অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ভারতের মধ্যপ্রদেশের কুনো অভয়ারণ্যে ফের চিতার মৃত্যুতে বাড়ছে দুশ্চিন্তা


আরও একটি চিতা মারা গেল ভারতের মধ্যপ্রদেশের কুনো জাতীয় উদ্যানে। গত ২৭ মার্চ থেকে শুরু করে এই নিয়ে চল্লিশ দিনে মারা গেল মোট তিনটি চিতা। শাশা, উদয় নামের দু’টি পুরুষ চিতার পরে এবার মারা গেল মেয়ে চিতা দক্ষ। উদ্যান কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, সম্ভবত চোট পেয়েই প্রাণ গেছে তার।

গত বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর নামিবিয়া থেকে আটটি চিতা এনে কুনোয় ছাড়া হয়েছিল প্রথম দফায়। এর পরে এই বছরের শুরুর দিকে ফেব্রুয়ারি মাসে আফ্রিকা থেকে ফের ১২টি চিতা শাবক আনা হয়। দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে রীতিমতো ঢাকঢোল বাজিয়ে বিশেষ বিমানে চাপিয়ে চিতাদের নিয়ে এসেছিল ভারত। উদ্দেশ্য ছিল চিতাহীন দেশে নতুন করে এই প্রজাতির সংরক্ষণ করা। প্রায় ৭৪ বছর পরে চিতা দেশে ফিরে আসায় আনন্দও কিছু কম ছিল না। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী নিজের হাতে চিতা ছেড়েছিলেন কুনোর জাতীয় উদ্যানে। কিন্তু ছন্দপতন হয় কিছুদিনেই। চিতারা অসুস্থ হয়ে পড়তে শুরু করায় উদ্বেগ বাড়ে।

এ বছর জানুয়ারি থেকেই কিডনির অসুখে ভুগতে শুরু করে চিতা শাশা। কয়েকদিন ভোগার পরে তার অবস্থা সঙ্কটজনক হয়ে পড়েছিল। অবশেষে ২৭ মার্চ মৃত্যু পূর্ণবয়স্ক আফ্রিকান চিতাটির।

এর পরেই একমাস কাটতে না কাটতেই এপ্রিল মাসের শেষে মারা যায় ৬ বছরের চিতাশাবক উদয়। বন দফতরের পশু চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ জানান, কুনোর এই দ্বিতীয় চিতার মৃত্যুর কারণ, কার্ডিয়ো পালমোনারি ফেলিওর।


চিকিৎসকরা বলছেন, চিতা উদয় মারাত্মক বটুলিজম অসুখে ভুগছিল যা ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে হওয়া একধরনের স্নায়ুর রোগ। শরীরে টক্সিন ঢোকে এবং তার থেকেই ধীরে ধীরে কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্র বিকল হতে শুরু করে। রোগটির লক্ষণ দুর্বলতা, ঝাপসা দৃষ্টি, ক্লান্তি এবং কথায় জড়তা দিয়ে শুরু হয়। এরপরে হাত, বুকের পেশী এবং পা দুর্বল হয়ে যেতে পারে। বমি বমি ভাব, পেট ফুলে যাওয়া এবং ডায়রিয়াও হতে পারে।

চিতা উদয়ের মধ্যেও একই উপসর্গ দেখা গিয়েছিল। হাঁটাচলা করতে কষ্ট হচ্ছিল তার। প্রায় পঙ্গু হয়ে গিয়েছিল। ঝাপসা হয়েছিল দৃষ্টি। খেতেও পারছিল না উদয়। তাকে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল অন্য এনক্লোজারে। সেখানেই মৃত্যু হয় তার।


এভাবে পরপর দু’টি চিতার মৃত্যু নিয়ে উদ্বেগ যথেষ্ট বেড়েছিল। প্রশ্নও উঠেছিল একাধিক। এমনকি প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিল দক্ষিণ আফ্রিকাও। সে দেশের প্রাণীবিদদের বক্তব্য, আফ্রিকান চিতাদের থাকার যে বিশেষ পরিবেশ প্রয়োজন, ভারতে তা নেই। দক্ষিণ আফ্রিকার বন, মৎস্য ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রকের তরফে জানানো হয়, যে চিতাগুলিকে কুনোর সংরক্ষিত অরণ্যে রাখা হয়েছে তারা ভাল নেই। কারণ তাদের থাকার মতো পরিবেশই দেওয়া হয়নি। সে দেশের পরিবেশ দফতর এ বিষয়ে রিপোর্ট দিতে গিয়ে রীতিমতো ভর্ৎসনার সুরে বলে, 'এমনটা তো হওয়ারই ছিল!"

দক্ষিণ আফ্রিকার প্রাণীবিদরা বলছেন, আফ্রিকান চিতা এইভাবে থাকে না। তাদের বিচরণের জন্য অনেক বড় খোলা জায়গা লাগে। কুনোর জাতীয় উদ্যানে সেই ব্যবস্থা নেই। তাদের খোলামেলা জায়গায় ছাড়তে হবে, হাতের কাছে যাতে শিকার থাকে তা দেখতে হবে। আফ্রিকায় যখন চিতারা ছিল তখন তাদের জন্য বিশাল বড় জায়গা রাখা হয়েছিল। প্রতিদিন দু’বার করে গিয়ে দেখে আসা হত চিতাদের। তারা কী খাচ্ছে, কখন খাচ্ছে, শরীর ঠিক আছে কিনা এইসব খতিয়ে দেখা হত দিনে কম করেও দু’বার।


তাই নয়, দ্বিতীয় চিতার মৃত্যুর পরেই দক্ষিণ আফ্রিকার বন, মৎস্য ও পরিবেশ বিষয়ক মন্ত্রক বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল, চিতার মৃত্যু আরও বাড়তে পারে। তাদের আঘাত লাগার সম্ভাবনাও বেশি। নিয়মিত দেখাশোনা না করলে চিতাদের ওই পরিবেশে রাখাও বিপজ্জনক। ঠিক সেইভাবেই আঘাত পেয়েই মৃত্যু হল আরও এক চিতার।

এর মধ্যে অবশ্য সুখবরও মিলেছিল একবার। জানা গেছিল, নামিবিয়া থেকে আনা সিয়ায়া নামের একটি চিতা চারটি শাবকের জন্ম দেয়। কিন্তু তা হলেও, এভাবে পরপর তিনটি চিতার মৃত্যুতে উদ্বেগের ভাঁজ পড়েছে কুনো কর্তৃপক্ষের কপালে।

জানা গেছে, শুক্রবার ৫ মে এক নম্বর খাঁচা থেকে ছাড়া হয়েছিল দক্ষকে। অন্যদিকে ৭ নম্বর থেকে বের করা হয় বায়ু এবং অগ্নি নামের দুই পুরুষ চিতাকে। কিন্তু কোনও এক পুরুষ চিতা আচমকাই হিংস্র হয়ে ওঠার কারণেই চোট পায় দক্ষ। সেই আঘাতই সহ্য করতে পারেনি সে।

XS
SM
MD
LG