অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

ভারতের নতুন নাগরীকত্ব আইন নিয়ে AFP রিপোর্টের ছায়া অবলম্বনে মিয়া বুশের একটি প্রতিবেদন


ভারতে, নতুন একখানা বিভাজনমূলক, নবতর নাগরীকত্ব আইন, নতুনতর মাত্রায় গুমরে উঠেছে- চাগিয়ে তুলেছে উচ্চকিত প্রতিবাদ বিক্ষোভ এবং তারই প্রেক্ষাপটে ওয়াশিংটন ও লন্ডন হতে কতৃপক্ষিয় মহলের তরফে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে যাওয়ার ব্যাপারে ভ্রমন-সতর্কতার হূঁশিয়ারী জারী হ’য়েছে। ভারতে এই প্রতিবাদ বিক্ষোভ ক’দিন ধ’রেই চ‘লছে – একাধিক প্রাণহানিরও খবর মিলেছে। আমাদের সংবাদদাতা মিয়া বুশ তাঁর প্রতিবেদনে ভারতের গুয়াহাটি অঞ্চলের হাওয়ালা দিয়ে ব’লছেন–ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলের ঐ খনিজ সম্পদ সমৃদ্ধ এলাকার দূরবর্তী অবস্থানগুলোয় অনেকেরই আশংকা যে নতুন এ আইন, প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে আগত বিপুল সংখ্যক অভিবাসীর জন্যে নাগরিকত্ব মঞ্জুর ক’রবে– যাঁরা কিনা, তাঁদের কর্মসংস্থানগুলো লুটেপুটে নিচ্ছে এবং অঞ্চলটির সাংষ্কৃতিক পরিচিতিকেও ঘোলাটে ক’রে তুলছে।

ওদিকে, রাজধানী নতুন দিল্লিতে- কয়েক হাজার প্রতিবাদী শনিবার দিনের শেষভাগে প্রতিবাদ সমাবেশে মিলিত হয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সরকারের প্রতি আর্জি তুলে ধরেন যে – নতুন এ আইনটি খারিজ ক’রে দেওয়া হোক – কয়েক প্রতিবাদী আবার ভারত ভাগ বন্ধ ক’রো -লেখা ব্যানার তুলে ধরেন। পঞ্চান্ন বছর বয়সী সাংবাদিক – প্রতিবাদী অমীত বড়ুয়া বলেন – এখানে যাঁরাই সমবেত হয়েছেন আজ তাঁদের পরিচিতি- না হিন্দু না মূসলীম – তাঁরা এসেছেন এখানে ভারতবাসি হয়ে। এই মৌদী সরকার এ যে আইন ক’রেছে – এটা আমরা মানিনা- এটা খারিজ ক’রতে হবে – আমাদের সংবিধানে যেমন বিধৃত রয়েছে- সবাইকে সে অধিকার দিতে হবে সমানভাবে।

রাজনৈতিক অসন্তোষের অগ্নিগর্ভ অবস্থান পশ্চিম বঙ্গে প্রতিবাদ বিক্ষোভ সহিংস মাত্রায় চাগিয়ে ওঠে – কম হ’লেও গোটা বিশেক বাস এবং দু’টি রেল স্টেশানের অংশ বিশেষ অগ্নি দগ্ধ হয়েছে – বিক্ষোভকারীরা সেখানে সড়ক প্রতিবন্ধক খাড়া করেন – টায়ারে পোড়ান। কোনো হতাহতের কথা শোনা যায়নি।

আসমের গুয়াহাটিতে ধিকি ধিকি জ্বলছে উত্তেজনার আগুন – অসন্তোষের ঐ কেন্দ্রস্থলটিতে , চিকিৎসা কর্মিদের বরাত দিয়ে বন্দুকের গুলিতে দু’ব্যক্তির প্রাণহানির কথা বলা হ’চ্ছে। বৃহস্পতিবার দিনের শেষভাগে সেখানে ২৬ জনকে হাসপাতালে ভর্তি হ’তে দেখা যায় - আরক্ষা বাহিনীর লোকেরা তাজা গুলি ছোঁড়ে।

অসম পুলিশের প্রধান কর্তাব্যক্তি ভাস্কর জ্যোতি মহান্ত শনিবার রাতে বার্তা সংস্থা প্রেস ট্রাস্ট অফ ইন্ডিয়াকে জানান – প্রতিবাদ বিক্ষোভের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পঁচাশি জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে – ভিডিও দেখে দেখে কর্মকর্তারা সেখানে সহিংস বিক্ষোভকারীদের সনাক্ত ক’রতে সক্রীয় রয়েছেন। বিক্ষোভকালে নিহত অস্টাদশ বর্ষিয় স্যাম স্ট্যাফার্ডের শব যাত্রায় ক্ষুদ্ধ-ক্রুদ্ধ-শোকার্ত মানুষের ঢল নামে- অসম যিন্দাবাদ ধ্বনী গর্জে ওঠে।

ঐ অস্টাদশ বর্ষিয় ছাত্রটির পিসি জূলী স্ট্যাফার্ড বার্তা সংস্থা এ এফ পি’কে বলেন – আমরা টিভি দেখছিলাম – খবর শুনছিলাম সারাটা দিন, বিকেলে আমার ঐ ভাইপো যখন বের হ’চ্ছিলো বাড়ি থেকে , আমরা বারণ ক’রেছিলুম – বাইরে যেতে নিষেধ ক’রেছিলুম – কিন্তু ও গিয়েছিলো বন্ধু বান্ধবের সঙ্গে মিলে।

