অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শান্তা-জিনিয়ারাও ভার্সিটিতে পড়তে চায়


জিনিয়া। (ছবি- মাহতাব হোসেন)

“এই যে টিএসসিতে ঘুইরা বেড়াই সারাদিন, আপা ভাইয়াগো দেখি তারা কেলাসে যায়, আহে; বইমেলায় যায় এক লগে- আমারও ইচ্ছা করে ভারসিটিতে পড়বার। কিন্তু আমগো ওই চিন্তা করলে তো হইবো না। সারাদিন ফুল বেইচা আমগোর খাওয়া জুটে।“

বইমেলার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের টিএসসি প্রবেশ গেটে দাঁড়িয়ে কথা হচ্ছিল শান্তার সঙ্গে। দুপুর থেকে তারা ব্যস্ত। কথা বলার সময় নেই। একটা ছোট বালতিতে ফুল নিয়ে বইমেলায় আগত দর্শনার্থীদের পেছনে পেছনে বিক্রির জন্য দৌঁড়াচ্ছে। কথা বলার সময় হলো, শেষ বেলায়। যখন মেলার গেট বন্ধ হচ্ছিল। শান্তার সঙ্গে কথা বলার সময়ই আরো অনেকেই জড়ো হয়।

শান্তা বলছিল, “তার খুব ইচ্ছা ছিল পুলিশ হওয়া।“ কিন্তু সে ইচ্ছে পুরণ হবার নয় জানালো ১২ বছর বয়সী মেয়েটি। বলছিল, “আমার খুব শখ ভারসিটিতে পইড়া পুলিশ অফিসার হমু, যারা অন্যায় করে তাগো শাস্তি দিমু। কিন্তু আমার তো বাপ মায়ে নাই। ক্যামনে হমু? “

পুলিশ হবার ইচ্ছের কথা জানানোর সময় শান্তার কণ্ঠে দৃঢ়তা লক্ষ্য করা যায়। বাবা-মা সম্পর্কে তথ্য দিতে পারলো না। কিংবা সে বিষয়ে কথা বলতে চায় না। সে মামার সঙ্গেই থাকে। মামা নিজেও ফুল বিক্রি করে। সেখান থেকে শান্তাকে ফুল বালতিতে দেয়। এসব বিক্রি করে যা আয় হয় তা শান্তা দিয়ে দেয়। রাতে ঘুমায় দলের বাকিদের সঙ্গে। টিএসসি ও সোহরাওয়ার্দী উদ্যানই তাঁর ঠিকানা। পড়ালেখার ইচ্ছে রয়েছে, ফলে সে পথশিশুদের একটা স্কুলেও যায়।

এবারের বইমেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫ জন শিশু কিশোর ফুল বিক্রি করছে বলে জানা যায়। যাদের বয়স ৬ থেকে ১৪ বছর। যারা অনেকেই পড়াশোনা শুরু করেছিল, ছেড়ে দিয়েছে নানা কারণে বাধ্য হয়ে। যাদের আগ্রহ আছে তারা এখনও সোহরাওয়ার্দী উদ্যান কেন্দ্রিক পথশিশুদের স্কুলে যায়।

জিনিয়া। (ছবি- মাহতাব হোসেন)
জিনিয়া। (ছবি- মাহতাব হোসেন)

শান্তার সবসময়ের সঙ্গী জিনিয়া। এই জিনিয়া অবশ্য টিএসসি এলাকার খুব পরিচিত মুখ। সারাদিন ছোট বালতিতে লাল গোলাপ বিক্রি করে। বইমেলায় বিক্রি কিছুটা বেশি হওয়ায় বেশ আনন্দিত সে। বললো, “আমার মায়ে খুব খুশি হয় বেশি টেকা দিলে। আমরা শনির আখড়া থাকি। মেলার জন্য এখন আমরা অতদূরে যাই না। উদ্যানের ভেতরেই ঘুমাই।“

জিনিয়া আয় করে প্রতিদিন ৫০০ থেকে ৮০০ টাকা। এই টাকা সে মায়ের হাতে তুলে দেয়। মা কী করে এই টাকা দিয়ে পরিস্কার বলতে পারে না।

রাব্বির বয়স ১০ নাকি ১১ ঠিক সে বলতে পারে না। রাব্বিকে জিজ্ঞেস করি, তুমি যাদের কাছে ফুল বিক্রি তাদের চেনো? রাব্বি বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে বলে, “আমি ক্যামনে চিনমু?” "তারা কোথা থেকে আসে?" রাব্বি এবার যেন সহজ প্রশ্ন পেয়েছে ঝটপট উত্তর দিলো, “হ বাসা থেকে আসে।" "তারা কেমন বাসায় থাকে জানো?" “হ, জানুম না ক্যান। ঢাকায় থাকে, ফেলাট বাড়িতে।“ রাব্বির ঝটপট উত্তর। রাব্বিকে জিজ্ঞেস করি, “ফ্ল্যাট বাড়িতে থাকে টাকা কোথায় পায় ওরা জানো?” রাব্বি যেন সত্যি অবাক হয়। প্রশ্নকর্তাকে সে বোকাই ভেবে বসে। উত্তর দেয় তবুও, “চাকরি করে তারা।" ফের প্রশ্ন করি- “চাকরি কিভাবে পাইলো?” রাব্বির উত্তর “ক্যান পড়ালেখা কইরা।" “তুমিও পড়ালেখা করে একটা চাকরি পেতে পারো না?”

