অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কোন আইনে টেলিফোনে আড়িপাতা হয় বাংলাদেশে


সেলফোনে নানারকম অ্যাপ

প্রশ্নটা অনেক দিন থেকেই ছিল কোন আইনকানুনের ভিত্তিতে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলো বাংলাদেশে টেলিফোনে আড়িপাতে। এতদিন সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বিষয়টি স্বীকারই করত না। এমনকি দায়ভারও নেয়নি কেউ। তারপরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের টেলিফোন ভয়েস ফাঁস হয়ে চলে আসে মেইন স্ট্রিম মিডিয়া বা সামাজিক মাধ্যমে। কী করে সম্ভব হচ্ছে? আদৌ এ ব্যাপারে কোনো আইন আছে কিনা তদন্ত করতে গিয়ে দেখা যায় বৈধ আইন করে নিয়েছে সরকার। নতুন করে আরও আইনের প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়েছে। নতুন আইন ও প্রস্তাব নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। টেলিফোন ভয়েস রেকর্ড করতে সক্ষম সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ এনটিএমসির প্রধান ব্রিগেডিয়ার জিয়াউল আহসানের সঙ্গেও কথা হয় ভয়েস অব আমেরিকার। তিনি স্বীকার করেছেন, তার প্রতিষ্ঠান দেশের স্বার্থে সরকারের চাহিদা অনুযায়ী সহায়তা করছে বিভিন্ন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে।

ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান
ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান

ফোনালাপ ফাঁসের ব্যাপারে প্রশ্ন করলে ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার এনটিএমসির পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়াউল আহসান জবাবে বলেন, এনটিএমসি মূলত একটি প্ল্যাটফর্মের ভূমিকা পালন করে। বাংলাদেশের সরকার কর্তৃক নির্দেশিত ক্ষমতাপ্রাপ্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থা তাদের অপারেশনাল কাজকে ত্বরান্বিত করার জন্য এনটিএমসি থেকে কারিগরি সহায়তা নিয়ে থাকে। প্রত্যেক সংস্থাই আলাদা আলাদাভাবে এই সহায়তা নিয়ে থাকে। এখানে, কোন সংস্থা কার ফোন রেকর্ড করছে এনটিএমসির জানার কোনো সুযোগ নেই।


বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশেও আড়িপাতা নিয়ে আলাদা আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়া বলেন, বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং অপরাধী-চক্রের গোপন পরিকল্পনা আগে থেকে জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই আড়িপাতার প্রয়োজন হয়। তবে বিষয়টি অবশ্যই আইনগত কাঠামোর ভিত্তিতে হতে হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার গুরুত্বের পাশাপাশি ব্যক্তির প্রাইভেসিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে ফোনালাপ রেকর্ড করা বা আড়িপাতা হয়, কিন্তু সেখানে আমাদের দেশের মতো ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা দেখা যায় না। এসব কারণে আইনি কাঠামো শক্তিশালী করার জন্য এ সম্পর্কিত আলাদা আইনের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে আমি মনে করি। এ ব্যাপারে আমি বিভিন্ন সময়ে সরকারের উচ্চ পর্যায়ের সভা এবং সংসদীয় কমিটির সভায় বলেছি। আশা করছি সরকার বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে এনটিএমসির কার্যপ্রণালি যথাযথভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে একটি সুনির্দিষ্ট আইন প্রণয়নের জন্য দ্রতই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।


এবার দেখা যাক বর্তমান সরকারি আইন কী বলে?


