অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

মজুরি নয়, অধিকারের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে সফররত ইইউ প্রতিনিধিদল—পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন


পররাষ্ট্র, শ্রম ও বাণিজ্য সচিবদের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠকে সাংবাদিকদের সঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন। ১৫ নভেম্বর, ২০২৩।
পররাষ্ট্র, শ্রম ও বাণিজ্য সচিবদের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠকে সাংবাদিকদের সঙ্গে পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন। ১৫ নভেম্বর, ২০২৩।

বাংলাদেশ সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল সরকারের সঙ্গে বৈঠকে তৈরি পোশাক কারখানার শ্রমিকদের জন্য সম্প্রতি ঘোষিত ন্যূনতম মজুরি নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করেনি। তবে যেসব বিষয় মজুরি বোর্ডে নেই, সেগুলো তাদের পর্যবেক্ষণে রয়েছে।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বিষয়টির বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয় এবং ইইউ পক্ষ আশা প্রকাশ করেছে আলোচনার মাধ্যমে তৈরি পোশাক খাতের বর্তমান পরিস্থিতি শিগগিরই স্বাভাবিক হবে।

বুধবার (১৫ নভেম্বর) রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র, শ্রম ও বাণিজ্য সচিবদের সঙ্গে ইইউ প্রতিনিধিদলের বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন পররাষ্ট্রসচিব মাসুদ বিন মোমেন।

ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের (ইইএএস) এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক পাওলা পাম্পালোনি প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন। বাংলাদেশে নিযুক্ত ইইউর রাষ্ট্রদূত চার্লস হোয়াইটলি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে রয়েছেন।

ইইউ প্রতিনিধিদল মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলে এবং বাংলাদেশ পক্ষ জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনায় (ইউপিআর) বাংলাদেশের সফল প্রতিরক্ষা সম্পর্কে তাদের জানায়।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ইইউ প্রতিনিধিদল পরবর্তী সরকার গঠনের আশা প্রকাশ করে। উভয় পক্ষ জাতীয় কর্মপরিকল্পনার সংস্কার এবং এর অগ্রগতি নিয়ে আলোচনা করেছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রম খাতে একটি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০২১-২০২৬) গ্রহণ করেছে এবং এই পরিকল্পনা আইএলও গভর্নিং বডির কাছে বাংলাদেশ সরকারের উপস্থাপিত রোডম্যাপের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত।

রোডম্যাপের লক্ষ্য হলো সংগঠনের স্বাধীনতা ও সম্মিলিত দর কষাকষির অধিকারসহ দেশের শ্রম অধিকারগুলোর উন্নতি করা।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, “আমরা কীভাবে জিএসপি প্লাস কর্মসূচিতে প্রবেশাধিকার পেতে পারি তা নিয়েও আলোচনা করেছি। আমরা শ্রম খাতের সংস্কারে সরকারের গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে জানিয়েছি”।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ শ্রম খাতের অবস্থার উন্নয়নে আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। “সরকার শুধু আইন প্রণয়নই নয়, তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নেও অঙ্গীকারবদ্ধ”।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতির প্রশংসা করলেও শিশুশ্রম, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা ও শ্রমিক ইউনিয়নের ক্ষেত্রে উন্নতির সুযোগ রয়েছে বলেও উল্লেখ করে।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, “আমরা মানবাধিকার ও শ্রম অধিকারের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি তুলে ধরেছি”। স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের যে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রয়োজন তা নিয়েও উভয় পক্ষ বিস্তারিত আলোচনা করেছে। আগামী বছরের মার্চে ইইউ শ্রম সংস্কার বিষয় নিয়ে আরও আলোচনা করবে।

মাসুদ বিন মোমেন বলেন, শিগগিরই জিএসপি প্লাসের কাঠামো চূড়ান্ত করা হবে। তিনি আরও বলেন, “একবার এটি চূড়ান্ত হয়ে গেলে, সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে এটি নিয়ে আলোচনার পথ উন্মুক্ত করবে”।

শ্রমসচিব এহসান ই এলাহী বলেন, জাতীয় কর্মপরিকল্পনায় বিদ্যমান ৯টি লক্ষ্যমাত্রার ৮০ শতাংশ পূরণ হয়েছে।

ইইউ প্রতিনিধিদল জানতে চায় আইএলও সন্তুষ্ট কি না। তিনি বলেন, আইএলওর বেশির ভাগ সুপারিশই মেনে নেওয়া হয়েছে। অন্য অংশে থাকা কিছু পরামর্শ গ্রহণ করতে পারিনি আমরা”।

এর আগে মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) ইইউ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আলোচনা করেন ট্রেড ইউনিয়ন ও শ্রমিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। তারা ইইউর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা স্বীকার করে বলেন, ইইউ বাংলাদেশের বৃহত্তম বাণিজ্যিক অংশীদার।

প্রতিনিধিদলকে তারা জানান, বিভিন্ন ধরনের সমস্যা হতে পারে, তবে তারা চান বাণিজ্যিক সম্পর্ক অব্যাহত থাকুক এবং আরও বিকশিত হোক। তারা ইইউ প্রতিনিধিদলকে সরকার ও বিজিএমইএর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন, যাতে তারা মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার পরিস্থিতির উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।

এ ছাড়া শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান এবং প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল মিয়াসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে শ্রম ও মানবাধিকার বিষয়ে বিস্তারিত মতবিনিময় করেন পাওলা পাম্পালনি।

