অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

উগ্রবাদের পেছনের কিছু মনস্তত্বের কথা আমরা আলোচনা করছিলাম গত অনুষ্ঠানে । একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হচ্ছে পাওয়ার বা ক্ষমতা অথবা শক্তি দেখানো। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় তো আসা যায় নির্বাচনের মাধ্যমেও এবং সেটা বৈধ গণতান্ত্রিক উপায় । আবার অনেক ক্ষেত্রে আমরা লক্ষ্য করি যে সামরিক অভূত্থানের মধ্য দিয়েও ক্ষমতা দখল করা হয়। সে রকম ক্ষমতায়নের বৈধতার প্রক্রিয়া আমরা দেখেছি বাংলাদেশ সহ বহু দেশে । কিন্তু ক্ষমতা দখলের বৈধ বা অবৈধ এ সব প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়েছে রাষ্টের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠি , যেমন ধরুন সেনাবাহিনী। আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোর একটি অংশই হচ্ছে সেনাবাহিনী । কিন্তু ক্ষমতা দখল এবং শক্তি প্রদর্শনের আরেকটি নতুন যে দিক আমরা লক্ষ্য করছি সাম্প্রতিক সময়ে সেটি হলো উগ্রবাদী ধারণাকে জোর করে চাপিয়ে দেওয়ার প্রচেষ্টা। আর এই প্রচেষ্টা কেবল যে রাজনীতির মধ্যে সীমিত তা নয় , সমাজ ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও বিস্তৃত হচ্ছে । বস্তুত সমাজে উগ্রবাদী ধ্যান ধারণা গ্রথিত করার জন্যই রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টা । পঞ্চান্ন বছর ধরে আমেরিকার পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে বিশেষজ্ঞ Insight Advisory Group ‘এর জ্যেষ্ঠ পরামর্শক টম ডাইন এই শক্তি বা ক্ষমতা সম্পর্কে বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেই হোক কিংবা যুক্তরাষ্ট্রের বাইরেই হোক , আরব বিশ্বে কিংবা বিশ্বের অন্যান্য উত্তেজনাপূর্ণ স্থানেই বলুন না কেন, এমন কী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে ও আমি থেকেছি , উগবাদ সাধারণত শুরু হয় ক্ষমতার লড়াইয়ের মাধ্যমে। কোন কোন ব্যক্তিবিশেষ বা কোন কোন গোষ্ঠি যখন তাদের চারপাশের অন্যদের জীবন নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ গ্রহণ করতে চায় , তখন তাদের এই কাজের যৌক্তিকতার ভিত্তি হচ্ছে ঐ অন্যদের নিয়ে তাদের শংকা কিংবা ঘৃণা। সে জন্যই আমার মনে হয় যে অসহিষ্ণুতা কিংবা উগ্রবাদ বা সহিংসতার কারণ হচ্ছে এই শংকা অথবা ঘৃণা। আর তিনি মনে করেন যে এই ধরণের আচরণই মূলত সবরকম সভ্যতা বহির্ভূত কর্মকান্ডের উপর প্রভাব বিস্তার করে থাকে।

উগ্রবাদের সঙ্গে ধর্মের যে সংশ্লিষ্টতা সেই প্রসঙ্গে মি ডাইন মনে করেন না যে রাজনীতি এবং ধর্মের সংশ্লিষ্টতা নতুন কিছু । তিনি বরঞ্চ দাবি করেন যে এই সংশ্লিতা পুরোনো এবং তা বহু যুগ ধরেই চলে আসছে ।

মি ডা্ইন বলছেন ধর্ম এবং ক্ষমতা , ধর্ম এবং রাজনীতিকে মিশিয়ে ফেলার বাপারটা বলা যায় মানব সভ্যতার একেবারের সূচনা লগ্ন থেকেই চলে আসছে। তবে সে কারণেই বোধ হয় লক্ষ্য করুন কি ভাবে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ক্ষমতা এবং ধর্মকে আলাদা করা
হয়েছে। অর্থাৎ মি ডাইন বোঝাতে চাইছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে ধর্ম এবং রাজনীতির পৃথকীরণ সম্ভব হয়েছে। এই যে প্রচলিত কথা , চার্চ এবং স্টেটের মধ্যে পার্থক্য এটাতো অন্যত্র মসজিদ ও রাষ্ট্রের মধ্য পৃথকীকরণ হিসেবেও গণ্য হতে পারতো কিংবা সিনেগগ ও রাষ্ট্রের মধ্যে পৃথকীকরণ হিসেবে দেখা যেতো। কিন্তু বহু দেশেই এখন দেখা যায় ধর্মের প্রবল প্রভাব। এমনকী এই যুক্তরাষ্ট্রেও ইভ্যানজেলিকাল খ্রীষ্টানরা চার্চ এবং স্টেটের পৃথকীকরণের বিরোধী । আর বেশ কয়েক প্রজন্ম ধরেই এখন এই ইভ্যানজেলিকাল খ্রীষ্টানদের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাও রাজনীতিতে প্রবেশ করছেন । মি ডাইন বলেন আর মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে তো দেখছেনই যে উগ্রবাদিরা ধর্মের নামেই তাদের তৎপরতা চালাচ্ছে । তারা তাদের সহিংসতা , তাদের নৃশংসতা এবং ক্ষমতা দখলের প্রচেষ্টার পেছনে যুক্তি হিসেবে ইসলামকে দাঁড় করিয়েছে। আর এরকম চিন্তাধারা একাধিক দেশে বিদ্যমান । এটা যেন সকলেই ধরে নিয়েছে যে এ ভাবেই চলতে থাকবে তবে মি ডাইন বলেন যে আমাদের এই ধরণের দৃষ্টিভঙ্গি এবং কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে রুখ দাঁড়াতে হবে।

