অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

সত্যজিতের ফেলুদা


ফেলুদা
ফেলুদা

ফেলুকে আমি ভারতবর্ষে রেখে, ভারতবর্ষে তার নানারকম এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী বলতে লাগলাম, আর শঙ্কুকে (নিয়ে) সারা পৃথিবী চষে বেড়াতে লাগলাম।” - সত্যজিৎ রায়

"উনি ছিলেন এক নম্বর ফেলুদা, আমরা সবাই তারপরে।" - প্রথম ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পর্কে পরবর্তী সব্যসাচী চক্রবর্তী

‘‘হয় আমি এর বদলা নেব, নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব!’’ - ফেলুদা

'মগজাস্ত্র', '২১ রজনী সেন রোড' বা 'চারমিনার' শব্দগুলো শুনলে যেকোন সাহিত্য আর সিনেমাপ্রেমীর মাথায় ‘ফেলুদা’ নামটা আসতে বাধ্য। সত্যি বলতে কি, ফেলুদাকে চেনেন না, এমন বাঙালি পাঠক খুঁজে পাওয়া শুধু কঠিনই নয়, প্রায় অসম্ভব। যারা কদাচিৎ দুই একটা বই হাতে নেন, ফেলুদার কোন না কোন বইয়ের দেখা তারাও পেয়েছেন। আর বই থেকে যারা শত ক্রোশ দূরে থাকেন, তারাও কখনো না কখনো টিভির পর্দায় বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মে দেখেছেন এই ফেলুদাকে। দু'টি সিনেমাতো বানিয়েছেন খোদ লেখকই।

কে এই ফেলুদা?

ফেলুদা বাংলা সাহিত্যের এক স্বঘোষিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ, সত্যজিৎ রায়ের অন্যতম সেরা সৃষ্টি। ভালো নাম প্রদোষচন্দ্র মিত্র, ভিজিটিং কার্ডে লেখা থাকে ‘প্রদোষ সি মিটার’। জটায়ু এই নামের এক সাংঘাতিক অর্থ খুঁজে বের করেছেন। প্র তে প্রফেশনাল, দোষ অর্থ ক্রাইম, আর সি হচ্ছে টু-সি, মানে ইনভেস্টিগেট করা। ফেলুদার উচ্চতা ছয় ফুট দুই ইঞ্চি। নিয়মিত ব্যায়াম ও যোগাসন করেন। দেখতে যেমন সুপুরুষ, তেমনি কাজে-কর্মে আর চিন্তা-জানায় ব্যাপক স্মার্ট। মুম্বাইয়ের পরিচালক পুলক ঘোষাল তো ফেলুদাকে সিনেমার হিরোও বানাতে চেয়েছিলেন।

তার দুটি নেশা, চারমিনার সিগারেট এবং রহস্যভেদ, আর মাঝে মাঝে খাওয়ার পর খয়ের ছাড়া মিঠে-পান। সবসময় দুটি অস্ত্র থাকে ফেলুদার সঙ্গে - পকেটে পয়েন্ট থ্রি টু কোল্ট রিভলভার, আর মাথায় বিখ্যাত মগজাস্ত্র - যার জুড়ি মেলা ভার।

ফেলুদার আছে প্রখর মেধা। স্কুলে দু’বার রিডিং পরেই পুরো 'দেবতার গ্রাস' মুখস্ত করে ফেলেছিলেন। তাসের ম্যাজিক জানেন, জানেন কিছুটা হিপনটিজম। ডান আর বাঁ - দুহাতেই লিখতে পারেন তিনি। বেশ ভাল ক্রিকেট খেলেন। আর তার জ্ঞানের পরিধি তো লিজেন্ডারি। দুর্বোধ্য দর্শন বলুন, কিংবা সাম্প্রতিক বিশ্বের যত খবর - সবই তার নখদর্পনে। কঠিন কঠিন সব বিষয়ে আছে তার দক্ষতা - এটিমোলজি, জিওমেট্রি থেকে শুরু করে গাছ বা কুকুরের জাত সনাক্ত করার মত বায়োলজি জ্ঞান। ফেলুদা ভাল আঁকতে পারেন, গাইতে পারেন।

