নরসিংদীতে মিছিলে আওয়ামী লীগ কর্মীদের গুলি, পিটিয়ে ৬ কর্মীকে হত্যা, গুলিবিদ্ধ ৪ জন
নরসিংদী জেলার সদর উপজেলার মাধবদী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় বৈষম্য বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়েছে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা। এর জের ধরে আওয়ামী লীগের ছয় কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন উত্তেজিত জনতা। এছাড়া তাদের ছোড়া গুলিতে আহত হয়েছেন চার আন্দোলনকারী।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রবিবার (৪ আগস্ট) আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে বের হলে আওয়ামী লীগের সমর্থকরা তাদের প্রতিহত করতে মিছিলে এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে চারজন গুলিবিদ্ধ হন। আহতদের মধ্যে সুমন মিয়া (৩৫), সোহেব (৪১), আল আমিনকে (২৫) নরসিংদী সদর হাসপাতালে এবং মীর জাহাঙ্গীরকে (৩০) মুমূর্ষু অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপতালে পাঠানো হয়।
এদিকে, গুলি উপেক্ষা করেই বিক্ষোভরত ৪/৫ হাজার মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ওপর চড়াও হয়। তারা দৌড়ে পালাতে থাকেন। এসময় ছয়জন মাধবদী বাসস্ট্যান্ডের পশ্চিম দিকের বড় মসজিদে আশ্রয় নেন। উত্তেজিত জনতা মসজিদ থেকে তাদের বের করে এনে মসজিদের সামনেই পিটিয়ে তাদের র মৃত্যু নিশ্চিত করে চলে যায়।
নিহতরা হলেন; চরদিগলদী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন (৪০), নরসিংদী সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেনের ছোট ভাই যুবলীগ নেতা দেলোয়ার হোসেন (৩৮), জেলা পরিষদের সাবেক সদস্য শ্রমিক লীগ নেতা মনিরুজ্জামান ভূইয়া ওরফে নাতি মনির (৪২), শ্রমিক লীগ নেতা আনিছুর রহমান সোহেল (৪০), মাধবদী পৌরসভার ১১ নম্বর ওয়ার্ড কমিশনার নওশের (৪০) ও অজ্ঞাত (৩৮) একজন।
বিকাল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত মরদেহ মসজিদের সামনেই পড়ে ছিলো। স্থানীয় সাংবাদিকরা পুলিশকে খবর দিলেও পুলিশ সেখানে যায়নি।
এ বিষয়ে মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা কামরুজ্জামানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি ৬ জনের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছেন।
রবিবার সকাল থেকেই নরসিংদী শহরের ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের জেলখানা মোড় চত্বরে ছাত্র-জনতা জমায়েত হতে শুরু করে। দুপুর ১টার দিকে তারা জেলখানা মোড় থেকে নরসিংদী স্টেডিয়াম পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করে।
(এই প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ইউএনবি থেকে নেয়া হয়েছে।)
আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদ খারিজ
আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদন খারিজ করে দিয়েছে হাইকোর্ট। তবে আন্দোলন দমনে পুলিশকে পিআরবি (পুলিশ রেগুলেশনস অফ বাংলাদেশ) অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সংবিধান ও আইন অনুযায়ী দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
রবিবার (৪ আগস্ট) বিচারপতি মোস্তফা জামান ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসাইন দোলনের দ্বৈত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেয়।
আদেশের পর রিটকারী পক্ষের আইনজীবী ব্যারিস্টার অনিক আর হক বলেন, রিট আবেদনটি খারিজ করেছে ঠিকই, তবে বেশ কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। “সেটা হচ্ছে, এদেশ গণতান্ত্রিক দেশ। এদেশের জনগণের সাংবিধানিক অধিকার আছে। সংবিধান অনুযায়ী ফ্রিডম অফ অ্যাসোসিয়েশন করার অধিকার, প্রতিবাদ করার অধিকার রয়েছে;” জানান ব্যারিস্টার অনিক আর হক।
তিনি আরো জানান, পিআরবিতে যেসব নির্দশনা আছে, পুলিশকে তা অবশ্যই অনুসরণ করতে হবে। পুলিশ রেগুলেশনে বলা আছে, এভাবে নির্বিচারে গুলি করা যাবে না। রিট খারিজ করা হলেও, যে বিষয়ে আবেদন করা হয়েছিলো, হাইকোর্টের আদেশে তা পূরণ হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
