। সেখানে হয়তো জাদুঘরের ট্রাস্টি দুজন থাকবেন। আমাদের মধ্যে তিনজন টিচার থাকবেন। সবাই মিলে বসে তখন আমরা ডিসাইড করব।


ভয়েস অফ আমেরিকা: অনুদানের ছবিতে ফিল্মমেকারদের কি কোন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে হয়, নাকি স্টোরিটেলাররা নিজেদের মতো করে গল্প বলতে পারেন?


তারেক আহমেদ: এখানে মানবাধিকার অনেক বড় একটা বিষয়। এখানে বহু কিছু হয়, ধরেন একটা লোক, তার স্বাস্থ্যগত সমস্যা হচ্ছে - তার মানবাধিকার। বিলকিসের ছবিটা একটা বড় হিউম্যান রাইটসের ইস্যু নিয়ে। সেখানে তো আসলে সবই পড়ে। (এজেন্ডা) আমাদের একটাই থাকে, আমরা আসলে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটা ছবিতে ফান্ড দিতে চাই। আর একটা হিউম্যান রাইটস দেই। সেখানে আমরা আর কোন বাঁধা ধরার চেষ্টা করি না। শুধু সিলেকশনটা করার পরে আমাদের দিক থেকে একটাই জায়গা থাকে, তিনি যেন এই বাজেট এবং সময়ের মধ্যে আমাদেরকে ছবিটা করে দেন। অনুদানের বিষয়টা হচ্ছে যে, কিছু হয়তো নীতিমালার মধ্যে একটা শর্ত দেয়া থাকে। সেটা এক নম্বর। অনুদানের ছবির যেটা সব চাইতে বড় সুবিধা এটা গভমেন্ট দিচ্ছে, রাষ্ট্রের টাকা। রাষ্ট্র কিন্তু ছবিটার প্রযোজক না। প্রযোজক আপনি। আপনার কাছে রাষ্ট্র শুধু চাচ্ছে একটা মিনিমাম একাউন্টটিবিলিটি - আপনি ছবিটা করবেন। অনেক সময় প্রডিউসাররা যেমনটা বলে, ছবিটার মাঝপথে বাধা দেয়, বলে অমুক আর্টিস্ট নেন, এভাবে করেন, ওভাবে করেন। রাষ্ট্র সেটা করে না। আমি কখনও এরকম ঘটনা শুনিনি। তার মানে আপনি অনেকের চাইতে বেশি ফ্রিডম পাচ্ছেন। কিন্তু একটা নীতিমালা আছে। মুক্তিযুদ্ধ, দেশীয় সংস্কৃতি - এগুলো সহ আরও নানা কিছু। কাগজপত্রে সেগুলোর মধ্যেই থাকতে চায়। হ্যাঁ, একেকটা গভমেন্টের একেক রকম বিষয় তো থাকেই। কিন্তু আমি যেটা বললাম, ছবিটা মাঝপথে গিয়ে বন্ধ করে দেয়া হলো, অমুক আর্টিস্ট না নেয়ার জন্য এটা আমরা বাইরে দেখে থাকি। সেরকম কোন কিছু আমি এখনো শুনিনি। বরঞ্চ আমি বলব নির্মাতাদের ফেইলিওর আছে। আমরা যেটা প্রায় আলাপ করি, ধরেন গভমেন্ট দিচ্ছে ৬০ লাখ ৭০ লাখ টাকা। সে ৫ কোটি টাকার একটা প্রজেক্ট নিয়ে বসে আছে। তাহলে ছবি কী করে শেষ হবে? বাকি টাকা তো তাকে জোগাড় করতে হবে। তাই না? তখন সে ছবিটা শেষ করতে পারে না। দ্বিতীয় বিষয় হলো অনেকেই ছবিটা শেষ করে না। তারা মনে করে যে এটা সরকারের টাকা। এটা আমাদের একটা অদ্ভুত কালচার। আমরা বহু জায়গায় ডিফল্টার হয়ে গিয়েছি, রাষ্ট্রের টাকা লোপাট করে ফেলছি। এখানেও সেটাই চেষ্টা থাকে। সেই অর্থে অনেকেই ছবি শেষ করে না। টাকা নিয়ে চলে যায়। প্রথম কিস্তি টাকা নিয়ে চলে গেল… এটা আগে ছিল না এখন হচ্ছে। গভমেন্ট নাকি এখন উকিল নোটিশ পাঠাচ্ছে। আমি এটাকে পজিটিভ জিনিস মনে করি। রাষ্ট্রের টাকা বলেই, আমি আক্ষরিক অর্থে বলি, মেরে দেয়া যাবে সেটা (মনে) করা উচিত না। মানে সেই প্রবণতা ফিল্মমেকারদের মধ্যেও দেখা গেছে। সেটা এখন গভমেন্ট, ঐ যে উকিল নোটিশ পাঠিয়ে, নানা রকম আইনি প্রক্রিয়ায় যায়, তাহলে সেটা ফেরত দিতে হবে আপনাকে। মানে সেই সুযোগটা কমবে। সেটা কমে গেলে ফিল্মমেকাররা অ্যাকাউন্টটিবিলিটির মধ্যে আসবে। নানা রকম ব্যাপার আছে, কোটারি স্বার্থ থাকে, নানা রকম স্বার্থ থাকে। তারপরেও তো কেউ কেউ অনুদান পাচ্ছে।


ভয়েস অফ আমেরিকা: এই যে কিছু ক্রাইটেরিয়া বেঁধে দেয়া, এটা কি কোনভাবে আমাদের কালচারটাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যেতে হ্যাম্পার করে?


