অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

করোনা-কালে করনীয় কিছু কথা  


করোনা ভাইরাসের রোগীদের জন্যে খুলনার একটি হাসপাতালে অক্সিজেন সিলিন্ডার নেয়া হচ্ছে । ফাইল ফটো- এএফপি

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশে এখন পর্যন্ত করোনা সংক্রমিত শনাক্ত রোগীর সংখ্যা ১৫ লক্ষ। এর মধ্যে মৃত্যুর সংখ্যা ২৭ হাজার। আর এখন পর্যন্ত সুস্থ হয়েছেন প্রায় ১৪ লক্ষেরও বেশি রোগী। কিন্তু সুস্থ হলেই কি আপনি নিরাপদ?

এ বিষয়ে আমাদের কথা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর সহকারী অধ্যাপক (মেডিসিন বিভাগ) ডাঃ এম.এস.আরেফিন পাটওয়ারীর সঙ্গে। তিনি পরামর্শ দিয়েছেন কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পর কি করবেন, কি করবেন না।

কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পর অধিকাংশ রোগীর শরীরেই নানান ধরণের উপসর্গ থেকে যায়, এই অবস্থাকে বলা হয় পোস্ট-কোভিড কন্ডিশন বা কভিড পরবর্তী অবস্থা। কোভিড-১৯ এ আক্রান্ত হয়ে যারা আইসিইউতে ভর্তি ছিলেন, তাদের অনেকের ফুসফুস অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তারা সুস্থ হয়েও পরিশ্রমের কাজ করতে গিয়ে হয়রান হয়ে যাচ্ছেন, সিড়ি দিয়ে উঠলে হাঁপিয়ে যাচ্ছেন, কাঁশিটা অনেক দিন ধরে থেকে যাচ্ছে, অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছেন অনেকেই, কারও কারও শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে। আসলে ফুসফুস অনেক বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হলে এটা হয়।

কোন কোন রোগীর জ্বর ও কাশি ভাল হয়ে গেলেও দেখা যায় কোভিড পরবর্তী কিছু উপসর্গ, যেমন প্রচন্ড রকমের একটা ক্লান্তি বোধ দীর্ঘদিন থাকে যাচ্ছে। এই উপসর্গগুলি অধিকাংশ মানুষের মধ্যেই থেকে যায়। অনেকের এক থেকে দুই মাস, আবার কারো কারো কয়েক বছর এই ক্লান্তিবোধ থেকে যায়। অনেকের খাবারের রুচি কমে যাচ্ছে, দীর্ঘদিন তাদের খাবার রুচির অভাব থাকে। কারো কারো ঘুমের প্রচন্ড সমস্যা হচ্ছে, কারো ঘুম কম হচ্ছে ,আবার কারো অনেক বেশি ঘুম হচ্ছে এবং দীর্ঘদিন যাবত মাথা ব্যথার সমস্যায় ভুগেছেন কেউ কেউ। অনেকের আবার মাথা ঘুরতে পারে। এই সব উপসর্গের পাশাপাশি কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় হাত পা জ্বালা করে, ঝিনঝিন করার মত সমস্যা।

এই রকম বিভিন্ন ধরনের লক্ষণ কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পরেও অনেকের মাঝে দেখা যায়। শারীরিক উপসর্গের পাশাপাশি মানসিক কিছু উপসর্গও অনেক রোগীদের মধ্যে দেখা যায় যেমন, অবসাদ ও বিষন্নতা । এটি অনেক দিন যাবত ভোগান্তিতে রাখতে পারে অনেককে। কারও কারও আতঙ্ক রোগ হয়ে যায়, যেমন বুক ধড়পড় করা , ভয় লাগা, একা একা কোথাও যেতে না পারা ইত্যাদি।

গবেষকদের মতে, দুই ধরণের লোক আবার কোভিড সংক্রণের ঝুঁকিতে থাকতে পারে: বয়স্ক মানুষ এবং যারা কোভিড-১৯ থেকে নিরাময়ের পর যথেষ্ট প্রতিরোধী ব্যবস্থার মধ্যে নেই। কোভিড আক্রান্ত হওয়ার পরে যখন কেউ সুস্থ হয়ে যায় নিরাপদ থাকতে হলে তাকে কতকগুলো নিয়ম কানুন মেনে চলতে হবে। ফেস মাস্ক পরা, নিয়মিত হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা। এর পাশাপাশি ইমিউন সিস্টেমকে আরো শক্তিশালী করার প্রচেষ্টা চালাতে হবে। কোভিড-১৯ থেকে সুস্থ হওয়ার পর কিছু বিষয় মেনে চললে ও কিছু বিষয় বাদ দিলে আপনি থাকতে পারবেন নিরাপদে।

