বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে সফল হবেন।
তিনি বলেন, “ড. মুহাম্মদ ইউনূস ছাত্র ও আমাদের দল, উভয়ের পক্ষ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন। আমরা জাতির পক্ষ থেকে তাঁকে এই দায়িত্ব অর্পণ করেছি। আমরা বিশ্বাস করি তিনি সফল হবেন।”
বৃহস্পতিবার (৮ অগাস্ট) রাজধানী ঢাকার নিটর হাসপাতাল (পঙ্গু হাসপাতাল নামে পরিচিত) পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
মির্জা ফখরুল আরও বলেন, “আমরা খুবই আশাবাদী, তাঁর সফল ও যোগ্য নেতৃত্বে আইনশৃঙ্খলার বিষয়টি সুরাহা হবে।”
সামগ্রিক সমস্যার মূলে গণতন্ত্র না থাকার বিষয়টি উল্লেখ করে মির্জা ফখরুল বলেন, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার করা হবে অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য একটি প্রধান কাজ।
তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী সরকার যত বেশি সফল হবে তত তাড়াতাড়ি গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার হবে।”
অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে তাদের প্রত্যাশা সম্পর্কে জানতে চাইলে মির্জা ফখরুল বলেন, প্রথমত আইনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজনীয় সব ধরনের ব্যবস্থা নিতে হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক সরকার ফিরিয়ে আনতে এবং অর্থনীতি সচল রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
(এই রিপোর্টের কিছু তথ্য ইউএনবি থেকে নেয়া হয়েছে।)
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকার
প্রধান উপদেষ্টা
অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস
অন্যান্য উপদেষ্টারা হলেন,
১. সালেহ উদ্দিন আহমেদ
২. ড. আসিফ নজরুল
৩. আদিলুর রহমান খান
৪. হাসান আরিফ
৫. তৌহিদ হোসেন
৬. সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান
৭. মো. নাহিদ ইসলাম
৮. আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া
৯. ব্রিগেডিয়ার জেনারেল এম সাখাওয়াত হোসেন (অব.)
১০. সুপ্রদিপ চাকমা
১১. ফরিদা আখতার
১২. বিধান রঞ্জন রায়
১৩. আ.ফ.ম খালিদ হাসান
১৪. নূর জাহান বেগম
১৫. শারমিন মুরশিদ
১৬. ফারুক–ই–আজম
বাংলাদেশে ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত
বাংলাদেশে চলমান নৈরাজ্য, অগ্নিসন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতা বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর পাশাপাশি অন্য সশস্ত্র বাহিনী ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান, পুলিশের নবনিযুক্ত আইজিপি মো. ময়নুল ইসলাম, র্যাবের মহাপরিচালক এ কে এম শহিদুর রহমান ও ডিএমপি কমিশনার মো. মাইনুল হাসানের উপস্থিতিতে বৈঠকে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বৈঠকে নৌ ও বিমানবাহিনী প্রধানও উপস্থিত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার (৮ অগাস্ট) সেনাসদরে এই বৈঠকে অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় আগামী ২৪ ঘণ্টার মধ্যে সেনাবাহিনীর সহায়তায় দেশের সব থানায় কার্যক্রম শুরু করার বিষয়ে আলোচনা হয়।
এ ব্যাপারে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে সবার সহযোগিতা কামনা করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ছাত্র–জনতার বিক্ষোভের মুখে শেখ হাসিনা ৫ অগাস্ট (সোমবার) প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দিয়ে দেশত্যাগ করেন। এরপর থেকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন থানায় আক্রমণ হয়েছে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া, রাতে রাজধানী ঢাকায় বিভিন্ন জায়গায় ডাকাতির ঘটনায় নগরবাসীর মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও র্যাব
২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাবের সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র । দেশটির ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট ও পররাষ্ট্র দফতর পৃথকভাবে এই নিষেধাজ্ঞা দেয়।
ওই কর্মকর্তারা হলেন র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজি বেনজীর আহমেদ, র্যাবের সাবেক মহাপরিচালক ও বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক আইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, র্যাবের সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) খান মোহাম্মদ আজাদ, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) তোফায়েল মোস্তাফা সরোয়ার, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. জাহাঙ্গীর আলম ও সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশনস) মো. আনোয়ার লতিফ খান। তাঁদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট।
