অ্যাকসেসিবিলিটি লিংক

জাতিসংঘের উচ্চ পর্যায়ের পার্শ্ব-বৈঠকে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে প্রধানমন্ত্রী হাসিনার ৫ দফা প্রস্তাব


রোহিঙ্গা বিষয়ক জাতিসংঘের পার্শ্ববৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

জাতিসংঘে দেশান্তরিত রোহিঙ্গাদের নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের এক ভারচুযাল বৈঠকে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যার কথা দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে তুলে ধরেন । তিনি বলেন আজ বিশ্বের নেতৃবৃন্দ জাতিসংঘের এই যে ৭৬ তম অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন এর থিম হচ্ছে আশা, পুণরুদ্ধারের আশা, টেকসই পূণনির্মানের আশা। তিনি বলেন তাঁর এই প্রতিনিধিদলও অনেকগুলো জরুরি বিষয়ে আশা নিয়ে যোগ দিয়েছে । আর এই সব আশার মধ্যে রয়েছে রোহিঙ্গাদের এই দূর্দশা দূর করার আশা । মিয়ান্মারের এই নাগরিকদের জোর করে দেশচ্যূত করা হয়েছে । তিনি বলেন , “গত চার বছর ধরে আমরা এই উচ্চাশাই পোষণ করে আসছিলাম যে এই সব স্থানচ্যূত লোকজন নিজেদের দেশ , তাদের মাতৃভূমি মিয়ান্মারে নিরাপদে , সুরক্ষিত ভাবে সসম্মানে ফেরত যেতে পারবে”। তিনি আরও বলেন , “ আমরা তাদের নিজ দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য আন্তর্জাতিক সমাবেশে এবং আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতি আস্থা রেখেছিলাম। তবে তিনি দুঃখের সঙ্গে বলেন , “ আমাদের কথা শোনা হয়নি , আমাদের আশা অপূর্ণই থেকে গেছে”। আমরা এখন এই সংকটের পঞ্চম বছরে রয়েছি , আমরা এখনও আশা করি এই সংকটের একটি স্থায়ী সমাধান।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে বাংলাদেশের চিন্তাধারাগুলো বিস্তারিত ভাবে তুলে ধরেন । তিনি বলেন প্রথমত আমাদের শীর্ষ অগ্রাধিকার হচ্ছে রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা । আর সেই লক্ষ্যেই আমাদের কাজ করে যেতে হবে। দ্বিতীয়ত, মিয়ান্মারকেও এই সংকটের সমাধান বের করতে হবে। তৃতীয়ত, এ বিষয়ে আমরা মনে করি আসিয়ানের একটা গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে এবং তিনি মনে করেন মিয়ান্মার বিষয়ক আসিয়ান দূতের নিয়োগ এই প্রত্যাবসনকে তাদের কর্মসূচিতে শীর্ষে স্থান দেবে। তিনি বলেন আসিয়ানকে মিয়ান্মারে এমন আস্থা তৈরি করাতে হবে যাতে করে রোহিঙ্গারা স্বদেশে ফিরে যেতে আগ্রহী হয়ে ওঠে। চতুর্থত, আমাদের মনে রাখতে মানবিক সহযোগিতা অত্যাবশ্যক তবে এটা কোন ক্রমেই স্থায়ী কোন সমাধান নয় ; জাতিসংঘ এবং শরীকদের গ্রহণযোগ্য এমন ব্যবস্থা নিতে হবে যাতে করে মিয়ান্মারে এমন পরিবেশ তৈরি করা যায় যা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের উপযোগী হয় । এ পর্যন্ত আমরা এমন কোন অগ্রগতি লক্ষ্য করিনি। পঞ্চমত রোহিঙ্গাদের উপর যে নির্যাতন চালানো হয়েছে তার জবাবদিহিতা গুরুত্বপূর্ণ কারণ তাতে রোহিঙ্গাদের মনে এই আস্থা জন্মাবে । কোন ভাবেই এই ঘৃণ্য অপরাধকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায় না। এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক বিচারিক আদালতসহ সব ক্ষেত্রেই মিয়ান্মারের জবাবদিহিতাকে বাংলাদেশ সমর্থন করে।

তিনি বলেন ২০১৭ সালে যখন মিয়ান্মারের রাখাইন প্রদেশ থেকে লক্ষ লক্ষ লোক বাংলাদেশে আসতে থাকে, শুরু হয় এই সংকট তখন আমাদের কাছে দুটি বিকল্প ছিল, তাদের জীবন রক্ষা করা অথবা সীমান্ত বন্ধ করে তাদেরকে জাতিগোষ্ঠিগত ভাবে নির্মূল হতে দেওয়া । আমরা মানবিক কারণে তাদের জীবন রক্ষা করার বিকল্পটিই গ্রহণ করলাম। তিনি বলেন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আমাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা আমাদের এই মানবিক দৃষ্টি ভঙ্গি গ্রহণ করতে অনুপ্রাণিত করে। তা ছাড়া তিনি বাংলাদেশের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান যে মানবিক নীতি স্থাপন করেছিলেন সেটিও উদ্ধৃত করে বলেন , তিনি বলেছিলেন, “ বাংলাদেশের সংগ্রাম শান্তি ও সুবিচারের জন্য বিশ্বের সংগ্রামেরই প্রতীক”। সুতরাং এটাই তো স্বাভাবিক ছিল যে বাংলাদেশ গোড়া থেকেই নির্যাতিত মানুষের পাশে দাঁড়াবে।

