অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ভারতের মণিপুর রাজ্য প্রবল অশান্ত হয়ে ওঠার কারণ বিশ্লেষণ: মেইতেই জনজাতি বনাম অন্যান্য উপজাতি


মণিপুর
মণিপুর

“আমার রাজ্য মণিপুর জ্বলছে! পরিস্থিতি খুব খারাপ। দয়া করে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিন…”, কাতর আবেদন রেখেছেন মণিপুর তথা ভারতের গর্ব, বক্সিং তারকা মেরি কম। উত্তপ্ত হয়ে রয়েছে গোটা রাজ্য, দফায় দফায় সংঘর্ষ চলছে, আগুন জ্বলছে, মোকাবিলায় রাস্তায় নেমেছে সেনা এবং আধাসেনা। কিন্তু তার পরেও সামলাতে বেগ পেতে হচ্ছে বিজেপি সরকারকে। শেষমেশ বৃহস্পতিবার ৪ মে রাজ্য প্রশাসন হুমকি দিয়ে জানিয়েছে, চরম পরিস্থিতিতে দেখা মাত্রই গুলি করা হবে।

মণিপুরে রাজনৈতিক বা জাতিগত উত্তেজনা নতুন নয়। তবে সাম্প্রতিক এই উত্তেজনাকে জানতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে কয়েকটা বছর, খানিকটা মণিপুরের ভূগোলেও চোখ বোলাতে হবে।

ভারতের উত্তর-পূর্বের অন্যতম বৈচিত্র্যময় পাহাড়ি রাজ্য মণিপুর। এর ঠিক মাঝখানে রয়েছে প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে এক উপবৃত্তাকার উপত্যকা, তাকে ঘিরে রয়েছে সুউচ্চ হরিৎ পাহাড়। এই উপবৃত্তাকার উপত্যকা আয়তনের দিক থেকে মোট রাজ্যের ১০%। কিন্তু জনসংখ্যার প্রায় ৬০% বসবাস করেন এখানে। যার বেশিরভাগই মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেই জনজাতি।

মণিপুর প্রায় ৩৪-টি ছোট বড় নানা জনগোষ্ঠীর বাসভূমি। মেইতেইরা তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড়, মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৩%। তাঁদের অধিকাংশই এই উপত্যকা অঞ্চলে থাকেন। বাকি রাজ্যের ৯০% পাহাড়-জঙ্গলে ঘেরা বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বাকি জনগোষ্ঠীর বসবাস।

মণিপুর
মণিপুর

মণিপুরে মোট ১৬-টি জেলা রয়েছে। যার মধ্যে ৬-টি আয়তনে ছোট জেলা রয়েছে কেন্দ্রীয় উপত্যকা অঞ্চলে। বাকি বড় বড় জেলাগুলি বৃত্তাকারে সজ্জিত। তাতে বসবাসকারী ৩৪টি জনগোষ্ঠীদের ‘নাগা’ অথবা ‘কুকি’— এই দুই ‘চিহ্নিত উপজাতি’-তে বিভক্ত করা হয়েছে। এই চিহ্নিত বা স্বীকৃত উপজাতিরা অত্যন্ত পরিশ্রমী, স্বাধীনচেতা এবং ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার ফলশ্রুতিতে ধর্মে অধিকাংশই খ্রিস্টধর্মাবলম্বী।

এবারের সমস্যার শিকড়ে রয়েছে মেইতেই জনজাতির সঙ্গে কুকি-সহ বিভিন্ন স্বীকৃত উপজাতিদের এক আইনি লড়াই। অকুস্থল— একেবারে মণিপুর হাইকোর্ট।