তারেক আহমেদ: একটু হ্যাম্পার করে এক অর্থে। কিন্তু গভমেন্টের অনুদান দিয়েই সব ছবি হবে তা তো না। গভমেন্টের অনুদান তো এক সময় ছিল না বা খুব কম ছিল। তখন কি ছবি হয়নি? আর গভমেন্ট সাপোর্ট দিয়েই কেন গোটা একটি ইন্ডাস্ট্রি বলি, ইকোসিস্টেম বলি, তাকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে? তা তো ঠিক না। এই যে পত্রিকায় দেখছিলাম, আইএমএফ বলছে, তোমাদের সাবসিডি কমাতে হবে। আর পার্টিকুলারলি যে সমস্ত ব্যাংকে তোমরা সরকারি লোকজন বসাচ্ছো, মানে ইনসেন্টিভ দিচ্ছো, টাকা ভর্তুকি দিচ্ছ, ওটা বন্ধ কর। মানে এভাবে রুগ্ন শিল্প পুনর্বাসন করা যায় না। তাই না? এটা কিন্তু ঠিক। মানে ইন্ডাস্ট্রিটা কিন্তু একসময় গভমেন্টের অনুদানে চলেনি। যে ইন্ডাস্ট্রি ছিল, তখন কিন্তু গভমেন্টের প্রণোদনা মিনিমাম ছিল। ছিল না বললেই চলে। গভমেন্ট কিছু ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারকে টাকা দিত। এখন বরঞ্চ ইন্ডাস্ট্রি নাই বলেই গভমেন্ট এখানে অনুদান দেয়ার চেষ্টা করছে। সেখানে হয়তো কিছু কিছু এসে উল্টোপাল্টা হচ্ছে। উল্টোপাল্টা না হওয়ার কোনো কারণ নেই। আপনি যখন টাকা বাড়াবেন সেখানে নানারকম কোটারি স্বার্থ তৈরি হবে, নানা রকম ভাবে পকেট তৈরি হবে। সেগুলো হবেই। কিন্তু আমি বলব, এটা গভমেন্ট এখন কন্টিনিউ করছে, আমি বেশি দিন কন্টিনিউ করার কোন মানে দেখি না। তাহলে রুগ্নশিল্প হবে। সেটা হওয়ার চান্স থাকবে। ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে হলে গভমেন্টকে পেছনে থেকে পলিসি সাপোর্ট দিতে হবে। যদি ধরুন মেন্ডেটরি করে, ঢাকা শহরে যত বিল্ডিং তৈরি হবে, তার টেন পার্সেন্ট ভবনে; যেগুলো মার্কেট কমপ্লেক্স, পার্টিকুলারলি আমি বলব সিটি কর্পোরেশনগুলো যে সমস্ত মার্কেট করছে; সেগুলোর মেন্ডেটরি করে দেয়া উচিত সিনেপ্লেক্স করতে হবে। আমি মিরপুরে থাকি। দশ নম্বরে একটা বিশাল সিটি কমপ্লেক্স করছে। সেখানে আমি জানি না সিনেপ্লেক্স আছে কি না। এই জায়গাগুলোতে গভমেন্টের নানারকম ইনসেনটিভ, পলিসি সাপোর্ট থাকতে হবে। যারা করতে চাচ্ছে তাদেরকে লোন দিচ্ছে, লোনের ট্যাক্স ব্রেক দিতে পারে, ওয়েভার দিতে পারে। এগুলোই কিন্তু দরকার। এরমধ্যে কেউ কেউ টাকা মেরে দিবে, এই বিষয়গুলো থাকবে। কিন্তু গভমেন্ট যে টাকা দিচ্ছে, সেটা যদি লং টাইম কন্টিনিউ করে; সেটা যদি অনুদান দেয়ার নামেও হয় তাতেও আপনি যেটা বললেন সেরকম হবে। কিন্তু তা না করে পেছনে থেকে পলিসি মেক করতে হবে - ইন্ডাস্ট্রি কি করে দাঁড়াবে? কারণ ইন্ডাস্ট্রি দাঁড়ালে নানারকম লোক আসবে, নানারকম ছবি তৈরি হবে। তখন কিন্তু আপনি যে কথাটা বললেন, সেটা হবে না। যার যার ফ্রিডম থেকে ছবি করতে পারবে। আমাদের এখানে ধরুন সেন্সরের যে প্রথা, সেটাও কিন্তু অনেক পুরনো। সেটাও কিন্তু আপডেট করা হয়নি। তো সেটা আপডেট করতে হবে নানা রকম ছবি করার জন্য। আমাদের মতো যারা ফিল্ম অ্যাক্টিভিস্ট বা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকিংয়ের সাথে ইনভলভড, তাদের একটা বড় দাবি ছিল, একটা ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটার করা হোক। সেটা অনেক দেশে আছে। আমাদের পাশের দেশ ভারতের কলকাতার নন্দনে - খুবই চমৎকার একটা ফিল্ম থিয়েটার। এটা কিন্তু এখনও হয়ে ওঠেনি (এখানে)। এই যে যারা অনুদানের ছবি দেখাবে, তাদের সিনেমা হলে যাওয়ার সুযোগ নেই। সে হয়তো ছবিটা ওখানে দেখাবে। ওটা গভমেন্টকে করে দিতে হবে। তাহলে ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকাররা তাদের ছবিগুলো ওখানে দেখাতে পারবে। বা যার সিনেমা হলে গিয়ে ছবি রিলিজ করার সামর্থ্য নেই, তারা সেখানে দেখাতে পারবে। সেখানে গভমেন্ট ইনসেনটিভ দিতে পারবে, ডিরেক্টলি ইনভলভড হতে পারবে। সেই কাজগুলো সব হচ্ছে না। সেটা কিছু কিছু করছে। করতে গিয়ে আপনি যেটা বললেন সেরকম কিছু কিছু জিনিস হচ্ছে। তখন কিন্তু কথা উঠছে। কিন্তু গভমেন্ট যদি পেছনে থাকে, পেছনে থেকে সাপোর্টটা দেয়, যে ইনসেনটিভ দেয়ার চেষ্টা করে… যেমন ধরুন এফডিসির মতো একটা প্রতিষ্ঠান। এফডিসিতো ইন্ড্রস্টি তৈরি করতে পারবে না। আপনি দেখুন, ইন্ডিয়াতে এফডিসির যে কাউন্টার - এনএফডিসি… আমি এবার মুম্বাই ফেস্টিভালে যাওয়ার কারণে এক লোকের সাথে পরিচয় হলো। তিনি একজন আমলা, এনএফডিসির যিনি এমডি। তার স্মার্টনেসের লেভেলটাই অন্যরকম। গোয়া ফিল্মবাজার যেটা সেটা কিন্তু এনএফডিসি অরগানাইজ করে। তারাও কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা কিছু লোকজনকে বাইরে থেকে নিয়ে এই ফিল্ম বাজারটা অর্গানাইজ করে। এবং করার মধ্য দিয়ে কি করছে - রিজিওনাল লেভেলে একটা অন্য মাত্রা তৈরি করে ফেলছে। আপনি বাইরে গিয়ে দেখুন, বহু জায়গায় আপনাকে রিকমেন্ড করবে যে, তোমার রিজিয়নের সবচেয়ে বড় ফিল্ম মার্কেট ওখানে। ওখানে তুমি যাও। এটা কী করে হলো? এটা বেশিদিন হয়নি, ১৫-১৬ বছর হয়েছে। এনএফডিসি কিন্তু আমাদের এফডিসির মত প্রতিষ্ঠান। কিন্তু তারা বাইরে থেকে কিছু লোক নিয়ে আসছে, তাদের সাথে কোলাবরেশন করছে। তারা হয়ত সরকারি আমলা না, কর্মচারী না। বেতনভুক্ত কনসালটেন্ট তারা, একটি পদে কখনো বসে না। মার্কেটটাকে এনাবল করতে তারা অ্যাডভাইজারের রোল প্লে করছে। তার ফলে কী হয়েছে? ইন্ডিয়ান ইন্ড্রাস্ট্রিটার একটা অন্যরকম আপস্কেল হয়ে গিয়েছে। আমাদের এখানে গভমেন্টের এখন এই ধরণের কাজগুলো করা উচিত। মানে ফিল্ম শুধু লোকাল ইন্ড্রাস্ট্রির জন্য নয়, এটা একটা গ্লোবাল ইন্ড্রাস্ট্রির অংশ। আমি নিজে দেখেছি, এনএফডিসির লোকজন বড় ফেস্টিভাল গুলোতে, মার্কেটগুলোতে কিভাবে গিয়ে আপনাকে পুশ করবে। আমার নিজেরই খেয়াল আছে, ১০-১২ বছর আগে, বার্লিন ফেস্টিভালে আমাকে টেনে নিয়ে চলে গেল। তারা ৭-৮ জন, একটা বুথ নিয়ে বসে আছে। শুধু বসেই নেই, লোকজনের সাথে হাই হ্যালো করছে, কথা বলছে, নেটওয়ার্কিং করছে। দ্যাট ইজ দেয়ার জব। তারাও কিন্তু কেউ কেউ সরকারি চাকরি করে। এবং দে আর নট দ্যা অনলি ওয়ানস। ওখানে ধরুণ, অনুরাগ কাশ্যপের একটি বুথ আছে তার কোম্পানির নামে, শাহরুখ খান একটি ছোট বুথ নিয়ে বসে আছে। আবার এনএফডিসির লোকও আছে। তারা তাদের মত কাজ করছে। তো, ওরা যদি পারে আমরা পারছি না কেন?

