অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বিশ্ব চিঠি দিবস: ফিরে দেখা কিছু বিখ্যাত চিঠির গল্প 


প্রতীকী ছবি
প্রতীকী ছবি

এগারো বছরের এক কিশোরী চিঠি লেখে অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনকে, তিনি দাড়ি রাখলে প্রেসিডেন্ট হতে সাহায্য করবে। লিঙ্কন তার ছোট্ট বন্ধুটিকে চিঠির উত্তর দিলেও জানাননি তিনি কী করবেন, কিন্তু এক মাস পরে দেখা যায় তার বিখ্যাত গালময় দাড়ি, মাস ছয়েক পর যখন প্রেসিডেন্ট-ইলেক্টের সঙ্গে দেখা হয় গ্রেস বেডেল নামের সেই ছোট্ট চিঠি-লিখিয়ের। লিঙ্কনকে লেখা গ্রেস বেডেল-এর সেই চিঠি আর তার উত্তর আজও মনে রেখেছি আমরা, দেড়শ-রও বেশি বছর অতিক্রম করে। চিঠি এমনই এক আশ্চর্য জিনিস।

ডিজিটাল যুগে চিঠির প্রয়োজন ফুরিয়েছে, বিশেষত ব্যক্তিগত আদান প্রদানের মাধ্যম হিসেবে, এসএমএস থেকে শুরু করে বিভিন্ন অ্যাপের সাহায্যে চ্যাট, যোগযোগের তাৎক্ষণিক মাধ্যম খুলে দিয়েছে, ফলে চিঠির আর প্রয়োজন পরে না। হাতে লেখা চিঠি তো দূর এমনকি ই-মেইলে লেখা ব্যক্তিগত চিঠিও প্রায় উঠেই যাচ্ছে। অথচ, টম হ্যাঙ্কস আর মেগ রায়ান অভিনীত জনপ্রিয় হলিউড সিনেমা ‘ইউ হ্যাভ গট আ মেইল’-কেও এখন অনেকে মনে করতে পারে ইতিহাস। চিঠি মানে কিন্তু শুধু চিঠি নয় তার অনেকটা বেশি, এ কথা অনেকে ভোলেননি, আর সেটা মনে রেখেই বিশ্ব চিঠি দিবসের শুরু। অস্ট্রেলীয় লেখক, শিল্পী ও ফটোগ্রাফার রিচার্ড সিম্পকিন শুরু করেন ২০১৪ সালে। হাতে লেখা চিঠি পাওয়ার যে আনন্দ বা একটা চিঠি কাগজে কলমে লিখে তা খামে বন্দী করে পাঠানোর অনুভূতি যাতে হারিয়ে না যায়, তার জন্যই ১ সেপ্টেম্বর দিনটাকে চিঠি উদযাপনের দিন হিসেবে বেছে নেন সিম্পকিন। এই ডিজিটাল যুগে যখন মুঠোর ভিতর টেক্সটে, ভিডিওতে সব্বাইকে ধরে ফেলা যাচ্ছে তখন আবার চিঠির মতো জিনিস নিয়ে ভাবার কারণ চিঠি যে শুধু কেজো যোগাযোগ নয়, ওর মধ্যে রয়েছে আরো অনেক কিছু।

চিঠি যোগাযোগের প্রয়োজন মিটিয়ে হয়ে উঠতে পারে অনেক কিছু। কখনো কারো মেয়েকে লেখা চিঠি হয়ে উঠেছে পরবর্তীতে ইতিহাস ও দর্শনের শিক্ষামূলক বই, তো কখনো কোনো ব্যক্তিগত প্রেমপত্র হয়ে উঠেছে সাহিত্যের অমূল্যসম্পদ। কোনো কোনো চিঠি তৈরি করেছে একটা জাতির সাহিত্যের ভাষা তো কোনো চিঠি তার রাজনৈতিক আন্দোলনের মর্মন্তুদ ইতিহাসের সাক্ষ্য। সেই রকম মনে রাখবার মতো চিঠি বা চিঠির গুচ্ছর উল্লেখ রইল –

লিঙ্কন-কে চিঠি লিখল ছোট্ট সমর্থক – রয়ে গেল দাড়ি

অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন
অ্যাব্রাহাম লিঙ্কন

প্রথমেই অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনকে লেখা চিঠিটার কথা বলা যাক। ১৮৬০ সালে গ্রেস বেডেল নামে এগারো বছরের এক ছোট্ট মেয়ে নিউ ইয়র্ক-এর ওয়েস্টফিল্ড থেকে চিঠি লিখেছিল প্রেসিডেন্ট ক্যান্ডিডেট অ্যাব্রাহাম লিঙ্কনকে। শত ব্যস্ততার মধ্যেও লিঙ্কন তার উত্তর দিতে ভোলেননি।

তাই শুধু নয়, ১৮৬১ সালে তিনি ওয়েস্টফিল্ড-এর উপর দিয়ে যাওয়ার সময় দেখাও করেন তার এই খুদে ভক্তর সঙ্গে।