২০০১ সালে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন পাস হয়। পরবর্তীতে ২০১০ সালে সেই আইনটি সংশোধন করা হয়। এ আইনে ফোনে আড়িপাতাকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ করা হয়েছে। তবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার স্বার্থে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ (সংশোধিত) আইন ২০০৬-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ আইন ২০০১ এ সন্নিবেশিত ৯৭ (ক) ধারা অনুসরণ করেই অনেক সময় ব্যক্তির ফোন কল রেকর্ড করে থাকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।

ধারাটি হচ্ছে ৯৭ ক। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে বিশেষ বিধান
(১) এই আইন বা অন্য কোন আইনে ভিন্নতর যাহা কিছুই থাকুক না কেন, (১) রাষ্ট্রের নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলার স্বার্থে যে কোন (২) টেলিযোগাযোগ সেবা ব্যবহারকারীর (৩) প্রেরিত বার্তা ও কথোপকথন প্রতিহত, রেকর্ড ধারণ বা তৎসম্পর্কিত তথ্যাদি সংগ্রহের জন্য সরকার সময় সময় নির্ধারিত সময়ের জন্য গোয়েন্দা সংস্থা, জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থা, তদন্তকারী সংস্থা বা আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে নিয়োজিত সংস্থার কোন কর্মকর্তাকে ক্ষমতা প্রদান করিতে পারিবে এবং উক্ত কার্যক্রমে সার্বিক সহায়তা প্রদানের জন্য (৪) টেলিযোগাযোগ সেবা প্রদানকারীকে নির্দেশ দিতে পারিবে এবং পরিচালনাকারী উক্ত নির্দেশ পালন করিতে বাধ্য থাকিবে।

(২) এই ধারার উদ্দেশ্য পূরণকল্পে “সরকার” বলিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে বুঝাইবে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর অনুমোদনক্রমে এই ধারার বিধান প্রয়োগযোগ্য হইবে।

সরকারি মহল থেকে বলা হচ্ছে, জঙ্গি তৎপরতা ঠেকাতে, বিদেশি গুপ্তচর সন্দেহ করলে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে উল্লিখিত আইন অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এনটিএমসির (ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন্স মনিটরিং সেন্টার) সহায়তায় যথাযথ কর্তৃপক্ষের অনুমোদনক্রমে কারও ফোন কল রেকর্ড করতে পারেন।

তারপরও কেন এত বিতর্ক


বিশ্বের অনেক দেশের মতো বাংলাদেশেও রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্র্মী, আইনজীবী, সরকারি কর্মকর্তা, বিজ্ঞানী, ব্যবসায়ী, ধর্মীয় নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি-পেশার মানুষের ফোনে আড়িপাতার ঘটনা ফাঁস হয়েছে। সাবেক প্রেসিডেন্ট, দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীও বাদ যাননি। ভিকারুননিসা নূন কলেজের অধ্যক্ষ, হেফাজতে ইসলামের আলোচিত নেতা মাওলানা মামুনুল হক, যশোর-৬ আসনের সংসদ সদস্য শাহীন চাকলাদার, ফরিদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী নিক্সনের ফোনালাপ ফাঁস সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে বেশ আলোচিত ছিল। কয়েক বছর আগে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া ফোন কল, এরপর বিএনপি নেতা তারেক রহমান ও শমসের মবিন চৌধুরী, সাদেক হোসেন খোকা ও মাহমুদুর রহমান মান্না, মাহি বি চৌধুরী ও আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বেশ কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের টেলিফোন কথোপকথন ফাঁস হয়েছে। বাংলাদেশ কোটা সংস্কার আন্দোলনের নেতা এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি নুরুল হক নূরের ফোনালাপ ফাঁস হয়েছিল। যার কারণে তার নামে মামলা হয়েছিল। বাংলাদেশের ফোনালাপে ফাঁস হওয়া বেশিরভাগই বিতর্কিত কথাবার্তা, ব্যক্তিগত দুর্বলতা বা চক্রান্ত প্রকাশ্যে এসেছে। এসব ফোনালাপ ফাঁস হওয়ায় তারা বেকাদায় পড়েছেন বা বিব্রত হয়েছেন। এই কারণে বিষয়টি আলোচনায় এসেছে।