এনএফডিসির মত একটা প্রতিষ্ঠান কী করে ফিল্ম মার্কেটিং করবে, কোথায় কোন মার্কেটে যাবে, সেটা পলিসি মাইন্ডসেটের ব্যাপার। যারা উপরে থেকে কাজ করছে, পলিটিকাল লোকজনের একটা ডিসিশন নিতে হবে। প্লাস, সেখানে কিছু লোককে তারা ইনভলভড করবে বাইরে থেকে, যারা এই কাজগুলোতে তাদের হেল্প করবে। সেটা ঘটছে না। এবং আমার কাছে মনে হয়, আপনি যতই কথা বলেন না কেন, আমি বলব, পার্টিকুলারলি ফিল্ম এজ এন আর্টফর্ম বলি বা ইন্ড্রাস্ট্রি বলি, এটা সরকারের প্রায়োরিটির জায়গায় নেই। এই মন্ত্রণালয়ের যে বাজেট, সেটার ধরণ দেখলেই আপনি টের পাবেন। আপনি শুধু ফিল্ম বলেন কেন? সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তো একই অবস্থা। গতকাল শিল্পকলায় দেখছিলাম… গঙ্গা-যমুনা উৎসব একটা বড় নাটকের উৎসব। সেখানে ইন্ডিয়ান কমিটি এখন সাপোর্ট দেয় না। বাংলাদেশের কমিটি অনেক টাকা দিত। গতকাল শুনলাম ওটার ক্লোজিং প্রোগ্রামে গিয়ে, মাত্র ১৫ লাখ টাকা এবার এই ফেস্টিভালে দিয়েছে। যে ফেস্টিভালে ১১০টি দল কাজ করেছে। এবং ওখানে কুদ্দুস ভাই, জোটের সভাপতি, তিনি বললেন, আমরা পারফর্ম করার জন্য ৫০জনের মত আর্টিস্ট নিয়ে এসেছি। পাঁচশো টাকা করেও দিতে পারিনি একজন আর্টিস্টকে। বাইরে থেকে মিউজিশিয়ান, ভেবে দেখুন অবস্থা! এই শিল্পী কি দুস্থ শিল্পী? সংস্কৃতি কি দুস্থ? ফিল্মের অবস্থাও কি তার চেয়ে ভাল? কোন কোন মন্ত্রণালয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়, তারা খরচ করতে পারে না। কয় হাজার কোটি টাকা বাজেট এই তথ্য আর সংস্কৃতির জন্য?


ভয়েস অফ আমেরিকা: আপনার কি মনে হয় যে ফিল্ম তথ্য থেকে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ে নিয়ে আসলে পরিবর্তন আসবে?


তারেক আহমেদ: আমি খুব তফাৎ হবে বলে মনে করি না। একই জিনিস থাকবে। দুইটি কারণ, একটা হচ্ছে যারা কাজ করে, আমলা, তাদের ক্যাপাসিটি নেই। এবং তারা এই বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে নাগরিক সংগঠন, পার্টিকুলারলি সংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর সাপোর্ট নেয় না। তারা বাজেট তৈরির ক্ষেত্রে সাপোর্ট নেয় না। বাজেট তৈরি করে বলে তোমরা এই টাকাটা নাও। ৪ লাখ, ৫ লাখ, ১৫ লাখ টাকা ম্যাক্সিমাম। তো ন্যাশনাল ফিল্ম থিয়েটারও গভমেন্টের প্রকল্পের মধ্যেই নেই। এখানে আমাদেরও ফেইলিয়র আছে। আমরাও গিয়ে বলতে পারি। যেমন আমি একটা এক্সাম্পল দেই, বাজেট তৈরির আগে সমস্ত সেক্টরের লোকজন, বাণিজ্য, অর্থ, ইম্পরট্যান্ট মন্ত্রণালয় যেমন শিল্প, এদের সাথে বসছে। ফিল্মের লোকজন কিন্তু যায় না। আমি বলব যে তাদের এটা ধারণার মধ্যেও নেই। তারা যা পায় তাতেই সন্তুষ্ট।


ভয়েস অফ আমেরিকা: সম্প্রতি ঘোষনা দেয়া হয়েছে, হিন্দি সিনেমা বাংলাদেশের হল গুলোতে রিলিজ পাবে। এটাকে কিভাবে দেখছেন?