কিন্তু এ কী কেবলই রাজনৈতিক বিষয় ? এর সঙ্গে মনস্তত্বের সংযোগ সম্পর্কে গত সপ্তার অনুষ্ঠানে ব্রিটেন থেকে পরমাণু বিজ্ঞানের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও গবেষক ড আনিসুর রহমান বলেছিলেন যে মনস্তত্ববিদ নিকোলাই সেনেলস মনে করেন যে রাগ দেখানোটা মুসলিম সংস্কৃতির একটা অংশ। এই রাগই উগ্রবাদে রূপান্তরিত হয় বলে সেনেলস মনে করেন। সেনেলস উগ্রবাদের পেছনে যে তিনটি কারণ কে চিহ্নিত করেছেন তার প্রথমটিই এই রাগের বিষয় । অন্যান্য কারণ সম্পর্কে
সেনেলসকে উদ্ধৃত করে ড আনিসুর রহমান বলছেন যে দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে Locus of Control অর্থাৎ নিয়ন্ত্রণের মূল জায়গাটা। এটার ব্যাখ্যাটা হলো এই যে আমাদের সঙ্গে যখন নানান ধরণের লোকজনের যোগাযোগ থাকে তখন আমরা তাদের উপর এক ধরণের নিয়ন্ত্রণ আরোপ করতে চাই। এই নিয়ন্ত্রণ কায়েম করাটাই
উগ্রবাদে রূপ নেয়। আর তৃতীয় যে বিষয়টি নিকোলাই সেনেলস বলছেন সেটি হচ্ছে মুসলিম পরিচিতির ব্যাপার। তিনি মনে করেন যে মুসলমানরা সব সময়ে এটাই ভাবেন যে তাঁদের জন্য মুসলিম পরিচিতিটাই একমাত্র এবং সর্বোচ্চ পরিচিতি। কিন্তু অন্য ধর্মের লোক যেমন ধরুন ইহুদি কিংবা হিন্দু এরা ভিন্ন ভিন্ন পরিচয়ে পরিচিত হতে পারে, পেশাগত কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়। মুসলমানদের জন্য তাদের ধর্মীয় পরিচিতিটাই যেন প্রধান হয়ে ওঠে।

অধ্যাপক আনিসুর রহমান এ পর্যায়ে ইসলামের একটা সামগ্রিক রূপ তুলে ধরেন এবং বলেন যে এই সামগ্রিক রূপের কারণে , ইসলামকে রাজনীতি , সমাজ কিংবা অর্থনীতি থেকে আলাদা করে দেখার কোন অবকাশ নেই ।

তা ছাড়া কোরানের ভাষা প্রায় ৯৫ শতংশ লোকই বোঝেন না। সুতরাং এর অপব্যাখ্যা দেন কিছু অর্ধশিক্ষিত ধর্মীয় নেতা । ইসলামের এই অপব্যাখ্যার সুযোগ গ্রহণ করে উগ্রবাদীরা , আইসিসের মতো সন্ত্রাসবাদী কার্যক্রমে যারা অন্তর্ভুক্ত তারা তাদের তৎপরতায় এক ধরণের যৌক্তকতা জোগানোর চেষ্টা করে। ইসলাম ধর্মের আর্থ-রাজনৈতিক সামগ্রিকতার সুযোগ গ্রহণ করে তারা । এই অপব্যাখ্যা , ভুল বিশ্লেষণ সম্পর্কে সতর্ক করে দিয়েছেন মিনেসোটা অঙ্গরাজ্য থেকে নির্বাচিত কংগ্রেসম্যান কীথ অ্যালিসন । কীথ অ্যালিসন খুব পরিস্কার ভাবেই বলছেন যে আইসিস আদৌ ইসলামের কোন রকম প্রতিনিধিত্ব করে না। তারা হত্যা , মৃত্যু , নির্যাতন-নিপীড়ন কেবল এগুলোরই প্রতিনিধিত্ব করে । তারা কেবল গুরুত্ব লাভের জন্য ইসলামকে ব্যবহার করে থাকে। । তারা বস্তুত কোন ভাল কাজই করছে না। শুধু তারা ঐ ধর্মের নাম ভাঙ্গিয়ে চলছে যে ধর্মটি প্রতিদিন চর্চা করেন দেড় শ ‘ কোটি লোক। সুতরাং আমি সবাইকে বলবো আপনারা যদি কোরান , হাদিস , সুন্নাহর মধ্য দিয়ে কোন উত্তর খোঁজেন , আইসিসের মাধ্যমে নয় , নিজেদের অধ্যয়নের মাধ্যমে , সমস্যার সমাধান খোঁজেন যাতে করে শান্তিপূর্ণ নিস্পত্তির মাধ্যমে সবাই মিলে একত্রে কাজ করে।

ইসলামের এই মানবিক দিকটিই সব রকমের গোঁড়ামি মুক্ত করুক বিশ্ব-সমাজকে , এটিই সকলেরই কাম্য।
উগ্রবাদ : উৎকন্ঠা ও উত্তরণ এই অনুষ্ঠানের পরবর্তী সংকলন আগামি রোববার ।

XS
SM
MD
LG