এ ছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দফতর পৃথক এক ঘোষণায় বেনজীর আহমেদ এবং র্যাব ৭–এর সাবেক অধিনায়ক মিফতাহ উদ্দীন আহমেদের ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে ।
যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি বিভাগের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, বাংলাদেশে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), মাদক দ্রব্যের বিরুদ্ধে সরকারের লড়াইয়ে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত।
বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, তারা আইনের শাসন, মানবাধিকারের মর্যাদা ও মৌলিক স্বাধীনতা এবং বাংলাদেশের জনগণের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিকে ক্ষুণ্ন করে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তা স্বার্থের বিরুদ্ধে হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। র্যাব হচ্ছে ২০০৪ সালে গঠিত একটি সম্মিলিত টাস্ক ফোর্স। তাদের কাজের মধ্যে রয়েছে অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের কর্মকান্ড সম্পর্কে গোপন তথ্য সংগ্রহ এবং সরকারের নির্দেশে তদন্ত পরিচালনা করা।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছিল, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো বা এনজিওদের অভিযোগ হচ্ছে যে, র্যাব ও বাংলাদেশের অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, ২০০৯ সাল থেকে ৬০০ ব্যক্তির গুম হয়ে যাওয়া এবং ২০১৮ সাল থেকে বিচার বহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতনের জন্য দায়ী। কোনো কোনো প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, এই সব ঘটনার শিকার হচ্ছেন বিরোধী দলের সদস্য, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীরা।
ডঃ ইউনুসের অভিজ্ঞতা সরকারের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখবে, বলছেন বিশ্লেষক
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক গণঅভ্যুত্থানের পর গ্রামীণ ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা ডঃ মুহাম্মাদ ইউনুসের নেতৃতে যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন করা হয়েছে, তা নিয়ে ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছেন বিদেশি বিশ্লেষকরা। তারা মনে করছেন ডঃ ইউনুসের অভিজ্ঞতা নতুন সরকারের সাফল্যে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
“ইউনুস কোন রাজনৈতিক দলের সাথে সম্পৃক্ত না, কিন্তু তিনি অরাজনৈতিক কোন ব্যক্তি নন, তাঁর অনেক রাজনৈতিক দক্ষতা আছে” বলেছেন যুক্তরাষ্ট্র-ভিত্তিক বেসরকারি গবেষণা কেন্দ্র কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশন্স এর দক্ষিণ এশিয়া ফেলো, জশুয়া কুরলান্টজিক।
কুরলান্টজিক বলেন ইউনুস দীর্ঘদিন অলাভজনক বা এনজিও সেক্টরে কাজ করছেন যেখানে অর্থ জোগাড় করতে এবং বিভিন্ন দাতা গোষ্ঠী আর আন্তর্জাতিক সংস্থার সাথে দরকষাকষি করতে “অনেক রাজনৈতিক দক্ষতা প্রয়োজন।”
“তিনি আকাশ থেকে পরেন নি, তিনি বোকা নন,” কুরলান্টজিক ভিওএ-র দিওয়া সার্ভিসকে এক সাক্ষাৎকারে বলেন।
কুরলান্টজিক বলেন গত সোমবার (৫ অগাস্ট) শেখ হাসিনার পদত্যাগ এবং দেশত্যাগের পর কিছু পদক্ষেপ আশার সঞ্চার করেছে। তিনি বিশেষ করে উল্লেখ করেন সেনা বাহিনীর নমনীয় ভূমিকার কথা।
“অতীতে আমরা সেনা বাহিনীকে হস্তক্ষেপ করে ক্ষমতা দখল করতে দেখেছি, কিন্তু এবার তারা বাংলাদেশকে বেসামরিক শাসনের পথে নিয়ে গেছে,” কুরলান্টজিক বলেন। “মনে হচ্ছে, সেনাবাহিনী রাজনীতি থেকে বের হয়ে যেতে চায়।”
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে সেনা বাহিনী ডঃ ইউনুসকে তাঁর মত কাজ করতে দেবে। “ইউনুস নিজের মত কাজ করেন এবং তিনি সহজে চাপ মেনে নেবেন না।”
কুরলান্টজিক বলেন প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হাসিনার আমলে গার্মেন্টস শিল্পের সম্প্রসারণ সহ অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে ঠিকই, কিন্ত তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের কারণে অনেক সুযোগ হাতছাড়া হয়েছে।
“রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা, স্বজনপ্রীতি, ক্রমবর্ধমান নির্যাতন-এর ফলে অনেক বিদেশী বিনিয়োগের সম্ভাবনা নস্যাৎ হয়েছে, অনেক যুবক চাকরী না পেয়ে বিদেশী চলে গেছে।
“গণতন্ত্র ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না করে দমনের নীতি গ্রহণ করা হচ্ছিল,” কুরলান্টজিক বলেন।