তারেক আহমেদ: আমি দুইটা জিনিস বলি, এপারেন্টলি মনে হবে আমি ন্যাশনালিস্টিক জায়গা থেকে বলছি। যেই অর্থে করা হচ্ছে আমি মনে করি এখনকার কন্টেক্সটে প্রয়োজন। অন্যভাবে সব ওপেন আরো ৩০ বছর আগে থেকে। আমি ইন্ডাস্ট্রিটাকে প্রটেক্ট করে রেখে কি করলাম। এর মূল জায়গা হচ্ছে সিনেমা হল। সেটা তো (আর) নাই। এখন একশরও নিচে সিনেমা হল চলে আসছে। সেটা যদি হিন্দি সিনেমা ইমপোর্ট করে বাঁচতে পারে, সেটা ভালো। যদি না বাঁচে, অন্য টোটকায় যেতে হবে। গ্লোবালাইজেশনের যুগে এটা বলে আর লাভ নাই। আমাদের শর্ট ফিল্ম ফেস্টিভালে ফিলিপিনের এক ভদ্রলোক এসেছিল ১১ বা ১২ সালে সেরা ফেস্টিভালের কেউ ডিরেক্টর। আমাকে বলেছিল, “তুমি কিসের এখানে হিন্দি নিয়ে সমস্যায় পড়ছো? আমাদের দেশে প্রতি বছর ১৫০ টি হলিউডের ছবি রিলিজ করে। তার মধ্যে আমরা ছবি করি না? ছবি রিলিজ করিনা?” ইউ নিড টু ফেস দোজ থিংস। ফাইট করেই বাঁচতে হবে। অন্য ইন্ডাস্ট্রিগুলো যদি বেঁচে থাকতে পারে, গার্মেন্টস নিয়ে কথা হচ্ছে না? মার্কেট ওপেন করে দিলে আমরা মরে যাব? আপনি যদি সেটা মজবুত করতে পারেন, অন্যান্য সেক্টর যদি বেঁচে থাকতে পারে, সারভাইভ করতে পারে, তারাও আরও বড় হতে পারে।


ভয়েস অফ আমেরিকা: অনেকে বলছে, ফেসবুকে/ইউটিউবে ছোট ছোট রিল, ছোট ছোট যে পাঁচ মিনিটের নাটকগুলো চলে, এটাই নাকি মেইনস্ট্রিম বাংলা সিনেমার দর্শকদেরকে অন্য দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আপনার কি অভিমত?


তারেক আহমেদ: বিষয়টা হচ্ছে, সিনেমা হলের এই সংকট কিন্তু গ্লোবাল সংকট। এই যে আমার একজন ফ্রেঞ্চ বন্ধু এসেছে (এবারের ফেস্টে)। ও কিন্তু খুবই ইনফ্লুয়েন্সিয়াল। ওইখানের ফিল্ম সেক্টরে ভালো যোগাযোগ তার এবং ফরাসি সরকারের সঙ্গে ও তার ভাল যোগাযোগ। সে আমাকে বলেছিল, (ফ্রান্সেও) সেম ক্রাইসিস চলছে। আমি গত বছর যখন মুম্বাইতে গেলাম, অলরেডি "পাঠান" কিন্তু তাদেরকে বাঁচিয়ে দিয়েছে। কিন্তু একটা ছবি দিয়ে বাঁচবে না। মুম্বাইয়ের মত শহরে সিনেমা হল বন্ধ হয়ে যাচ্ছে তো। হলিউড? তারা ব্যবসাটা (শুধু) সিনেমা হল দিয়ে না, অন্যভাবে করছে - নানাভাবে করছে। ইউরোপ-আমেরিকাতে নেটফ্লিক্স একটা বড় সংকট। থিয়েট্রিকাল রিলিজ থেকে ওগুলো বেশি হচ্ছে। ফিল্মমেকাররা ঐদিকে যেতে চাচ্ছে না। স্টুডিওর লোকজন প্রডিউসাররা এই দিকে টেনে আনতে চায়। তাদের ক্রাইসিস আমাদের থেকে আরো বড়। সিনেমা হল কম - সেটা একটা গ্লোবাল সংকট। সোশ্যাল মিডিয়া এত স্ট্রং হয়ে গেছে। আমাদের এখানে যদি বলি নেটফ্লিক্স, হইচই - আমাদের এখানেও লোকালে ওটিটি দাঁড়িয়েছে। এগুলা তো চেঞ্জ। তো সেই চেঞ্জগুলোর সাথে কোপ আপ করতে হবে। নতুন চ্যালেঞ্জ নিতে হবে। ফেসবুক একটা গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ না? ইউটিউব একটা গ্লোবাল চ্যালেঞ্জ না? টিকটক নিয়ে একটা যুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে না? আমেরিকানরা ইউরোপিয়ানরা টিকটক ব্যান করবে কিনা সে চিন্তা করছে না? এই যে চেঞ্জটা হচ্ছে, সেটাতে তো সিনেমা হল একা ভুগছে না। একটা বিশাল রকম রেভুল্যুশন হচ্ছে। সেটার সাথে কোপ আপ কিভাবে করা যায়, সেটা (ঠিক) করা যাচ্ছে না। মাইন্ড সেট করা যাচ্ছে না। খালি আপনি মনে করছেন হিন্দি ছবি ইমপোর্ট করে আপনার সব সমাধান হয়ে যাবে। সেটা তো একটা বড় ব্যাপার। সেটা নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী ভাবনা না হলে, কোন লাভ নাই।


ভয়েস অফ আমেরিকা: একটা সাস্টেইনেবল ইন্ড্রাস্ট্রি দাঁড়া হতে হলে কী দরকার?