এ ব্যাপারে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল জিয়া বলেন, ফোনালাপ কোনো আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ফাঁস হয় বলে আমি মনে করি না। যেমন, ভিকারুননিসা নূন কলেজের অধ্যক্ষের ফোনালাপ ফাঁসের ব্যাপারে যদি বলি, আপনারা জানেন, ভিকারুননিসা নূন কলেজের অধ্যক্ষ যার সঙ্গে কথা বলছিলেন তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, তার মোবাইলে কল রেকর্ডার অ্যাপ ইন্সটল করা ছিল। স্বয়ংক্রিয়ভাবে ওই কলটি রেকর্ড হয়ে যায়। যা পরবর্তীতে কেউ সোশ্যাল মিডিয়াতে প্রকাশ করে। এভাবেই দুই পক্ষের কোনো একজনের অসাবধানতা বা কেউ উদ্দেশ্যমূলকভাবে এসব ফোনালাপ ফাঁস করে থাকে বলে আমি মনে করি।


আড়িপাতার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন


সুপ্রিম কোর্টের হাই কোর্ট বিভাগের প্রকাশিত এক রায়ে এ বিষয়টি নিয়ে অনেকটা পরিষ্কার দিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। রায়ে বলা হয়েছে, সংবিধানের ৪৩ নম্বর অনুচ্ছেদে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ও অন্যান্য যোগাযোগের ক্ষেত্রে গোপনীয়তার অধিকারের নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। এটি কোনো স্বার্থবাদী গোষ্ঠীর বেসরকারি মুঠোফোন অপারেটর কোম্পানি থেকে আনুষ্ঠানিক লিখিত চাহিদা ছাড়া এবং গ্রাহককে অবহিত না করে কললিস্ট বা কল রেকর্ড সংগ্রহ অবশ্যই বন্ধ হওয়া উচিত।

বিষয়টি নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান খন্দকার ফারজানা রহমান বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশে ব্যক্তির রাইট অব প্রাইভেসি সংরক্ষণ করা আছে। আমাদের মতো দেশে তা নেই বলেই টেলিফোনে আড়িপাতার কথা শুনি। এ ব্যাপারে ব্যক্তির অধিকার যেন ক্ষুন্ন না হয় সেদিকে দৃষ্টি রাখতে হবে। রাষ্ট্র ও সরকারের ইন্টারেস্ট- এ দুটি একসঙ্গে গুলিয়ে ফেললে হবে না। অনেক সময় সবকিছু একাকার করে ব্যক্তির প্রাইভেসি ক্ষুন্ন করা হয়। যা কোনোভাবে কাম্য নয়। জঙ্গি সন্ত্রাসী আটকে ফোন ট্যাপ করা আর কারও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা জনসম্মুক্ষে প্রকাশ আলাদা বিষয়। "মানুষের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা প্রকাশের (আমি) অবশ্যই বিপক্ষে। সন্ত্রাসী আটক করুন। কিন্তুু সাধারণ নাগরিক যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেদিকেও খেয়াল রাখুন।"


সুপ্রিম কোর্ট আপিল বিভাগের বিচারপতি (অব.) শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক বলেন, অপরাধ কার্যক্রমে প্রযুক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি পাওয়ায় মোবাইল ফোনে আড়িপাতা কিংবা ইন্টারনেটে নজরদারির বিষয়টি রাষ্ট্র ও মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজন হয়। বিশ্বের অনেক দেশ করে থাকে। বিভিন্ন সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং অপরাধী চক্রের গোপন পরিকল্পনা আগে থেকে জেনে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার জন্যই নজরদারির প্রয়োজন। তবে রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যেমন গুরুত্ব আছে, তেমনি ব্যক্তির নিরাপত্তারও গুরুত্ব আছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তার জন্য কিছু তথ্য সংগ্রহ করা বা আড়িপাতার প্রয়োজন হতে পারে। সেটা হতে হবে আইনগত ভিত্তির ওপর। বিভিন্ন রাষ্ট্রের যখন এ ধরনের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়, তার জন্য একটি শক্ত আইনি ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশে প্রয়োজনে আইন করা যেতে পারে। এতে কোনো সমস্যা দেখি না। জননিরাপত্তা ও জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাস দমনে অবশ্যই সরকার নজরদারির অধিকার রাখে।

XS
SM
MD
LG