সত্যজিৎ রায় নিজেও ছিলেন ছ’ফুট তিন। গমগমে গলার স্বর, ম্যাজিকাল পার্সোনালিটি। পড়াশোনা কল্পনাতীত। খেয়াল করে দেখতেন সবকিছু আর চিন্তা-বিশ্লেষণ করতে ভালবাসতেন তিনি। ফেলুদার চরিত্র মানিকবাবু তৈরি করেছেন নিজের আদলেই। ফেলুদার তীক্ষ্ণ মনন, সাথে তোপসের তরতরে লেখনী আর লালমোহন বাবুর হিউমার - তিনে মিলে যেন সম্পূর্ণ সত্যজিৎ।

ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ফাইল ছবি। জুন ১৯৬৭।
ভারতের চলচ্চিত্র নির্মাতা সত্যজিৎ রায়ের ফাইল ছবি। জুন ১৯৬৭।

ফেলুদার সাইডকিক তোপসে

ফেলুদা সম্পর্কে এত কিছু আমরা জানতে পারি তোপসের কল্যাণে। ফেলুদার খুড়তুতো ভাই সে - হোমসের ওয়াটসন বা ব্যাটম্যানের রবিন। ফেলুদার সব কাহিনীগুলো লেখা তার কলমে - উত্তম পুরুষে। তোপসের ভাষায়, ফেলুদা যদি কোন জ্যোতিষ্ক হন, সে তার স্যাটেলাইট। হবেই না বা কেন? এমন গুণধর দাদার ভক্ত না হয়ে পারা যায়? তাইতো একেবারে শুরু থেকেই দাদার সহকারী হিসেবে আছে তপেশরঞ্জন মিত্র, ওরফে তোপসে। দাদার সংস্পর্শে থেকে তোপসেও হয়ে ওঠে তার সমবয়সীদের থেকে স্মার্ট এবং সাহসী, যদিও দুজনের বয়সে বিস্তর ফারাক। শুরুতে তোপসের বয়স ছিল ১৩/১৪, আর ফেলুদার ২৭। ফেলুদার আদেশেই রহস্যভেদের সব কাহিনী টুকে রাখে সে। দাদার সাথে প্রথম পাঁচটি গল্পে একাই ছিল তোপসে। এরপর তাদের সাথে যোগ দিয়ে 'থ্রি মাস্কেটিয়ার্স' সম্পূর্ণ করেন জটায়ু।

জটায়ুর আগমন

‘সোনার কেল্লা’ কাহিনীতে ফেলুদা এবং তোপসে ট্রেনে করে আগ্রা ফোর্ট থেকে বান্দিকুই যাচ্ছিলেন। তখনই তাদের সাথে পরিচয় মাথায় টাক, নাকের নিচে ঝাঁটা গোঁফওয়ালা জটায়ুর। দেখতে অত্যন্ত নিরীহ হলেও উনি কিন্তু বেস্টসেলিং রহস্য রোমাঞ্চ লেখক, প্রখর রুদ্রের স্রষ্টা তবে তোপসে তাকে প্রথম দেখে সেটা ঘূনাক্ষরেও আঁচ করতে পারেনি। ভেবেছিল, "যে রকম গল্প লেখে, চেহারা নিশ্চয়ই হবে একেবারে জেমস বন্ডের বাবা।" জটায়ু ছদ্মনামধারী লালমোহন গাঙ্গুলিকে সত্যজিৎ রায় নিয়ে এসেছিলেন এই ক্রাইম অ্যাডভেঞ্চারের গল্পে কমিক বাঙালির নির্দোষ হাস্যরসের প্রতীক হিসাবে। বলা যায়, তিনি ফেলুদার গল্পের সবচাইতে ‘ইন্টারেস্টিং’ চরিত্র। জটায়ুর আছে বিভিন্ন ধরণের, বিভিন্ন দেশের অস্ত্র সংগ্রহের অদ্ভুত এক শখ। যেমন সোনার কেল্লায় ছিল ‘নেপাল কা অস্ত্র’ ভোজালি, বাক্স রহস্যে বুমেরাং, কৈলাসে কেলেঙ্কারিতে মিলিটারি স্মোকবম্ব। জীবন তার ভুলে ভরা। একদিকে যেমন ভুলভাল ইংরেজি বা হিন্দি বলেন, অন্যদিকে তার লেখায়ও থাকে অনেক ভুল। ভুল বুঝতে পারলেই জিভ দুই ইঞ্চি বের করে বলতেন- "এঃ, ছ্যা ছ্যা ছ্যা ছ্যা।" ভাগ্যিস ফেলুদা তাকে শুধরিয়ে দিতেন, নইলে তো তার নায়ক প্রখর রুদ্রের সাথে জলহস্তীর ফাইট বাঁধিয়েই বসেছিলেন নর্থ পোলে। একসাথে ঘুরতে গিয়ে তাকে নাকালও কম হতে হয়নি। ফেলুদার অনেক শত্রুই বেশ যন্ত্রণা দিয়েছে তাকে। মগনলাল মেঘরাজ তো কখনো চায়ের সাথে মাদক মিশিয়ে, কখনো ভাড়াটে নাইফ থ্রোয়ার দিয়ে লালমোহনবাবুকে টার্গেট বানিয়ে ছুরি নিক্ষেপের খেলা দেখিয়ে তার আয়ুই কমিয়ে দিয়েছে অন্তত তিন বছর।