তারেক আহমেদ: ডকুমেন্টারি না, যদি ফিল্মেরই কথা বলি, এখানে ওইরকম কোন ইন্ডাস্ট্রি আসলে নেই। এখানে যেটা ইন্ডাস্ট্রি, সেটা মূলত এডভারটাইজিং ফিল্ম। এটাই হচ্ছে ইন্ডাস্ট্রি। জানিনা আসলে সত্য কতখানি, আমি শুনেছি হাজার কোটি টাকার ইন্ডাস্ট্রি না কি ওটা, অনেকেই বলে। এখন অনেকেই ওয়েব সিরিজ করছে। হয়তো চাহিদা আছে বলে করছে। রুটি রুজি করতে পারছে বলেই করছে। সবাই তো আর ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়াবে না। ফিল্মের ক্ষেত্রে - মেইনস্ট্রিম যদি দাঁড়ায়, তাহলে কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমা দাঁড়াবে। এটা হল এক নাম্বার। ডকুমেন্টারি সেক্টরটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট সিনেমার মধ্যেই বিলং করে। একটা এক্সাম্পল দেই। ইউকে বেজড একটা ফাউন্ডেশন আছে - উইকারস ওয়ার্ল্ড ফাউন্ডেশন। ওরা আমাদের ডকল্যাবেও জয়েন করে। ওরা প্রতিবছর একটা গ্লোবাল সার্ভে করে, সিচুয়েশন অব গ্লোবাল ডকুমেন্টারি ইন্ডাস্ট্রি বা ফিল্মমেকারস। মাসখানেক আগে ওটার রিপোর্টটা দেখছিলাম। সার্ভের কাজ শুরু করে এক বছর আগে থেকে। এটা শেফিল্ড অফিসের সাথে ওদের একটা কলারোবেশন। ওরা জুন মাসে লোকজনকে সার্কুলেট করে। তারপর আস্তে আস্তে সার্ভে করে। এটা মূলত আমাদের এদিকের ডাটা খুব একটা নেয় না। আমাদের এদিকে কেবল ইন্ডিয়ার ডাটা ওরা নেয়। আর এশিয়াতে জাপান, কোরিয়া, চায়না, এসব দেশে ডাটা নেয়; ইউরোপ, নর্থ আমেরিকায় ডাটা নেয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারদের আয় রোজগার কমে যাচ্ছে গ্লোবালি। এটা রিসেন্ট সিনারিও। তাদের এক্সিস্ট করার পথটা আরো কঠিন হয়ে যাচ্ছে। এটা প্রথম শঙ্কার কথা। সুতরাং আপনি বুঝতে পারছেন যে গ্লোবালি যারা এই জনরা নিয়ে কাজ করে। তারা আসলে আরো বেশি এনডেঞ্জারড। শুধু ডকুমেন্টারি বানিয়ে কেউ টিকে থাকতে পারবে না। আমাদের এখানকার কনটেক্সটে যদি আসি, আমাদের এখানে ডকুমেন্টারি ইন্ডাস্ট্রি কখনোই ছিল না। ফিচার ফিল্ম, ফিকশন ফিল্ম হতে পারে। ওইযে যেটা আমি বললাম, এটা এক ধরনের এলটিজমের চর্চা ছিল। কিছু লোক কাজ করতো। মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক কিছু কাজ তারা করেছে। এটা পুরনো, অনেক আগে থেকেই হয়ে আসছে। আরেকটা চর্চা ছিল সেটা অনেক কাল আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। সরকারের ছবি বানানো। ডিএফপি একসময় প্রজেক্ট করতো। এর বাইরেও কেউ কেউ করত। আমি যেখান থেকে উঠে এসেছি, আমি এনজিও ফিল্ম মেকার বলি নিজেকে। এনজিওদের একটা বড় ডমিনেন্স ছিল ৮০-৯০ দশক সময়টায়। গত আট-দশ বছরে এটার প্রভাব অনেকটাই কমে গেছে। তার মানে রুটি রুজির সুযোগ এখান থেকেই অনেকটা হয়ে যেত। এখন এই সংখ্যাটা খুবই কম আমাদের এখানে। ইন্ডাস্ট্রির কথাটা বললে বুঝতে পারবেন। সেটা শুধু ডকুমেন্টারির ক্ষেত্রে না, ফিকশন ছবি যারা করেন, তারাও - যেটাকে ইংরেজিতে বলে, ‘লিভিং অন দ্যা প্রজেক্ট’। ধরুণ, একটা ছবি শুরু করল কোথাও থেকে একটা গ্র্যান্ট নিয়ে। সেটার হয়তো কোন কন্ডিশন নেই। সেটা দিয়ে ছবিটার একটা ভার্সন করল বা করল না। হয়তো কিছু কাজ করে বাকি টাকা-পয়সা নিজের খরচে লাগালো। এরপর একটা মার্কেটে গেল। ওইখানে গিয়ে হয়তো আরেকটা (গ্র্যান্ট) ম্যানেজ করল। এরকম একটা প্রজেক্ট পাঁচ বছর চালাতে থাকে। ওই প্রজেক্ট টেনে টেনে বড় করলে নিজের ফিনান্সিসিয়াল লাভ আছে। কিন্তু আল্টিমেটলি যদি ছবিটা না হয়, তাহলে কিন্তু কোন লাভ নেই। এটা অনেকেই করে। এটা বাইরের দুনিয়ায়ও অনেকে করে। ইন্ডিয়ানরা এক্ষেত্রে অনেক স্মার্ট। তারাও করে। আমাদের এখানে (ডকুমেন্টারিতে) এরকম একজন দুজন আছে। দে আর লিভিং দ্যাট কাইন্ড অফ ওয়ে। ফিকশন ছবির ক্ষেত্রেও এরকম অনেকেই করে। আমরা অনেককেই পুশ করার চেষ্টা করছি নানাভাবে। কিন্তু সেটার জন্য সময় লাগবে। এটা একটা ইকোসিস্টেম। তো সেই ইকোসিস্টেমের মধ্যে প্রথম জিনিসটা হচ্ছে, যদি মেইন স্ট্রিমটা না দাঁড়ায়, তাহলে কিন্তু এই ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেক্টরটা