অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

রূপপুরে ৫ রুশ নাগরিকের মৃত্যু, কারণ খোঁজা হচ্ছে


প্রতীকী ছবি।

পাবনার ঈশ্বরদীতে নির্মাণাধীন রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে কর্মরত ৫ জন রুশ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে গত কয়েকদিনে। কেন, কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে তার কারণ অনুসন্ধানে কাজ করছে কয়েকটি তদন্ত সংস্থা। যদিও কারও মৃত্যুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোন অভিযোগ করা হয়নি। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি রাশিয়ার সহযোগিতায় বাংলাদেশ বাস্তবায়ন করছে। এই প্রকল্পে ৪ হাজার ৮০০ জনের মতো বিদেশি নাগরিক কাজ করছেন। তাদের ৪০ থেকে ৪৫ ভাগ রাশিয়ান নাগরিক। অন্যরা বেলারুশ, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানের নাগরিক। প্রকল্পে কর্মরত বিদেশি নাগরিকরা প্রকল্প এলাকার কাছে গ্রিনসিটি আবাসনে বসবাস করেন। সুরক্ষিত এই আবাসনে বাজার, বারসহ সব ধরনের সুযোগ সুবিধা রয়েছে।

এই আবাসন এলাকায় ২৬শে জানুয়ারি থেকে ৬ই ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এই কয়দিনে ৫ জন রুশ নাগরিকের মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন ১৪ তলা ভবন থেকে পড়ে মারা যান। অন্য একজন কর্মস্থলে অসুস্থ হয়ে পড়লে হাসপাতালে নেয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। বাকি তিনজনেরই মৃত্যু হয়েছে বাসায়।

সর্বশেষ রবিবার ভোরোটনিকভ আলেকজান্দ্রা নামের একজন রুশ নাগরিকের লাশ তার বাসা থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি প্রকল্পের ‘নিকিম’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন। তিনি রূপপুরে বিদেশিদের জন্য নির্মিত সাহাপুরের নতুনহাট ‘গ্রিনসিটি আবাসিক প্রকল্পের একটি কক্ষে থাকতেন। রবিবার দুপুরের দিকে তাকে নিজের কক্ষে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখেন এক সহকর্মী। খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতাল মর্গে পাঠায়। এর আগে শুক্রবার রাতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ট্রেস্ট রোসেম নামে রুশ সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার চুকিন পাভেল মারা যান। নিজ বাসায় অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

একইদিন রাতে তলমাসেফ ভাইয়াসেলভের নামের আরো এক রুশ নাগরিকের মৃত্যু হয়। তিনি ১২ নম্বর আবাসিক ভবনের ১৩ তলার ১৩১ নম্বর ফ্ল্যাটে বসবাস করতেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের এসএমইউ-১ নামে আরেকটি সাব-ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ইনস্টলার হিসেবে কাজ করতেন তিনি। গত ২রা ফেব্রুয়ারি শাকিরভ আলেক্সেইয়ের মৃত্যু হয় ঘুমের মধ্যে। ২৮শে জানুয়ারি ঈশ্বরদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয় বারচেনকো আলেক্সেইয়ের। তারা দু'জনই এই প্রকল্পের কর্মী ছিলেন।

কয়েকদিনে বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর কারণ খুঁজতে কয়েকটি সংস্থা কাজ করছে বলে জানিয়েছেন ঈশ্বরদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, "অল্প সময়ে কয়েকজনের মৃত্যু হওয়ায় তাদের মৃত্যুর কারণ খুঁজে দেখা হচ্ছে। এই প্রকল্পে বিদেশি নাগরিক যারাই মারা যান তাদের প্রত্যেকের লাশের ময়নাতদন্ত হয়। এই ৫ জনেরও হয়েছে। তাদের শরীর থেকে নেয়া নমুনার রাসায়নিক পরীক্ষাও হবে। ইতিমধ্যে ২ জনের নমুনা রাজশাহীতে পাঠানো হয়েছে।" ওসি জানান, বিদেশি নাগরিকদের মৃত্যুর বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তদন্ত কমিটি হয়নি। রুটিন কাজের অংশ হিসেবে তদন্ত করা হচ্ছে।

ওদিকে রূপপুর প্রকল্পের দায়িত্বে থাকা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী স্থপতি ইয়াফেস ওসমান বলেন, "বিদেশি নাগরিকদের ভালো রাখার জন্য আমরা সবই করেছি। কিন্তু যা ঘটেছে তা অপ্রত্যাশিত। সেখানে ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে বিদেশি প্রতিষ্ঠান। মৃত্যুর ঘটনায় বাংলাদেশ সরকার কোনো তদন্ত কমিটি করবে না।"

রূপপুর প্রকল্পের সাইট ইনচার্জ রুহুল কুদ্দুস জানিয়েছেন, "প্রকল্প এলাকায় ৪ হাজার ৮০০ বিদেশি নাগরিক বসবাস করেন। সেখানে অনেকে পরিবার নিয়ে থাকেন। তাদের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করে সেনাবাহিনী। বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তার কোনো সমস্যা নেই।"

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট অন্য একটি সূত্রের দাবি, রুশ নাগরিকদের সুবিধার জন্য প্রকল্প এলাকায় একটি বার স্থাপন করা হয়েছে। এই কয়েকদিনে যাদের মৃত্যু হয়েছে তাদের কেউ কেউ বারে নিয়মিত যাতায়াত করতেন।

উল্লেখ করা যায় যে, ২০১৩ সালের অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভিত্তিস্থাপন করা হয়। প্রকল্প বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের ২৫শে ডিসেম্বর রুশ প্রতিষ্ঠান রোসাটমের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্টের সঙ্গে চুক্তি করে বাংলাদেশের পরমাণু শক্তি কমিশন।

জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি-একনেক ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড ব্যয়ের এ প্রকল্পে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়। নির্মাণ কাজ শুরু হয় ২০১৭ সালের ৩০শে নভেম্বর। সরকার আশা করছে, ২০২৩ সালের মাঝামাঝি কেন্দ্রটির ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার প্রথম ইউনিট চালু হবে। পরের বছর চালু হবে সমান ক্ষমতার দ্বিতীয় ইউনিট। রূপপুর প্রকল্প এলাকায় এক হাজার ৬২ একর জমির ওপর চলছে কর্মযজ্ঞ। রুশ সহায়তায় এ প্রকল্পে দুই ইউনিট মিলিয়ে ব্যয় ধরা হয়েছে ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলার। টাকার অংকে যা এক লাখ কোটি টাকার বেশি।

XS
SM
MD
LG