অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

চব্বিশের লোকসভা ভোটে দু’রকম নরেন্দ্র মোদীকে দেখা গেল কেন?


নরেন্দ্র মোদী
নরেন্দ্র মোদী

কলকাতা থেকে কতদূর আর হবে? কমবেশি বিশ কিলোমিটার। গ্রামের নাম শ্রীনগর। মসজিদের অদূরে তাঁর বাড়ির দাওয়ায় বসে কথা বলছিলেন মৌলানা সিদ্দিক ঢালি— "এই মানুষটা কেমন বেমালুম মিথ্যে কথা বলেন দেখেছেন!” মিথ্যে কথা? “হ্যাঁ মিথ্যে কথাই তো? এই সেদিন বলছিলেন, বিরোধী জোট ক্ষমতায় এলে দেশের সব সম্পদ তাদের কাছে চলে যাবে, যাদের বেশি ছেলেপুলে হয়। বলছিলেন না?”

“বাংলায় এসে বললেন তো, এখানে হিন্দুরা দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে গেছে। কলকাতা থেকে এই যে ঘুঁটিয়ারিতে এলেন, কোথাও মনে হল কি হিন্দুরা সেকেন্ড ক্লাস? এটা হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ করা নয়?”

বেশিদূর পুঁথিগত পড়াশোনা করেননি সিদ্দিক। এখন মৌলানা। মসজিদের ইমাম। রক্ষণশীল মুসলিম। পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়েন। বললেন, “এই গ্রামে ছোট থেকে বড় হয়েছি। এখানে মুসলমানের সংখ্যা বেশি। আশপাশের গ্রাম রয়েছে, ওখানে সব হিন্দু। ছোটবেলায় খেলেছি একসঙ্গে। কেউ তো বলেনি, তোরা এখানে কেন, পাকিস্তানে চলে যা। কেউ তো বলেনি, তোরা আমাদের সব খেয়েপরে নিচ্ছিস। ওরাও জানত এ দেশ তো আমারই। ওরাও জানত আমাদের মিলেমিশেই থাকতে হবে।”

তাতে কি কোনও ফারাক হয়েছে এখন?

হয়নি কি? “এই যে অনবরত উস্কানি দেওয়া চলছে, তাতে হিন্দুদের অনেকেই কি বিভ্রান্ত হচ্ছেন না! তাঁরা সবাই কি এখন মুসলমানদের আগের মতোই দেখেন? মুসলমানরাও কি বিপন্ন বোধ করছে না এতে? তারা কোথায় যাবে? এই ক্ষত কীভাবে গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে, কেউ খোঁজ রাখছে কি?”

কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তার ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় পৌঁছান। ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী তার ভারত জোড়ো ন্যায় যাত্রা নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায় পৌঁছান। ৩১ জানুয়ারি, ২০২৪।

দেশে প্রথম দফার ভোট শেষ হতেই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে যেন নতুনভাবে আবিষ্কার করেছিলেন অনেকে। সর্বভারতীয় রাজনীতিতে মোদীকে বিরোধীরা অনেকেই সাম্প্রদায়িক নেতা বলেন। তা আজ থেকে নয়। ২০০২ সালে গোধরা-কাণ্ডের পর থেকেই তাঁর ওপর সেই তকমা সেঁটে দিয়েছেন তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষরা। সে প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। কিন্তু এবার প্রথম তিন দফা পর্যন্ত ভোটের প্রচারে প্রধানমন্ত্রী যে রকম চড়া দাগের হিন্দু-মুসলমান তর্ক জুড়েছিলেন, তাতে বিস্মিত হয়েছেন অনেকেই।

প্রধানমন্ত্রী বলছিলেন, "ইন্ডিয়া জোট ক্ষমতায় এলে হিন্দু মহিলাদের মঙ্গলসূত্র কেড়ে নেওয়া হবে।" "অনগ্রসর শ্রেণিদের জন্য রাখা সমস্ত সংরক্ষণ মুসলিমদের দিয়ে দেওয়া হবে।" "সব মানুষের কাছে গিয়ে কানে কানে বলতে হবে", "জয় শ্রীরাম" ইত্যাদি।

সংখ্যালঘুরা তো বটেই, বহু উদার হিন্দুদেরও মনে হচ্ছিল, অন্তত প্রধানমন্ত্রীর থেকে এটা অনভিপ্রেত। যে দেশের প্রায় কুড়ি শতাংশ মানুষ সংখ্যালঘু, সে দেশের প্রধান প্রশাসকের মুখে এ কথা বেমানান বলেছেন অনেকে। দিল্লিতে বিধানসভা ভোটের সময়ে খোদ কেন্দ্রীয় মন্ত্রী অনুরাগ ঠাকুর স্লোগান তুলেছিলেন, ‘গোলি মারো শালো কো!’ বিজেপির ছোট, মেজো, সেজো নেতাদের মুখে এসব কথা প্রায়ই শোনা গেছে। এবার প্রধানমন্ত্রীও একই সুরে বললেন।