দাঁড়াবে না। বেসিক্যালি, ইন্ডিপেন্ডেন্ট সেক্টরটা নানাভাবে সাবসিডি পায়। সে সাবসিডি গুলো সরকার দেয় অনুদানের নামে। সেই সাবসিডি প্রাইভেট সেক্টরও কখনো কখনো দিতে পারে, জাদুঘরের মত প্রতিষ্ঠান বা এরকম আরো কিছু কিছু ফাউন্ডেশন। মেইনস্ট্রিমটা দাঁড়ালেই কিন্তু তার বাইপ্রোডাক্ট হিসেবে কিছু কিছু সাবসিডি তৈরি হবে। তখন কিন্তু ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি করার জন্য লোকজন দিবে। আমি অন্যভাবে উদাহরণ দেই, আমাদের এখানে একসময় মেইনস্ট্রিমটা অনেক স্ট্রং ছিল। একেএম জাহাঙ্গীর খান - তিনি একসময় প্রচুর পপুলার ছবি করেছেন। তিনি আলমগীর কবিরের ছবিরও কিন্তু প্রডিউসার। তার মানে আপনি বুঝতেই পারছেন - তার একটা টেস্ট ছিল। তিনি একসময় খুব পপুলার ছবি করেছেন। এর মধ্যে দেবদাসের একটা ভার্সনও তিনি করেছিলেন। আরেকজন ছিলেন স্টার সিনেমা হলের মালিক ইস্তেখারুল আলম। ভদ্রলোক মারা গিয়েছেন। খুবই প্রমিনেন্ট ফিল্ম প্রডিউসার। তখন মেইনস্ট্রিম সিনেমাটা স্ট্রং ছিল। তাদের কখনো কখনো মনে হয়েছে, যে ঠিক আছে তাকে একটু টাকা দেই, তিনি যদি একটু অন্যরকম একটা ছবি করেন। সেই সুযোগটা ছিল, এই লোকগুলো ছিলেন কারণ টা হচ্ছে মূল ধরার ছবিটা খুব পপুলার ছিল, টাকা আসছিল। সেখান থেকে বাই প্রোডাক্ট সামান্য কিছু টাকা তারা এদিক সেদিক দিতে পারতেন। এখন তো মূল ধরার ছবিটাই স্ট্রং না। মূল ধরার ছবিই নেই। আমাদের এখানে বহুদিন পর এসে আপনি ‘হাওয়া’র কথা শুনলেন। আমরা তো বছরে এরকম পাঁচটা ছবিও পাই না। আমাদের এখানে ১০০ সিনেমা হল নাই। তাই না? বছরে পাঁচটা এমন ছবি সিনেমা হলে যায় না যেগুলো ১-২ কোটি টাকা আর্ন করবে। তার মানে রিটার্নটা নাই। তো মেইনস্ট্রিমে সেই রিটার্নটা না থাকলে, ব্যবসা না হলে, এই বাই প্রোডাক্ট যেগুলো তৈরি হচ্ছে, তার সাপোর্ট শুধু গভমেন্ট দিয়ে পারবে না। মানে এটা টোটাল ইকো সিস্টেমের অংশ। ওই মূলধারাটা শক্তিশালী হলে অন্যরা হবে। ইন্ডিয়া হচ্ছে তার সবচাইতে বড় উদাহরণ। বলিউড ইজ সো স্ট্রং। এখন বলিউড অন্যভাবে ডাইভার্ট করছে, সাউথ ইন্ডিয়ান সিনেমা পপুলার হয়ে গেছে। তার বাই প্রোডাক্ট হিসেবে ডকুমেন্টারি মুভমেন্ট আস্তে আস্তে ইন্ডিয়াতে নানা জায়গায় ছড়িয়ে গেছে। সেখানে শুধু সরকার না, বরঞ্চ সরকার এখন টাকা কমিয়ে দিয়েছে, প্রাইভেট সেক্টরও এগিয়ে আসছে। ইন্ডিয়ান ছবি এখন বড় বড় ডকুমেন্টারি ফেস্টিভালে যাচ্ছে, পুরস্কার পাচ্ছে। শর্ট লিস্টেড হচ্ছে অস্কারের জন্য। আরেকটা হচ্ছে, যেহেতু মেইনস্ট্রিম নানারকম সাহায্য পাচ্ছে, তখন সরকারও কিন্তু ইন্টারেস্টেড হচ্ছে। তাদের আগ্রহ বাড়ছে। দ্যাট ইজ দ্যা কেস। শুধু ডকুমেন্টারি কনটেক্সটে না, রিজিওনাল সিনেমার কনটেক্সটেও। রিজিওনাল সিনেমা ইন্ডিয়াতে খুবই স্ট্রং। সেটার কারণটা হচ্ছে মেইনস্ট্রিম স্ট্রং বলে কমপিট করার জন্য, কখনো কখনো গভমেন্ট ইনসেনটিভ নিয়ে, রিজিওনাল গভমেন্টগুলো ইনসেনটিভ নিয়ে এটাকে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। আমি মনে করি, যদি মেইনস্ট্রিমটা আমাদের এখানে দাঁড়ায় আস্তে আস্তে, সেই একই সিস্টেমের অংশ হিসেবে ডকুমেন্টারি চর্চাটা বাড়বে। সেই জায়গাটা আমরা পুশ করার চেষ্টা করছি, যেটাকে বলে এনেবলিং এনভায়রনমেন্ট। মিউজিয়াম কাজ করছে, ডকল্যাব কাজ করছে, আরো কেউ কেউ হয়তো আসবে। একটু সময় লাগবে আমার ধারণা। প্লাস পাশাপাশি ফিল্মমেকারদেরও নার্চার করতে হবে। সে কাজটা আমরা কন্টিনিউয়াস করে যাচ্ছি। এবং শুধু ঢাকায় কিছু লোকের মধ্যে চর্চাটা করা না, আমরা এখন বাইরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। আমরা চট্টগ্রামে ‘১৯ সালে একটা ওয়ার্কশপ করলাম। তার অলরেডি ফলাফল কিছু এসেছে। কিছু ফিল্ম মেকার অলরেডি তৈরি হয়ে গেছে। তানিম ইউসুফ, রফিকুল আলম রাসেল - সে অলরেডি ছবি করছে। এটার কনটেক্সটে আরেকটা কথা বলি, শুধু ঢাকায় বসে তো আপনি সব সুবিধা পাবেন না। বাইরে অনেক লোকজন আছে। এবং বাইরে গেলে আপনি একদম লোকালাইজড কনটেন্ট পাবেন - যেটা ঢাকায় পাবেন না আপনি। তো ওই চিন্তা থেকে এটা করা।


