অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে—হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না


ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে—হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না
ঢাকায় ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ছে—হাসপাতালে শয্যা বাড়িয়েও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোতে বর্তমানে ডেঙ্গু রোগীর কোনো শয্যা (বেড) খালি নেই। শয্যা বাড়িয়ে এবং পৃথক সেল করেও পরিস্থিতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ডেঙ্গু রোগীর চাপ বাড়ার কারণে দেখা দিয়েছে শয্যা সংকট।

ঢাকার সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন শত শত ডেঙ্গুরোগী ভর্তি হচ্ছেন। রোগীদের প্রচণ্ড চাপ বাড়ার কারণে শয্যা সংকটে অনেকেই চিকিৎসা নিতে এসে ফেরত যাচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে রোগীদের নিয়ে ছুটছেন স্বজনেরা।

ঢাকার বেশ কয়েকটি হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এই নাজুক পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকেরা। হাসপাতালের আনাচে-কানাচেও বিছানো ম্যাট্রেসে ভর্তি আছেন রোগীরা। শুধু হাসপাতালের মেঝেই নয়, হাসপাতালের বারান্দা, বাথরুমসংলগ্ন জায়গাও এখন রোগীতে ঠাসা। রোগী আর স্বজনদের ভিড়ে সেখানে দাঁড়ানো যাচ্ছে না।

ঢাকায় সরকারি হাসপাতালগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী সামাল দেওয়া মুগদা হাসপাতালে রোগী বেড়েছে কয়েক গুণ। ডেঙ্গু ওয়ার্ডগুলোতে গিয়ে দেখা যায়, রোগীদের জন্য নির্ধারিত শয্যা পূর্ণ হয়ে গেছে। অনেকে মেঝেতে বিছানা পেতে চিকিৎসা নিচ্ছেন। তবে ডেঙ্গু আক্রান্ত হওয়ার পরও বেশির ভাগ রোগীকে মশারি ছাড়াই থাকতে দেখা গেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এসব রোগীদের মশারির ব্যবস্থা করে দিলেও গরমের কারণে অনেক রোগী মশারি টাঙাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করছেন।

এই অবস্থা শুধু মুগদা হাসপাতালেই নয়, ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, মাতুয়াইল শিশু–মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট এবং বাংলাদেশ শিশু হাসপাতালে চাপ সামাল দিতে রোগীদের মেঝেতেও রাখতে হচ্ছে। স্থান সংকুলান না হওয়ায় বিভিন্ন জটিল রোগীদের সঙ্গে ডেঙ্গু রোগীদের সেবা দেওয়া হচ্ছে।

এসব হাসপাতালে একাধিক রোগীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চিকিৎসা নিতে এসে বিভিন্নভাবে ভোগান্তিতে পড়ছেন তারা। বিশেষ করে টিকিট কাটা, রক্ত জমা দেওয়া, টেস্টের ডেলিভারি রিপোর্ট পাওয়া, ডাক্তার দেখানো এবং ওষুধ সংগ্রহ করতে লম্বা লাইনে দাঁড়ানোসহ প্রতি পদে পদে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

এসব হাসপাতালের ডাক্তারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, হাসপাতালে জনবল সংকট একটি বড় সমস্যা। রোগী বাড়লেও চিকিৎসক বাড়ছে না। তাই চাহিদার তুলনায় রোগী বেশি হওয়ায় চাপ সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়েছে।

ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়তে থাকায় রাজধানীর কোভিড ডেডিকেটেড মহাখালী ডিএনসিসি হাসপাতালকে ডেঙ্গু ডেডিকেটেড ঘোষণা করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। ঘোষণার পর ডিএনসিসি হাসপাতালেও বাড়ছে রোগী।

মুগদা হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মো. নিয়াতুজ্জামান ইউএনবিকে বলেন, হাসপাতালের ধারণক্ষমতা ও লোকবলের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি রোগী। আমরা কোনো শয্যা দিতে পারব না, এখন লিখিত শর্তে রোগী ভর্তি করছি। চিকিৎসক আছেন মাত্র পাঁচজন। ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য নতুন করে কোনো লোকবল নেই।