এহেন প্রধানমন্ত্রী অবশ্য এখন সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়ে সম্পূর্ণ ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গিয়েছেন। তিনি বলছেন, “আমি সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে তো একটা কথাও বলিনি। আমি যেদিন হিন্দু-মুসলমান করব, সেদিন দেশের প্রধানমন্ত্রী পদে থাকার আর যোগ্য থাকব না। আমি শুধু কংগ্রেসের তুষ্টিকরণ ও ভোট ব্যাংক রাজনীতির কথা বলেছি।” শুধু তা নয়, প্রধানমন্ত্রী এও বলেছেন, কে বলেছে যে বেশি সংখ্যায় ছেলেপুলের কথা বললেই তা কেবল মুসলিমদেরই বোঝায়!

প্রধানমন্ত্রীর রাতারাতি এই ভোল বদলকে মিথ্যা কথা বলছেন সিদ্দিক ঢালি। তাঁর প্রশ্ন, “সমাজজীবনে এত বড় মিথ্যে কেউ বলতে পারেন? দেশের সবাইকে কি উনি বোকা ভাবেন?”

হিন্দু-মুসলমান তর্কে প্রধানমন্ত্রী এখন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন তা বিক্ষিপ্ত নয়। বরং ধারাবাহিক। গত সাত দিন ধরে প্রায় প্রতিটি সংবাদমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তা বলছেন প্রধানমন্ত্রী।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

কৌতূহলের বিষয় হল, ২০২৪ সালের এই লোকসভা ভোটে কেন এই দু’রকম মোদীকে দেখা গেল?

এবার প্রথম দফার ভোটের পর দেখা যায়, গোটা দেশজুড়ে কম হারে ভোট পড়েছে। প্রথম দফায় যেসব এলাকায় ভোট হয়েছে, গত নির্বাচনে সেখানে ৬৯.৯ শতাংশ ভোট পড়েছিল। এবার ভোট পড়েছে ৬৬.১৯ শতাংশ। দ্বিতীয় দফার ভোটেও তাই। আগের তুলনায় কম। মাত্র ৬৬.৭১ শতাংশ। তারপর থেকেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা এর ব্যাখ্যায় নেমে পড়েন। অনেকের মত ছিল, এই ভোটে কোনও ইউফোরিয়া নেই। উগ্র জাতীয়তাবাদের বিষয় একেবারে উবে গেছে তা নয়। তবে ২০১৯ সালে পুলওয়ামায় নাশকতা ও তারপর পাকিস্তানের বালাকোটে ভারতীয় বায়ুসেনা হামলা চালানোর পর যে ধরনের পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, তা এবার নেই। এও হতে পারে, বিজেপি তথা মোদীর সমর্থকদের অনেকেই মনে করছিলেন, এই ভোটের ফলাফল ঠিক হয়ে গেছে। তাহলে আর ভোট দিতে গিয়ে কী লাভ!

সম্ভবত এই পরিস্থিতি দেখেই প্যানিক বোতাম টিপেছিল বিজেপি। দলের কর্মী, সমর্থকদের উজ্জীবিত করতে প্রধানমন্ত্রী ক্রিজের বাইরে বেরিয়ে এসে ব্যাট চালাতে শুরু করেছিলেন। সংখ্যালঘুদের প্রশ্নে বা কংগ্রেস তথা ইন্ডিয়া জোটের বিরুদ্ধে এমন সব কথা বলতে শুরু করেছিলেন, যাতে হিন্দু ভোটের তীব্র মেরূকরণ হয়। হিসাব কষে দেখলে বোঝা যাবে, প্রায় ১৫-১৬ দিন ধরে একটানা তা করে গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

জানা গেল, প্রধানমন্ত্রী চড়া দাগের কথা যখন বলছিলেন, তখন বিজেপির অভ্যন্তরীণ সমীক্ষাও চলতে থাকে। তা ছাড়া যশবন্ত দেশমুখের মতো সেফোলজিস্টরাও বলতে থাকেন, ভোট শতাংশের হার যে কমেছে, তা শুধু বিজেপির কমেছে তা ভাবলে ভুল হবে। দক্ষিণ ভারতে যেখানে বিজেপির জনভিত্তি দুর্বল, সেখানেও ভোট শতাংশ কমেছে। সুতরাং এ দিয়ে বোঝা যাবে না বা বলা যাবে না যে বিজেপির আসন কমতে চলেছে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং অমিত শাহ।