ভয়েস অফ আমেরিকা: মুক্তিযুদ্ধ যাদুঘরের পাশাপাশি আপনি ঢাকা ডকল্যাবের সাথেও জড়িত। ডকল্যাব প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য কী ছিল?


তারেক আহমেদ: আমরা ডকল্যাব শুরু করি ২০১৭ সালে। আমি নিজে ফিল্ম করা, অ্যাক্টিভিজম এগুলোর সাথে এরও প্রায় বিশ-বাইশ বছর আগে থেকে জড়িত। সব মিলিয়ে প্রায় ত্রিশ বছরের বেশি সময় ধরে এই ফিল্ম আর অ্যাক্টিভিজমের সাথে যুক্ত। সাংগঠনিক ভাবেও আমি অনেক কিছুর সাথে আছি। পার্টিকুলারলি বাংলাদেশের পুরোনো একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকারদের অর্গানাইজেশন ‘শর্টফিল্ম ফোরাম’, যেটায় আমি ৮৮ সালে জড়িত হই। আমরা এখানে যেটা দেখি, ডকুমেন্টারির চর্চাটা অনেককাল ধরেই হয়, কিন্তু সেটা একটা লিমিটেড স্কেলে আছে। আর শুনলে হয়ত খারাপ মনে হবে, আমি বলব এটা একধরণের এলিটিস্ট চর্চাও আসলে তৈরি করেছে। কিছু লোক প্রামাণ্য চিত্র বানায়, যেগুলোর লিমিটেড স্ক্রিনিং হয়। কোন ছবি আবার কিছু কিছু ফেস্টিভালেও যায়। একসময় এখানে ‘ডকুমেন্টারি বাংলাদেশ’ নামে একটা ফেস্টিভাল হত, যেটা বাংলাদেশের ডকুমেন্টারি কাউন্সিল আয়োজন করত। সেই ফেস্টিভালটাও এখন নেই। আমরা কিছু কিছু সহমনা বন্ধুবান্ধব মিলে ১৭ সালেরও আগে থেকে দেখছিলাম যে আসলে… আমি আলাদা করে ডকুমেন্টারি বলব না। প্রামাণ্য চিত্র এবং ফিকশন ছবি যারা বানায়, তার একটা বৈশ্বিক চাহিদা আছে। পার্টিকুলারলি আমি তারেক মাসুদের কথা বলব, এর আগে মোরশেদুল ইসলামের ছবিও কিছু কিছু হয়েছে। এবং আমাদের কনটেম্পোরারির মধ্যে মোস্তফা সরয়ার ফারুকী, সে প্রথম থেকেই তার ছবি বৈশ্বিক মার্কেটে নেয়ার জন্য একটা চেষ্টা করছে। প্রামাণ্য চিত্রের ক্ষেত্রে এটা খুব ব্যতিক্রম। আমি একমাত্র কামার আহমেদ সাইমনের কথা বলতে চাই। তিনি একমাত্র লোক যে এটার কো-প্রোডাকশন করেছেন। তার ছবি বড় ফেস্টিভাল ইডফাতে প্রিমিয়ার হয়েছে। এর বাইরে আর কোন উদাহরণ নেই। তো একটা কো-ইন্সিডেন্স ঘটে। আমাদের এক পুরনো বন্ধু যে কলকাতার, নীলোৎপল মজুমদার। তিনি মূলত শিক্ষকতা করেন। বিভিন্ন টেলিভিশনে একসময় শিক্ষকতা করতেন, ডিনও ছিলেন। এরপর[ পড়ান] মনিপুর প্রিলিমেন্টারি টেলিভিশন স্কুলে। আমার সঙ্গে তার যোগাযোগটা ২০১৫ তে। তিনি একটা কাজ করে থাকেন, এটাকেও এশিয়ান ফোরাম ফর ডকুমেন্টারি ফিল্মমেকারই বলেন তারা। ভারতে একমাত্র প্রামাণ্য চিত্র মার্কেট, পিচিং হয় এবং কর্মশালাও করেন। সেটা তারা প্রায় ১৯ বছর ধরে করে আসছেন। আমি তার সাথে ডকেজে যাই ২০১৫ সালে। সেখানে গিয়ে আমার চোখ খুলে দেয়ার মত একটা অনুভূতি হয়। এর আগে আমি ২০১৩ তে যাই বার্লিনে। আমি গিয়েছিলাম সেখানে ডয়েচভেলের একটা কর্মশালায়। অলমোস্ট সেভেন উইকস ধরে ফেস্টিভাল ম্যানেজারদের একটা ওয়ার্কশপ। ওখানে আমি বার্লিন ফেস্টিভালে যোগ দেই, ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের প্রোগ্রামগুলোতে যাই। এই ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের প্রোগ্রামগুলোতে গিয়ে মনে হল একদম ভিন্ন একটি মাত্রা। কারণ হচ্ছে বার্লিন ট্যালেন্ট ক্যাম্পাসের কার্যক্রম ২০ বছরের মত হয়ে গিয়েছে। ওইটা ফেস্টিভালেরই অংশ। ফেস্টিভালের লোকজন বলে, আমাদের যারা অ্যালামনাই তারাই এখন গোটা দুনিয়ার ছবির জগত ডমিনেট করে বেড়াচ্ছে। এই দুটি বিষয় কো-ইন্সিডেন্ট আমার জন্য। আরেকটা ঘটনা ঘটে, নীলোৎপল মজুমদার, যিনি ডকেজের মূল লোক, ‘১৬ সালে ঢাকায় এসেছিলেন। আসার পরে তিনি খুব অভিভূত হন। আমরা একটা ফেস্টিভাল করি। প্রায় ৭-৮ দিন ছিলেন। আমাদের সাথে আলাপ করেন, যে দেখো তোমরা এখানে কোন একটা জিনিস করতে পারো কিনা। তিনি বললেন, তফাৎটা হচ্ছে আমি কলকাতায় থেকে করি। পশ্চিমবঙ্গ ভারতের একটা কোণায় পড়ে আছে। কিন্তু তোমরা একদম রাজধানীতে আছো। সেখানে তোমরা যদি কর, একটা অন্যরকম বিষয় হবে। এইসব মিলিয়ে কিন্তু আমার মাথার মধ্যে আসে যে, এটা খুব ইন্টারেস্টিং সংযোগ হতে পারে। তারপরে আমাদের যারা সহমনা বন্ধু-বান্ধব ছিল কয়েকজন; ইমরান হোসেন কিরমানি, আমাদের চেয়ারম্যান নাসির উদ্দিন ইউসুফ সেই শুরুর প্রক্রিয়ার মধ্যে ছিলেন। আমাদের আরেকজন বন্ধু তিনি অনেকদিন ধরে বাইরে, সামিয়া জামান, তিনি একাত্তর টিভির সিইও ছিলেন। আমরা সবাই মিলেই শুরুর দিকে আলাপটা করি, এরকম একটা জিনিস কিভাবে করা যায়। এখানে সামিয়া জামান এর একটা বড় ক্রেডিট আছে। তিনি কানে বেশ কয়েক বছর ধরে যান। বিশেষ করে মারচে দ্যু ফিল্ম মার্কেট, যেটা বিশ্বের সবচাইতে বড় ফিল্ম মার্কেট। এবং সেই এক্সপেরিয়েন্সটাও কিন্তু তিনি আস্তে আস্তে ঢাকায় নিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে ঢাকা ফিল্ম ফেস্টিভালের সময় তিনি কিছু প্রোগ্রাম করেন, ওখানকার কিছু মার্কেট রিলেটেড লোকজন নিয়ে। এর মধ্যে একটা প্রতিষ্ঠানের কথা বলতে পারি, এমার্জিং ফিল্ম ট্যালেন্ট অ্যাসোসিয়েশন। তারা আমাদের সাথে ডকল্যাব শুরু করার সময় পার্টনার হয়ে যায়। তারা প্রতিবছর এখান থেকে দুইটি প্রজেক্ট নিয়ে যায়। এই বছর তারা একটু পলিসি শিফট করেছে। আমাদের একটা প্রজেক্টকে তারা ফান্ড দিচ্ছে দুই হাজার ইউরো, পুরষ্কার হিসেবে। এই সব মিলিয়েই আমাদের ডকল্যাব করার একটা অনুপ্রেরণা তৈরি হয়। যার ফলশ্রুতিতে আমরা ২০১৭ থেকে ডকল্যাব শুরু করি।


ভয়েস অফ আমেরিকা: ডকল্যাব কি গভর্নমেন্টের পলিসি লেভেল ইনফ্লুয়েন্স করার জন্য কিছু করছে?