তিনি আরও বলেন, এই হাসপাতালে প্যাথলজিতে প্রতিদিন ৩০০ জনের পরীক্ষার সক্ষমতা রয়েছে। আমরা সাধারণত প্রতিদিন দেড় থেকে ২ হাজার রোগীর নমুনা পরীক্ষা করতাম। সেখানে এখন আমাদের করতে হচ্ছে ৫ থেকে ৬ হাজার পরীক্ষা। আমাদের এখন তিন শিফট চালাতে হচ্ছে। তাই ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য আলাদা অতিরিক্ত রুটিন করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছি।

নিয়াতুজ্জামান বলেন, বর্তমানে দুই ধরনের ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছে। একটি হচ্ছে ‘ক্লাসিক ডেঙ্গু সিনড্রোম’ (এসব রোগীর লক্ষণ থাকে জ্বর কিংবা হাত-পা ব্যথা) এবং অপরটি হচ্ছে ‘কমপ্লিকেটেড ডেঙ্গু সিনড্রোম’ (যে রোগীর এক থেকে তিনবারের বেশি ডেঙ্গু হয়েছে)। আর হাসপাতালগুলোতে ‘কমপ্লিকেটেড ডেঙ্গু সিনড্রোম’ রোগী সংখ্যা বেশি।

মিটফোর্ড হাসপাতালে ডেঙ্গু ইউনিট নতুন ভবনের ষষ্ঠ ও সপ্তম তলায়। এখানে স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ডেঙ্গু রোগী ভর্তি। রোগী ও স্বজনদের ভিড়ে পা ফেলার জায়গা নেই। অনেক রোগীকে মেঝেতে শুয়ে চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।

এ ব্যাপারে স্মিটফোর্ড হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কাজী মো. রশিদ উন নবী সাংবাদিকদের বলেন, শুধু ডেঙ্গু রোগী নয়, এখানে সব ধরনের রোগীকে সেবা দেওয়া হয়। ফলে রোগীদের কিছুটা ভোগান্তি হবে এটাই স্বাভাবিক।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের নতুন ভবনে দুটি ডেঙ্গু ইউনিট রয়েছে। একটি ভবনের সপ্তম তলায় অপরটি ষষ্ঠ তলায়। এই দুটি ইউনিটই নির্ধারিত শয্যার চেয়ে তিন গুণ বেশি রোগী ভর্তি। রোগীর এত চাপের পরও করা হয়নি আলাদা ইউনিট বা ওয়ার্ড। অন্য রোগীর সঙ্গে চলছে ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসা।

মাতুয়াইল শিশু–মাতৃ স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ডা. এম এ মান্নান ইউএনবিকে বলেন, চিকিৎসার জন্য সার্জারি বিভাগের ওয়ার্ডটিতে শুধু ডেঙ্গু রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিছানা, খাট অন্য ওয়ার্ড থেকে নেওয়া হচ্ছে।

জানা গেছে, ঢাকার বাইরের চিত্রও একই রকম। অনেক জেলা ও উপজেলা হাসপাতালে ডেঙ্গু পরীক্ষার কিট না থাকায় রোগীদের পরীক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে না। কোথাও নেই পর্যাপ্ত চিকিৎসক। শয্যা সংকট তো রয়েছেই। ডেঙ্গু চিকিৎসার সুযোগ-সুবিধা না থাকায় অনেক হাসপাতাল থেকে রোগীদের ফিরিয়ে দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে বাংলাদেশে এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে আরও ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ ছাড়া বৃহস্পতিবার (২৭ জুলাই) সকাল ৮টা পর্যন্ত সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ২ হাজার ৩৬১ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আক্রান্তদের মধ্যে ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ১২২ জন। আর ঢাকার বাইরে বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন বাকি ১ হাজার ২৩৯ জন।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, সারা দেশে বর্তমানে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন ৮ হাজার ৪৬৭ জন রোগী। এর মধ্যে ৪ হাজার ৮০৯ জন ঢাকায় এবং ৩ হাজার ৬৫৮ জন রোগী ঢাকার বাইরের বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি আছেন।

সরকারি প্রতিবেদন অনুযায়ী, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ২৭ জুলাই পর্যন্ত মোট ৪২ হাজার ৭০২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে। মৃত্যু হয়েছে ২২৫ জনের।

XS
SM
MD
LG