ফেলুদার শত্রুরা

সত্যজিৎ রায় কোন চুনোপুঁটিকে ভিলেন বানিয়ে কিন্তু ফেলুদার সামনে দাঁড় করাননি। ফেলুদার পাশাপাশি ভিলেনদের চরিত্রেও সমান গুরুত্ব দিয়েছিলেন তিনি। তাদের প্রায় সবাই প্রখর বুদ্ধিমান এবং দুর্ধর্ষ, যা ফেলুদাকে নিজের মাহাত্ম্য প্রতিষ্ঠা করতে সাহায্য করেছে। কারণ বুদ্ধির খেলায় শত্রুকে হারাতে হলে শত্রুর চাইতে অবশ্যই বুদ্ধিমান হতে হবে।

এদের মধ্যে মগনলাল মেঘরাজের কথা বলতেই হবে। ফেলুদার গল্পের ‘প্রফেসর মরিয়ার্টি’ হলো মগনলাল। ফেলুদার এই আর্চনেমেসিসকে বর্ণনা করতে তিনবার ‘সাংঘাতিক’ শব্দটা ব্যবহার করেছিলেন সত্যজিৎ রায়। মগনলাল টিপিক্যাল ভিলেনদের মত ফেলুদাকে আক্রমণ করতেন না, তিনি খেলতেন মাইন্ডগেম। এতে তিনি এতটাই পাকা ছিলেন, প্রচন্ড আত্মবিশ্বাসী ফেলুদার মনে গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেয়ার ভাবনাও আসে। ‘জয় বাবা ফেলুনাথ’-এ ফেলুদা মগনলাল মেঘরাজের বাড়িতে জটায়ু অপমানিত হলে পর দশাশ্বমেধ ঘাটের সিঁড়িতে বসে ফেলুদা বলেছিল, ‘‘হয় আমি এর বদলা নেব, নয় গোয়েন্দাগিরি ছেড়ে দেব!’’

ফেলুদার সাথে মগনলালের দেখা হয় তিনবার: একবার কাশীতে, একবার বানারসে, একবার কাঠমুন্ডুতে। কিন্তু প্রতিবারেই ফেলুদা তার বিস্তৃত জ্ঞান আর মগজাস্ত্রের ব্যবহার করে শেষ হাসিটা হাসেন।

ফেলুদার গল্পে ভ্রমণের স্বাদ

ফেলুদার গল্পে যেমন অ্যাডভেঞ্চার আছে, টুইস্ট আছে, রহস্যের জট ছাড়ানো আছে, তেমনি আছে ভ্রমণের স্বাদ। কারো মুখে শুনে বা বই পড়ে এসব ভ্রমণের গল্প ফাঁদেননি সত্যজিৎ। যতগুলো জায়গায় ফেলুদার প্লট, সবগুলো জায়গাতেই কোনো না কোনো সময় গিয়েছিলেন তিনি। তার প্রিয় জায়গা দার্জিলিংয়েই শুরু হয় ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি। ফেলুদা ঘুরেছেন পুরী, লখনৌ, কাশ্মীর কিংবা দেশের বাইরে হংকং-লন্ডনে। বাক্স রহস্য গল্পে তোপসে মুগ্ধ হয়ে দেখেছে শিমলার সৌন্দর্য্য, পাশাপাশি জানিয়েছে শিমলা পত্তনের ইতিহাস। ভ্রমণের সাথে ডিটেভটিভ নভেলের এই মিশ্রস্বাদ ফেলুদা বাদে অন্য কোথাও পাওয়া সম্ভব নয়। সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়কে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ বলেন, “ফেলুকে আমি ভারতবর্ষে রেখে, ভারতবর্ষে তার নানারকম এ্যাডভেঞ্চারের কাহিনী বলতে লাগলাম, আর শঙ্কুকে (নিয়ে) সারা পৃথিবী চষে বেড়াতে লাগলাম।”

