অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শহরের ফ্ল্যাটেও গাছই সহায় তীব্র গরমে


শহরের ফ্ল্যাটেও গাছই সহায় তীব্র গরমে
শহরের ফ্ল্যাটেও গাছই সহায় তীব্র গরমে

পশ্চিমবঙ্গে তীব্র গরমে জনজীবন নাজেহাল। সারাক্ষণ এসি বা কুলার চালিয়ে রেখেও কমছে না তাপমাত্রা। আবহাওয়া দপ্তরের মতে তাপমাত্রার পরিমাণ আগামী মাসগুলিতে আরও বাড়তে পারে।

এই সমস্যার প্রধান কারণ হিসেবে দায়ী করা হচ্ছে অনিয়ন্ত্রিত গাছ কাটা এবং সেই পরিমাণ নতুন গাছ না লাগানোকে, যাতে গরমের পাশাপাশি অন্য ঋতুগুলির ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে ও প্রকৃতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে।গ্রামাঞ্চলে এখনও খানিকটা প্রকৃতির সবুজ রূপ দেখা গেলেও শহর ও শহরতলীতে তা খুঁজে পাওয়া যায় না। বিশেষত ফ্ল্যাট বাড়ির পরিসরে গাছ লাগিয়ে ঘর-দু্যার কীভাবে কিছুটা শীতল করা যায় সে চিন্তা আজকাল থাকে সকলেরই। এই ভয়াবহ গরমে খানিক শ্রমে মিলতে পারে অনেকটা স্বস্তি। বেশ কিছু সাম্প্রতিক গবেষণা, যার মধ্যে রয়েছে আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সিও (ইপিএ), তাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, ঘরের ভেতরে, জানালা এবং বারান্দায় কিছু নির্দিষ্ট গাছকে, যাদের সামান্যই পরিচর্যা প্রয়োজন হয়, ঘরের ভেতরকে ঠান্ডা করা সহজ হয়। এই প্রতিবেদনে রইল এইরকম কিছু গাছের কার্যকারিতা নিয়ে আলোচনা।

কলকাতায় রাস্তার ফুটপাতে গাছের চারা বিক্রি করেন সুনীল বসাক। তাঁর সঙ্গে গাছ সম্পর্কিত বিষয় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে কিছু গাছের নাম জানা গেলো, যেগুলি ঘরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। তিনি জানালেন, “গরমকালে কিছু গাছের প্রচন্ড চাহিদা থাকে। তারমধ্যে ফিকাস, মানি প্ল্যান্ট-এর চাহিদা থাকে বেশি। এইগুলি ঘরে রাখলে দেখতে যেমন ভালো লাগে, তেমনি ঘরের পরিবেশ ঠান্ডা থাকে।” উইপিং ফিগের বাংলায় নাম লক্ষ পাকুড়, তবে এই নামের থেকে বেশি পরিচিতি ফিকাস নামে। তিনি আরও বলেন, “এখন শহরে গাছ লাগানোর জায়গা কম, কিন্তু মানুষ তার বাড়ির বারান্দা বা ঘরেই গাছ লাগান, তাদের যত্ন করেন। যে কারণে সারা বছরই আমাদের এখানে গাছ বিক্রি হয়। নতুন নতুন গাছের চাহিদাও বাড়ে।”

জমির সংকটের জন্য বাগান করার শখ এখন স্বপ্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে নিজের বাড়িকেই বাগান করে ফেলা যায়, এইরকমটা করে দেখিয়েছেন চাকরীজীবনে সদ্য অবসর নেওয়া সুস্মিতা দাশগুপ্ত। বরাবরই তাঁর গাছের শখ। তিনি নিজের ঘরের ভেতরে তো গাছের টব রেখেইছেন, পাশাপাশি জানালায় পর্দা না লাগিয়ে বিভিন্ন গাছ দিয়েই পর্দা তৈরি করে ফেলেছেন। তিনি জানালেন, “প্রতি বছর যেভাবে গরম বাড়ছে, তাতে এসি বা কুলারের উপর ভরসা রাখা যায় না। এইগুলি এমনিতেও পরিবেশের ক্ষতিই করে। আমার গাছ নিয়ে নাড়াচাড়া দীর্ঘদিনের। এদের মধ্যে বস্টন ফার্ন, অ্যালোভেরা, স্নেক প্ল্যান্ট ঘরের ভেতরের আর্দ্রতাকে অনেকটা নিয়ন্ত্রণ করে। তবে এই গাছগুলিতে নিয়মিত জল দিতে হয়, নয়তো শুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা থাকে।”

