অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

জয় বাংলা: বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান


বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা। (ছবি- অ্যাডোবি স্টক)

‘জয় বাংলা’ জাতীয় স্লোগান

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে মুক্তিকামী মানুষের স্লোগান ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা বৈঠকে সম্প্রতি এ সিদ্ধান্ত হয়েছে।

‘জয় বাংলা’ কোথায় ও কীভাবে উচ্চারিত হবে

মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম গণমাধ্যমে জানিয়েছেন, ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান করার জন্য হাইকোর্টের একটি রায় আছে। ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হবে। সব জাতীয় দিবসগুলোতে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারিগণ এবং রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয় বা সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চরণ করবেন। দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ (এসেম্বলি) সমাপ্তির পর ক্ষেত্রমতে সভা-সেমিনারে ছাত্র-শিক্ষকগণ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করবেন।

মাদ্রাসার ক্ষেত্রে কী হবে

বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলোতে এখনো জাতীয় সংগীত পরিবেশন হয় না। সেখানে হয় না শপথ বা সাধারণ এসেম্বলি। এ অবস্থায় মাদ্রাসাগুলোতে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে সেই বিষয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব গণমাধ্যমে বলেছেন, "বিষয়টি ভিন্ন। মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের নির্দেশনায় সব কিছু থাকবে।"

জাতীয় স্লোগান হওয়ার নেপথ্যে

২০২০ সালের ১৯ মার্চ বিচারপতি এফ আর এম নাজমুন আহসান এবং বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের বেঞ্চ এক রিট আবেদনের রায়ে ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগানের পক্ষে রায় দেন। রায়ে তিন দফা নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এগুলো হচ্ছে-

১. ‘জয় বাংলা’ বাংলাদেশের জাতীয় স্লোগান হবে। প্রতিপক্ষগণ অবিলম্বে এ ঘোষণা কার্যকরী করার জন্য পদক্ষেপ নেবেন। অর্থাৎ ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবেন।

২. যাতে সব জাতীয় দিবসে এবং উপযুক্ত ক্ষেত্রে সাংবিধানিক পদাধিকারীগণ এবং রাষ্ট্রের সব কর্মকর্তা রাষ্ট্রীয়/সরকারি অনুষ্ঠানের বক্তব্য শেষে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করবেন। সে জন্য প্রতিপক্ষগণ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

৩. যাতে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে, অর্থাৎ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাবেশ (অ্যাসেম্বলি) সমাপ্তির পর ক্ষেত্রমতে সভা-সেমিনারে ছাত্র-শিক্ষকগণ ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করেন, তার জন্য প্রতিপক্ষগণ যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।

তারও আগে ২০১৭ সালে আইনজীবী বশির আহমেদ ও ২০১২ সালে আব্দুল বাতেন ‘জয় বাংলা’কে জাতীয় স্লোগান হিসেবে ঘোষণা করার জন্য হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।

হাইকোর্টে রিট আবেদনের সময়ে বলা হয়, বিশ্বের ১৬৬টা দেশে সাংবিধানিক স্লোগান রয়েছে। ১২টি দেশ জাতির পিতাকে স্লোগানে রেখে সম্মানীত করা হয়েছে।

‘জয় বাংলা’ নিয়ে বাংলা একাডেমিতে আলোচনা একাত্তরের ফেব্রুয়ারিতে

১৯৭১ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি বাংলা একাডেমিতে ভাষা স্মরণ সপ্তাহ ছিল। সেই সময়ে বাংলা একাডেমির সেই অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন তখনকার বাংলা একাডেমির নবীন কর্মকর্তা সেলিনা হোসেন। যিনি এখন বাংলা একাডেমির সভাপতি, সেলিনা হোসেন।

স্মৃতিচারণ করে ভয়েস অফ আমেরিকাকে তিনি বলেন, ১৫ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধু শহীদ স্মরণের অনুষ্ঠানে এসেছিলেন। সেদিন তিনি অল্প কথাই বলেছিলেন। বলেছিলেন, ‘জয় বাংলা’ স্লোগানের মধ্যে আমাদের মুক্তির কথা আছে। এটাই বাঙালির স্লোগান হবে।

৭ই মার্চের আগেই প্রজ্ঞাপন

জাতীয় স্লোগান হিসেবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান বাস্তবায়নে আগামী ৭ মার্চের আগেই মন্ত্রিসভা প্রশাসনিকভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারে। প্রজ্ঞাপন হলে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসায় অ্যাসেম্বলি শেষে জয় বাংলা স্লোগান দিতে হবে। জাতীয় দিবসে সরকারি অনুষ্ঠানে বক্তব্য শেষ করতে হবে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান উচ্চারণ করে। সাংবিধানিক পদধারীরাও বক্তব্য শেষ করবেন ‘জয় বাংলা’ বলে।

বিশিষ্টজনরা যা বলছেন

ইতিহাসবিদ অধ্যাপক সৈয়দ আনোয়ার হোসেন ভয়েস অফ আমেরিকাকে বলেন, ‘জয় বাংলা স্লোগান একটি ইতিহাস আশ্রিত স্লোগান। একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধারা এই স্লোগান দিয়ে রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে এই স্লোগান উচ্চারিত হয়ে। তাই এটা উচ্চারণ করতে কারো কোনো আপত্তি থাকার কথা না।’

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. সৌমিত্র শেখর বলেন, ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীজমন্ত্র হিসেবে কাজ করে এই স্লোগান। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে বিগত শতকের ছয়ের দশকে পরিচালিত বাঙালির স্বাধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এই স্লোগান যে গতি ও শক্তি সঞ্চার করে তার তুলনা বিশ্বের ইতিহাসে নেই।

'জয় বাংলা' ও কবি নজরুল

'জয় বাংলা'র উৎপত্তি ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে। এ আন্দোলনের নেতা ছিলেন মাদারীপুরের স্কুলশিক্ষক পূর্ণচন্দ্র দাস। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন করে জেল-জুলুম-নির্যাতনের শিকার হন তিনি। তার আত্মত্যাগে মুগ্ধ হয়ে তারই কারামুক্তি উপলক্ষে কবি কাজী নজরুল ইসলাম রচনা করেন ‘ভাঙার গান’ কাব্যগ্রন্থ’র ‘পূর্ণ-অভিনন্দন’ কবিতাটি। এখানেই কাজী নজরুল প্রথম ‘জয় বাঙলা’ শব্দটি ব্যবহার করেন।

XS
SM
MD
LG