কি সহজ সরল মেদহীন ভ্রমণ বৃত্তান্ত! তোপসের বর্ণনাতেও সেটাই প্রতিভাত হয়। সোনার কেল্লা উপন্যসে ফেলুদারা গেলেন বাজস্থানের বিকানির। তোপসে লিখেছে, “বিকানির পৌঁছলাম পৌনে বারোটায়। শহরে পৌঁছবার কিছু আগে থেকেই রাস্তা ক্রমেই চড়াই উঠেছে। এই চড়াইয়ের উপরেই পাঁচিল দিয়ে ঘেরা শহর। আর শহরের মধ্যে চোখে পড়ার মতো জিনিস হচ্ছে লালচে রঙের পাথরের তৈরি প্রকাণ্ড দুর্গ। আমাদের গাড়ি একেবারে সোজা দুর্গের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। লক্ষ করলাম, যতই কাছে যাচ্ছি ততই যেন দুর্গটাকে আরও বড় বলে মনে হচ্ছে। রাজপুতরা যে দারুণ শক্তিশালী জাত ছিল সেটা তাদের দুর্গের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়।”

ফেলুদা বনাম ব্যোমকেশ

ব্যোমকেশের সাথে ফেলুদার একটা মস্ত বড় তফাৎ - ভ্রমণকাহিনীর কোন ছিটেফোটা নেই ব্যোমকেশের গল্পে। বাঙালি পাঠকরা প্রায়ই এই দুই গ্রেটের মধ্যে সেরা কে, এই নিয়ে তর্কে মাতেন। জনপ্রিয়তার দিক থেকে ফেলুদা এগিয়ে থাকায় তর্কটা সেভাবে জমে ওঠে না। তবে ভ্রমণ বাদেও দুজনের গল্পে বিস্তর ফারাক আছে। ব্যোমকেশের গল্পগুলো ‘আধুনিক’ এবং তা প্রাপ্তবয়স্কদের কথা মাথায় রেখেই লেখা। শরদিন্দু বলেছিলেন, ‘‘মানুষের সহজ সাধারণ জীবনে কতগুলি সমস্যা অতর্কিতে দেখা দেয় - ব্যোমকেশ তারই সমাধান করে। কখনও কখনও সামাজিক সমস্যাও এর মধ্যে দেখাবার চেষ্টা করেছি।’’ অর্থাৎ ব্যোমকেশের উপন্যাসগুলো কেবল রহস্য নয়, সামাজিকও বটে। অন্যদিকে জটায়ুর হাস্যরস, ফেলুদার জ্ঞানের বহর আর তোপসের কিশোর আচরণ দুইয়ের মাঝে একটা পরিষ্কার লাইন এঁকে দেয়। ‘সত্যান্বেষী’ ব্যোমকেশের ডিটেকটিভ শব্দটা তেমন একটা পছন্দ নয়, কিন্তু ফেলুদা একবাক্যে গুরু মেনে নেন শার্লক হোমসকে, বনে যান প্রাইভেট ইনভেস্টিগেটর।

ফেলুদার মৌলিকতা

‘লন্ডনে ফেলুদা’ গল্পে ২২১ বি বেকার স্ট্রিটে দাঁড়িয়ে ফেলুদা স্মরণ করেন শার্লক হোমসকে, "গুরু, তুমি ছিলে বলেই আমরা আছি।" ফেলুদা সৃষ্টিতে অনুপ্রেরণা হিসেবে যে ছিলেন আর্থার কোনান ডয়েলের শার্লক হোমস, সেটা কমবেশি সবারই জানা। সত্যজিৎ রায় নিজেও শার্লক হোমসের ভক্ত। সাথে ছিল হার্জের ‘টিনটিন’ আর তার বিশ্বভ্রমণ। কিন্তু এর বাইরে ফেলুদা একদমই মৌলিক। সত্যজিৎ রায় অন্য কোথাও থেকে প্লট ধার নেননি, চরিত্র সাজাননি। তার লেখনি এবং উপস্থাপনার গুণে বাঙালি পাঠকরা ফেলুদাকে আপন করে নেয়।

