অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সামাজিক মাধ্যম জুড়ে কপালে কপালে প্রতিবাদী টিপ


সামাজিক মাধ্যম জুড়ে কপালে কপালে প্রতিবাদী টিপ (প্রতীকী ছবি)

আয় আয় চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা/ চাঁদের কপালে তুই টিপ দিয়ে যা’ - শৈশবে এই ছড়া শোনেনি এমন বাঙালি খুঁজে পাওয়া কঠিন। ছোট্ট শিশুর কপালে কালো টিপ এঁকে দেওয়ার প্রচলন বহু পুরনো। অমঙ্গলের নজর যেন না লাগে সেই ধারনা থেকে মায়েরা তার সন্তানের কপালে কাজল দিয়ে টিপ পরিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। আবার বাঙালি নারীর সাজে টিপ বহুল ব্যবহৃত হয়ে আসছে। শাড়ি, চুড়ি আর টিপে সাধারণে অসাধারণ সাজ হয়ে যায় নারীর। টিপ পছন্দ করেন না এমন বাঙালি নারীর সংখ্যা খুবই নগন্য। শুধু শাড়ি আর সালোয়ার কামিজের সঙ্গেই নয়, জিনস ফতুয়ার সঙ্গেও আজকাল টিপ পরেন অনেকে। ফুটপাত থেকে শপিং মল, প্রায় সবখানেই টিপ পাওয়া যায়। আবার এর দামও হাতের নাগালে। দশ টাকা থেকে শুরু করে হাজার টাকা নানা দামে টিপ পাওয়া যায় বাংলাদেশে।

এতো গেল টিপের একদিকের কথা। সংখ্যায় কম হলেও টিপ পরা নিয়ে নানা প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখিও হতে হয় নারীদের। সবশেষ জানা গেল এমন এক অভিযোগ যেখানে এক নারী কলেজ শিক্ষককে পুলিশের পোশাক পরিহিত একজনের কাছে টিপ পরার জন্য হেনস্থা হতে হয়েছে। শনিবার (২ এপ্রিল) রাজধানী ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা ফার্মগেটে এই ঘটনা ঘটে বলে থানায় দায়ের করা অভিযোগ পত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে ঢাকার শেরেবাংলা নগর থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ঘটনার শিকার রাজধানী ঢাকার বেসরকারি তেজগাঁও কলেজের থিয়েটার অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের প্রভাষক লতা সমাদ্দার।

এর প্রতিবাদে দেশে নানা প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করা হচ্ছে। বিশেষকরে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঘটনার প্রতিবাদে নারীরা টিপ পরিহিত ছবি প্রকাশ কার মধ্য দিয়ে প্রতিবাদ জারি রেখেছেন।

একাত্তরে শহীদ সুরকার আলতাফ মাহমুদের মেয়ে শাওন মাহমুদ ফেসবুকে টিপ পরিহিত ছবি দিয়ে লিখেছন- “টিপ কাহাকে বলে, কত প্রকার ও কি কি? ছবিতে উত্তর দেয়া আছে।"

ফুটনোট - ‘টিপ পরছোস কেন’ বলে যা ইচ্ছে তাই গালিগালাজ করতে করতে এক পুলিশ, শিক্ষিকা লতা সমাদ্দার পায়ের উপর দিয়ে মোটরসাইকেল চালিয়ে দিয়ে গেছে।”

অভিনেত্রী মৌটুসি বিশ্বাস ফেসবুকে টিপ পরিহিত ছবি দিয়েছেন। নিজের ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন- “তালেবানি পুলিশ মহোদয় কোন রাস্তায় বাইকসহ ডিউটি করে জানলে ইনবক্স করলে খাওয়াবো। আমি তার বাইকের সামনে গিয়ে দাড়িয়ে থাকতে চাই যতক্ষণ না আমার ওপর বাইক তোলে। তার মুরোদটা দেখতে চাই।”

বেসরকারি টেলিভিশন ইন্ডিপেনডেন্ট টিভির নির্বাহী প্রযোজক পিয়া রহমান ফেইসবুকে ছবি আপলোড দিয়েছেন সহকর্মীদের নিয়ে। ব্যঙ্গ করে লিখেছেন -“আসুন, সবাই টিপ পরি আর দলে দলে ইভটিজিং এর শিকার হই! ইভটিজিং কে এনজয় করা শিখি।”


তৈয়বা বেগম লিপি বাংলাদেশের একজন খ্যাতনামা চিত্রশিল্পী। দেশে-বিদেশে চিত্রকর্মের জন্য সমাদৃত এই চিত্রশিল্পীও শামিল হয়েছেন প্রতিবাদে। তিনি লিখেছেন- “পরি তো!!!! নিজের কপালে নিজে পরি।”


