অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

কাক নিয়ে কথকতা  


কাকের ঝাঁক

কাকের সাথে আমাদের পরিচয় সেই ছোট বেলা থেকে। ছোট বয়সে কাক বলতে কা কা স্বরে ডাকা এক জাতীয় কালো পাখিকেই বুঝতাম। আস্তে আস্তে কাকের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য জানতে পারি। মূলত সবার পরিচিত এই কাককে আমরা কতখানি চিনি?

কাকের বংশ-পরিচয়ঃ

জীববৈচিত্র বিষয়ক অনলাইন পোর্টাল লিস্টভার্স ডটকম থেকে জানা যায়, কাক বা Crow কর্ভিডি গোত্রের অন্তর্গত এক ধরণের পাখী। কাকের উদ্ভব ঘটেছে মধ্য এশিয়ায়। সেখান থেকে এটি উত্তর আমেরিকা, আফ্রিকা, ইউরোপ ও অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। পৃথিবীতে ৪০টিরও বেশি প্রজাতির কাক দেখা যায়। তবে বাংলাদেশে সাধারণত বেশি সংখ্যক পাতিকাক ও অল্প সংখ্যক দাঁড়কাক দেখা যায়। পাতিকাকের মাথার পেছন থেকে গলা ও বুক এবং পেটের সামনের দিকটা ধূসর বা ফ্যাকাসে ধূসর; বাকি সারা দেহ, ঠোঁট, চোখ এবং পা কালো। মাথার তালু, কপাল ও গলার নিচের দিকটাও কালো। ঠোঁট দাঁড়কাকের মত, তবে একটু কম বাঁকা। ঠোঁটে গোঁফ দেখা যায়। বার্ড ওয়াচার জাবের আনসারীর সাথে কথা বলে কাক সম্পর্কে বেশ কয়েকটি তথ্য জানা যায়।

বাংলা বাগধারায় এত কাক কেন?

কাক নিয়ে বাংলা ভাষায় প্রায় ১৮টি জনপ্রিয় বাগধারার প্রচলন আছে। এই বাগধারার মাঝেই লুকিয়ে আছে কাকের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য। যেমন কাকদের বাসার অগোছালো বৈশিষ্ট্যের জন্য ‘কাকের বাসা’ বাগধারাটির উদ্ভব হয়েছে। কাকদের বুদ্ধির কারণে “কাকের বুদ্ধি” বাগধারাটির উদ্ভব হয়েছে। কাক অনেক ধৈর্যের অধিকারী। তাই “তীর্থের কাক” বাগধারাটিও মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত আছে।এছাড়া এর অর্থ দাঁড়ায়—কোনো কিছু প্রাপ্তির আশায় অধীর আগ্রহে অপেক্ষাকারী ব্যক্তি। 'কাক নিদ্রা’ বাগধারাটির অর্থ অগভীর নিদ্রা, কাক ভূষণ্ডী এর অর্থ দীর্ঘজীবী ব্যক্তি।

কাক
কাক

কাক নিয়ে আরও কয়েকটি বাগধারা বাংলা ভাষায় প্রচলিত আছে, যেমন, বিপর্যস্ত অবস্থাকে বোঝাতে ঝড়ো কাক, পরিষ্কার স্বচ্ছ জল বোঝাতে কাকচক্ষু , অত্যধিক চেষ্টা অর্থে কাকচেষ্টা এবং খুব প্রাতঃকাল বুঝাতে কাকভোর বাগধারাটি ব্যবহার করা হয়।

কাকের পছন্দের কাজঃ

পাতিকাকের গোসল করার প্রবণতা প্রবল। জমাট বাঁধা পানিতে বা পানির ধারায় একাকী বা দলবদ্ধভাবে পানি ছিটিয়ে গোসল করতে এরা খুব ভালবাসে। কখনও কখনও বৃষ্টির সময় কাকেরা জুবুথুবু হয়ে এক জায়গায় বসে বৃষ্টিতে ভেজে। কাক ভোজনরসিকও বটে।

সমাবেশ প্রিয় কাকঃ

কাকেরা বেশ সমাবেশ প্রিয়। শহর অঞ্চলে পাতিকাকেরা ভরদুপুরে বা দুপুরের পরে সমাবেশ করে। তখন এরা সবাই একসাথে ডাকাডাকি করে। কখনও একসাথে উড়েও বেড়ায়।

