অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

শান্তিরক্ষা মিশনে র‍্যাবকে নিষিদ্ধের দাবি জানিয়ে জাতিসংঘে ১২ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনের চিঠি


ফাইল ছবি- বাংলাদেশের র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‍্যাব) সদস্যরা প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এর কার্যালয় পাহারা দিচ্ছে। ২৬ নভেম্বর ২০১৩।

'জাতিসংঘের শান্তি অপারেশন বিভাগের উচিত বাংলাদেশের আধাসামরিক বাহিনী র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন(র‍্যাব)কে শান্তিরক্ষা মিশনে অবিলম্বে নিষিদ্ধ করা', এই মর্মে সংস্থার আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জ্যাঁ পিয়ের ল্যাক্রোইক্সকে চিঠি পাঠিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচসহ ১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন।

চিঠিতে বলা হয়, "আমরা ১২টি সংস্থা গভীরভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করছি যে, জাতিসংঘের ২০১২ সালের পলিসি অন হিউম্যান রাইটস স্ক্রিনিং অব ইউনাইটেড ন্যাশন পারসোনেল বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না।

বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে শীর্ষ সেনা ও পুলিশ মোতায়েনকারী দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম। ২০২০ সালে দেশটি বিভিন্ন মিশনে ৬ হাজার ৭৩১ জন পোশাকধারী কর্মী মোতায়েন করে সর্বোচ্চ অবদান রাখে।"

সংস্থাগুলো তাদের চিঠিতে বিশেষ উদ্বেগের কথা উল্লেখ করে বলেছে, "আমরা লক্ষ করছি যেসব ব্যক্তিরা র‍্যাবের সঙ্গে কাজ করেছেন তাদেরকে জাতিসংঘ মিশনে পাঠানো হচ্ছে। ২০০৪ সালে এই ইউনিটটি গঠিত হওয়ার পর থেকে এই ইউনিটের সদস্যদের মাধ্যমে বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং জোরপূর্বক গুম করার ধারাবাহিক ও বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ থাকার পরও তাদেরকে শান্তি মিশনে পাঠানো হচ্ছে।"

চিঠিটি ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর পাঠানো হয়। এটি হিউম্যান রাইটস ওয়াচের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় বৃহস্পতিবার (২০ জানুয়ারি)।

জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা অপারেশন বিভাগ চিঠিটি সম্পর্কে আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া এখনো দেয়নি।

চিঠিতে আরও বলা হয় যে, সরকার এই ধরনের অভিযোগ অস্বীকার করে আসছে। সরকার এই বিষয়ে কোন তদন্ত করা বা অভিযুক্তদের জবাবদিহিতা নিশ্চিতের পরিবর্তে তাদের পুরস্কৃত করছে। উদাহরণস্বরূপ বর্তমান পুলিশের মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদ তার কাজের জন্য একটি পদকও পেয়েছেন। ২০১৫ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত র‍্যাবের প্রধান হিসেবে বেনজীর আহমেদ নিয়োজিত ছিলেন। এ সময় ১৩৬টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ১০টি জোরপূর্বক গুম করার ঘটনা ঘটে।

১২টি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা র‌্যাব সদস্যদের জাতিসংঘ শান্তি মিশন থেকে প্রত্যাহারের যে দাবি করেছে সে বিষয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বৃহস্পতিবার বলেন, "র‌্যাব যে মাদক নির্মূলে কাজ করছে, র‌্যাব যে ভেজাল খাদ্য নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে, জলদস্যুমুক্ত করলো, চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে এ্যাকশনে যাচ্ছে। তারা যে সব সময় জঙ্গি দমন, সন্ত্রাস দমনের জন্য কাজ করছে সে কথাগুলো তারা কখনো তুলে ধরেন না। ....নানা ধরনের মানবাধিকারের কথা বলে, আমরা তো চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি, এমন কোনো দেশ নাই যেখানে এনকাউন্টারের ঘটনা না ঘটে। পুলিশের সঙ্গে যদি কেউ অস্ত্র তুলে কথা বলে, পুলিশ তো তখন চুপ করে বসে থাকে না। তখনই এইসব ফায়ারের ঘটনা ঘটে।"

এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম মানবাধিকার সংগঠনগুলোর এই দাবি নাকচ করে দিয়েছেন। বিশেষ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের কথা উল্লেখ করে মি. আলম ভয়েস অব আমেরিকাকে বলেন, "আমাদের কাছে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিবৃতির কোনো মূল্য নেই। কারণ সরকার একাধিকবার হিউম্যান রাইটস ওয়াচের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে । তারা আমাদের বক্তব্য শুনে অভিযোগ যাচাই-বাছাইয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু তারা কথা রাখেনি। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের বিরোধিতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের কোর ইস্যুগুলোর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ। সরকার তাদের সঙ্গে দফায় দফায় যোগাযোগ করেছে। আমি নিজেও তাদের রিজিওনাল হেড এবং স্থানীয় প্রতিনিধির সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের পেছনে অনেক সময় দিয়েছি। তিন, চার বছর আগের সেই বৈঠকগুলোতে তারা মিনিংফুল এনগেইজমেন্টের অঙ্গীকার করেছিল। কিন্তু তারা তাদের প্রতিশ্রুতি রাখেনি বরং সেই সব বিরোধীদল যাদের কোনো জনসমর্থন নেই তাদের মুখপাত্রের মতো অহেতুক সরকারের সমালোচনা করে চলেছে। এ কারণে তাদের সমালোচনার কোনো মূল্য আমাদের কাছে নেই।"

জাতিসংঘে পাঠানো চিঠিতে স্বাক্ষর করেছে- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, এশিয়ান ফেডারেশন এগেইনস্ট ইনভলান্টারি ডিজঅ্যাপেয়ান্সেস, এশিয়ান ফোরাম ফর হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট, এশিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিশন, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন, ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট জাস্টিস প্রজেক্ট, সিভিকাস: ওয়ার্ল্ড এলায়েন্স ফর সিটিজেন পার্টিসিপেশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ, ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস, রবার্ট এফ. কেনেডি হিউম্যান রাইটস, দ্য এডভোকেটস ফর হিউম্যান রাইটস ও ওয়ার্ল্ড অর্গানাইজেশন এগেইনস্ট টর্চার।

২০২১ সালের মার্চে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাই কমিশনার মিচেল ব্যাচেলেট বলেছিলেন, "র‌্যাবের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও অশোভন আচরণের অভিযোগ দীর্ঘদিনের উদ্বেগের বিষয় হয়ে আছে।"

২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লংঘনের অভিযোগে র‍্যাবের সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথকভাবে এ নিষেধাজ্ঞা দেয়। এই কর্মকর্তাদের মধ্যে র‍্যাবের সাবেক মহাপরিচালক এবং বর্তমান আইজিপি বেনজীর আহমেদও রয়েছেন। এরইমধ্যে তার আমেরিকান ভিসাও বাতিল করা হয়েছে। এ ছাড়া র‍্যাবের বর্তমান মহাপরিচালক চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন্স) মো. আনোয়ার লতিফ খানের ওপরও নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর পৃথক এক ঘোষণায় বেনজীর আহমেদ এবং র‍্যাব-৭ এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, বাংলাদেশে র‍্যাপিড অ্যাকশান ব্যাটেলিয়ান (র‍্যাব), মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াইয়ে গুরুতর মানবাধিকার লংঘনের জন্য অভিযুক্ত। এতে বলা হয়েছে যে তারা আইনের শাসন, মানবাধিকারের মর্যাদা ও মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ক্ষুন্ন করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। র‍্যাব হচ্ছে ২০০৪ সালে গঠিত একটি সম্মিলিত টাস্ক ফোর্স। তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারের নির্দেশে তদন্ত পরিচালনা করা।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বা এনজিওদের অভিযোগ হচ্ছে যে র‍্যাব ও বাংলাদেশের অন্যান্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০ ব্যক্তির গুম হয়ে যাওয়া এবং ২০১৮ সাল থেকে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী। কোন কোন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে এই সব ঘটনার শিকার হচ্ছে বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।

XS
SM
MD
LG