অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

গাইবান্ধায় প্রতারণার শিকার ৬০০ হতদরিদ্র নারী; বিক্ষোভ, মামলা দায়ের

গাইবান্ধায় প্রতারণার শিকার ৬০০ হতদরিদ্র নারী; বিক্ষোভ, মামলা দায়ের
গাইবান্ধায় প্রতারণার শিকার ৬০০ হতদরিদ্র নারী; বিক্ষোভ, মামলা দায়ের

বাংলাদেশের গাইবান্ধা জেলায় প্রতারণার শিকার হয়েছেন ৬০০ হতদরিদ্র নারী। এ ঘটনার প্রতিবাদে, তারা বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেছেন জেলা সদরে; আদালতে মামলা দায়ের করেছেন। প্রতারক চক্রের বিচার ও শাস্তি দাবি করেছেন তারা।

কোহিনুর,মিনতি,ওশনা,আলেমা,মঞ্জুয়ারা। এরা সবাই গাইবান্ধার গ্রামাঞ্চলের অতি দরিদ্র ঘরের গৃহিনী। এদের মতো ৬শ’ গৃহিণী প্রতারণার শিকার হয়েছে। শিশু ভাতা,বয়স্কা ভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতা,আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঘর দেয়ার নাম করে তাদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা আদায় করেছে নুরুল ইসলাম ও মুক্তি নামের দুই ব্যক্তি। এ নিয়ে প্রতিবাদ মুখর দরিদ্র গ্রামীণ নারীরা।তারা জেলা শহরে বিক্ষোভ ও মানববন্ধন কর্মসুচি পালন করেছেন।

গাইবান্ধা সদর উপজেলার হতদরিদ্র শিল্পী আকতার; স্বামী দিনমজুর। শিল্পী বেগমের কাছে আসেন গাইবান্ধা সদর উপজেলা পরিষদের পিয়ন নুরুল ইসলাম ও মুক্তি নামের এক নারী। তারা বলেন, আপনারা টাকা দিলে আপনাদের দেয়া হবে বিধবা,বয়স্ক,প্রতিবন্ধী,মাতৃকালীন শিশু ভাতা ও আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর। এই আশ্বাসের ফাঁদে পা দেন গাইবান্ধার দাড়িয়াপুর,গিদারী,ঘগোয়া,রুপার বাজার,মালিবাড়ি ও বোয়ালী ইউনিয়নের বেশ কিছু গ্রামের নারীরা।

ভিক্ষুক জামাল মিয়া স্ত্রী ছেলে-মেয়ে নিয়ে বাস করেন ৫ টিনের একটি ছাপড়া ঘরে। তাকে লোভ দেখানো হয়, ১৮ হাজার টাকা দিলে তাকে দুটি প্রতিবন্ধী কার্ড ও আশ্রয়ণ প্রকল্পে একটি ঘর দেয়া হবে। এই আশায়, জামাল মিয়া গ্রামের মানুষের কাছে সুদে ঋণ নেন ১৮ হাজার টাকা নেন। গোটা টাকাই তুলে দেন দালালের হাতে। দালাল মুক্তি বেগম ও নুরু মিয়া তাদের হাতে তুলে দেয় প্রতিবন্ধী কার্ড ও ঘরের চাবি। প্রতিবন্ধী জামাল মিয়া পায়ে হেটে পৌঁছেন কার্ডের টাকা তুলতে। জানতে পারেন, তার কার্ড ও ঘরের চাবি ভুয়া। তিনি প্রতারণার শিকার হয়েছেন।

পরে গাইবান্ধা সদর উপজেলা সমাজ সেবা অফিসে যান জামাল মিয়া। সেখানে তিনি নিশ্চিত হন যে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। বাড়িতে ফিরে এই ঘটনা তিনি গ্রামের অন্যদের বলেন। তারাও পরপর কয়েকদিন সমাজ সেবা অফিসে গিয়ে জানতে পারেন তাদের কাছে যে কার্ড দেয়া হয়েছে, সেটি নকল। বয়স্ক ভাতা ,বিধবা ভাতা,শিশু ভাতা,প্রতিবন্ধী ভাতার নকল কার্ড ছাপিয়ে উল্লিখিত দুই ব্যক্তি তাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন।