কাক পরিকল্পনা করে কাজ করেঃ
মানুষের মত পরিকল্পনা করে কাজ করার কারণে কাকের অনেক সুনাম আছে বলে জানা যায়। কাক কখন কী খাবার খাবে, কোথায় খাবার পাবে, সে তার সঙ্গীকে খাবার থেকে কতটুকু দিবে এগুলো সে আগেই পরিকল্পনা করে রাখে। খুব সুযোগসন্ধানী ও চতুরতার কারণে কাকের ‘চোর’ হিসেবেও বদনাম আছে। মাঝে মাঝে কাক গর্ত করে তার খাবার লুকিয়ে রাখে। কাজটি করতে সে আরেকদিকে চোখ রাখে, অন্য কাক এই লুকানোর ব্যাপারটি দেখে ফেলল কি না সেটা সে নিশ্চিত হতে চায়!

কাক কি খায়?

আমাদের আশপাশের কাকগুলি খাবারের উচ্ছিষ্টাংশ, পোকামাকড়, ফলমূল, ফসলের বীজ, পাখির ডিম, ছোট সরীসৃপ, সাপ, ব্যাঙসহ প্রায় সব খাবারই খায়।

কাকের বাসা কি দিয়ে তৈরি?

কাক যে বাসায় থাকে তা মূলত স্ত্রী কাকের তৈরি করা। রাস্তায় পড়ে থাকা পরিত্যক্ত প্রায় সব কিছু দিয়েই অগোছালোভাবে বাসা তৈরি করে।

কাকেরা রাতে কোথায় থাকে, কি করে?

দিনের বেলায় কাক খাবারের সন্ধানে দলবেঁধে এক এলাকা থেকে আরেক এলাকায় যায়। ভোরে ও সন্ধ্যায় নজর রাখলে এরকম দলে দলে কাক উড়ে যাবার দৃশ্য দেখা যায়। রাত এলে কাকেরা বেশ অসহায় বোধ করে। দিনের বেলায় খাবার সংগ্রহ শেষে রাত নামার আগেই তারা দল বেঁধে নিজেদের আশ্রয়ে চলে যায়। নিজের বাসা থেকে দূরে চলে এলে দলবদ্ধ কাক অপেক্ষাকৃত যৌক্তিক ও নিরাপদ আশ্রয় খোঁজে। সেখানেই তারা আশ্রয় নেয়, বিশ্রাম নেয় ও ঘুমায়।

কাকের প্রজননঃ

উইকিপিডিয়া থেকে জানা যায়, কাকের প্রজনন ঋতু মূলত মার্চ থেকে জুলাই পর্যন্ত, তবে স্থানভেদে প্রজনন ঋতুর বিভিন্নতা দেখা যায়। কাক একবারে ৩-৬টি ডিম দেয়। ডিমের রং আকাশি, তার ওপর থাকে কালচে-বাদামি ফোঁটা। ডিমের মোটা অংশে বাদামি ফোঁটার ঘনত্ব বেশি। স্ত্রী কাকই মূলত ডিমে তা দেয়। পুরুষ কাকও দেয়, খুব কম সময়ের জন্য। তবে বৃষ্টি নামলে, শিলাবৃষ্টি হলে বা প্রচণ্ড রোদ পড়লে পুরুষ কাক স্ত্রী কাকের সঙ্গে ডিম আগলে রাখে। ১৬ থেকে ১৭ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।

পাতিকাকের ছানা

সদ্যোজাত কাকের ছানার গায়ে পালক থাকে না, চোখ বন্ধ থাকে। দেহের বর্ণ আর ঠোঁট গোলাপী থাকে। ৭-১০ দিন বয়সী ছানার শরীর কালচে হয়, ঠোঁট কালচে-ধূসর ও চোখ কালো হয়। ২১ থেকে ২৮ দিন পর ছানারা বাসা ছাড়ে।

কাকের আয়ুষ্কাল

বেশির ভাগ প্রজাতির কাকের স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল ১০-১৫ বছর হলেও প্রায়ই বৈদ্যুতিক তারে আটকে পাতিকাক মারা যায়। এছাড়া ঝড়ের কবলে পড়ে এবং নানান রোগেও কাক মারা যায়।

তথ্যসূত্রঃ লিস্টভার্স ডটকম, বাংলা উইকিপিডিয়া ও বার্ডওয়াচার জাবের আনসারী

XS
SM
MD
LG