অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ঘূর্ণিঝড় মোখার খবরে বাগেরহাটের উপকূলীয় এলাকায় আতঙ্ক—৪৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত


ঘূর্ণিঝড় মোখা ধেঁয়ে আসার খবরে বাংলাদেশের বাগেরহাট জেলার উপকূলবর্তী মানুষের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। কখন, কোথায় ঝড় আঘাত হানবে এবং কত উচ্চতায় জলোচ্ছ্বাস হবে তা নিয়ে উপকূলের মানুষের ভাবনার শেষ নেই। বিশেষ করে শরণখোলায় বলেশ্বর, মোংলায় পশুর এবং মোড়েলগঞ্জের পানগুছি নদী পাড়ের মানুষ আকাশে মেঘ আর নদীতে পানি বাড়লেই তাদের নির্ঘুম রাত কাটে।

জেলার বিভিন্ন এলাকায় বেশ কয়েক কিলোমিটার বেড়িবাঁধ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। আর স্বাভাবিকের চেয়ে জোয়ারে ৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ এলাকায় বাঁধ উপচে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত এবং কয়েক হাজার মৎস্যঘের ডুবে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে যেতে পারে। সব মিলে জেলার উপকূলবাসী আতঙ্কে রয়েছেন।

বাগেরহাট জেলা প্রশসানের পক্ষ থেকে জেলায় ৪৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে এরই মধ্যে জেলায় মোট আবাদের ৯৮ শতাংশ জমির বোরো ধান কাটা শেষ হয়েছে।

বাগেরহাটে জলোচ্ছ্বাসে সব চেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় নদী পাড়ের বাঁধ। প্রচন্ড ঢেউয়ের আঘাতে বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকে গ্রামের পর গ্রাম প্লাবিত হয়। মানুষের ঘরবাড়ি, সম্পদ, ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি জলোচ্ছ্বাসে মানুষও ভেসে যায়।

নদী পাড়ের মানুষকে রক্ষার জন্যই মূলত বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে। বাঁধের বাইরেও কিছু মানুষ ঝুঁকি নিয়ে বসবাস করছেন। জেলায় বর্তমানে ১১ কিলোমিটার বাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে ৫ ফুট পানি বৃদ্ধি পেলে অধিকাংশ এলাকায় বাঁধ উপচে পানি গ্রামে ঢুকে পড়তে পারে। আর ৭ কিলোমিটার নদী রয়েছে ভাঙনের ঝুঁকিতে। সব মিলে নদী পাড়ের মানুষের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বাগেরহাট জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুম বিল্লাহ জানান, জেলায় তাদের মোট ৩৪০ কিলোমিটার বাঁধ রয়েছে। এ মুহূর্তে জেলার মোড়েলগঞ্জে তাদের ঝুঁকিপূর্ণ ৩ কিলোমিটার বাঁধ মেরামতের কাজ চলছে। স্বাভাবিক জোয়ারের চেয়ে পানি বৃদ্ধি পেলে ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধ ভেঙে এবং বাঁধ উপচে পানি লোকালয়ে প্রবেশ করতে পারে।

সাদা সোনাখ্যাত চিংড়ি উৎপাদনের জেলা বাগেরহাট। চিংড়ি রপ্তানি করে বাংলাদেশ যে পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা আয় করে তার অধিকাংশ চিংড়ি বাগেরহাটে উৎপাদন হয়। জলোচ্ছ্বাস হলেই এই জেলায় চিংড়ি শিল্পে বিপর্যয় নেমে আসে। মৎস্যঘের ডুবে চিংড়িসহ সবধরনের মাছ ভেসে যায়। শত শত কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়ে চিংড়ি শিল্প।

ঘূর্ণিঝড় মোখা উপকূলে ধেঁয়ে আসার খবরে চিংড়ি চাষিরা পড়েছেন দুশ্চিন্তায়। জলোচ্ছ্বাস হলে হাজার হাজার চিংড়িঘের ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ অবস্থায় চাষিরা জলোচ্ছ্বাস থেকে চিংড়ি রক্ষা করতে ঘেরের পাড় মাটি দিয়ে উঁচু করছেন এবং নেট দিয়ে ঘিরে দিচ্ছেন। তাতেও শেষ পর্যন্ত চিংড়ি রক্ষা হবে কি না তা নিয়েও শঙ্কা রয়েছে চাষিদের মধ্যে।