গাইবান্ধার মালিবাড়ি ,গিদারী,ঘাগোয়া,দাড়িয়াপুর,লক্ষীপুর,খোলাহাটি,দাড়িয়াপুর সহ বেশ কয়েকটি গ্রামে এই ভুয়া কার্ড বিতরণ করে ৬ শ’ জনের কাছে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার পর্যন্ত টাকা নিয়েছে। প্রতারিত নারীরা খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন পিয়ন নুরুল ইসলাম নুরু ও মুক্তি বেগম গা ঢাকা দিয়েছেন।

প্রতারণার শিকার গোলাপী ,মেহেরন ,সাবেনি জানান, “আমরা বয়স্ক ভাতার কার্ডের আশায় সুদের ওপর টাকা নিয়ে তার হাতে টাকা দিয়েছি। এখন আমরা কি শুনছি। আমারা গরীব মানুষ হাঁস মুরগি বিক্রি করে টাকা দিয়েছি ঘর পাওয়ার আশায়। তাদের পেছনে যারা জড়িত, তাদের গ্রেপ্তার করা হোক।”

“আম্বিয়া খাতুন বলেন, “আমাদের ভিক্ষার টাকা ,সুদে নেয়া টাকা ,ছাগল বিক্রি করা টাকা যারা আত্মসাৎ করেছে, আমরা তাদের বিচার চাই । টাকা ফেরৎ চাই।”

প্রতারণার এই ঘটনা ফাঁস হওয়ার পর, বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে ৬ শ’ জন দরিদ্র নারী ও পুরুষের কাছ থেকে মোট ২৬ লাখ ২৫ হাজার ৫ শ’ টাকার হিসাব পাওয়া যায়। বিভিন্ন গ্রাম থেকে নারীরা স্থানীয় প্রশাসনের কাছে গেলে তারা জানতে পারেন যে প্রকৃত তালিকায় কারো নাম নেই ।

এর পর, দরিদ্র নারীরা সংগঠিত হয়ে গাইবান্ধা শহরে এসে বিক্ষোভ মানববন্ধন করেন। পরে তারা জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। বিক্ষোভে বক্তব্য দেন; আহসানুল হাবীব সাঈদ,নারী নেত্রী নিলুফার ইয়াসমীন শিল্পী,শুভাষীনি দেবী,ভুক্তভোগী নারী শিল্পী আকতার। পরে একটি বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে। ভুক্তভোগী অসহায় দরিদ্র পরিবার সমূহ এবং নারীমুক্তি কেন্দ্র এই বিক্ষোভ কর্মসুচির আয়োজন করে।প্রতারিত শিল্পী বেগম বাদী হয়ে ও ৫১ জন নারী সাক্ষী হয়ে আদালতে মামলা দায়ের করেন।

বোয়ালী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সহিদুল ইসলাম সাবু জানান, “ আমি দায়িত্বে আসার আগে এই ঘটনা ঘটেছে। আমি বিষয়টি জানি। যারা প্রতারিত হয়েছেন, তারা অত্যন্ত দরিদ্র। প্রতারকদের বিচার হওয়া উচিৎ।”

জেলা সমাজ সেবা বিভাগের উপ পরিচালক ফজলুর রহমান বলেন, “বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। তবে, নারীরা ভুয়া কার্ডধারী। আর, যারা এই কার্ড দিয়েছে তারা অপরাধী। তাদের আইনের আওতায় আনা উচিৎ।

গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক মো. অলিউর রহমান জানান,অনেক নারী প্রতারিত হয়েছে। তাদেরকে কার্ড করে দেয়ার নাম করে কেউ যদি টাকা নিয়ে থাকে, প্রমাণিত হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

XS
SM
MD
LG