পর্যাপ্ত বিশ্রামঃ করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পরপরই কাজে যুক্ত হওয়া যাবে না। কিছুদিন অতিরিক্ত বিশ্রাম নিতে হবে। অন্যথায়, ক্লান্তি ও অবসাদে ভেংগে পড়ার আশংকা থেকে যাবে। ঠিকমত ঘুমাতে হবে। সুস্থ হয়েই কাজে যোগ না দিয়ে আস্তে আস্তে কাজে যুক্ত হতে হবে। খুব পরিশ্রমের কাজে যুক্ত হলে কিছুক্ষণ পরপর বিশ্রাম নিতে হবে।

কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে নিয়মিত শরীরচর্চা করা প্রয়োজন
কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে নিয়মিত শরীরচর্চা করা প্রয়োজন

নিয়মিত শরীরচর্চা: করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়ে পর্যাপ্ত বিশ্রামের পরে শরীরচর্চার বিকল্প নেই। শরীরে দূর্বলতার কারণে এ অবস্থায় শরীরচর্চাকে কঠিন ও কষ্টকর মনে হতে পারে। অল্প অল্প করে শরীরচর্চার সময় বাড়াতে হবে।

পুষ্টিকর খাবার খাওয়া: করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পর স্বাস্থ্যকে শক্তি ও সামর্থ দিতে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার কোন বিকল্প নেই। বেশি বেশি শাকসবজি ও ফল খাওয়া যেতে পারে। বাইরের খাবার না খেয়ে ঘরে রান্না করা খাবার খাওয়া যেতে পারে। সহজে হজম হয়, এ সময় এমন খাবার খাওয়াই ভাল।

কোভিড ভ্যাক্সিনঃ কোভিডে আক্রান্ত হওয়ার আগে যারা টিকা নেননি, পরবর্তিতে চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে তাদের টিকা নিয়ে নেয়া উচিৎ। ভ্যাক্সিন নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চললে কোভিড থেকে রক্ষা পাওয়া সহজ হতে পারে।

কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে বই পড়ায় উপকার হতে পারে
কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে বই পড়ায় উপকার হতে পারে

স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধির চর্চা: করোনার সংক্রমণের কারণে কারও কারও ক্ষেত্রে স্মৃতি কোষসমূহ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই সুস্থ হওয়ার পর এমন কিছু করা যেতে পারে যাতে স্মৃতি, মনোযোগ ও চিন্তাভাবনার স্বাভাবিকতা ফিরে আসে। সেক্ষেত্রে পাজলস ও মেমোরি গেমস খেলার পাশাপাশি নিয়মিত বই পড়তে পারেন।

সচেতন থাকাঃ অনেকে ভেবে থাকেন, “আমার তো কোভিড হয়ে গেছে, আমার আর কোভিড হওয়ার কোন আশংকা নেই” । এই ধারনাটা একদম ভুল। প্রচুর ক্ষেত্রে দেখা যায় , ২-৩ মাস পরে আবার কোভিড এ আক্রান্ত হচ্ছেন। যারা একবার কোভিড থেকে সুস্থ হয়ে ভাবছেন আর মাস্ক পড়বেন না, স্বাস্থ্যবিধি মানবেন না, নিরাপদ থাকতে চাইলে এমন ভাবা যাবে না।

ধূমপান ও অন্যান্য খারাপ অভ্যাস ত্যাগ করাঃ অনেকে ধূমপান করেন, ধূমপান সব সময়ই শরীরের ক্ষতি করে, করোনার সংক্রমণ থেকে সুস্থ হওয়ার পর এই খারাপ অভ্যাসটি অবশ্যই ত্যাগ করতে হবে। এছাড়া, ফাস্টফুড বা অনিরাপদ খাদ্যাভাস থেকে দূরে থাকার অভ্যাস করতে হবে।

XS
SM
MD
LG