এবার রাব্বি উত্তর দিতে সময় নেয়। জানায় এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে পঙ্গু মাকে নিয়ে তারা দুই ভাই থাকে। দুই ভাই-ই ফুল বিক্রি করে। এখন কিছুটা আয় হচ্ছে, কিন্তু বইমেলা চলে গেল আয় কমে যাবে।

রাব্বি বলে, “আমাগো ঘর নাই। আমরা দুই ভাই ফুল বেচি, আমার মায়ের পেরালাইজ (প্যারাইলজড), আমগো পড়ালেখা হইবো না।“

ফরহাদ। (ছবি- মাহতাব হোসেন)
ফরহাদ। (ছবি- মাহতাব হোসেন)

সুজন,আল আমিন, জিসান, ইয়াসিন, ফরহাদ, নাসরিন... এরা সবাই ধরেই নিয়েছে, এই সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, শহীদ মিনার, রমনা, টিএসসি, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস, তাদের ঠিকানা। আর তাদের ভাগ্য বইমেলা, পয়লা বৈশাখ, পয়লা ফালগুনের মতো বিভিন্ন উৎসবে ফুল বিক্রি করা। এভাবেই তারা বড় হচ্ছে। কারো কারো মনে স্বপ্ন উঁকি দিলেও পরিস্থিতির কারণে হয়তো সেসব আলোর মুখ দেখছে না।

এদের মধ্যে কেউ কেউ আসে কামরাঙ্গীরচর, রায়ের বাজার এলাকা থেকে। ফুল বিক্রি করে চলে যায়। এদের একজন ইয়াসিন বলে, “আমি আমার ভাগ্নিরে নিয়া মেলায় ফুল ব্যাচতে আসি। যে টেকা পাই আমার মায়রে দেই। ঘর ভাড়া দেয়, খাওয়ার কিনে।"

যাদের কাছে ফুল বিক্রি করো, তাদের মতো হতে ইচ্ছে করে না? প্রশ্নের জবাবে ইয়াসিন বলে, “মাঝেমধ্যে চিন্তা করি, আফসোসও লাগে। কিন্তু ওগো মতো হইতে গ্যালে তো পড়ালেখা কইরা বড় হইতো হইবো। সেইটা তো হয় না, মায়ের চিন্তা ঘর ভাড়ার চিন্তা করন লাগে। তহন আর স্কুলে যাওয়ার চিন্তা আসে না।"

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক দুটো পথশিশুদের স্কুলের খোঁজ পাওয়া যায়। একটি “মজার স্কুল” অপরটি “স্বপ্ন পাঠশালা।“ স্বপ্ন পাঠশালার উদ্যোক্তাদের একজন আসাদুজ্জামান শাকিল। তিনি রাজধানীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করেন, বাকি সময় কয়েকজন মিলে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্কুলটি পরিচালনা করেন। ফুল বিক্রেতা পথশিশুদের সম্পর্কে বিষদ তথ্য রয়েছে শাকিলের কাছে। বললেন, “বইমেলাকে কেন্দ্র করে অন্তত ২৫ জন শিশু কিশোর ফুল বিক্রি করছে। এরা আমাদেরই শিক্ষার্থী। এদেরকে আমরা নানাভাবে বুঝিয়ে পড়াতে নিয়ে আসি। কিন্তু এদের যাদের অভিভাবক রয়েছে- তাদের আয়ের প্রধান উৎসই এসব ছেলে মেয়ে- যার কারণে অনেক সময় আমরা জোর করতে পারি না। ফলে অনেকেই অনিয়মিত হয়ে যায়। তবে যাদের আগ্রহ লক্ষ্য করি তাদের প্রতি আমাদের চেষ্টাও বেড়ে যায়।“

সাদিয়া ও জান্নাত নামের দুই বোনের কথা উল্লেখ করলেন শাকিল। যারা এই বইমেলা এলাকায় ফুল বিক্রি করতো একসময়। ওরা এবার জিপিএ ফাইভ পেয়ে কলেজে পড়ছে। শাকিল বলেন, “দুইবোন কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে এখানে আসতো ফুল বিক্রি করতে। তাদের পড়াশোনার বিষয়ে আগ্রহ ছিল। আমরা ৬ বছর আগে তাদেরকে কামরাঙ্গীর চরের একটি স্কুলে সিক্সে ভর্তি করে দিয়েছিলাম। তাদের অভিভাবকদের মেয়েদের ওপর যেন নির্ভর করতে না হয় এজন্য একটি অটোরিকশা কিনে দিয়েছিলাম। যার ফলে দুইবোন পড়তে পেরেছে।" এরকম আরো কয়েকটি ঘটনা রয়েছে বলেও তিনি জানালেন।

শাকিল বলেন, “এদের পড়াশোনা করানোটা সহজ নয়, অনেক প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। তারপরেও আমরা তাদের ভেতর স্বপ্নের বীজ বপন করার চেষ্টা করছি। যদি কেউ কেউ স্বপ্নের স্পর্শ পায়- তাহলে আমাদের প্রচেষ্টা স্বার্থক হবে।"

XS
SM
MD
LG