অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

উগ্রবাদ নিয়ে উৎকন্ঠা এখন বিশ্বব্যাপী । যুক্তি পরাস্ত হচ্ছে বার বার অপশক্তির কাছে । ভক্তিও আনত প্রায় অপশক্তির উপদ্রবেই ।

মানবতাবোধের প্রতি অকষ্মাৎ এই চ্যালেঞ্জ কেন, এর স্বরূপ কি, কী ভাবেই বা এ থেকে বেরিয়ে আসা যায় , এ সব কিছুর অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ নিয়ে আমাদের এই রবিবারিক আয়োজন।

আমরা গত অনুষ্ঠানে ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার সেই তত্ব নিয়ে আলোচনা করেছিলাম যেখানে তিনি বলেছেন যে পশ্চিমি গণতন্ত্রের বিজয় সাধনে ইতিহাস তার পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। কিন্তু ইতিহাস যে পূর্ণতা লাভ করেনি, করেনা সেটা পরবর্তী ঘটনা প্রবাহে প্রমাণিত হয়েছে। অনেকটা যেন ১৯৯২ সালে প্রকাশিত ফ্রান্সিস ফুকুইয়ামার তত্বের বিপরীত তত্ব হিসেবে সভ্যতার সংঘাত বা The Clash of Civilization ‘এর কথা বললেন আরেক রাষ্ট্র বিজ্ঞানি স্যামুয়েল হান্টিংটন। হান্টিংটন বলেন যে ১৯৮৯ সালে বার্লিন প্রাচীরের পতনের পর যে এক ধরণের উল্লাস দেখা দিয়েছিল তা যেন দ্রুতই হারিয়ে যায়। তখন মনে কা হয়েছিল যে আমরা এক ধরণের নতুন বিশ্বব্যবস্থার দিকে এগুচ্ছি , যেখানে মুক্ত গণতন্ত্র এবং পুঁজিবাদ গোটা বিশ্বে সম্প্রসারিত হবে আর নতুন এক সম্মিলনের যুগের সূচনা হবে। কিন্তু তা হয় নি। ইতিহাস ও সেখানে থেমে যায়নি।

স্যামুয়ল হান্টিংটন প্রথমে তাঁর এক ভাষণে , পরে এক নিবন্ধে এবং তারও পরে ১৯৯৬ সালে প্রকাশিত The Clash of Civilization and the Remaking of World Order বইটিতে বলেন যে শীতল যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে বিশ্বের বিভিন্ন সংস্কৃতির মধ্যে সংঘাত বাধবে, বিশেষত পশ্চিমি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে সোচ্চার ও সক্রিয় হয়ে উঠবে বিভিন্ন সংস্কৃতি ও সভ্যতা। এখানে তিনি ইসলামের কথা উল্লেখ করেন । বর্তমানে প্রয়াত , স্যামুয়েল হান্টিংটন সেই সময়ে এক সাক্ষাৎকারে বলেন যে শীতল যুদ্ধের সময়ে বিশ্ব তিন ভাগে বিভক্ত ছিল , যুক্তরাষ্ট্রের নের্তৃত্বে মুক্ত বিশ্ব , সোভিয়েট ইউনিয়নের নের্তৃত্বাধীন কমিউনিস্ট বিশ্ব এবং মোটামোটি জোট নিরপেক্ষ তৃতীয় বিশ্ব। ইতিহাসের সেই আকৃতির পরিবর্তন ঘটেছে। সুতরাং প্রশ্ন উঠতেই পারে যে শীতল যুদ্ধোত্তর সময়ে , বিভিন্ন জাতির মধ্যে সমন্বয়ের এবং সংঘাতের রূপটা কি হবে ? তিনি বলছেন একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন যে বিভিন্ন দেশ সমমনা সাংস্কৃতিক ভাবধারা সমন্বয় ঘটাচ্ছে এবং যে সব দেশ ঐতিহাসিক ভাবেই ভিন্ন সংস্কৃতির বাহক , তারা পৃথক হয়ে পড়ছে। আর তাই হান্টিংটন মনে করছেন যে বিভেদ রেখাটা সাংস্কৃতিক পার্থক্য ধরেই হবে , যা কীনা সভ্যতায় সভ্যতায় সংঘাত ঘটাবে।