শহর ও শহরতলীর ফ্ল্যাট বাড়ির ক্ষেত্রে গাছ লাগানোর অন্য উপায় না থাকায় টব ব্যবহার করে অনেকেই গাছের পরিচর্যা করছেন। তাতে খুব অল্প হলেও প্রকৃতিতে কিছু প্রভাব পড়ে। কলকাতার শমিতা চট্টোপাধ্যায় দীর্ঘদিনের ফ্ল্যাট বাড়ির বাসিন্দা, কিন্তু পরিবেশ সচেতনতা ও শখের কারণে নিজের বাড়িতেই তৈরি করে করেছেন নানান গাছের সম্মিলিত বাগান। তাঁর সঙ্গে কথাবার্তায় বললেন, “আমাদের পূর্বে উঠোনওয়ালা বড়ো বাড়ি ছিল, যেখানে ফুল-ফল থেকে শুরু করে নানান প্রজাতির গাছ লাগানো ছিল। গাছের চারা লাগানো এবং তার পরিচর্যা করে বড়ো করা আমাদের দীর্ঘদিনের অভ্যাস। কিন্তু ফ্ল্যাট বাড়িতে আসার পরে স্থানাভাবের জন্য আগের মতন বড়ো গাছ লাগাতে না পারলেও ঘরের উপযোগী নানান গাছ রয়েছে আমার বাড়িতে। তার মধ্যে পটহোজ, চাইনিজ এভারগ্রিন, এরিকা পাম, অ্যালোভেরা, বাম্বু পাম ইত্যাদি গাছ গরমে খুব আরামদায়ক হয়। নিয়মিত জল দিলে ঘরের তাপমাত্রা অনেকটা কম হয়, শ্বাস নিতেও ভালো লাগে। হার্টের রোগীদের জন্য ঘরের ভেতর গাছ রাখা খুব জরুরি।”

আমেরিকার এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন এজেন্সি বা ইপিএ তাদের প্রকাশিত জার্নালে জানাচ্ছে, নিয়মিত ঘরে গাছের পরিচর্যা চালিয়ে গেলে গরমের সময়ে কিছুটা স্বস্তি যেমন পাওয়া যায়, তেমনি ঘরে অক্সিজেনের মাত্রা বৃদ্ধি হয়, ঘরের ভেতরের বায়ু বিশুদ্ধ হয়, গ্রিনহাউজ গ্যাসের পরিমানকে নিয়ন্ত্রণ করা সহ এসি বা কুলার ব্যবহারের মাত্রাকেও কমিয়ে আনে। যা একদিকে পরিবেশকে রক্ষার কাজও করে। তারা আরও দাবি করেছে, নির্দিষ্ট কিছু গাছকে দীর্ঘদিন ধরে ঘরে রেখে তাদের সঠিক পরিচর্যা করলে গরমকালে ১ থেকে ৫ ডিগ্রি পর্যন্ত তাপমাত্রা কমে যেতে পারে।

নিয়মিত গাছ লাগানো এবং পরিচর্যা করে যাওয়াও একধরণের চর্চা। এর জন্যে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকেই বাচ্চাদের মধ্যে সচেতনতা এবং উদ্যোগ তৈরি করতে হবে। ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতলায় বসবাসকারী শিক্ষক নীলয় সরকার-এর মতে, “আমার দৃষ্টিকোণ থেকে বর্তমানের যে কোন সমস্যা থেকে ভবিষ্যতকে বাঁচানোর চাবিকাঠি শিক্ষক শিক্ষিকাদের হাতেই আছে। অহেতুক গাছ না কাটা, নিয়মিত গাছ লাগানো, গাছ লাগিয়ে দায় না সেরে সেই গাছগুলিকে সঠিকভাবে পরিচর্যা করা এবং বড়ো হতে সাহায্য করা, এইগুলি প্রাথমিক পাঠ হিসেবেই বাচ্চাদের শিখিয়ে দিতে হবে। তাতে পড়ার সাথে এটাও যে জরুরি কাজ, এটা যেনো বুঝতে পারে। পাশাপাশি জায়গা সংকোচনের কারণে ঘরের ভেতরেই গাছ লাগানোকে অভ্যাসে পরিণত করা। আমি নিজে অ্যালোভেরা, চাইনিজ এভারগ্রিন, এরিকা পাম, নানারকম ফুলের গাছ ঘরে লাগিয়েছি এবং বাচ্চাদেরও উৎসাহ দিয়ে যাচ্ছি একই কাজ করার জন্যে। তাতে এই মারাত্মক গরমে কিছুটা আরাম পাওয়া যাবে। এইরকম অভ্যাস সমস্ত বিদ্যালয়, কলেজে গড়ে তুলতে পারলে আগামী ৫-৬ বছরে আমরা এর সুফল দেখতে পাবো, এটা নিশ্চিত করে বলা যায়।”

XS
SM
MD
LG