আইন মতে কখন গুলি করা যাবে এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার অনিক আর হক জানান, আইনে বলা আছে, কখনো কোথাও আগুন দিলে, আক্রমণ করলে, ডাকাতি করলে, এসব ক্ষেত্রে গুলি চালাতে পারবে।
“কিন্তু শান্তিপূর্ণ সমাবেশে গুলি চালানো হয়েছে;” তিনি আরো বলেন। উল্লেখ করেন, হাঙ্গামা দমন করতে হলে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। ম্যাজিস্ট্রেট না পাওয়া গেলে, সেখানে উপস্থিত সর্বোচ্চ কর্মকর্তার কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। গুলি চালাতে হলে মাইকিং করে জানাতে হবে। আর, এমনভাবে গুলি করতে হবে যাতে সর্বনিম্ন ক্ষতি হয়, যাতে প্রাণঘাতি আক্রমণ না হয়।
আদেশের পর অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন সাংবাদিকদের জানান, “হাইকোর্ট রুলস অনুযায়ী এই রিট করতে পারে না। সেজন্য আদালত রিট খারিজ করে দিয়েছে। তবে কিছু পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। আদালত বলেছেন, যে কেউ শান্তিপূর্ণভাবে সভা-সমাবেশ করতে পারবে। তবে প্রয়োজন হলে পিআরবি মেনে পুলিশ পদক্ষেপ নিতে পারবে।”
আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি ব্যবহার না করার নির্দেশনা চেয়ে করা রিট আবেদনটি, আদেশের জন্য সংশ্লিষ্ট হাইকোর্ট বেঞ্চের কার্যতালিকায় তোলা হয়। এটি কার্যতালিকার ১০ নম্বর ক্রমিকে ছিলো। উভয়পক্ষের শুনানি গ্রহণ শেষে হাইকোর্ট রিট আবেদনটি খারিজ করে দেন।
এর আগে, গত ২৯ জুলাই কোটা সংস্কার আন্দোলনকারীদের ওপর গুলি না চালানোর নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়। একইসঙ্গে রিট আবেদনে কোটা আন্দোলনের ছয় সমন্বয়ককে ডিবি হেফাজত থেকে মুক্তির নির্দেশনা চাওয়া হয়।
হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মানজুর আল মতিন প্রীতম ও আইনুন্নাহার সিদ্দিকা লিপি এ রিট করেন। রিটে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সচিব, পুলিশ মহাপরিদর্শক, সেনাবাহিনী প্রধানসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়।
গত ২৯ ও ৩০ জুলাই রিটের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয়। এর পর রবিবার (৪ আগস্ট) ফের শুনানি নিয়ে হাইকোর্ট রিট খারিজ করে দেন।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন ব্যারিস্টার সারা হোসেন, অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না, ব্যারিস্টার অনীক আর হক, অ্যাডভোকেট মানজুর আল মতিন প্রীতম।
রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল এস এম মুনীর, অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ মো. মোরসেদ ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল ব্যারিস্টার মেহেদী হাছান চৌধুরী।
(এই প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ইউএনবি থেকে নেয়া হয়েছে।)
রবিবারের সংঘর্ষে মৃতের সংখ্যা
প্রথম আলো তাদের রবিবারের (৪ আগস্ট) অনলাইন সংস্করণে বলছে, রবিবারের সংঘর্ষে নিহতের সংখ্যা ৩৮।
এএফপি তাদের রবিবারের প্রতিবেদনে বলছে, রবিবার অন্তত ২৪ জন মারা গেছে।
রয়টার্স তাদের প্রতিবেদনে বলছে, অন্তত ২৭ জন মারা গেছে।
রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে কারফিউ জারি
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে রবিবার (৪ আগস্ট) সন্ধ্যা ৬টা থেকে অনির্দিষ্টকালের জন্য কারফিউ জারি করেছে বাংলাদেশ সরকার।
ঢাকা মহানগরসহ দেশের সব বিভাগীয় সদর, সিটি কর্পোরেশন, পৌরসভা, শিল্পাঞ্চল, জেলা ও উপজেলা সদরে কারফিউ বলবৎ থাকবে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এ সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে।
পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত এই কারফিউ বলবৎ থাকবে বলে জানান সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা শরীফ মাহমুদ অপু।
(এই প্রতিবেদনের কিছু তথ্য ইউএনবি থেকে নেয়া হয়েছে।)