তিনি আরও বলেন এ কথা সত্যি যে জাতীয় স্বার্থ দ্বারাই এই বিভাজন পরিচালিত হবে। কিন্তু তিনি প্রশ্ন তোলেন , তা হ’লে এই জাতীয় স্বার্থকে তারা কি ভাবে সংজ্ঞায়িত করবে ? কাজেই হান্টিংটনের যুক্তি হলো এই জাতীয়তাবোধ সংজ্ঞায়িত এখন ক্রমবর্ধমান ভাবে সংজ্ঞায়িত হচ্ছে সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে। সুতরাং একই ধরণের সংস্কৃতি সম্পন্ন দেশগুলো যেমন একত্রিত হচ্ছে তেমনি ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে তারা পৃথক হয়ে পড়ছে। পূর্ব পশ্চিমের মধ্যকার এই দ্বন্দ্বকে হান্টিংটন যদিও সাংস্কৃতিক সংঘাত বলছেন এক অর্থে মুসিলম সভ্যতার সঙ্গে অন্যান্য সভ্যতার সংঘাতের কথাও তিনি তুলেছেন।

স্যামুয়েল হান্টিংটনের এই তত্ব সম্পর্কে দ্বিমত প্রকাশ করছেন ইসলামাবাদে কায়েদে আজম ইউনিভার্সিটির পদার্থবিজ্ঞানের অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় ।অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় বলেন অনেক মুসলমান যে পশ্চিমের দেশগুলোতে যায় , সেটাই বা কেন ; সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব থাকলে তো মুসলমানদের পশ্চিসে যাওয়ার কথা নয়। আবার পশ্চিমের দেশগুলো ও তো তাদের সহজে গ্রহণ করে , সেটা কেন ? হ্য়ত বলতে পারেন সস্তা শ্রম শক্তির জন্য কিন্তু সেই ধারণাটা ও সম্পুর্ণ ঠিক নয় । খোদ পশ্চিমের দেশগুলোতে বড় ধরণের বেকারত্বের সমস্যা রয়েছে। তারপরও দেখা যাচ্ছে যে ইউরোপে আমেরিকায় বসবাসরত মুসলমানদের সংখ্যা স্থানীয় এবং অভিবাসী উভয় ধরণের মুসলমানের সংখ্যা ক্রমশই বাড়ছে এবং মুসলমানরা সেখানে সর্বাধিক সংখ্যক ধর্মীয় সংখ্যালঘু। তিনি আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন । বলেন যে মুসলমান বাবা-মা’র যে সন্তান যুক্তরাষ্ট্রে জন্মায় সে তো অন্যান্যদের মতো আপনা থেকেই মার্কিন নাগরিক হয়ে যায় । কিন্তু যেমনটি পারভেজ হুদাভয় প্রশ্ন তোলেন কই সৌদি আরব সহ অনেক মুসলমান দেশের নাগরিকত্ব তো ও দেশে জন্মালেও পাওয়া যায় না। অথচ ঐ সব দেশ নিজেদেরকে ইসলামের রক্ষক হিসেবে দেখে। সুতরাং হান্টিংটনের তত্ব অনুযায়ী পশ্চিমের সঙ্গে সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্ব থাকলে কিংবা ইসলামের সংঘাত থাকলে , কেন পশ্চিমে আছে এমন অবারিত ধর্মীয় স্বাধীনতা । এ সম্পর্কে অধ্যাপক পারভেজ হুদভয় বলেন বাস্তবতা হচ্ছে যে খোদ যুক্তরাষ্ট্রে মসজিদের সংখ্যা বেড়েছে বহুগুণ । তিরিশ চল্লিশ বছর আগে মসজিদ ছিল বড় জোর ২০০-৩০০ ‘র মতো , আর এখন এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আড়াই হাজারের মতো। তা ছাড়া সাংবিধানিক ভাবে মুসলমানদের অধিকার অন্য যে কোন নাগরিকের অধিকারের সমান। তিনি বলেন বৈষম্য যে নয় তা নয় , কিন্তু বৈষম্যের বিরুদ্ধে বিচারের ব্যবস্থা আছে । আপনি পশ্চিমে ন্যায় বিচার পেতে পারেন। কিন্তু আপনি যদি সৌদি আরব বা পাকিস্তানে থাকেন , আপনার কি সুবিচার পাবার আদৌ কোন সম্ভাবনা আছে। উপসংহারে পারভেজ হুদাভয় প্রশ্ন রাখেন , মুসলমানদের প্রতি যদি মুসলিম দেশগুলোর তুলনায় ও পশ্চিমে ভালো ও ন্যায় সংগত আচরণ করা হয় , তাহলে সভ্যতার এই সংঘাতের প্রশ্নটা উঠছে কোত্থেকে ?

স্যামুয়েল হান্টিংটনের এই সভ্যতার সংঘাতের তত্ব নিয়ে আরও কিছু বিতর্কের কথা , আমরা শুনবো , আগামি রোববারে , উগ্রবাদ : উৎকন্ঠা ও উত্তরণ অনুষ্ঠানের ৬ষ্ঠ পর্বে । শোনার আমন্ত্রণ রইল।

এই অনুষ্ঠানটি রচনা ও উপস্থাপনায় ছিলেন আনিস আহমেদ ।

XS
SM
MD
LG