প্রায় এক দশক ধরে নানাভাবে মণিপুরের সংখ্যাগরিষ্ঠ মেইতেইরা আইনিভাবে তফশিলি উপজাতি বা ‘শিডিউলড ট্রাইব’ (এসটি) তালিকাভুক্ত হওয়ার জন্য দাবি জানিয়ে আসছিল। তাঁদের বক্তব্য, স্বাধীনতার আগে স্বাধীন মণিপুর রাজ্যে তাঁদের ‘উপজাতি’ হিসেবেই স্বীকৃতি ছিল। স্বাধীনতা ও তারপর ভারতীয় যুক্তরাষ্ট্রে মণিপুরের অন্তর্ভুক্তির পর তাঁদের এই তকমা চলে যায়। ফলে জমি থেকে ঐতিহ্য, ভাষা, পোশাক সবেতেই স্বকীয়তা বজায় রাখার যে সুবিধেগুলি তফসিলি উপজাতিরা পেয়ে থাকেন, তাঁরা তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

এই মর্মে তাঁরা আবেদন রেখেছিলেন মণিপুর হাইকোর্টে। হাইকোর্ট সব আবেদন শুনে রাজ্য সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে, চার সপ্তাহের মধ্যে আবেদনকারীদের দাবিদাওয়া যথাযোগ্য গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে রাজ্যের অবস্থান জানাতে।

মণিপুর
মণিপুর

কিন্তু এতেই বেজায় চটেছেন মণিপুরের বাকি উপজাতিরা। তাঁদের বক্তব্য, এতে অন্যায়ভাবে সুবিধে পেয়ে যাবেন মেইতেইরা এবং তাতে আখেরে ক্ষতি হবে নাগা, কুকি-সহ বাকি উপজাতিদের। এমনিতেই মেইতেইরা যথেষ্ট অগ্রসর। রাজ্যের বেশিরভাগ বসতি যেহেতু উপত্যকায়, বিধানসভার আসনও বেশিরভাগ ওখানেই। মেইতেইরাও বিধানসভায় প্রবলভাবে গরিষ্ঠ। মেইতেই ভাষাকে সংবিধানের বাইশটি সরকারি ভাষার মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া মেইতেইরা বেশিরভাগ হিন্দু হওয়ায় এমনিতেই তফশিলি জাতি (এসসি) বা অন্যান্য অনগ্রসর জাতি (ওবিসি) সংরক্ষণের সুযোগ পান। তাঁরা তফশিলি উপজাতি-ভুক্ত হলে বাকি উপজাতিদের কাজের ক্ষেত্রে বা পড়াশোনায় বা চাকরিবাকরিতে যেটুকু যা সুযোগ-সুবিধে ছিল, তাও থাকবে না।

কুকি উপজাতিদের মুখপাত্ররা জানিয়েছেন, রাজ্যে কুকি-সহ বিভিন্ন উপজাতিদের দাবিদাওয়া মেইতেইদের দাপটে চাপা পড়ে গেছে। সংখ্যালঘু হিসেবে যেটুকু যা তাঁদের ন্যায্য পাওনা, এবার তা থেকেও তাঁদের বঞ্চিত করতে চায় মেইতেইরা। ফলে হাইকোর্টের এই রায়ের বিরুদ্ধে মিছিলের ডাক দিয়েছিল উপজাতি ছাত্রদের সংগঠন ‘অল ট্রাইবাল স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন অফ মণিপুর’। যেখান থেকে সংঘাত তথা গৃহযুদ্ধের শুরু।

ঘটনায় তীব্র চাপের মুখে মণিপুরের বীরেন সিংয়ের নেতৃত্বে বিজেপি সরকার। এই জাতি সংঘাতের সঙ্গে স্থানীয় আবেগ এমন ভাবে জড়িত যে ধমকে চমকে থামানো যাচ্ছে না। উপায় না দেখে সরাসরিভাবে নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন বিরোধীরা। এবার কি তাহলে মণিপুরে অশান্তি থামাতে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি করা হবে? জল্পনা তুঙ্গে উঠেছে। ঘটনাক্রম কোনদিকে গড়ায়, সেটাই দেখার।

XS
SM
MD
LG