তারেক আহমেদ: এখনো পর্যন্ত সেই জায়গায় ভাবিনি। কারণটা হচ্ছে, আমরা ছোট্ট একটা সংগঠন। এখন করতে গেলে হয়তো নিজেদের কাজকর্মের হ্যাম্পার হতে পারে। হ্যাঁ, আমরা হয়তো সেমিনার করে, আমাদের ওপেনিং প্রোগ্রাম, ক্লোজিং প্রোগ্রাম, স্পেশাল সেশন সেগুলোতে নানা রকম কথাবার্তা বলি। গভমেন্টের লোকজনদেরকে আমরা ডাকি, কথাবার্তা হয়। সামনেও হয়তো ডাকবো, কথাবার্তা হবে। কিন্তু সেটা পরে কতখানি ফলোআপ অনেক সময় থাকে না। তবে আপনি যেটা বললেন আমরা কিছু কিছু জায়গায় ভাবছি। তবে সেটা এখন না। সামনে হয়তো বা পুশ করব বিভিন্ন জায়গায়।


ভয়েস অফ আমেরিকা: এখন মেইনস্ট্রিম ফিল্মমেকার যারা আছে বা ফিকশন যারা বানায়, এদের অনেকেই কিন্তু দেশের ইন্ড্রাস্ট্রিতে কাজ করতে চায় না। বাইরেই কাজ করতে চায়। এটা কেন হচ্ছে?


তারেক আহমেদ: সিনেমার একটি বড় মার্কেট যেহেতু বাইরে, সেটা একটা কারণ। আরেকটা কারণ হচ্ছে, গভমেন্টের বাইরে তো সিনেমাতে টাকা দেয়ার মত লোক নেই। কাজেই সেদিকে তাদের তো একটা ইচ্ছা থাকবে। আর অবশ্যই সিনেমা ইজ এ গ্লোবাল মিডিয়াম। সিনেমার জন্ম থেকে এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল মিডিয়াম। কাজেই বাইরে যেতেই হবে আপনাকে। আপনি যদি বলেন শুধু দেশে দেশীয় অডিয়েন্সদের জন্য ছবি বানাই, এটাকে আমি বলব এক ধরনের ভন্ডামি। সেটা করে কোন লাভ নেই। বড় পেইন্টার-আর্টিস্টদের এখানে তাও একটা মার্কেট আছে। তারা হয়তো কেনাবেচাটা চুপিচুপি করে। আওয়াজটা হয় না আর কি। কারণ যিনি কিনছেন, তিনি তো আপনাকে আওয়াজ দিয়ে কিনবেন না। কেউ হয়তোবা ব্ল্যাক মানি হোয়াইট করার জন্য একটা ছবি কিনে ফেললেন। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোতে তার সিএসআর করতে হবে, সেজন্য। এটা ফিল্মের মত মাস অডিয়েন্স রিলেটেড না - যে কারণে আমরা জানি না। কিন্তু, আমি ইন্ডিভিজ্যুয়ালি জানি, আমার যাদের সাথে যোগাযোগ আছে। হ্যাঁ, সেটার একটা বাজে দিক আছে। সেটা খুব বেশি ঢাকা কেন্দ্রিক। যারা কনসিয়্যার, তারা ঢাকারই। বাইরে আবার অন্যভাবে করে। সেটা হচ্ছে গ্যালারি নিয়ে যায়, আর্ট ক্যাম্প করে। ফিল্মের ক্ষেত্রে আমার ধারণা, এটা এখন যেহেতু একটু একটু করে বাড়ছে। আমি পজেটিভ মনে করি যে, হয়তো ইন্ডিয়ার মতো এত না, কিন্তু তারপরেও আমাদের ফিল্মমেকারদের বাইরে যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সেটা আমি খুব পজিটিভ মনে করি। বাড়বে। সেটা ফিকশনে একরকম, ডকুমেন্টারিতে একরকম। আমরা ডকুমেন্টারিতে আমাদের মতো করে চেষ্টা করছি পুশ করার জন্য।


ভয়েস অফ আমেরিকা: হাওয়া হয়েছে, পরাণ হয়েছে। অনেকে বলছে, সিনেমা ইন্ড্রাস্ট্রিতেও একটা জোয়ার আসছে। কয়েকটা মুভি আসছে, মানুষজন দেখছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?

তারেক আহমেদ: আমি তো অবশ্যই পজেটিভ মনে করি। আপনি যদি শুধু ডকুমেন্টারির কথাও বলেন, আমরা পাঁচ বছর কাজ করেই দেখছি যে, আমাদের ফিল্মমেকাররা আস্তে আস্তে বড় হচ্ছে। ইডফার মত, অ্যামস্টারডামের মত বড় বড় ফেস্টিভালে আমাদের ছবি যাচ্ছে। আমাদের ফিল্মমেকাররা বাইরে গিয়ে ছবি প্রিমিয়ার করছে। আমাদের ফিল্মমেকাররা বাইরে থেকে গ্র্যান্ট পাচ্ছে। আমাদের এক অ্যালামনাই সানড্যান্স ইন্সটিটিউট থেকে ২৫ হাজার ডলার গ্র্যান্ট পেয়েছে। এই সাকসেসগুলো কিন্তু আগে ছিল না। মাঝখানে দুই বছর করোনা ছিল। না হলে আরেকটু স্পিড আপ হত। এনএইচকে-এর সাথে আমাদের একটি আন অফিশিয়াল কোলাবরেশন শুরু হয়েছিল। সেটা করোনা এসে বন্ধ করে দিয়েছে। আমাদের দুই তিনটি ছবি সেখানে ব্রডকাস্টও হয়েছিল। এগুলো আস্তে আস্তে বাড়বে। একটু একটু হাঁটি হাঁটি পা করে আগাচ্ছে। লোকালিও আমরা চেষ্টা করছি। ডকল্যাব এখন শিল্পকলার সাথে কিছু কাজ করার চেষ্টা করছে। সামনে এটা হয়তো আরো রেগুলার হবে। আমরা আমাদের চেষ্টাটা করব। পলিসি লেভেলেও পুশ করার চেষ্টা করা। সেটাও টুডে অর টুমরো হয়তো আমাদেরকে করতে হবে। দেখি কী দাঁড়ায়! ওভারঅল এনভায়রনমেন্ট - ইকোসিস্টেমটা চেঞ্জ করতে একটু সময় লাগবে। আমি যেটা দেখতে চাই, ১০ বছর পরে অন্তত বাংলাদেশ থেকে ১০ জন ফিল্মমেকার ইন্টারন্যাশনালি কো-প্রোডাকশন বা কোলাবোরেশন করছে। মিনিমাম। তাদের ছবি আন্তর্জাতিক সার্কিটে চলাফেরা করছে। ছবি দেখানো হচ্ছে বড় ফেস্টিভালে, কোন টেলিভিশন চ্যানেল দেখাচ্ছে, কোন ওটিটি প্ল্যাটফর্ম দেখাচ্ছে। আমাদের এখানে বাইরের লোকজন এসে ছবি কো-প্রোডিউস করতে ইন্টারেস্ট পাচ্ছে। মিনিমাম আমি এই জায়গাটা দেখতে চাই। বড় র‍্যাডিক্যাল কোন চেঞ্জ হয়ে যাবে বলে আমি মনে করছি না। ওটার জন্য অনেক সময় লাগে। অন্তত ওইটুকু দেখতে চাই।

XS
SM
MD
LG