লিঙ্কনকে লেখা এক বাচ্চা মেয়ের সরল চিঠি আর অদ্ভুত স্নেহ ও বাৎসল্যে ভরা উত্তর চিনিয়ে দেয় ভাবীকালের জাতিভেদ-বিরোধী লড়াইয়ের তার মানবিক মুখটিকেই।

জওহরলাল নেহরু-র চিঠি ইন্দিরাকে – সময়ের সাক্ষী

জওহরলাল নেহরু
জওহরলাল নেহরু

এমনই আরেক চিঠির গুচ্ছ ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু-র তার কিশোরী কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে (পরবর্তীতে ভারতের প্রধানমন্ত্রী) লেখা, যা পরবর্তী সময়ে ‘লেটারস ফ্রম আ ফাদার টু হিজ ডটার’ বলে পরিচিত হবে। নেহরু ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে তখন এলাহাবাদ জেলে বন্দী, আর তার মেয়ে ইন্দিরা মুসৌরি শহরে, মেয়ের সঙ্গে সামনাসামনি দেখা হওয়ার উপায় নেই, অথচ তিনি তার শিক্ষা নিয়ে চিন্তিত। মেয়েকে প্রাকৃতিক ও মানুষের ইতিহাসের পাঠ দিতে তাই তিনি জেল থেকে লিখতে শুরু করলেন চিঠি। সে চিঠি নিরস তথ্যে ভরা নয় বরং যেন সামনে বসে বাবা তার মেয়েকে পড়াচ্ছেন। উদাহরণ দিলে বোঝা যাবে, যেমন জওহরলাল চিঠিতে লিখছেন

“Perhaps you remember a gentleman who came to see us in Geneva. His name is Sir Jagadish Bose. He has shown by experiments that plants have a great deal of life…” এইভাবে তিনি সহজ ভঙ্গিতে তার মেয়েকে বোঝাচ্ছেন।

ভঙ্গি সহজ কিন্তু বিষয় নয়, জওহরলাল যে বিশ্ব-নাগরিকতা ও আন্তর্জাতিকতাবাদে বিশ্বাস করতেন তার প্রথম পাঠ তিনি মেয়েকে দিয়েছেন এই চিঠিগুলোয়। ১৯২৯ সালে এলাহাবাদ ল জার্নাল প্রেস এই চিঠিগুলোকে বই আকারে প্রকাশ করে। নেহরুর লেখা বিশ্ব ইতিহাসের বই ‘গ্লিম্পসেস অফ ওয়ার্লড হিস্ট্রি’ এই চিঠিগুলিরই বর্ধিত রূপ। এই বইটির হিন্দি তর্জমা করেন হিন্দি ভাষার বিখ্যাত লেখক মুন্সী প্রেমচন্দ।

রবীন্দ্রনাথের ছিন্নপত্র – মূর্ত হয়ে ওঠে বাংলা

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

দেশ, কাল ও মানুষের কথা নিয়ে জওহরলাল নেহরুরও আগে নিজের ভাবনাগুলো আরেক কিশোরী ইন্দিরা লিখে পাঠিয়েছিলেন তারই দেশের এক কবিকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চব্বিশ বছর থেকে চৌত্রিশ বছর বয়স পর্যন্ত লেখা চিঠি যার বেশির ভাগ ভাইঝি ইন্দিরা দেবীকে লেখা একত্রিত করে ও সঙ্গে আরো কয়েকটা অন্যকে লেখা চিঠি সমেত বেরোয় ‘ছিন্নপত্র’। এই চিঠির বেশির ভাগ লেখা পদ্মার বোট থেকে, শিলাইদহ, পাতিসর, সাজাদপুরে ঘোরার সময়। তরুণ রবীন্দ্রনাথের মনের ভিতর সমগ্র বাংলাদেশ মূর্ত হয়ে ওঠে এই ভ্রমণকালে আর চিঠিগুলোর মধ্যে দিয়ে সেই বাংলদেশকে খুঁজে পাওয়া যায়। বইটি বেরোয় ‘ছিন্নপত্র নামে’।

কারণ সযত্নে ইন্দিরা তার রবিকা-র (যে নামে তিনি রবীন্দ্রনাথকে ডাকতেন) চিঠিগুলো নিজে হাতে নকল করে উপহার দেয় কবিকে।

তিনি তার থেকে কিছু অদরকারি অংশ বাদ দিয়ে দেন পাঠকের উপযোগী করে তুলতে, আর তাই যখন এটি প্রকাশ করেন নাম দেন ‘ছিন্নপত্র’। ১৩১৯ সালে এটি প্রকাশিত হয়।

