অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

গাজার উত্তরাঞ্চলে 'পূর্ণাঙ্গ দুর্ভিক্ষ', বলছে জাতিসংঘ; এর অর্থ কি?

ফিলিস্তিনিরা গাজা ভূখন্ডের রাফাহতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪।
ফিলিস্তিনিরা গাজা ভূখন্ডের রাফাহতে খাবারের জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে আছে, ১৬ ফেব্রুয়ারী, ২০২৪।

জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির প্রধান বলেছেন, ইসরায়েল ও হামাসের মধ্যে প্রায় সাত মাস যুদ্ধের পর উত্তর গাজা "পূর্ণাঙ্গরুপে দুর্ভিক্ষে"র কবলে পড়েছে। কিন্তু একটি আনুষ্ঠানিকভাবে এবং অত্যন্ত সংবেদনশীল, দুর্ভিক্ষের ঘোষণা রাজনীতি এবং কতজন লোক মারা গেছে তা নিশ্চিত করার জটিলতার সম্মুখীন হবে।

সিন্ডি ম্যাককেইন রবিবার সম্প্রচারিত এনবিসির একটি সাক্ষাত্কারে বলেন, দীর্ঘকাল ধরে বাইরের খাদ্য সহায়তার উপর নির্ভরশীল এই অঞ্চলে মানবিক সরবরাহের উপর ইসরায়েলের কঠোর নিষেধাজ্ঞার কারণে গাজার সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন, বিধ্বস্ত অংশে বেসামরিক নাগরিকদের প্রান্তিক অবস্থানে ঠেলে দিয়েছে। তিনি বলেন, দুর্ভিক্ষ এখন গাজার দক্ষিণ দিকে অগ্রসর হচ্ছে।

ডব্লিউএফপি-এর একজন মুখপাত্র পরবর্তীতে দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, দুর্ভিক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণার তিনটি মাপকাঠির মধ্যে একটি ইতোমধ্যেই গাজার উত্তরাঞ্চলে সম্পূর্ণভাবে দেখা দিয়েছে এবং অন্যটি প্রায় পূরণের পথে রয়েছে - এটিই মারাত্মক অনাহার নথিভুক্ত করার প্রচেষ্টা কতদূর এগিয়েছে তার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ।

ইসরায়েল তার শীর্ষ মিত্র যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যদের কাছ থেকে গাজায় আরও সহায়তা প্রবেশ করতে দেওয়ার জন্য ক্রমবর্ধমান চাপের সম্মুখীন হচ্ছে, বিশেষ করে ট্রাকের মাধ্যমে সবচেয়ে কার্যকরী উপায়ে মানবিক সহায়তা সরবরাহের জন্য আরও স্থল সীমান্ত খোলার জন্য। মানবিক সহায়তা গোষ্ঠীগুলি বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এবং অন্যান্য দেশগুলি দ্বারা আকাশ ও সমুদ্রপথে যে সরবরাহ করা হয় তা গাজার ২৩ লক্ষ মানুষের চাহিদা মেটাতে পারে না। এই সংখ্যার একটি ক্রমবর্ধমান সংখ্যক মানুষ অপুষ্টির পর্যায়ে পৌঁছেছে যেখানে একটি শিশুর বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে এবং এরপর তাদের মৃত্যু ঘটে।

মার্চ মাসে ইন্টিগ্রেটেড ফুড সিকিউরিটি ফেজ ক্লাসিফিকেশনের একটি প্রতিবেদনে গাজার কিছু অংশে দুর্ভিক্ষের কথা বলা হয়। এটি একটি বৈশ্বিক উদ্যোগ যাতে ডব্লিউএফপি একটি অংশীদার হিসাবে অন্তর্ভুক্ত। এতে বলা হয়, গাজার জনসংখ্যার প্রায় এক তৃতীয়াংশ সর্বাপেক্ষা বিপর্যয়কর ক্ষুধার শিকার হচ্ছে এবং জুলাই নাগাদ তা বেড়ে প্রায় অর্ধেক হতে পারে।

পরবর্তী আইপিসি রিপোর্ট জুলাইয়ে আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। ইসরায়েল গাজায় দুর্ভিক্ষের যে কোনো দাবিকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাদের মানবিক সংস্থা ম্যাককেইনের দাবিটিকে ভুল বলে অভিহিত করেছে। একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণাপত্র আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতে প্রমাণ হিসাবে ব্যবহার করা যেতে পারে, যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার আনা একটি মামলায় ইসরায়েলকে গণহত্যার অভিযোগের মুখোমুখি করা হয়েছে।