কথাসাহিত্যিক ও কলামনিস্ট গাজী তানজিয়া লিখেছেন - “যে দেশে নানা ধর্মের মানুষের বাস, সেখানে একজন পুলিশ কিভাবে কাউকে টিপ পরার জন্য হেনস্থা করতে পারে! মাত্র ১০ বছর আগেও এদেশের মানুষের মানসিকতা এতটা পশ্চাদপদ ছিল না। নারীর পোশাক, সাজসজ্জা ও চলাফেরার ওপর পুরুষতান্ত্রিক খবরদারি নির্মূল করতে সরব হতে হবে এখনই।"

শিক্ষক কেকা অধিকারী তার বন্ধুর সাথে ছবি দিয়ে লিখেছেন- “আমরা দু'জন টিপ পরে - আমি ও সৈয়দ বংশীয় তারিক।”

সংগীতশিল্পী সুপর্ণা রায় চৌধুরী নিজের বড় টিপ পরিহিত ছবি দিয়ে লিখেছেন - “এরচাইতে ছোট টিপ আমার পছন্দ না। কারো কাছে এরচেয়ে বড় সাইজের টিপের collection থাকলে আমায় জানাবেন please। টিপ ছাড়া আমার চলেনা; চলবেওনা।”

আবার এই প্রতিবাদী কর্মসূচীতে পুরুষদেরও অংশ নিতে দেখা যাচ্ছে। সাংবাদিক আসিফ জাকারিয়া নিজের সহকর্মীদের সাথে নিয়ে কপালে টিপ পরে ছবি তুলেছেন। সেই ছবি ফেইসবুকে প্রচার করেছেন। একইরকম প্রতিবাদী দেখা গেল আরেক নাট্যকার উৎপল সর্বজ্ঞকে। নিজের স্ত্রীর সাথে ছবি শেয়ার করে তিনি লিখেছেন -“তার কপালের ওই লাল টিপ দেখেই একটা পুরো জীবন কাটিয়ে দিতে পারি।”



ঢাকার একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন তানজির সুলতানা অন্তরা। তিনি নিজের ছবি না দিলেও লিখেছেন এই প্রসঙ্গে। তিনি লিখেছেন- “বাংলাদেশ-এর বাজারে ভালো মানের টিপ পাওয়া যায় না। ফেব্রিক ভালো না গোল ও পার্ফেক্ট না। ভালো টিপের জন্য এখনো ইন্ডিয়ার দ্বারস্থ হইতে হয়। এটা একটা সমস্যা।”

কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ফারহা তানজীম তিতিল। নিজের টিপ পরিহিত ছবি দিয়ে তিনি লিখেছেন- “কপাল আমার, টিপ পরা না পরার সিদ্ধান্ত আমি নেব। আপনি নিজেকে নিয়ে মগ্ন হোন। অন্যকে নিয়ে উদ্বিগ্ন হবেন না বন্ধু।”


ম্যাগডিলিনা মৃ গারো। নিজে উদ্যোক্তা এবং লেখক। এই আদিবাসী নারী নিজের কপালে টিপ এঁকে সেই ছবি ফেইসবুকে দিয়েছেন। লিখেছেন- “হোক প্রতিবাদ।”



টিপ ব্যবহার করায় এক নারীর হেনস্থা এবং এর প্রতিবাদে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নারীদের প্রতিবাদ বিষয়টিকে কীভাবে দেখছেন তা জানতে চাওয়া হয় কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের কাছে। দেশের বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সোচ্চার সেলিনা হোসেন ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, “সেই আবহমান কাল থেকেই বাংলার নারীরা টিপ পরে আসছেন। এখন কেউ যখন এটাকে বাধা দিতে চায় তখন বুঝতে হবে তিনি নারীর স্বাধীনতা এবং এর পাশাপাশি বাংলাদেশের যে অসাম্প্রদায়িক চেতনা তাকেই থামিয়ে দিতে চায়। এমন ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. জোবাইদা নাসরিন বলেন, “টিপের মতো নারীর একটি সাজ-সজ্জার বিষয়কে যখন আঘাত করা হয় তখন এটি একইসাথে নারীর প্রতি অবমাননা এবং হয়রানি। পাশাপাশি এটি একটি সাম্প্রদায়িক আক্রমণও।”

নিজের অভিজ্ঞতা জানিয়ে এই নারী অধ্যাপক বলেন, "আমি যখন নিউমার্কেটে যাই তখন অনেকে টিপ দেখে মন্তব্য করে। এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। আবার লাল টিপ দেখলে একটি বিশেষ ধর্মের লোক মনে করা হয়। এটি অন্তত গত পনেরো বছর ধরে আমি লক্ষ্য করছি। তবে সাধারণের বলা আর রাষ্ট্রের কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যর বলা এক নয়। রাষ্ট্রীয় বাহিনীর পোশাক পরিহিত একজনের বিরুদ্ধে যখন কোনো নারী এমন অভিযোগ করেন তখন সেটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে তাদের মানসিকতার প্রকাশ পেয়েছে।"

XS
SM
MD
LG