দেশের শ্রম খাতের সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করতে প্রতিনিধিদলটি রবিবার (১২ নভেম্বর) ঢাকায় এসেছে।

শ্রম ও মানবাধিকারের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সংস্কারে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান ইইউ প্রতিনিধিদলের

এদিকে সফররত ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) প্রতিনিধিদল আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি ও চর্চা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের প্রচেষ্টাকে জোরদার করার সুপারিশ করেছে।

শ্রম খাতের ওপর জাতীয় কর্মপরিকল্পনা সম্পূর্ণরূপে বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে পর্যবেক্ষক মিশন। বিশেষ করে সমিতির স্বাধীনতা, সম্মিলিত দরকষাকষি এবং ত্রিপক্ষীয় পরামর্শের মাধ্যমে শ্রমিক ইউনিয়নগুলোর অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রতিনিধিত্বমূলক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেয় মিশনটি। ইইউ কর্মকর্তারা পোশাক খাতে নিরাপত্তার মানোন্নয়নের অগ্রগতিকে স্বাগত জানান এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক অধিকার উন্নয়নে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন।

ঢাকায় পৌঁছেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধি দল। ১২ নভেম্বর, ২০২৩।
ঢাকায় পৌঁছেছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) একটি প্রতিনিধি দল। ১২ নভেম্বর, ২০২৩।

এক বিবৃতিতে ইইউ বলেছে, “শ্রম ও মানবাধিকার উভয় ক্ষেত্রেই চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে”।

এতে বলা হয়, মানবাধিকারের ক্ষেত্রে, নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি (আইসিসিপিআর), মত প্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার এবং সুশীল সমাজের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করার মতো মূল ইবিএ কনভেনশনগুলো মেনে চলার জন্য আরও প্রচেষ্টা প্রয়োজন।

এ বিষয়ে জাতিসংঘ মানবাধিকার কাউন্সিলের ২০২৩ সালের ইউনিভার্সাল পিরিয়ডিক রিভিউয়ের (ইউপিআর) সুপারিশ গ্রহণ ও বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করেছে ইইউ।

এভরিথিং বাট আর্মস (ইবিএ) বাণিজ্য ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশের অঙ্গীকার পূরণের বিষয়টি মূল্যায়ন করতে ঢাকায় অবস্থান করছে ইইউ পর্যবেক্ষক মিশন।

ইবিএ ব্যবস্থা স্বল্পোন্নত দেশগুলোর জন্য শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকার দেয়, যা ইউরোপীয় বাজারে মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার সম্পর্কিত মূল কনভেনশনগুলোকে সম্মান করে।

বাংলাদেশ ইবিএর সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী। ২০২২ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানি ২৪ বিলিয়ন ইউরোতে পৌঁছেছে।

ইইউ প্রতিনিধিদলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইউরোপিয়ান এক্সটার্নাল অ্যাকশন সার্ভিসের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর পাওলা পাম্পালোনি। প্রতিনিধিদলে কর্মসংস্থান ও বাণিজ্যবিষয়ক ইউরোপীয় কমিশনের প্রতিনিধিরা রয়েছেন।

পর্যবেক্ষক মিশন বাংলাদেশ সরকারের কর্মকর্তা, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ট্রেড ইউনিয়ন, তৈরি পোশাক ব্র্যান্ড ও বিজিএমইএ'র সঙ্গে বৈঠক করে।

মিশন দুঃখ প্রকাশ করে বলেছে, বাংলাদেশ শ্রম আইনের সাম্প্রতিক সংশোধনীগুলো ইইউ ও আইএলও'র উদ্বেগের আংশিক সমাধান করেছে।

এসব লক্ষ্যে বাংলাদেশ শ্রম আইনের আরও সংশোধনী দ্রুত প্রবর্তনের জন্য সরকারের অঙ্গীকারকে স্বাগত জানায় মিশন।

ন্যাশনাল অ্যাকশন প্লানের (ন্যাপ) অধীনে সম্মত সময়সূচিতে বিলম্বের কথা উল্লেখ করে ইইউ দলটি প্রয়োজনীয় সংস্কারগুলো ত্বরান্বিত করার জন্য কর্তৃপক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

পাওলা পাম্পালোনি বলেন, বাংলাদেশ সফর ইবিএ ব্যবস্থার অন্তর্নিহিত অংশ মানবাধিকার ও শ্রম অধিকার পূরণের গুরুত্ব সম্পর্কে মূল অংশীজনদের সঙ্গে জড়িত হওয়ার একটি মূল্যবান সুযোগ দিয়েছে।

তিনি বলেন, “প্রয়োজনীয় সংস্কার ত্বরান্বিত করতে আমরা বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ, ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজ ও ট্রেড ইউনিয়নগুলোর সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করে যাব”।

ইইউ বাংলাদেশ সরকার এবং সকল অংশীজনদের সঙ্গে বিদ্যমান দ্বিপক্ষীয় সংলাপের মাধ্যমে ইবিএ কমপ্লায়েন্সের বর্ধিত মনিটরিং প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখবে।

ইবিএ শর্তাবলী মেনে চলার বিস্তারিত মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত ইইউর পরবর্তী জিএসপি প্রতিবেদনটি নভেম্বরের শেষে প্রকাশিত হবে।

২০২৪ সালের বসন্তে অনুষ্ঠেয় পরবর্তী ইইউ-বাংলাদেশ যৌথ কমিশনে সংস্কারের অগ্রগতি পর্যালোচনা করবে ইইউ।

XS
SM
MD
LG