শেখ হাসিনা বলেন সেই ২০১৭ সাল থেকে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সব অধিবেশনে বৈঠকে এই সংকট নিরসনের জন্য তিনি এই সমস্যার টেকসই সমাধানের জন্য সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দিয়ে আসছেন। তিনি এ কথাও স্মরণ করিয়ে দেন যে তাঁর সরকার মিয়ান্মারের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক রক্ষা করে চলেছেন। তিনি বলেন আঞ্চলিক পর্যায়ে আমরা চীন ও ভারত সহ বিভিন্ন আঞ্চলিক শক্তি সম্পন্ন দেশকে সম্পৃক্ত করেছি । সমস্যাটি আমরা আসিয়ানের কাছেও তুলে ধরেছি। তিনি বলেন বহু পাক্ষিক দিক থেকেও আমরা বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার সামনে সমস্যাটি তুলে ধরেছি। তিনি দুঃখ প্রকাশ করে বলেন যে বাংলাদেশের এত প্রচেষ্টা মিয়ান্মারের নাগরিকদের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের পক্ষে কোন সুফল আনতে পারেনি। তিনি বলেন আজ পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও তাদের স্বদেশে ফিরে যেতে পারেনি।

শেখ হাসিনা বলেন আমাদের সম্পদ ও ভূমির সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও আমরা বাংলাদেশে তাদের অবস্থানকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত রাখার জন্য সব রকমের চেষ্টা চালিয়েছি। তিনি ছোট্ট জায়গায় এই বিপুল সংখ্যক লোকের অবস্থান আশাপাশের পরিবেশ এবং প্রাকৃতিক পরিবেশে যে প্রতিকুল প্রভাব ফেলছে সে কথা ও তুলে ধরেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন যে এই কভিড-১৯ এর চ্যালেঞ্জের মুখেও বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার দিকে দৃষ্টি রেখেছে। তিনি বলেন আমরা এই বিশ্বাসে অটল থেকেছি যে কেউ নিরাপদ থাকতে পারে না , যদি না আমরা প্রত্যেকেই নিরাপদ থাকি। তিনি বলেন রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের জাতীয় টিকাদান কর্মসূচীতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে নিয়ে যাবার কথাও উল্লেখ করেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন , আমরা আমাদের নিজস্ব বাজেট থেকে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার খরচ করে ভাসানচরের উন্নতি সাধন করেছি এবং সেখানে যথার্থ অবকাঠামো নির্মাণ করেছি। তিনি আশা করেন শিগগিরই ভাসানচরে জাতিসংঘের কর্মতত্পরতা শুরু হবে।

হাসিনা জোর দিয়েই বলেন যে বার বার আমি যে ভাবে বলেছি তারা মিয়ান্মারের নাগরিক, তাদেরকে নিরাপদে সুরক্ষার সঙ্গে মিয়ান্মারে ফেরত যেতে হবে এবং এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আন্তর্জাতিক মিত্রদের এবং উন্নয়ন সহযোগিদের এ ব্যাপারে বাংলাদেশকে সমর্থন দানের আহ্বান জানান। তিনি বলেন এটি সকলের সম্মিলিত দায়িত্ব কারণ এ ধরণের সমস্যা কোন বিশেষ দেশের সীমানার মধ্যে সীমিত থাকে না। এই বিষয়ে বিলম্ব হলে আমাদের সম্মিলিত নিরাপত্তা ও বিঘ্নিত হবে। তিনি বলেন তাদের হতাশার কারণে তারা উগ্রবাদি আদর্শের সহজ শিকারে পরিণত হতে পারে। আর এর ফলে গোটা অঞ্চলের অস্থিতিশীলতার আশংকাও রয়ে গেছে। সুতরাং প্রকৃতত পক্ষে জরুরি ভিত্তিতে আমাদের এখনই কাজ করতে হবে।

তিনি বলেন প্রধান সহযোগীদের এই আয়োজনে উপস্থিত দেখতে পেয়ে তিনি উত্সাহ বোধ করছেন। তিনি আশা করেন সকলেই এই গুরুতর সমস্যা সমাধানে বাংলাদেশের সঙ্গেই থাকবেন। তিনি বলেন কথার ঊর্ধ্বে উঠে আমাদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে প্রায়োগিক পদক্ষেপ নিতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের আগে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন মিয়ান্মারে রোহিঙ্গা সমস্যার ইতিহাস তুলে ধরেন এবং রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও নিশ্চিত প্রত্যাবসনের উপর জোর দেন।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি রূবাব ফাতিমা সঞ্চালনায়অন্যান্যদের মধ্যে বক্তব্য রাখেন মিযান্মার বিষয়ক আসিয়ানের বিশেষ দূত এরিভান ইউসুফ । তা ছাড়া তুরস্ক , গাম্বিয়া , আয়ারল্যন্ড , সৌদি আরব, ভারত ও কানাডার প্রতিনিধিরাও বক্তব্য রাখেন।

এ দিকে জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের মিশন প্রধান লিন্ডা টমাস গ্রীন-ফিল্ড রোহিঙ্গারা যে মানবিক সংকটের সম্মুখীন তার জন্য বর্মার ভেতরে ও বাইরে আরও ১৮০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দানের কথা বলেন। তিনি বলেন এই অর্থের মধ্যে প্রায় ১৫৮ মিলিয়ন ডলার দেওয়া হবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে রোহিঙ্গাদের জন্য এই সহায়তার কারণে রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা , আশ্রয়, খাদ্য , বিশুদ্ধ পানীয় জল , স্বাস্থ্য পরিচর্যা আএবং মনস্তাত্বিক সহায়তা প্রদান সম্ভব হবে। কভিড-১৯ দূর্যোগ থেকে রোহিঙ্গাদের ত্রাণ পেতে যেমন সহায়তা দেবে এই অর্থ তেমনি বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও অন্যান্য দক্ষতারও প্রশিক্ষণ প্রদান করবে।


XS
SM
MD
LG