আরো বিক্ষোভ –অসন্তোষ হতে পারে – এ আশংকায় , কতৃপক্ষ তামাম অসমে ইন্টারনেট নিষিদ্ধ হুকুমনামা সোমবার অব্দি সম্প্রসারিত ক’রেছে। দোকানপাট বেশিরভাগই বন্ধ থেকেছে – উদ্বিগ্ন-দূশ্চিন্তাগ্রস্ত নগরবাসি রসদ-মালামাল মজুদ ক’রেছেন প্রয়োজনমতো। শনিবার কার্ফু কিছুটা শিথিল করা হয়।

ঐ নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনে পাকিস্তান, আফগানিস্তান এবং বাংলাদেশ থেকে হিন্দু ও শিখ ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের কাছ থেকে চট জলদি দরখাস্ত গ্রহনের বিধান দেওয়া রয়েছে– কিন্তু মূসলিমদের জন্যে নয়। প্রতিবাদ বিক্ষোভের একেবারে অগ্রবর্তী অবস্থানে সক্রিয় যে নিখিল অসম ছাত্র য়ুনিয়ন সেই তার সদস্য সমুজ্বল ভট্রাচার্য বার্তা সংস্থা এ এফ পি’কে জানান – তাঁরা ঐ নতুন আইনের প্রতিবাদে তাঁদের লড়াই নিরবচ্ছিন্নভাবে চালিয়ে যাবেন লাগাতার সড়কে- আদালতে।

মোদী এবং জাপানের প্রধাণমন্ত্রী শিনযো আবে’র এক শীর্ষ বৈঠকে মিলিত হবার কথা ছিলো রবিবার গুয়াহাটিতে –সেটি মুলতুবি করা হয়। এবং যুক্তরাষ্ট্র ও বৃটেন – ব্যাপক বিস্তৃত উত্তর পূর্বাঞ্চলে সফরের ব্যাপারে তাদের নাগরিকদেরকে সতর্ক ক’রে দিয়েছে।

ইসলামপন্থী গ্রুপগুলো এবং সেই সঙ্গে বিরোধী ও অধিকার সংগঠনগুলো ব’লছে – এ আইন আসলে , ভারতের বিশ কোটি মূসলিমের নিপাতের লক্ষে প্রণীত মোদীর হিন্দু জাতিয়তাবাদী এজেন্ডা বৈ আর কিছু নয়।

উনি অবশ্য এ অভিযোগ অস্বীকার ক’রেছেন –ব’লেছেন, ঐ তিনটি দেশের মূসলিমদেরকে এর আওতাভুক্ত করা হয়নি এ কারণে যে ভারতের তরফে কোনো সূরক্ষার প্রয়োজন তাদের নেই। মোদীর দক্ষিন হস্তবৎ অমিত শা’ শনিবারদিন উত্তর পূর্বাঞ্চলবর্তী রাজ্যগুলোকে আস্বস্ত ক’রে বলেন – তাঁদের সংষ্কৃতি-সামাজিক পরিচিতি , ভাষা এবং রাজনৈতিক অধিকারসমুহ রক্ষা ক’রবে সরকার।

অসমে জাতিগোষ্ঠীগত উত্তাপ-উত্তেজনা নতুন কিছু নয় -চলে আসছে তা বহূকাল ধ’রেই । দু’হাজার সালে , প্রায় হাজার দু’ই লোক নেলী নিধন নামে এখন যার পরিচিতি, সেই হত্যাকান্ডে, কোতোল হয়েছিলো – যার বেশির ভাগই ছিলো বঙ্গভাসি মূসলীম।

এ বছর নাগরিকত্ব তালিকায় নাম ওঠেনি ১৯ লক্ষ মানুষের – যার বেশির ভাগই মূসলীম – একাত্তরের আগে তাঁরা বা তাঁদের পূর্ব পূরুষ যে অসমেই বসবাস ক’রেছেন এটা ওঁদের অনেকেই তা প্রমান ক’রতে অপারগ হয়েছেন এবং এভাবেই তাঁরা এখন সম্ভাব্য রাষ্ট্রবিহিন নাগরীকে পরিণত হয়েছে ।

এভাবেই এই এখনকার মতো, বাংলাদেশ থেকে আগত অবৈধ অভিবাসিদের বিরূদ্ধে উন্মত্ত এ আগ্রাসন বহূ বছর ধ’রে চ’লে আসছে ব’লে ব’লছেন দিল্লির জামিয়া মিল্লিয়া ইসলামিক য়ুনিভার্সিটীর প্রফেসার সঞ্জয় হাযারিকা।

এঁরা মনে করেন – ভুমির অধিকার, কর্মসংস্থান আর বেবাক সামাজিক বিন্যাস ভুক্ত শিক্ষা দিক্ষার এবং অন্যান্য সবকিছুর অধিকারের ওপর এর প্রভাব পড়ছে। শুক্রবার দিল্লিতে , বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে পুলিশের – পুলিশ লাঠি চালায় – কাঁদানে গ্যাস ছোঁড়ে প্রতিবাদীদের কন্ঠরোধ করার প্রয়াসে। ঐ নাগরিকত্ব সংশোধনী বিল পাশ ক’রতে সংষদের উভয় কক্ষেই ক্ষুদ্ধ-ক্রুদ্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় – সাংসদদের একজন এ আইন প্রনয়নের সঙ্গে ১৯ শ’ তিরিশের দশকের নাৎসী জার্মানীর ইহূদী-বিদ্বেষী আইনের সঙ্গে সাযুজ্য খুঁজে পেয়েছেন।

please wait

No media source currently available

0:00 0:06:32 0:00


XS
SM
MD
LG