অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

বাংলাদেশে জীবনযাত্রা স্বাভাবিকের পথে তবে চ্যালেঞ্জ অনেক


HEALTH-CORONAVIRUS-BANGLADESH-GARMENTS

অনেক প্রশ্ন সামনে রেখে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে চলেছে বাংলাদেশ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছাড়া সবকিছুই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। তবে আন্তঃদেশীয় বিমান যোগাযোগে এখনও অচলাবস্থা, অনিশ্চয়তা। এসবের মধ্যেও ভাইরাসের ভয় এখনও কাটেনি। পর্যাপ্ত টিকা দেয়া সম্ভব হলে হয়তো এই ভয় কেটে যেত অনেকখানি। ১৭ কোটি মানুষের দেশে মাত্র ৬৪ লাখ মানুষকে দুই ডোজ টিকা দেয়া সম্ভব হয়েছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, টিকার পরিমাণ দ্রুত বাড়াতে না পারলে অন্য দেশের মতো সংক্রমণ আবারও বেড়ে যেতে পারে।

ব্যবসা-বাণিজ্য সচল হয়েছে। তবে করোনার প্রভাবে বেকারত্ব বেড়েছে। চাপে পড়েছে অর্থনীতি। ঝুঁকি তৈরি হয়েছে রেমিট্যান্সে। জিডিপিতে নেতিবাচক চাপ পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো জানিয়েছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৩ দশমিক ৫১ শতাংশ। সরকার আশা করেছিল, তা ৫ দশমিকের উপরে হবে।

সাধারণ ছুটি আর লকডাউনে অর্থনীতির সূচক স্থবির হয়ে পড়েছে। রিজার্ভ ও শেয়ারবাজারে সূচক ছিল ঊর্ধ্বমুখী। তবে প্রায় পাঁচ লাখ শ্রমিক চাকরি হারিয়ে দেশে ফিরেছেন। এরমধ্যে কয়েক লাখ শ্রমিক এখন বেকার। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির হিসাব মতে, করোনায় ২২ লাখ লোক চাকরি হারিয়েছে। এ ছাড়া অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত প্রায় এক কোটির মতো মানুষ বেকার হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ বলেছে, করোনা শুরু হওয়ার পর ৬২ শতাংশ মানুষ চাকরি ও কাজ হারিয়েছে। কাজ না থাকায় লাখ লাখ পরিবার খাবার কমিয়ে দিয়েছে। সঞ্চিত পুঁজি ভেঙ্গে অনেক পরিবার এখন নিঃস্ব। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার এবং ব্র্যাক ইন্সটিটিউট অব গভর্নেন্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট-এর এক যৌথ জরিপ রিপোর্টে বলা হয়েছে, করোনার কারণে দুই কোটি মানুষ নতুন করে দারিদ্র্য সীমায় পৌঁছে গেছে। সবচাইতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। দোকান মালিক সমিতি বলেছে, ঘনঘন লকডাউনে অনেকেই পুঁজি হারিয়ে বেকার। এসএমই ফাউন্ডেশন বলছে, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের ৭০ ভাগ কর্মচারী কাজ হারিয়েছে। লোকসানে পড়েছেন ৮৩ শতাংশ উদ্যোক্তা। আর ৩৩ শতাংশ ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। জনশক্তি রপ্তানি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। ২০২০ সনে বাংলাদেশ থেকে সাড়ে সাত লাখ নতুন কর্মী পাঠানোর কথা ছিল। মহামারির কারণে দুই লাখ ১৭ হাজার ৬৬৯ জন কর্মী পাঠানো সম্ভব হয়েছে। রাজস্ব আদায়েও ঘাটতি ছিল লক্ষণীয়।

বিদায়ী অর্থবছরে (২০২০-২১) জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) শুল্ক-কর আদায়ে সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ লাখ ১ হাজার কোটি টাকা। আর সর্বসাকুল্যে আদায় হয়েছে প্রায় ২ লাখ ৫৯ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। সেই হিসাবে বিদায়ী অর্থবছর রাজস্ব আদায়ে প্রায় ৪১ হাজার কোটি টাকা ঘাটতি ছিল।

রপ্তানির উপরেও চাপ পড়েছে। বিগত অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় রপ্তানি আয় কমেছে পাঁচ দশমিক ৪৭ শতাংশ। বিদেশি বিনিয়োগও কমেছে ১৯ শতাংশ। শিল্পখাতে প্রতিদিন ক্ষতির পরিমাণ ছিল গড়ে প্রায় এক হাজার কোটি টাকা। মহামারির মধ্যেই রেমিটেন্সে অতীতের সব রেকর্ড ভঙ্গ হয়েছে। বিগত অর্থবছরে প্রবাসীরা ২৪ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার রেমিটেন্স পাঠান। যা এর আগে কখনো হয়নি।

বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৬ বিলিয়ন ডলার। এ সম্পর্কে বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেছেন, এতদিন রেমিটেন্সের যে জাদু ছিল সেটা সম্ভবত শেষ হতে চলেছে। কারণ, মানুষ বিদেশে গিয়েছে কম, এসেছে বেশি। সরকারি প্রণোদনার কারণে হুন্ডি থেকে মানুষ ব্যাংকিং খাতে টাকা পাঠিয়েছে। এ অবস্থায় জাদু শেষ হয়ে যাচ্ছে কিনা সেটাই বোঝার বিষয় রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে চাকরির বাজারে বিদেশিদের প্রভাব ছিল মাত্রাতিরিক্ত। প্রতি পাঁচ জন বাংলাদেশির বিপরীতে একজন বিদেশি নাগরিকের চাকরির সুযোগ ছিল। করোনার কারণে সরকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, প্রকল্প বাস্তবায়নকালে একজন বিদেশি নাগরিকের বিপরীতে ১০ জন বাংলাদেশি এবং উৎপাদনকালে একজন বিদেশি নাগরিকের বিপরীতে নিতে হবে ২০ জন বাংলাদেশি। ওয়ার্ক পারমিট ছাড়া বিদেশি কাউকে কাজ করতে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশি যোগ্য শ্রমিকদের সুযোগ করে দিতেই সরকার এই সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে।

XS
SM
MD
LG