‘ছিন্নপত্র’ বাংলাদেশের প্রকৃতি ও মানুষকে যেমন চেনায় বাংলা ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূর। রবীন্দ্রনাথের তখনও গদ্যভাষা ছিল সাধু বাংলা। কিন্তু ব্যক্তিগত চিঠি তাই এ ছিল মুখের ভাষায় লেখা। রবীন্দ্রনাথের হাতে এই ভাষা মুক্তি পেল ছাপায় এবং এই অনন্যসুন্দর চলিত বাংলা এখনো বাংলা ভাষার গদ্যের ভিত তৈরি করে রেখেছে। রবীন্দ্রনাথের সারা জীবনে লেখা নানা বিখ্যাত থেকে অখ্যাত মানুষের চিঠি অমূল্য তার ভাবনা ও সাহিত্যিক মূল্যের জন্য। তার মধ্যেও ছিন্নপত্রের কথা বাংলা ভাষী মানুষের প্রথম মনে পড়বে তার ভাষার সৌন্দর্য আর তার বাংলাদেশের প্রতি গভীর প্রেমের জন্য।

কাফকা ও মিলেনা-র চিঠি – প্রেম আর ইতিহাসের সাক্ষ্য বয়ে চলে

কাফকা
কাফকা

প্রেমপত্রের নজির সাহিত্যের ইতিহাসে কম নয়, সে কিটস-এর লেখা ফ্যানি ব্রাউনকেই হোক বা রিলকের লেখা লুই অ্যাদ্রিয়াস সালোমে-কে। কিন্তু সমস্ত পত্রগুচ্ছর মধ্যেও যা সবচেয়ে দাগ কাটে তা হল কাফকা -র লেখা মিলেনা-কে চিঠি। তেইশ বছরের মিলেনা তার একটি গল্প জার্মান থেকে চেক ভাষায় অনুবাদ করার মাধ্যমে পরিচিত হন। কাফকা তাকে চিঠি লিখতে শুরু করেন, এবং দ্রুতই চিঠি বদলে যায় প্রেমপত্রে। মাত্র তিন বছর তাদের এই সম্পর্ক ছিল। কিন্তু এই তিন বছরে লেখা কাফকার চিঠিগুলো যেমন একজন আধুনিক এলিয়েনেটেড, মননশীল লেখকের প্রেমের আবেগ ও কল্পনার একটা ছবি ধরে, তেমনি মিলেনার মেধা ও মননেরও পরিচয় দেয়।

তাদের প্রেম টেঁকেনি, কিন্তু চিঠিগুলো রয়ে গেছে।

এই চিঠির মাধ্যমে মিলেনাকেও চেনা যায়, যিনি পরবর্তীতে নাৎসি বিরোধী আন্দোলনে যোগ দেবেন ও মারা যাবেন কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পে। কাফকার মতো ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী লেখকের সঙ্গে সঙ্গে এক লড়াকু মহিলার কাহিনিও জড়িয়ে এই চিঠিগুলোয়। যদিও দুঃখের বিষয় কাফকাকে লেখা মিলেনার চিঠি পাওয়া যায় না, তা কাফকা নিজেই নষ্ট করে ফেলেছিলেন, কাফকার চিঠির মধ্যে উদ্ধৃতি থেকে মিলেনার কথাগুলো মেলে।

শফি ইমাম রুমী-র চিঠি – মুক্তিযুদ্ধের দলিল

শফি ইমাম রুমী
শফি ইমাম রুমী

এমনই দেশপ্রেমের এক জ্বলন্ত চিঠি দেখি আমরা বাংলাদেশের তরুণ মুক্তিযোদ্ধা ‘শহীদ জননী’ হিসাবে খ্যাত জাহানারা ইমামের জ্যেষ্ঠ পুত্র শফি ইমাম রুমী-র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য গেরিলা যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন তরুণ রুমী, বিদেশে পড়াশোনা করার ডাক অগ্রাহ্য করে।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন তিনি তার মামাকে চিঠি লেখেন যা তার সাহস ও স্বপ্নের রঙে উজ্জীবিত।

জাহানারা ইমাম তার দিনলিপি ‘একাত্তরের দিনগুলি’-তে লিখে গেছেন তার এই তরুণ সন্তানের কথা। রুমী পাকিস্তানি সেনার হাতে ধরা পড়ার পরও তার মা ক্ষমাভিক্ষা করেননি, এবং তরুণ রুমীকে আর পাওয়া যায়নি। এই মর্মন্তুদ অথচ বীরত্বের কাহিনি যেমন জাহানারা ইমামের লেখায় পাওয়া যায়, তেমনই রুমীর লেখা ওই একখানা চিঠিও একই রকম উল্লেখযোগ্য দলিল।

এই সমস্ত উদাহরণ মাথায় রাখলে মনে হয় চিঠির প্রয়োজন শুধু একে অপরের যোগাযোগের জন্য নয়, তা ছাড়িয়েও বৃহৎভাবে তা সময়, ইতিহাসকে চিনিয়ে দেয়। তাই বিশ্ব চিঠি দিবসে মানুষ হয়ত আবার কালি, কলম ও কাগজ নিয়ে বসবে, কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মতো আবার কেউ লিখবে, ‘হেমন্তের অরণ্যে আমি পোস্টম্যান দেখেছি অনেক’।

তথ্যসূত্র: ইউনিভার্সিটি অফ লাইব্রেরি সায়েন্স

Abrahamlincolnonline.org

Letters From Father To His Daughter, Penguin-Random House

ছিন্নপত্র, বিশ্বভারতী

XS
SM
MD
LG