এর পর তৃতীয় দফার ভোট আসতে আসতে দেখা যায়, পশ্চিমবঙ্গে প্রচারে এসে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলছেন, কেন্দ্রে সরকার গঠনের জন্য ‘সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে ফেলেছে বিজেপি’। যে ৩৮০টি আসনে ভোট হয়েছে, তার মধ্যে ২৭০টি আসনে জিতে গেছেন তাঁরা।

শুধু অমিত শাহর এই দাবি জানানো নয়, এও দেখা যায় এর পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর মুখেও আর চড়া দাগের হিন্দু-মুসলমান কথা নেই। বরং ব্যাখ্যা দিচ্ছেন, এ দেশে কীভাবে সাম্যের পরিবেশ রাখতে মরিয়া তিনি। ‘সবকা সাথ’-ই হল তাঁর ও বিজেপির মন্ত্র। ধর্মের ভিত্তিতে তিনি কোনও ভেদাভেদ করেন না।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক অমল মুখোপাধ্যায়ের মতে, “প্রথম দুই দফার ভোট শতাংশের হার কম দেখে বিজেপিকে হয়তো একটা অনিশ্চয়তা গ্রাস করছিল। বিজেপির নেতারা মনে করছিলেন, পরিস্থিতি বেগতিক। কিন্তু তৃতীয় দফার ভোট দেখা ও তাঁদের অভ্যন্তরীণ সমীক্ষার পর তাঁরা হয়তো এখন মনে করছেন, বিপদ কেটে গিয়েছে। আগের তুলনায় তাই অনেক বেশি আত্মবিশ্বাসী দেখাচ্ছে অমিত শাহদের। সম্ভবত সেই কারণে প্রধানমন্ত্রী তাঁর স্বাভাবিক প্রচারে ফিরে গিয়েছেন।”

আবার অনেকের মতে, মনে রাখতে হবে প্রধানমন্ত্রী তাঁর প্রচারে সংখ্যালঘুদের ব্যাপারে যা বলছিলেন, তা আন্তর্জাতিক মহলও ভালো চোখে দেখছিল। তা ছাড়া বিদেশি পত্রপত্রিকায় তাঁর সম্পর্কে যে ধরনের সমালোচনা হচ্ছিল, তা নিয়ে ভবিষ্যতেও প্রশ্নের মুখে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছিল। কেননা, এইসব কথা ইতিহাসে থেকে যাবে। ভারতে সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি নিয়ে এমনিতেই বারবার প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে। যুক্তরাষ্ট্রের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা থেকে শুরু করে বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন পর্যন্ত ভারতে সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। ফলে অতিশয় হিন্দু-মুসলমান তর্কের জন্য রাজনৈতিক পরিসর যে রকম কর্দমাক্ত হয়েছিল, এখন ঠিক করার চেষ্টা করছেন মোদীই।

হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
হোয়াইট হাউসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।

শুধু কূটনৈতিক বিষয়-আশয় নয়, ভারতের ঘরোয়া রাজনীতির জন্যও প্রধানমন্ত্রীকে তা ঠিক করতে হবে। নইলে ঘরোয়া পরিবেশে অস্থিরতার আশঙ্কাও থেকে যাচ্ছে। সংখ্যালঘু বিপন্ন বোধ করলে তা দেশের সুস্থির পরিস্থিতির জন্য মোটেই ইতিবাচক নয়।

তবে লোকসভায় কংগ্রেস নেতা অধীর চৌধুরীর বক্তব্য, “এসব আপনাদের ব্যাখ্যা হতে পারে। নরেন্দ্র মোদীর চারশ পারের গল্প শেষ। সেই কারণেই হিন্দু-মুসলমান তর্ক জুড়েছিলেন। এখন দেখছেন, তাও ব্যাকফায়ার করছে। এই মিথ্যাচার হিন্দুরাও নিচ্ছেন না। কর্মসংস্থানের অভাব, মুদ্রাস্ফীতির মতো পরিস্থিতিকে শাক দিয়ে ঢাকা যাচ্ছে না। এবার তাই অন্য ভেক ধরেছেন।”

অধীর চৌধুরী কংগ্রেসের নেতা। তিনি ব্যাপারটা এ রকম সাদাকালোয় দেখাতে চাইবেন, সেটাই স্বাভাবিক। তবে সিদ্দিক ঢালির কথাটা কানে লেগে থাকার মতো। তাঁর কথায়, “এই হিন্দু-মুসলমান খেলা স্বল্প মেয়াদের রাজনীতির ফায়দার জন্য হলে, মারাত্মক বইকি। মনে রাখতে হবে, সমাজের ক্ষতটা কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি হবে; যা দ্রুত সারানো যাবে না।”

XS
SM
MD
LG