সত্যজিৎ রায় তাঁর গল্পে বাড়তি চরিত্র আনেননি, অহেতুক কাহিনী বড় করেননি বা জোর করে পাঠকের উপর কোন কিছু চাপিয়ে দেননি। একজন নির্ভরযোগ্য গুরুশ্রেণির ক্যারেক্টারও এনেছেন লেখক, ফেলুদার মেন্টর সিধু জ্যাঠার মধ্য দিয়ে, যা সাধারণত এ ধরণের ‘সর্বেসর্বা’ গোছের ডিটেকটিভের কাহিনীতে দেখা যায় না। শুধু ওয়াকিং টকিং এন্সাইক্লোপিডিয়া বা সার্চ ইঞ্জিনই নন এই সিধু জ্যাঠা, তিনি আসলে ফেলুদার মোরাল কম্পাস।

ভাবতে অবাক লাগতে পারে, ফেলুদা সিরিজ নিয়ে শুরুতে বড় কোন পরিকল্পনা ছিল না সত্যজিৎ রায়ের। ১৯৬৫ সালের ডিসেম্বর মাসের সন্দেশ পত্রিকার জন্য তিনি লেখেন প্রথম গল্প “ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি”। এরপর লিখেন ‘বাদশাহী আংটি’ যা পুরো একবছর ধরে সন্দেশ পত্রিকায় প্রকাশ করা হয়। তুমুল জনপ্রিয়তা পাওয়ার পরপরই আস্তে আস্তে আরো গল্প আসতে থাকে সন্দেশ পত্রিকায়। পরে এক বছর বড়দের ‘দেশ’ পত্রিকার পূজাবার্ষিকীতে, অন্য বছর কিশোরদের ‘সন্দেশে’ নিয়মিত বেরতে থাকে ফেলুদা।

কেন সব বয়সের পাঠকের কাছে জনপ্রিয় ফেলুদা?

মনে রাখতে হবে, সন্দেশ কিশোরদের জন্য প্রকাশ করা একটি পত্রিকা, যার পাতায় প্রথম দেখা মেলে ফেলুদার। অর্থাৎ, শুরুতে ফেলুদা কিন্তু কিশোরদের জন্যেই লিখেছিলেন সত্যজিৎ রায়। দেশ-বিদেশের সব গোয়েন্দাকাহিনীতে সহকারী থাকে সমবয়সী। অথচ তোপসে একজন কিশোর, যা আকর্ষণ করে কিশোর-কিশোরীদের। তোপসে এখানে সেই পাঠকদেরই প্রতিনিধি। দাদার সাথে দেশ-বিদেশ ভ্রমণ, অ্যাডভেঞ্চার, রহস্যভেদ! তোপসের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করার সুযোগ কেই বা হাতছাড়া করতে চায়?

তারপরও, গল্পের কাঠামো, উপস্থাপনা, তথ্যভাণ্ডার আর ফেলুদার ক্যারিশমাতে সেটা কিশোরদের মধ্যে আবদ্ধ থাকেনি কখনো। ২৬ বছরের দীর্ঘ এই সিরিজে তোপসের বয়স তেমন না বাড়লেও পাঠকদের তো বেড়েছে। তাই তারা একসময় নিজেকে তোপসে ভাবা বাদ দিয়ে, ফেলুদা হিসেবেই কল্পনা করতে পেরেছেন।