বাগেরহাট জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এ এস এম রাসেল জানান, জেলায় ৭৩ হাজার মৎস্যঘের রয়েছে। এর মধ্যে ২৫ হাজার মৎস্যঘের ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। জলোচ্ছ্বাস হলে এসব ঘের ডুবে চিংড়িসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ভেসে যেতে পারে। জলোচ্ছ্বাস এবং অতিবৃষ্টি হলে ঘের রক্ষা করতে চাষিদের নানা ধরনের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। ঘেরের বাঁধ পানি থেকে আড়াই ফুট এবং মাটি থেকে সাড়ে ৬ ফুট উচ্চতায় নেট দিয়ে ঘিরে দেওয়ার জন্য চাষিদের পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। জেলায় মোট ৬৭ হাজার মৎস্য চাষি রয়েছেন।

ঘূর্ণিঝড় মোখা উপকূলে ধেঁয়ে আসার খবর বেশ কয়েক দিন ধরে প্রচার পাচ্ছে। এমন খবরে জেলার ধান চাষিরা আগেভাগেই তাদের রোপণ করা বোরো ধান কাটা শুরু করেন। এরই মধ্যে রোপণ করা ৯৮ শতাংশ জমির পাকা ধান কেটে নিয়েছেন কৃষকরা। আর যে ২ শতাংশ জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে তা এক থেকে দুই দিনের মধ্যে শেষ হবে বলে কৃষি বিভাগ আশা করছে।

বাগেরহাট কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ঘূর্ণিঝড় আসতে পারে এমন খবরে কৃষকদের দ্রুত পাকা ধান কাটার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে রোপণ করা শতকরা ৯৮ শতাংশ জমির ধান কাটা শেষ হয়েছে। সে হিসাবে মাত্র ১ হাজার ২৪৩ হেক্টর জমির ধান কাটা বাকি রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, আগামী এক থেকে দুই দিনের মধ্যে এসব জমির ধান কাটা শেষ হবে। জেলায় ৬২ হাজার ১৬৯ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদ করা হয়।

রফিকুল ইসলাম বলেন, এ বছর জেলায় ধানের উৎপাদন ভালো হয়েছে। হেক্টর প্রতি গড়ে ৪ দশমিক ৫৯ মেট্রিক টন চাল পাওয়া গেছে। ঝড়, জলোচ্ছ্বাস হলেও সবজির তেমন ক্ষতির আশঙ্কা নেই। তবে আমের কিছু ক্ষতি হতে পারে। এ জন্য চাষিদেরকে দ্রুত আম পাড়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।

নদী পাড়ে বসবাসকারী অধিকাংশ মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রই শেষ ভরসা। বিগত সময়ে ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার দিনক্ষণ জানার পর উপকূলবাসীকে দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে আনা হয়েছে। তবে মানুষ তাদের সহায়-সম্পদ রেখে বাড়ি-ঘর ছেড়ে সহজে আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে চান না। অনেকের বাড়ি থেকে আশ্রয় কেন্দ্র দূরে এবং যাওয়া-আসার সহজ পথ না থাকায় মানুষের আশ্রয়কেন্দ্রে আসতে অনেকটা অনিহা রয়েছে।

চাহিদার তুলনায় আশ্রয়কেন্দ্রের সংখ্যা সামান্য। জেলায় মাত্র ৪৪৬টি আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এসব আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। এসব আশ্রয়কেন্দ্রের ধারণ ক্ষমতা ২ লাখ ৩৫ হাজার ৯৭৫ জন।

বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ আজিজুর রহমান জানান, ঘূর্ণিঝড় মোখা উপকূলে ধেঁয়ে আসতে পারে এমন খবরে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রয়েছে। আবহাওয়ার বার্তার ওপর নির্ভর করে সবধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

XS
SM
MD
LG