অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বন্যার পর শীতের সংকট মোকাবেলা করছে সুনামগঞ্জের মানুষ, সর্বনিম্ন তাপমাত্রা চুয়াডাঙ্গায়


বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় ঘন কুয়াশার সঙ্গে অনুভূত হচ্ছে তীব্র শীত। কোথাও কোথাও শৈতপ্রবাহ বয়ে চলছে। শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। গত বন্যায় বিপর্যস্ত সুনামগঞ্জের মানুষ এই তীব্র শীতে মোকাবেলা করছে আর একটি বিপর্যয়কর পরিস্থিতি।

গত কয়েকদিন ধরে সুনামগঞ্জে বিরাজ করছে তীব্র শীত। হিম-হাওয়া আর নিম্ন তাপমাত্রায় জনজীবন বিপর্যস্থ হয়ে পড়েছে। তাপমান দিনের বেলায় কিছুটা সহনীয় হলেও, রাতের বেলা শীতের তীব্রতা বেড়ে যায়। শীতের তীব্রতা থেকে রক্ষা পেতে অনেকে খড়কুটোতে আগুন জ্বালিয়ে শীত নিবারণের চেষ্টা করছে।

নিম্নআয়ের মানুষ ফুটপাতে দোকান থেকে শীত নিবারণের জন্য সোয়েটার, জ্যাকেট, মাফলার কিনছেন। এছাড়া অনেকেই পুরাতন শীতের কাপড় সংগ্রহ করে শীত নিবারণের চেষ্টা করছেন। শহরের হতদরিদ্ররা নানাভাবে সহায়তা পেলেও, গ্রামের মানুষ শীতবস্ত্রের অভাবে কষ্টে দিন যাপন করছে। এক কম্বলে চারজন ঘুমাচ্ছে, এমন অবস্থাও আছে কোন কোন পরিবারে।

সুনামগঞ্জ শহরতলি, সরদাবাজ গ্রামের দিনমজুর বিকাশ রঞ্জন দাস ও রেখা রানী দাসের পাঁচ ছেলে মেয়ে। জুনের ভয়াবহ বন্যায় পানিতে তলিয়ে গিয়েছিল এই দম্পত্তির বসত ঘর। বিছানাপত্র-থালাবাসন সবই ভেসে যায় ঢলে। একজনের রোজগারে কোনো রকমে সংসার চলে। তিনদিন শীতের সঙ্গে লড়াই করে একেবারে অসহায় হয়ে পড়েছে এই পরিবারের সদস্যরা।

রেখা রানী দাস বলেন, “এলাকার মেম্বার একখান (একটা) কম্বল দিছলা (দিয়েছিলেন), আরেকজনে (অন্য একজন) দিছলা (দিয়েছিলেন) আরেক কম্বল। দুই কম্বল দিয়াই চাইর (চার) পুয়া পুরি (ছেলে মেয়ে) আর আমরা দুইজন কোনভাবে ঘুমায়রাম।”

তিনি জানান, এক মেয়ে মামার বাড়িতে আছে। কয়েকদিন ধরে তিন মেয়ে নিয়ে এক কম্বল দিয়ে চারজন গুশাচ্ছেন। বিকাশ ও রেখা রানীর মত বিপদাপন্ন অবস্থা আছে হাওরপাড়ের অসংখ্য মানুষ। সুনামগঞ্জ সদর, দোয়ারাবাজার ও ছাতকের বেশিরভাগ এলাকাতেই এখন এমন সংকটে দিন যাপন করছে শীতে বিপন্ন মানুষ।

সুনামগঞ্জ শহরের বড়পাড়ার বাসিন্দা নুরুল আমিন ও পিয়ারা খানম বন্যার পর কেনো সাহায্য পাননি। নুরুল আমিন ফুটপাতে বসে লেবু বিক্রয় করে সংসার চালান। সরকারি সহায়তার টাকা দিয়ে তিনি একটি লেপ কিনেছিলেন। পিয়ারা খানম বলেন, এক লেপ দিয়ে চারজনের রাতযাপন হয় কেমন করে।

সুনামগঞ্জ শহরের কাছের ইউনিয়ন কোরবাননগর। এখানকার ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আবুল বরকত বলেন, “শীতের তীব্রতায় বিপদে পড়েছেন দরিদ্র মানুষ। গেল বন্যায় সবকিছু হারানো এসব মানুষ একটি কম্বল পাওয়ার জন্য বার আসছেন আমাদের অফিসে। ইউনিয়নের সবকটি গ্রামে বিতরণ করতে তিন হাজার কম্বল প্রয়োজন, আমরা পেয়েছি তিনশ। লুকিয়ে এসব কম্বল বিতরণ করতে হয়েছে।”

জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ শফীকুল ইসলাম বলেন, “শতাব্দীর ভয়াবহ বন্যায় বহু মানুষের বিছানাপত্র-ঘরবাড়ি নষ্ট হয়েছে। এই জেলায় অতিরিক্ত কম্বল বরাদ্দের জন্য তিনবার চিঠি পাঠানো হয়েছে। অতিরিক্ত কোন বরাদ্দ এখনো পাওয়া যায় নি। রুটিন বরাদ্দের ৪৫ হাজার ১০০ কম্বল ১২ উপজেলায় পাঠানো হয়েছে।”