পর্দার ফেলুদারা

এ পর্যন্ত ফেলুদার চরিত্রে অভিনয় করেছেন আটজন অভিনেতা। পরমব্রত চট্টোপাধ্যায় এখানে এক ধাপ এগিয়ে। শুরুতে ফেলুদার তোপসে হিসেবে তিনটি সিনেমায় অভিনয় করেছিলেন। পরে ফেলুদা ওয়েব সিরিজে দিব্যি ফেলুদাই বনে যান। খুব বেশি দর্শক সমর্থন অবশ্য পাননি তিনি। বাকি সাতজনের মধ্যে সবচেয়ে ‘আইকনিক’ ফেলুদা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অভিনয় করেছিলেন সত্যজিৎ রায় পরিচালিত দুটি সিনেমাতে। দর্শকরা ফেলুদা চরিত্রে আপন করে নিয়েছিল সব্যসাচী চক্রবর্তীকে। সত্যজিৎ রায়ের ছেলে সন্দীপ রায়ের পরিচালনায় বেশ কয়েকটি সিনেমা ও টিভি শোতে ফেলুদা হিসেবে অভিনয় করেন তিনি। অবশ্য তাঁর মতে এখনো সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় এক নম্বর ফেলুদা। বাংলাদেশেও ফেলুদাকে নিয়ে একটি ওয়েব সিরিজ নির্মাণ করা হয় ২০১৯ সালে। তৌকির আহমেদের পরিচালনায় সেই সিরিজে ফেলুদা হিসেবে অভিনয় করেন আহমেদ রুবেল। এছাড়াও, নানান সময়ে ফেলুদার চরিত্র রূপায়িত করেছেন ইন্দ্রনীল সেনগুপ্ত, আবীর চট্টোপাধ্যায়, টোটা রায় চৌধুরী। এমনকি, বলিউডের শশী কাপুরও হয়েছিলেন ফেলুদার একটি হিন্দি এ্যাডাপটেশনে - যদিও বয়সের ভারে কিছুটা স্থূল সেই ফেলুদাকে ঠিক গ্রহণ করতে পারেনি দর্শক।

ফেলুদার সমালোচনা

কিশোরকাহিনী ফেলুদায় নারী চরিত্রের দেখা মেলে খুব কম। না, শুধু মূল ক্যারেক্টারগুলোতে নয়, পার্শ্বচরিত্রেও কদাচিৎ দেখা মিলিছে কোনও নারীর। বলার মতো আছে কেবল জয় বাবা ফেলুনাথের বাসন্তী, নয়তো তোপসের মা। ফেলুদাই একমাত্র ডিটেকটিভ, যার গল্পে নারীরা খুব কম ভূমিকা পায়। কিশোরপাঠ্য এ গল্পগুলোতে কোনপ্রকার এ্যাডাল্ট থিম, তা সিডাকশনই হোক বা সেক্সুয়াল হ্যারাজমেন্টই হোক, কখনো ঠাঁই পায়নি, সঞ্জীবকে বলেছিলেন সত্যজিৎ। নিজে যেমন অনেক সিগারেট খেতেন, তেমনি গল্পের ফেলুদাকেও চেইন স্মোকার বানিয়েছিলেন তিনি। আধুনিক জীবনের সাথে, আধুনিক মননের সাথে তা সাংঘর্ষিক কি না, তা নিয়ে মোটেই ভাবিত ছিলেন না তিনি।

শেষ কথা

শুধু রহস্যের সমাধান করে পাঠককে আনন্দ দেয়া নয়, ফেলুদা আমাদের জিজ্ঞাসু চোখে জগৎকে দেখতে শেখায়, ভাবতে শেখায়। বিপদের সময় মাথা ঠান্ডা রাখতে শেখায়। ফেলুদার আবির্ভাবের পর পেরিয়ে গেছে প্রায় ষাট বছর। এর মধ্যে আমরা পেয়েছি ৩৫টি সম্পূর্ণ ও চারটি অসম্পূর্ণ গল্প ও উপন্যাস। শেষ গল্পটি প্রকাশিত হয় ‘৯৭ সালে, লেখকের মৃত্যুর পর। ১৯৯২ সালের ২৩ এপ্রিল চিরবিদায় নেন সত্যজিৎ রায়।

কিন্তু ফেলুদাতো এখনও জীবন্ত। কোনো তথ্যের জন্য ইন্টারনেট না ঘেঁটে এখনও তিনি চলে যান সিধু জ্যাঠার কাছে, এখনও টান দেন ফিল্টারবিহীন চারমিনার, ঘুরে বেড়ান দেশে বিদেশে। দক্ষিণ কলকাতার রজনীসেন রোডের ২১ নাম্বার বাড়িতেই থাকেন তিনি। কোন রহস্য উদ্ঘাটনের প্রয়োজন হলেই ছুটে যাবেন সেখানে, দরজায় টোকা দিয়ে জিজ্ঞেস করবেন, ফেলুবাবুর সাথে একটু দেখা করা যাবে?

XS
SM
MD
LG