গাজার দুর্ভিক্ষ এবং ক্ষুধা সংকট সম্পর্কে যা যা জানা গিয়েছে এখানে তার বিবরণ দেয়া হল।

দুর্ভিক্ষ মানে কি

আইপিসি অনুসারে, তিনটি জিনিস ঘটলে একটি অঞ্চলকে দুর্ভিক্ষের শিকার বলে মনে করা হয়: ২০ শতাংশ পরিবারে খাদ্যের চরম অভাব রয়েছে বা মূলত অনাহারে রয়েছে; কমপক্ষে ৩০ শতাংশ শিশু তীব্র অপুষ্টি বা অপচয়ে ভুগছে, যার অর্থ তারা তাদের উচ্চতা হিসেবে অনেক চিকন; এবং প্রতি ১০,০০০ জনে দুইজন প্রাপ্তবয়স্ক বা চারজন শিশু প্রতিদিন ক্ষুধা ও এর জটিলতা সংক্রান্ত কারণে মারা যাচ্ছে।

ডব্লিউএফপির সিনিয়র মুখপাত্র স্টিভ তারাভেলা দ্য অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে বলেন, গাজার উত্তরাঞ্চলে, খাদ্যের চরম অভাবের প্রথম শর্ত পূরণ হয়েছে। তিনি বলেন শিশুরা তীব্র অপুষ্টির শিকার হওয়ায় দ্বিতীয় শর্তটি প্রায় পূরণের পথে। তবে মৃত্যুর হার নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

এটা করা কঠিন। ত্রাণ সহায়তা সংস্থাগুলি বলে, ইসরায়েলি বিমান হামলা এবং অভিযান গাজার উত্তরাঞ্চলে চিকিৎসা পরিষবোকে ধ্বংস করেছে এবং জনসংখ্যার বেশিরভাগ অংশকে বাস্তুচ্যুত করেছে। এতে তাদের কাছে পৌছানোর বিধিনিষেধের পাশাপাশি, তাদের মৃত্যুর তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে সংগ্রহ করার ক্ষমতাকে জটিল করে তোলে।

বিপর্যয়কর ক্ষুধার কারণসমূহ

একবার গাজার অভ্যন্তরে পৌছালে, খাদ্য এবং অন্যান্য সাহায্য সবসময় সবচেয়ে দুর্বলদের কাছে পৌঁছায় না। সহায়তা সংস্থাগুলি বলে, চলমান লড়াই এবং বিশৃঙ্খল নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে প্রবেশ সীমিত, বিশেষ করে উত্তরে।

গাজা সিটিসহ গাজার উত্তরাঞ্চল ছিল ইসরায়েলের আক্রমণের প্রথম লক্ষ্যবস্তু এবং তা ক্ষুধা সংকটের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়। অনেক মানুষ পশুর খাদ্য খেতে এবং খাবারের জন্য আগাছা সংগ্রহ করতে বাধ্য হয়। মার্চ মাসে আইপিসি রিপোর্টে বলা হয়, উত্তরাঞ্চলের প্রায় ২,১০,০০০ জন মানুষ বিপর্যয়মূলক ক্ষুধার সম্মুখীন হয়।

কিভাবে দুর্ভিক্ষ এড়ানো যায়

মানবতাবাদী দলগুলো বলছে, যুদ্ধবিরতি ছাড়া জীবন রক্ষাকারী সহায়তা সরবরাহ করা কঠিন হবে। কিছু বিশেষজ্ঞ বলেন, এমনকি যুদ্ধে বিরতি দিয়েও, গাজার উত্তরাঞ্চলের পরিস্থিতি একটি আজীবন-স্থায়ী পরিণতিতে পরিণত হবে, বিশেষ করে নবজাতক এবং গর্ভবতী নারীদের জন্য।

গাজার মানুষের কথা

কিছু ফিলিস্তিনি বলেন, সাহায্য বৃদ্ধির ফলে, বিশেষ করে খাবারের দাম কমানোর ফলে পরিস্থিতি কিছুটা সহজ হয়েছে।

গাজা শহরের বাসিন্দা সাইদ সিয়াম বলেন, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দাম কমেছে। তবুও, ১৮ বছর বয়সী এই যুবক বলেন, যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে তিনি এবং তার পরিবারের সদস্যরা প্রত্যেকে কমপক্ষে ১০ কিলোগ্রাম (২২ পাউন্ড) ওজন হারিয়েছেন। তারা বেশিরভাগই প্রতিদিন এক বেলা কুমড়ার স্যুপ খান। ফল, শাকসবজি এবং তাজা মাংস দুষ্প্রাপ্য।

This item is part of
XS
SM
MD
LG