এরমধ্যে, তাহিরপুরে তিন হাজার পাঁচশ, জামালগঞ্জে তিন হাজার, ধর্মপাশায় তিন হাজার, শাল্লায় দুই হাজার, দিরাইয়ে চার হাজার, শান্তিগঞ্জে চার হাজার, সুনামগঞ্জ সদরে পাঁচ হাজার, বিশ্বম্ভরপুরে দুই হাজার পাঁচশ, ছাতকে ছয় হাজার পাঁচশ, দোয়ারাবাজারে পাঁচ হাজার, মধ্যনগরে দুই হাজার এবং জেলা প্রশাসকের কার্যালয় হতে ছয়শ’ কম্বল বিতরণ করা হয়েছে।

জেলা প্রশাসক দিদারে আলম মোহাম্মদ মাকসুদ চৌধুরী বলেন, “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে ৪৫ হাজার ১০০ শীতবস্ত্র পেয়েছি। সেগুলো সব উপজেলায় বিতরণ করা হয়েছে। তবে, তা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। চিঠি লিখেছি, বাস্তবতা বিবেচনা করে আরও শীতবস্ত্র পাঠানোর জন্য।পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেগুলো বিতরণ করা হবে।”

চুয়াডাঙ্গায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা

শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) বাংলাদেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস রেকর্ড করা হয়েছে চুয়াডাঙ্গায়। ঘন কুয়াশা আর হিমেল হাওয়ায় চুয়াডাঙ্গায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে আছে। মানুষ জরুরি কোনো কাজ ছাড়া ঘরের বাইরে বের হচ্ছেন না। আবার সন্ধ্যার আগেই সবাই ঘরে ফিরছেন।

বেশি দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার খেটে খাওয়া মানুষ। এলাকার বিভিন্ন মোড়ে ও চায়ের দোকানে শীত নিবারনের চেষ্টায় খড়কুটো জ্বালিয়ে উত্তাপ নিতে দেখা গেছে নিম্ন আয়ের মানুষদের। এছাড়া ঘন কুয়াশার কারণে হেডলাইট জ্বালিয়ে চলাচল করছে যানবাহন।

জেলার আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রকিবুল হাসান জানান, শুক্রবার সকাল ৯টায় সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস। যা সারাদেশের মধ্যে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা। বাতাসের আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৮ শতাংশ। এছাড়া শৈত্যপ্রবাহ শনিবার পর্যন্ত অব্যাহত থাকতে পারে। তাপমাত্রা আরও কমতে পারে বলেও জানান তিনি।

তিনি আরও জানান, চুয়াডাঙ্গায় হাড়কাঁপানো শীতে বিপর্যস্ত স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও অতিদরিদ্র মানুষ সবচেয়ে বেশি সমস্যায় আছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের দেখা মিললেও, শৈত্যপ্রবাহের কারণে কমেনি শীতের দাপট।শীতজনিত কারণে হাসপাতালগুলোতে নিউমোনিয়া ও ডায়রিয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে গেছে। বেশি আক্রান্ত হচ্ছে শিশু ও বৃদ্ধরা।

চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে শিশু ওয়ার্ডে ১৩ বেডের বিপরীতে ভর্তি রয়েছে ৫০ জন। অপরদিকে প্রতিদিন ডায়রিয়া ওয়ার্ডে রোগী ভর্তি হচ্ছে শতাধিক। চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালের শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. মাহবুবুর রহমান মিলন জানান, তীব্র শীতে শ্বাসকষ্ট, ডায়রিয়াসহ শীতজনিত বিভিন্ন রোগে হাসপাতালের আউটডোরে প্রচুর রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন।

ঘন কুয়াশার কারণে শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌরুটে ফেরি চলাচল বন্ধ রয়েছে। ঘাটে দেখা দিয়েছে যানজট। দুর্ঘটনা এড়াতে বৃহস্পতিবার (৫ জানুয়ারি) ভোর ৪টা থেকে শুক্রবার (৬ জানুয়ারি) সকাল পর্যন্ত সদরের হরিণা ফেরিঘাটে ফেরি চলাচল প্রায় আড়াই ঘন্টা বন্ধ ছিলো।

ফেরিঘাট ব্যবস্থাপক ফয়সল আলম চৌধুরি জানান, “মধ্যরাত থেকেই কুয়াশার ঘনত্ব বেড়ে যায়। তাই ঝুঁকি এড়াতে শরীয়তপুর-চাঁদপুর নৌপথে ফেরি চলাচল বন্ধ রাখা হয়। তিনি জানান, নরসিংহপুর ঘাটে চারটি ফেরি এবং হরিণাঘাটের ফেরি যানবাহন নিয়ে অবস্থান কুয়াশার কারণে আটকা পড়ে। কুয়াশা কেটে গেলে ফেরিগুলো চলাচল শুরু করে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ফেরি চলাচল ব্যহত হওয়ায়, হরিণা ও নরসিংহপুর ফেরিঘাটে যানজট সৃষ্টি হয়েছে। পারাপারের অপেক্ষায় রয়েছে শত শত যানবাহন।

XS
SM
MD
LG